স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। স্বামীজী তখন পেরেন্টাপল্লীতে উঁচু পাহাড়ের মাথায় কুটিয়া বানিয়ে সাধন-ভজন করছিলেন এবং ওনাকে কেন্দ্র করে অনেকরকম লোকিক বা অলৌকিক ঘটনা ঘটছিল__সেই সব কথা বলা হচ্ছিলো।।
পাহাড়ের উঁচুতে সাধন ভজন করার সময় কখনও কখনও তার প্রবল ইচ্ছা হোতো পাহাড়ের নিচে অবস্থিত আশ্রমের কুটিরে যাওয়ার! সঙ্গে সঙ্গেই তিনি হাঁটা শুরু করতেন । আলো, অন্ধকার,রাস্তার দুর্গমতা ইত্যাদি সেই সময় তাঁর কাছে কোনো সমস্যাই ছিল না । ঈশ্বর চিন্তায় নেশাগ্রস্থের মতো চোখ বন্ধ করেই তিনি পাহাড়ের উঁচু স্থান থেকে নিচুতে তাঁর আশ্রমে আসতে পারতেন । যে পথে তিনি নামতেন, সেই পথেই তার ‘পা’-ই তাকে এগিয়ে নিয়ে যেত, যেন তারা পথ চেনে_ পথ জানে।
কখনো কখনো পাহাড়ে ওঠা বা নামার সময় তিনি একতারা বাজিয়ে গান গাইতেন! এতে করে পাহাড়ে ওঠা বা নামার জন্য তাঁর কোনো কষ্ট হোতো না এবং পথের মধ্যে অসংখ্য কাঁটাগাছ থাকলেও কোনদিনই তাঁর পায়ে একটাও কাঁটা ফুটতো না।
পাহাড়ের উপরে থাকাকালীন তিনি খুব অল্প খাবার খেতেন । কোনো কোনো দিন উনি না খেয়েই কাটিয়ে দিতেন, আবার কখনো কখনো পাকা ফল খেতেন। যথেষ্ট পরিমাণে খাবার না খাওয়ার দরুন তাঁর স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারতো, শরীর দুর্বল হোতে পারতো, কিন্তু ওই অবস্থাতেই তিনি যথেষ্ট সবল ছিলেন, সুস্থ ছিলেন। যদিও তিনি মোটাসোটা ছিলেন না কিন্তু শক্তসমর্থ ছিলেন। এই অবস্থায় তাঁর ত্বক সোনার মতো উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিল । প্রকৃতপক্ষে তাঁর শরীর স্বাভাবিকভাবেই(naturally) পুষ্টি হোতো। পার্থিব কোনো খাবারের দ্বারা নয়। নচেৎ স্বামীজীর পক্ষে ওই অবস্থায় তাঁর শরীর ঠিক রাখা সম্ভব হোতো না এবং তাঁর ত্বক‌ও এতো উজ্জ্বল হোতো না।
স্বামীজি পাহাড়ের উপর প্রায় বারো মাস ধরে কঠোর তপস্যা করেছিলেন । একদিন রাত্রে তাঁর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হোল, তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন পেলেন । তাঁর (শ্রীরামকৃষ্ণদেবের) গায়ের রঙ ছিল সোনালী! তাঁর হাত ও পা গলিত সোনার মতো দেখাচ্ছিল! তাঁর পরনে ছিল লেংটি এবং কাঁধে ছিল উত্তরীয়! এই উত্তরীয় হাঁটু পর্যন্ত ঝোলা ! ছবিতে যে ভঙ্গী দেখা যায়, ঠিক সেই ভঙ্গিতে মাথায় পাগড়ী বেঁধে স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ।
এই দুই মহাপুরুষকে দেখে স্বামীজী ভক্তি ভরে উঠে দাঁড়ালেন । তাঁদের দুজনেরই এই হাসিমুখ তাঁর অন্তরে চরম আনন্দের সূচনা করেছিল। তিনি ঈশ্বরকে স্বাগত জানাতে চাইলেন কিন্তু কথা বলতে পারছিলেন না । আনন্দে হতবাক হয়ে ছিলেন ! ভাবে তিনি তখন ভরপুর এবং আনন্দে তার বুক বুক ফুলে ফুলে উঠছিলো! জিহ্বা যা করতে পারলো না তা করলো চোখ ! তাঁর চোখদুটি হতে প্রবল বেগে অশ্রুপাত হতে লাগলো।।(ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
গেরুয়া নেওয়ার ইচ্ছা প্রসঙ্গে স্বামীজীকে জিজ্ঞাসা করায় স্বামীজী বললেন :– “ গেরুয়াধারীকে সর্বলােকে স্বীকৃতি জানাবে এরকম কোন কথা নেই। এটা ব্যক্তি এবং পরিবেশের উপর নির্ভর করে। গেরুয়া ধারণ করলেই সন্ন্যাসী হয় না। সত্যনিষ্ঠা, প্রচণ্ড ত্যাগ, হৃদয়ের প্রসারতা এবং মনুষ্যত্ব — এইগুলি হল সন্ন্যাসীর বৈশিষ্ট্য। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলি অর্জন করা যায় – কৃপা লাভের দ্বারা, অভ্যাসের দ্বারা এবং জীবন যাপনের দ্বারা। গেরুয়া পড়লেই এগুলি অর্জন করা যায় না। গেরুয়া সন্ন্যাসের প্রতীক। কিন্তু একথা বলা যায় না যে, যারাই গেরুয়া পড়েছে তারাই সন্ন্যাসীতে রূপান্তরিত হয়েছে এবং বিখ্যাত হয়েছে। যাদের জীবনে পরিবর্তন এসেছে তারা গেরুয়া পড়ুক বা নাই পড়ুক লােকে তাদেরকে স্বীকৃতি জানাবে। ধর্মই ঐ সমস্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করে থাকে। লােকের স্বীকৃতি পেল আর নাই পেল তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। আর এটা ভাবা ভুল যে গেরুয়াধারীরাই একমাত্র ভিক্ষা পায় এবং বসবাসের জায়গা পায়।
আদর্শ বিশুদ্ধ হওয়া উচিত। উৎসর্গ যা হবে তা যেন হয় ভাবনায়, কথায় এবং কাজে। তােমার উচিত নির্জনে গিয়ে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া। একমাত্র তখনই তুমি ফল পাবে।”
জিজ্ঞাসা :– “ সন্ন্যাস গ্রহণের পর তপস্যা করাই তাে রীতি। আমি বুঝতে পারছি না কেন আপনি আমাকে এ পথ হতে নিবৃত্ত করতে চাইছেন। আমি কি অনুপযুক্ত? আপনি কি আমাকে গেরুয়া দেবেন না ?–দয়া করে পরিষ্কার করে বলুন।”
মীমাংসা :– “ তুমি অনুপযুক্ত বা তােমাকে গেরুয়া দেওয়া হবে না বলে আমরা তােমাকে নিবৃত্ত করছি তা নয়। ‘ সন্ন্যাস ’ কথার তাৎপর্য এবং বৈশিষ্ট্য বােঝার চেষ্টা কর। আদর্শ সন্ন্যাসীর লক্ষণ হল — পার্থিব সমস্ত কিছুর সংস্ৰব ত্যাগ, পার্থিব সমস্ত কিছুর প্রতি অনাসক্তি এবং উদার ও বিশাল হৃদয়। শুধু তুমি নও, প্রত্যেক মানুষই এই বৈশিষ্ট্যগুলি পাওয়ার অধিকারী। জন্মসূত্রে তারা এগুলির অধিকারী। এই অবস্থা পাওয়ার জন্য গেরুয়া পড়ার দরকার নেই এবং সাধনা করার জন্যও তোমার গেরুয়া পড়ার প্রয়ােজন নেই। তুমি রামেতেই রয়েছ এবং তাঁর কৃপা তােমার উপর রয়েছে। আর কি চাও? তুমি রামের(রামতীর্থ) কাজ এবং চিন্তাতেই রয়েছ। ত্যাগ, সত্যের প্রতি ভালবাসা এবং পরম আনন্দ তােমার মধ্যে রয়েছে। সাধনা করতে থাক। সাধনা করার পরিবর্তে যদি তুমি নাম, যশের লালসায় গেরুয়া পরিধান কর তাহলে বিপদ আছে। এবং আদর্শ লাভের সম্ভাবনাও তােমার থাকবে না। যে উৎকৃষ্ট সময় তুমি সাধনা করে কাটাতে পারতে তা এরকম খ্যাতি লাভ করতেই কেটে যাবে। ত্যাগ, নিঃস্বার্থপরতা এবং নির্ভয়তায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে পরবর্তী সময়ে লােকের সঙ্গে মেলামেশা করলেও কোন ভয় থাকে না। এজন্য তােমার এই অভিপ্রায় হতে তােমাকে সরে থাকতে বলছি। ”
জিজ্ঞাসা :– ‘ গেরুয়া ’ হল ত্যাগের প্রতীক। গেরুয়াধারী ঐ ত্যাগে প্রতিষ্ঠিত না হলেও, গেরুয়া পােষাকের দিকে তাকালেই তার ঐ আদর্শের কথা মনে পড়বে এবং সে পতন হতে রক্ষা পাবে। এই পােষাক পূর্ণতার লক্ষণ না হতে পারে কিন্তু এটা নিশ্চিত যে এতে ত্যাগের প্রতি অনুরাগ আসবে। এই কারণেই গেরুয়া পড়ার কোন অসুবিধা নেই এবং আমি গেরুয়া পড়ার জন্য মনস্থির করেছি। আমাকে আশীর্বাদ করুন। আপনি এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যের মূর্ত প্রতীক। আমার ঈপ্সিত আদর্শের পরাকাষ্ঠায় আপনি উন্নীত এবং ঐ আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আপনি কাজ করে চলেছেন। সেজন্য আমি মনে করি যে আপনিই আমাকে সন্ন্যাস দেওয়ার যােগ্য ব্যক্তি। আপনার নিকট সন্ন্যাস নিয়ে আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য আমি এসেছি। অনুগ্রহ করে আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করুন এবং আমাকে আশীর্বাদ করুন।”
মীমাংসা :– “ যেহেতু গেরুয়া দেওয়ার জন্য তুমি আমাকে পীড়াপীড়ি করছ সেহেতু তােমাকে আরও কয়েকটা কথা বলব। আমি গেরুয়া দেওয়ার বিরােধী। সুতরাং এখান হতে গেরুয়া পেতে পার না। মনের দিক থেকে তুমি সন্ন্যাসী এবং এখন যা নিতে চাইছ তা বাহ্যিক। তােমার মতো যার মধ্যে এরূপ পরিবর্তন বা রূপান্তর এসেছে তাকে কেউ যদি গেরুয়া দেন তাহলে তিনি তােমার গুরু হওয়ার জন্য যশ বা খ্যাতি লাভ করবেন। যদি তিনি ভাবেন যে তিনি তােমার চেয়ে বড় তাহলে তুমি ত সেই ভাবনায় ভাবিত হবে। এই সমস্ত চিন্তা করে আমরা তােমাকে তােমার নিজের স্বার্থের জন্য গেরুয়া দিতে নারাজ। তৎসত্ত্বেও যদি তুমি গেরুয়া পড়ার জন্য জিদ ধর, তাহলে তুমি নিজে নিজেই গেরুয়া পােষাক পড়। তাছাড়া স্বামী রামতীর্থ হলেন ত্যাগ এবং সত্যনিষ্ঠার প্রতিমূর্তি। তিনি হলেন তােমার গুরু। তিনিই তােমার সর্বোচ্চ আদর্শ। তিনি ইতিপূর্বেই তােমার মধ্যে শিকড় গেড়ে তােমার হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কেন তােমার এবং তােমার ঐ মহান গুরুর মাঝে অপর ব্যক্তিকে এনে বাধা সৃষ্টি করছ? আর তােমাকে গেরুয়া দিয়ে অন্য কারও গুরু সাজা উচিত নয় — তােমার এবং তােমার আদর্শের মাঝে দাঁড়ানােও তাঁর উচিত হবে না। এটা কোন সুযােগ নেওয়ার ব্যাপার নয়। যদি তুমি গেরুয়া পােষাক পড়তে চাও তাহলে গুরুকে স্মরণ করে নিজে নিজেই তা পড়ে নাও।”