স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। স্বামীজী যখন পেরেন্টাপল্লীতে সাধন-ভজন করছিলেন, সেই সময় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল_এখন সেইগুলো আলোচনা করা হচ্ছিলো।।
মাটিতে বীজ পড়লে যেমন তা সহজে নষ্ট হয় না, মাটির আর্দ্রতা যথেষ্ট পরিমাণে থাকলে বা বৃষ্টির জল পেলে অঙ্কুরিত হয়__ ঠিক তেমনি মূর্তিপূজারী সন্ন্যাসী, স্বামী বাউলানন্দকে তাড়াবার জন্য কিছু অশুভ শক্তির পূজা করেছিলেন এবং কয়েক মাস আশ্রম থেকে কিছু অশুভ কাজ করেছিলেন __তার সেই সব অশুভ শক্তি ঐ স্থানেই ক্রিয়াশীল ছিল। দত্তাত্রেয় প্রকটিত হয়ে যদি তাকে না সরাতো, তাহলে ওই অশুভ শক্তি আরো শক্তিশালী হোতো এবং হয়তো অজেয় হয়ে উঠতো।
ইতিপূর্বে দেখা গিয়েছে যে, ভালোবাসা- জ্ঞান এবং শক্তি সবসময়ই আধ্যাত্মিক পুরুষের দেহ থেকে নির্গত হয় এবং অনুরূপ শক্তির আধার সেগুলিকে শোষণ করে। যাই হোক, মুর্তি-পুজারী সন্ন্যাসী কতৃক সৃষ্ট এই অশুভ শক্তিগুলিও ক্রমশঃ শক্তিশালী হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।।
একদিন রাত্রে স্বামীজী আশ্রমেই ছিলেন। তিনি দেখলেন বহু মানুষ কুঠার, তরবারি এবং অন্যান্য অস্ত্র হাতে নিয়ে আশ্রম আক্রমণ করতে আসছে। তারা তাঁকেও আক্রমণ করতে উদ্যত! স্বামীজী সাধারণত খুবই নির্ভীক ছিলেন। হিংস্র বন্য জন্তুদেরকেও তিনি ভয় করতেন না। কিন্তু এই সময় তিনি আক্রমণকারীদেরকে দেখে ভয় পেলেন। আক্রমণকারীদের ভয়ে তিনি দৌড়াতে লাগলেন ! তাঁকে দৌড়াতে দেখে আক্রমণকারীরা আরো দ্রুতগতিতে তার দিকে ধাবিত হলো ।
স্বামী বিবেকানন্দের জীবনীতে আমরা দেখতে পাই ভ্রমণকালে একদিন তিনি কোনো এক অজানা স্থানের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন । হটাৎ কতকগুলি বানর তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করলো । স্বামীজী স্বভাবতই খুব সাহসী ছিলেন কিন্তু ওই সময় বানরের ভয়ে তিনিও দৌড়াতে লাগলেন। স্বামী বিবেকানন্দকে দৌড়াতে দেখে বানরগুলি তাঁর দিকে আরো দ্রুতগতিতে ধাবিত হোলো । এমন সময় তিনি একজন বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন, যিনি বললেন __”থামো, জানোয়ারদের সামনে রুখে দাঁড়াও!” এই কথা শুনে স্বামী বিবেকানন্দ দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং বাঁদর গুলিকে বাধা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা পালিয়ে গেল।
এটিও ছিল অনুরূপ একটা পরিস্থিতি, কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছিল স্বপ্নদর্শনে এবং পরিণতি ও ছিল পৃথক ! যারা মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে স্বামী বাউলানন্দকে ধাওয়া করেছিল, তাদের ভয়ে তিনি ভীত হয়েছিলেন ! তাদের দিকে পিছন ফিরে তিনি যখন দৌড়াতে লাগলেন, তখন সেই অশুভ শক্তিরূপী অস্ত্রধারী মানুষগুলি__ স্বামীজী ভীত হয়েছেন দেখে আরো শক্তি এবং উদ্যম নিয়ে তার পিছু ধাওয়া করলো । স্বামীজী দ্রুত গতিতে দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে এক নদীর ধারে এসে থামতে বাধ্য হোলেন ! তিনি খুবই সমস্যায় পড়লেন কারণ নদী কত গভীর তা তার জানা ছিল না ! জলে নামলে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল ! কিন্তু তিনি যদি নদীর তীরে দাঁড়িয়েও থাকেন, তাহলেও ওই অশুভ শক্তিরূপী মানুষেরা তাঁকে ধরে ফেলবে এবং হত্যা করবে ! উভয় সংকটে পড়লেন তিনি __কি করবেন তা স্থির করতে পারছিলেন না!!
এমনসময় তিনি দেখলেন _নদীর অপর পাড়ে ৪/৫-বছরের একটি বালিকা দাঁড়িয়ে আছে। সে সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁতন করছিল!
সেই মেয়েটির মাথায় আলুথালু কোঁকড়ানো চুল! সেই চুল তার মুখ ঢেকে ফেলেছে ! মেয়েটির নাক দিয়ে সর্দি ঝরছে, পরনে তার একফালি কাপড় ! ভাবভঙ্গি তার অদ্ভুত এবং অস্বাভাবিক !
তাকে দেখে স্বামীজীর হুঁশ ফিরে এলো । “এই মেয়ে জগদম্বারই প্রকাশ” __একথা ভাবতেই তিনি দেখলেন সেই বালিকার মধ্যে থেকে শক্তি বেরিয়ে এলো ! তিনি আরো দেখলেন সেই ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য __জগদম্বার মুখ হতে জ্যোতিও বেরিয়ে এলো ! এতে স্বামীজীর মন থেকে ভয়ঙ্কর ভয়ের অন্ধকার দূর হয়ে গেল ! পরে একটা শব্দ শোনা গেল _”নদী পার হয়ে এপারে আয়!” জগদম্বার এই কথা __সম্ভবত সেই সব দুষ্ট শক্তিদেরও শ্রুতিগোচর হোলো ! এই শব্দ তাদের কাছে সিংহগর্জনের মত মনে হোলো ! তারা আর এক পা-ও এগোতে পারলো না । ভয় পেয়ে সরে গেল । নদী পার হয়ে স্বামীজী অনুভব করলেন যে, তিনি মা জগদম্বার আশ্রয়ে এসে পড়েছেন। চরম নিরাপত্তাবোধ করতে লাগলেন তিনি। পিছন ফিরে চেয়ে দেখলেন যে, পশ্চাদ্ধাবনকারীরা পালিয়েছে ! এটা দেখে তিনি সত্যিই একটু অবাক হোলেন। এইভাবে একটা ঘোর দুস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে তাঁর সেই রাতটা কেটে গেল।
পরের দিন সকালে মন্দিরের পূজো সেরে স্বামীজী ঝর্ণার কাছে গেলেন ! সেখানে তিনি আগের দিনের দেখা জগদম্বার মূর্তির অনুরূপ ৪/৫-বছরের একটি মেয়েকে দাঁতন করতে দেখলেন ! এই মেয়েটিরও চুল কোঁকড়ানো এবং আলুথালু ! এরও নাক দিয়ে সর্দি পড়ছিল _একেবারে অস্বাভাবিক অবস্থা। এই দৃশ্য দেখে স্বামীজী খুবই উল্লসিত হোলেন ! চরম আনন্দে এবং ভাবাবেগে তিনি “মা” বলে চিৎকার করে উঠলেন ! এই “মা”-ডাক শুনে ছোট্ট বালিকা মা-টি খিল খিল করে হেসে উঠলো। স্বামীজী এই বালিকা মা-টিকে আশ্রমে নিয়ে এলেন। ততক্ষণে ভোগ রান্না হয়ে গিয়েছিল। আশ্রম-দেবতাকে নিবেদন করে ভোগের কিছুটা অংশ ওই মাকে খেতে দেওয়া হোলো। মা-টি চরম তৃপ্তি ভরে প্রসাদ খেয়ে হাসিমুখে গ্রামে ফিরে গেল।
এরপর থেকে প্রতিদিন সেই মা-টি আশ্রমে প্রসাদ খেতে আসতো ! স্বামীজি আদর করে তাকে “মা” বলে ডাকতেন । ফলে, আশ্রমে যেই আসতো_ সেই ঐ বালিকাকে “মা” বলেই ডাকতো ! সে এখন সকলের মা _সে আশ্রমের মা ! সত্যিই সে মা _ আশ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিদেরও মা!!
==================©==========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………
স্বামীজী (স্বামী বাউলানন্দ) বলতে লাগলেন, ” আজ সন্ধ্যাবেলায় স্বামী বিবেকানন্দের একটা বই-এ পড়ছিলাম যে, যদি ‘একজন আগের কোনো ধর্ম-প্রবর্তকের সঙ্গে আরেকজন নবীন ধর্ম-প্রবর্তকের মতের যদি অমিল দেখা যায়, তাহলে বিচারবুদ্ধি দিয়ে এর মীমাংসা করতে হবে। তা না হলে নবীন ধর্মপ্রবর্তকের কথা এবং আগের জনের কথা,যা পুস্তকে লেখা রয়েছে, সেই সব বিষয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্য রয়েই যাবে। আর সমস্ত ধর্মের সার হল মনুষ্যত্ব।’
স্বামী বিবেকানন্দের এই কথাগুলি সত্যই মহৎ। মনুষ্যত্ব বলতে কেবলমাত্র মানুষের শরীর বা জাগতিক চেতনাকেই বুঝায় না, সূক্ষ্ম হতে আধ্যাত্মিক সমস্ত চেতনাকেই বুঝায়। মানুষের সমগ্র চেতনার যথাযথ ক্রিয়া হোতেই মনুষ্যত্বের বিকাশ। যদি কাণ্ডজ্ঞান, সূক্ষ্ম এবং সূক্ষ্মতর চেতনা গুণগত দক্ষতাসহ যথাযথ ক্রিয়া করে তাহলে মানব __দেবত্ব লাভ করে।
যে সমস্ত মহান আধ্যাত্মিক পুরুষের পূর্ণ মনুষ্যত্বের বিকাশ হয়েছে, তাঁরা সাধারণ মানুষকে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যে কতকগুলি নীতি প্রণয়ন করার প্রয়ােজন বােধ করেন। এইগুলি পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়।
মহামানবদের অনুভূতিগুলি মানুষ নিজ নিজ ভাব অনুযায়ী গ্রহণ করে, ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করে না এবং সমস্ত সম্ভাব্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করে না। মহান ব্যক্তিরা নিজ নিজ মত প্রকাশ করেন। এভাবে বিভিন্ন ধর্মের উৎপত্তি হচ্ছে। আমরা অনেক ধর্ম-প্রবর্তকের কথা শুনেছি যাঁরা বিভিন্ন ধর্মের (সম্প্রদায়ের) সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আমরা এমন কোনো মানুষের কথা শুনি নি যে, ঐ সমস্ত ধর্মের দ্বারা পূর্ণ মানব তৈরী হয়েছে। যীশু খ্রীষ্ট, গৌতম বুদ্ধ, শঙ্কর, রামানুজ, মাধ্ব—এঁরা সকলেই মহাপুরুষ। তাঁদের ঘোষিত সমস্ত কথাই ধর্মপুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে । তাঁদের অনুগামীরা তাঁদের কথাগুলি বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছেন। এইভাবেই বেশী সংখ্যক পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এই সমস্ত বই-ই অণু-ধর্ম (sub-religion)-এর উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্ত বই পড়ে কোন পূর্ণ মানব তৈরী হননি। ধর্ম পুস্তকগুলি ভিন্ন ভিন্ন নীতি প্রচার করছে। কোনো কোনো বই-এ গরুর পূজা করতে বলছে। আবার কোন পুস্তক গরু-বধ করে খাওয়ার কথা বলছে ।
মনুষ্যত্বের অপয়িহার্য লক্ষণ হল ঐক্য। কিন্তু ধর্মমত বা সম্প্রদায় স্বার্থের গণ্ডীতে পুষ্টিলাভ করছে। এই সম্প্রদায় সৃষ্ট-স্বার্থের কোন সীমা নাই। অসীম সঙ্কীর্ণতার মধ্যে ইহা বর্দ্ধিত হচ্ছে। এর ফলে এক ধর্ম (সম্প্রদায়) অন্য ধর্মের বিরােধী হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিভিন্ন বর্ণের মানুষ সমাজে বাস করছে ৷ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য–এই বর্ণের মানুষ অন্যান্য বর্ণের মানুষদের হিন্দুধর্মের অন্তর্গত বলে মনেই করে না।(ক্রমশঃ)
মাটিতে বীজ পড়লে যেমন তা সহজে নষ্ট হয় না, মাটির আর্দ্রতা যথেষ্ট পরিমাণে থাকলে বা বৃষ্টির জল পেলে অঙ্কুরিত হয়__ ঠিক তেমনি মূর্তিপূজারী সন্ন্যাসী, স্বামী বাউলানন্দকে তাড়াবার জন্য কিছু অশুভ শক্তির পূজা করেছিলেন এবং কয়েক মাস আশ্রম থেকে কিছু অশুভ কাজ করেছিলেন __তার সেই সব অশুভ শক্তি ঐ স্থানেই ক্রিয়াশীল ছিল। দত্তাত্রেয় প্রকটিত হয়ে যদি তাকে না সরাতো, তাহলে ওই অশুভ শক্তি আরো শক্তিশালী হোতো এবং হয়তো অজেয় হয়ে উঠতো।
ইতিপূর্বে দেখা গিয়েছে যে, ভালোবাসা- জ্ঞান এবং শক্তি সবসময়ই আধ্যাত্মিক পুরুষের দেহ থেকে নির্গত হয় এবং অনুরূপ শক্তির আধার সেগুলিকে শোষণ করে। যাই হোক, মুর্তি-পুজারী সন্ন্যাসী কতৃক সৃষ্ট এই অশুভ শক্তিগুলিও ক্রমশঃ শক্তিশালী হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।।
একদিন রাত্রে স্বামীজী আশ্রমেই ছিলেন। তিনি দেখলেন বহু মানুষ কুঠার, তরবারি এবং অন্যান্য অস্ত্র হাতে নিয়ে আশ্রম আক্রমণ করতে আসছে। তারা তাঁকেও আক্রমণ করতে উদ্যত! স্বামীজী সাধারণত খুবই নির্ভীক ছিলেন। হিংস্র বন্য জন্তুদেরকেও তিনি ভয় করতেন না। কিন্তু এই সময় তিনি আক্রমণকারীদেরকে দেখে ভয় পেলেন। আক্রমণকারীদের ভয়ে তিনি দৌড়াতে লাগলেন ! তাঁকে দৌড়াতে দেখে আক্রমণকারীরা আরো দ্রুতগতিতে তার দিকে ধাবিত হলো ।
স্বামী বিবেকানন্দের জীবনীতে আমরা দেখতে পাই ভ্রমণকালে একদিন তিনি কোনো এক অজানা স্থানের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন । হটাৎ কতকগুলি বানর তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করলো । স্বামীজী স্বভাবতই খুব সাহসী ছিলেন কিন্তু ওই সময় বানরের ভয়ে তিনিও দৌড়াতে লাগলেন। স্বামী বিবেকানন্দকে দৌড়াতে দেখে বানরগুলি তাঁর দিকে আরো দ্রুতগতিতে ধাবিত হোলো । এমন সময় তিনি একজন বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন, যিনি বললেন __”থামো, জানোয়ারদের সামনে রুখে দাঁড়াও!” এই কথা শুনে স্বামী বিবেকানন্দ দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং বাঁদর গুলিকে বাধা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা পালিয়ে গেল।
এটিও ছিল অনুরূপ একটা পরিস্থিতি, কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছিল স্বপ্নদর্শনে এবং পরিণতি ও ছিল পৃথক ! যারা মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে স্বামী বাউলানন্দকে ধাওয়া করেছিল, তাদের ভয়ে তিনি ভীত হয়েছিলেন ! তাদের দিকে পিছন ফিরে তিনি যখন দৌড়াতে লাগলেন, তখন সেই অশুভ শক্তিরূপী অস্ত্রধারী মানুষগুলি__ স্বামীজী ভীত হয়েছেন দেখে আরো শক্তি এবং উদ্যম নিয়ে তার পিছু ধাওয়া করলো । স্বামীজী দ্রুত গতিতে দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে এক নদীর ধারে এসে থামতে বাধ্য হোলেন ! তিনি খুবই সমস্যায় পড়লেন কারণ নদী কত গভীর তা তার জানা ছিল না ! জলে নামলে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল ! কিন্তু তিনি যদি নদীর তীরে দাঁড়িয়েও থাকেন, তাহলেও ওই অশুভ শক্তিরূপী মানুষেরা তাঁকে ধরে ফেলবে এবং হত্যা করবে ! উভয় সংকটে পড়লেন তিনি __কি করবেন তা স্থির করতে পারছিলেন না!!
এমনসময় তিনি দেখলেন _নদীর অপর পাড়ে ৪/৫-বছরের একটি বালিকা দাঁড়িয়ে আছে। সে সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁতন করছিল!
সেই মেয়েটির মাথায় আলুথালু কোঁকড়ানো চুল! সেই চুল তার মুখ ঢেকে ফেলেছে ! মেয়েটির নাক দিয়ে সর্দি ঝরছে, পরনে তার একফালি কাপড় ! ভাবভঙ্গি তার অদ্ভুত এবং অস্বাভাবিক !
তাকে দেখে স্বামীজীর হুঁশ ফিরে এলো । “এই মেয়ে জগদম্বারই প্রকাশ” __একথা ভাবতেই তিনি দেখলেন সেই বালিকার মধ্যে থেকে শক্তি বেরিয়ে এলো ! তিনি আরো দেখলেন সেই ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য __জগদম্বার মুখ হতে জ্যোতিও বেরিয়ে এলো ! এতে স্বামীজীর মন থেকে ভয়ঙ্কর ভয়ের অন্ধকার দূর হয়ে গেল ! পরে একটা শব্দ শোনা গেল _”নদী পার হয়ে এপারে আয়!” জগদম্বার এই কথা __সম্ভবত সেই সব দুষ্ট শক্তিদেরও শ্রুতিগোচর হোলো ! এই শব্দ তাদের কাছে সিংহগর্জনের মত মনে হোলো ! তারা আর এক পা-ও এগোতে পারলো না । ভয় পেয়ে সরে গেল । নদী পার হয়ে স্বামীজী অনুভব করলেন যে, তিনি মা জগদম্বার আশ্রয়ে এসে পড়েছেন। চরম নিরাপত্তাবোধ করতে লাগলেন তিনি। পিছন ফিরে চেয়ে দেখলেন যে, পশ্চাদ্ধাবনকারীরা পালিয়েছে ! এটা দেখে তিনি সত্যিই একটু অবাক হোলেন। এইভাবে একটা ঘোর দুস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে তাঁর সেই রাতটা কেটে গেল।
পরের দিন সকালে মন্দিরের পূজো সেরে স্বামীজী ঝর্ণার কাছে গেলেন ! সেখানে তিনি আগের দিনের দেখা জগদম্বার মূর্তির অনুরূপ ৪/৫-বছরের একটি মেয়েকে দাঁতন করতে দেখলেন ! এই মেয়েটিরও চুল কোঁকড়ানো এবং আলুথালু ! এরও নাক দিয়ে সর্দি পড়ছিল _একেবারে অস্বাভাবিক অবস্থা। এই দৃশ্য দেখে স্বামীজী খুবই উল্লসিত হোলেন ! চরম আনন্দে এবং ভাবাবেগে তিনি “মা” বলে চিৎকার করে উঠলেন ! এই “মা”-ডাক শুনে ছোট্ট বালিকা মা-টি খিল খিল করে হেসে উঠলো। স্বামীজী এই বালিকা মা-টিকে আশ্রমে নিয়ে এলেন। ততক্ষণে ভোগ রান্না হয়ে গিয়েছিল। আশ্রম-দেবতাকে নিবেদন করে ভোগের কিছুটা অংশ ওই মাকে খেতে দেওয়া হোলো। মা-টি চরম তৃপ্তি ভরে প্রসাদ খেয়ে হাসিমুখে গ্রামে ফিরে গেল।
এরপর থেকে প্রতিদিন সেই মা-টি আশ্রমে প্রসাদ খেতে আসতো ! স্বামীজি আদর করে তাকে “মা” বলে ডাকতেন । ফলে, আশ্রমে যেই আসতো_ সেই ঐ বালিকাকে “মা” বলেই ডাকতো ! সে এখন সকলের মা _সে আশ্রমের মা ! সত্যিই সে মা _ আশ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিদেরও মা!!
==================©==========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………
স্বামীজী (স্বামী বাউলানন্দ) বলতে লাগলেন, ” আজ সন্ধ্যাবেলায় স্বামী বিবেকানন্দের একটা বই-এ পড়ছিলাম যে, যদি ‘একজন আগের কোনো ধর্ম-প্রবর্তকের সঙ্গে আরেকজন নবীন ধর্ম-প্রবর্তকের মতের যদি অমিল দেখা যায়, তাহলে বিচারবুদ্ধি দিয়ে এর মীমাংসা করতে হবে। তা না হলে নবীন ধর্মপ্রবর্তকের কথা এবং আগের জনের কথা,যা পুস্তকে লেখা রয়েছে, সেই সব বিষয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্য রয়েই যাবে। আর সমস্ত ধর্মের সার হল মনুষ্যত্ব।’
স্বামী বিবেকানন্দের এই কথাগুলি সত্যই মহৎ। মনুষ্যত্ব বলতে কেবলমাত্র মানুষের শরীর বা জাগতিক চেতনাকেই বুঝায় না, সূক্ষ্ম হতে আধ্যাত্মিক সমস্ত চেতনাকেই বুঝায়। মানুষের সমগ্র চেতনার যথাযথ ক্রিয়া হোতেই মনুষ্যত্বের বিকাশ। যদি কাণ্ডজ্ঞান, সূক্ষ্ম এবং সূক্ষ্মতর চেতনা গুণগত দক্ষতাসহ যথাযথ ক্রিয়া করে তাহলে মানব __দেবত্ব লাভ করে।
যে সমস্ত মহান আধ্যাত্মিক পুরুষের পূর্ণ মনুষ্যত্বের বিকাশ হয়েছে, তাঁরা সাধারণ মানুষকে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যে কতকগুলি নীতি প্রণয়ন করার প্রয়ােজন বােধ করেন। এইগুলি পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়।
মহামানবদের অনুভূতিগুলি মানুষ নিজ নিজ ভাব অনুযায়ী গ্রহণ করে, ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করে না এবং সমস্ত সম্ভাব্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করে না। মহান ব্যক্তিরা নিজ নিজ মত প্রকাশ করেন। এভাবে বিভিন্ন ধর্মের উৎপত্তি হচ্ছে। আমরা অনেক ধর্ম-প্রবর্তকের কথা শুনেছি যাঁরা বিভিন্ন ধর্মের (সম্প্রদায়ের) সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আমরা এমন কোনো মানুষের কথা শুনি নি যে, ঐ সমস্ত ধর্মের দ্বারা পূর্ণ মানব তৈরী হয়েছে। যীশু খ্রীষ্ট, গৌতম বুদ্ধ, শঙ্কর, রামানুজ, মাধ্ব—এঁরা সকলেই মহাপুরুষ। তাঁদের ঘোষিত সমস্ত কথাই ধর্মপুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে । তাঁদের অনুগামীরা তাঁদের কথাগুলি বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছেন। এইভাবেই বেশী সংখ্যক পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এই সমস্ত বই-ই অণু-ধর্ম (sub-religion)-এর উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্ত বই পড়ে কোন পূর্ণ মানব তৈরী হননি। ধর্ম পুস্তকগুলি ভিন্ন ভিন্ন নীতি প্রচার করছে। কোনো কোনো বই-এ গরুর পূজা করতে বলছে। আবার কোন পুস্তক গরু-বধ করে খাওয়ার কথা বলছে ।
মনুষ্যত্বের অপয়িহার্য লক্ষণ হল ঐক্য। কিন্তু ধর্মমত বা সম্প্রদায় স্বার্থের গণ্ডীতে পুষ্টিলাভ করছে। এই সম্প্রদায় সৃষ্ট-স্বার্থের কোন সীমা নাই। অসীম সঙ্কীর্ণতার মধ্যে ইহা বর্দ্ধিত হচ্ছে। এর ফলে এক ধর্ম (সম্প্রদায়) অন্য ধর্মের বিরােধী হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিভিন্ন বর্ণের মানুষ সমাজে বাস করছে ৷ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য–এই বর্ণের মানুষ অন্যান্য বর্ণের মানুষদের হিন্দুধর্মের অন্তর্গত বলে মনেই করে না।(ক্রমশঃ)
