স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখন যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন অবশ্য উনি পেরেন্টাপল্লীতেই পাকাপাকিভাবে থেকে সাধন-ভজন করছিলেন। এখানেই ওনার জীবনে বহু অলৌকিক ঘটনা ঘটে চলেছিল । এখানেই তাঁর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন, মা জগদম্বার দর্শন ইত্যাদি নানা দর্শন হয়েছিল এবং ওনার ভবিষ্যৎ জীবনের কর্ম-পরিকল্পনা কি হবে__ তার নির্দেশ পাচ্ছিলেন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল যে পেরেন্টাপল্লী গ্রামটি হোল হায়দ্রাবাদের নিজাম রাজ্যের শেষ সীমা। এই এলাকা ঘন বনে ঢাকা! বাঘ, চিতা প্রভৃতি সমস্ত ধরনের বন্যজন্তু সেখানে বাস কোরতো। সীমানা পরিদর্শনের অজুহাতে নিজাম সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা এই বনে শিকার করতে আসতো।
যে কেউ পেরেন্টাপল্লী গ্রামে আসতো, সেই স্বামী বাউলানন্দজী কে দর্শন করার জন্য আশ্রমে আসতো। তাদের নিকট স্বামীজী ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য !
মিঃ ডব্লিউ টার্নার নামে নিজাম সরকারের একজন এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলর ছিলেন । তিনি 1933 সালে পেরেন্টাপল্লী আশ্রম দর্শন করে কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন । অবসর গ্রহণের পর তিনি ইংল্যান্ড চলে যান । সেখানে তিনি এডিনবরার চেম্বার্স পত্রিকায় একটা লেখা প্রকাশ করেন । এই লেখাটির শিরোনাম ছিল “একজন রোগীর শক্তি”! লেখাটি 1954 সালে “ওয়ার্ল্ড ডাইজেস্ট্” পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হয় !
কর্নেল রাজু ওই লেখাটি পড়েছিলেন । তিনি ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনীতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সহচর ছিলেন । পরে তিনি ভারত সরকারের একজন মন্ত্রী হয়েছিলেন । রাজমন্দ্রি এসে তিনি স্বামীজীর সঙ্গে দেখা করেন । তিনি লেখাটি স্বামীজীকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করেন__ এটা তাঁর সম্বন্ধেই লেখা কিনা?
ঐদিন লেখক আঃ বেঙ্কট রাও স্বামীজীর নিকটেই ছিলেন । তিনি স্বামীজীকে লেখাটি পড়ে শুনিয়েছিলেন । লেখাটির সারমর্ম ছিল নিম্নরূপ:—
“তোমরা যদি ভারতের মহান যোগীদেরকে দেখতে চাও, তাহলে তাদেরকে শহরে দেখতে পাবে না _এমনকি গ্রামেও না ! যদি সত্যই তাঁদের দেখার ইচ্ছা তোমাদের থাকে, তাহলে তোমাদেরকে হিমালয়ের গুহায় গুহায় বা অন্য কোনো বন-জঙ্গলে খুঁজতে হবে । তাদের অধিকাংশই উলঙ্গ অবস্থায় থাকেন। তুষারপাতের সময় বা প্রচণ্ড ঠান্ডায় তারা নিজেদেরকে অনাবৃত রাখেন। তাঁরা তপস্যা করতে বসে সমাধিস্থ হয়ে যান । প্রায়শঃই তাঁরা কোনো বাহ্যিক খাবার খান না, তবে কখনো কখনো তাঁরা অল্প খাবার গ্রহন করেন। একজন করে শিষ্য তাঁদের পাহারা দেন এবং সযত্নে তাঁর পরিচর্যা করেন । সেই সেবক একান্ত ভক্তিভাবে গুরু সেবা করেন । কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, যদি তাঁরা সেবা দ্বারা গুরুকে সন্তুষ্ট করতে পারেন __তাহলে তাদের অভিষ্ঠ সিদ্ধ হবে।।
জলের উপর দিয়ে হাঁটা, শূন্যে ঘোরাফেরা করা, রোগ নিরাময় করা এবং জীবনের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করা ওই সমস্ত যোগীদের পক্ষে অনায়াসেই সম্ভব ।
1933 সালে নিজাম রাজ্যের পপি হিলের বনে “স্বামী ঈশ্বর* নামে এক স্বামীর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয় ! ওই এলাকায় “রেড্ডি” নামে এক পাহাড়ি আদিবাসী জনজাতি বাস করে । স্বামীজী ভারতবর্ষের সমস্ত স্থান পরিদর্শন করেছেন ।
বন বিভাগের প্রধান নবাব ইয়ার জং বাহাদুরের সঙ্গে বড়দিনে অর্থাৎ ক্রিসমাস ডে তে স্বামীজীকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
যখন আমরা তাকে দেখলাম, তখন তিনি প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় ছিলেন! পপি পাহাড় হতে যে ঝর্ণা নিচে নেমে আসছে সেই ঝর্ণার বরফের ন্যায় ঠাণ্ডা জলে তিনি তখন ডুব দিয়ে স্নান করছিলেন। স্বামীজীর বলিষ্ঠ দেহ সুন্দর মুখ,__ সুন্দর মানুষ তিনি!
সমস্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা বিশেষ করে তেলেগু ভাষী, যাঁরা ঐ অঞ্চলে চাকরি করতেন__ তাঁরা সকলে ওই সন্ন্যাসীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন । সাষ্টাঙ্গে অথবা পা ছুঁয়ে প্রণাম করাটাকে তাঁরা তাদের ভাগ্য বলে মনে করতেন । স্বামীজীর বেশি খাবারের প্রয়োজন হোতো না ! লোকে বলে __’তিনি নাকি কোনো খাবারই খান না!! কিন্তু স্বামীজি নিজে বলেছেন তিনি কখনো কখনো কিছু খাবার খান !
স্বামীজী একজন ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েট ছিলেন, ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন । কেন তিনি নিঃসঙ্গ জীবন পছন্দ করলেন __এরূপ প্রশ্ন করা হলে, তিনি কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর কবিতা হোতে দু লাইনের শ্লোক উচ্চারণ করে উত্তর দিয়েছিলেন ।
তাঁর অর্থের কোনো প্রয়োজন হয় না। তাঁর টাকাপয়সা স্পর্শ ‘না করার ইচ্ছা’_ আমার মত প্রাশ্চাত্যের লোককে মুগ্ধ করেছে ! লোকে বলে স্বামিজী অনেক মন্ত্র জানেন ! মন্ত্রবলে তিনি বেশ কিছু রোগ আরোগ্য করতে পারেন ! জন্তুদের বশীভূত করার অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর আছে ! তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার তিন চারদিন পরেই __তাঁর এই ক্ষমতা পরীক্ষা করার সুযোগ আমাদের হয়েছিল।”
===============©===========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………..
চিন্তা করে দ্যাখো—এই স্বার্থপরতা তথা ভালবাসার অভাবকে ক্ষমা করা যায় কিনা! মনে করো_ একটি পরিবারে পাঁচ ভাই আছে। যদি ঐ পাঁচ ভাই আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হয় এবং তাদের সূক্ষ্মচেতনা গুণগত এবং পরিমাণগত সূক্ষ্মশক্তির দ্বারা কাজ করে, তাহলে তারা প্রত্যেকেই একই পরিবারের লােক বলে অপর ভাই সম্বন্ধে গর্ব প্রকাশ করবে । ভালবাসার বন্ধনে তারা অাবদ্ধ হবে। প্রত্যেক ভাই অন্য ভাই-এর সুখ-দুঃখকে নিজের সুখ-দুঃখ বলে মনে করবে এবং সমানভাবেই সুখ-দুঃখ ভোগ করবে। একে অপরকে সাহায্য করবে, সহযোগিতা করবে। ঐক্যের মাধ্যমে তাদের মধ্যে গভীর ভালবাসা দানা বাঁধবে । জ্ঞানের বিকাশ হবে। শক্তি বিস্তৃত হবে। শত্রু তাদের দিকে কটাক্ষ করতে সাহস করবে না। তারা নিঃশত্রু হবে ।
অপরপক্ষে, যদি তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব না জাগে তাহলে তারা ক্রমাগত সঙ্কীর্ণমনা হয়ে যাবে। তাদের চিন্তা-ভাবনা সঙ্কীর্ণ হবে। সীমার বন্ধনে আবদ্ধ হবে। নীচতা দেখা দেবে। এই সকল ব্যক্তির মধ্যে ভালবাসা থাকে না। ঈর্ষা প্রবল হয় । জ্ঞানের পরিবর্তে ঈর্ষা এবং ঘৃণার সমন্বয়ে ঔদ্ধত্য বৃদ্ধি পায়। ঐক্যের অভাবে দুর্বলতা দেখা দেয় | একে অপরের প্রতি সন্ধিগ্ধপ্রবণ হয়। বিক্ষোভ বাড়ে। ফলে একে অপরের অনিষ্ট কামনা করে। পরস্পর পরস্পরকে নিধন করতে চায়। এই সমস্ত ভেদ হল ধর্ম-সম্প্রদায়ের। ঐরূপ ধর্মভুক্ত, পরিবারের ছোট ভাই যদি পরিবার বর্হিভূত হয়ে যায় তাহলে বড় ভাই কোনরূপ উদ্বিগ্ন হয় না। বড় ভাই সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে যে জিনিস ভোগ করছে তার অংশ ছােট ভাইকে দিতে চায় না। ক্ষুধার তাড়নায় ছােট ভাই যদি অখাদ্যকুখাদ্য খায় তাহলে বড় ভাই তাকে চণ্ডাল বলে দূরে সরিয়ে দেয়। যদি ছোট ভাই অন্য ধর্মাবলম্বী হয় তাহলে বড় ভাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সে ভাবতে থাকে যে তার অধিকার এখন নিরাপদে বজায় থাকবে। নিজের সুখ বৃদ্ধির জন্য, নিরাপত্তাকে কায়েম করার স্বার্থে এবং ঐশ্বর্য বৃদ্ধির স্বার্থে যদি সমাজে অন্য সকলে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে তার মনে কোন রেখাপাত করে না। এই হল সম্প্রদায়গত ধর্ম।
এই ধর্মকে যারা অবলম্বন করে তাদের হৃদয় নেই। তারা নিজেদের শরীর ছাড়া অপর কাউকে ভালবাসতে পারে না। যদি তারা স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, আত্মীয়স্বজন বা তাদের সঙ্গে যুক্ত কাউকে ভালবাসে তাহলে দেখা যাবে তারা এরূপ করছে কেবলমাত্র নিজের স্বার্থের জন্য । যতক্ষণ তাদের নিকট হতে নিজের সুখ পাওয়া যাবে, যতক্ষণ তারা ওদের সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে, নিরাপত্তার জন্য সহযােগিতা করবে, তাদের নাম-যশ বৃদ্ধির জন্য সহযোগিতা করবে, ততক্ষণ তাদেরকে ভালবাসবে। এসবের একটু ত্রুটি হলেই তাদের ভালবাসা লোপ পায়। যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণ তারা অপরের সঙ্গে মেলামেশা করবে। প্রয়োজন মিটে গেলেই অপরকে ঘৃণা করবে।
এই ধরনের আচরণ সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিকতার বিরােধী বা প্রকৃত ধর্ম নয় । রীতি, নীতি, প্রথার উপর ধর্ম (সম্প্রদায়) নির্ভর করে। এই ধর্মপথের মানুষ বিশেষ এক শ্রেণীর লােকের অধিকার এবং সুযােগ-সুবিধা রক্ষা করে চলে । এবং এই পথের লোকেরা ধর্মকে আঁকড়ে ধরে থাকে শুধু নিজের স্বার্থে । নিজের নিরাপত্তা এবং সুখের ব্যাঘাত ঘটলেই তারা ‘ঐক্য’-র কথা বলে । যখনই দেখে তারা সুপ্রতিষ্ঠিত তখনই তারা আবার পূর্বের খেলা শুরু করে।(ক্রমশঃ)
আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল যে পেরেন্টাপল্লী গ্রামটি হোল হায়দ্রাবাদের নিজাম রাজ্যের শেষ সীমা। এই এলাকা ঘন বনে ঢাকা! বাঘ, চিতা প্রভৃতি সমস্ত ধরনের বন্যজন্তু সেখানে বাস কোরতো। সীমানা পরিদর্শনের অজুহাতে নিজাম সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা এই বনে শিকার করতে আসতো।
যে কেউ পেরেন্টাপল্লী গ্রামে আসতো, সেই স্বামী বাউলানন্দজী কে দর্শন করার জন্য আশ্রমে আসতো। তাদের নিকট স্বামীজী ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য !
মিঃ ডব্লিউ টার্নার নামে নিজাম সরকারের একজন এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলর ছিলেন । তিনি 1933 সালে পেরেন্টাপল্লী আশ্রম দর্শন করে কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন । অবসর গ্রহণের পর তিনি ইংল্যান্ড চলে যান । সেখানে তিনি এডিনবরার চেম্বার্স পত্রিকায় একটা লেখা প্রকাশ করেন । এই লেখাটির শিরোনাম ছিল “একজন রোগীর শক্তি”! লেখাটি 1954 সালে “ওয়ার্ল্ড ডাইজেস্ট্” পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হয় !
কর্নেল রাজু ওই লেখাটি পড়েছিলেন । তিনি ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনীতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সহচর ছিলেন । পরে তিনি ভারত সরকারের একজন মন্ত্রী হয়েছিলেন । রাজমন্দ্রি এসে তিনি স্বামীজীর সঙ্গে দেখা করেন । তিনি লেখাটি স্বামীজীকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করেন__ এটা তাঁর সম্বন্ধেই লেখা কিনা?
ঐদিন লেখক আঃ বেঙ্কট রাও স্বামীজীর নিকটেই ছিলেন । তিনি স্বামীজীকে লেখাটি পড়ে শুনিয়েছিলেন । লেখাটির সারমর্ম ছিল নিম্নরূপ:—
“তোমরা যদি ভারতের মহান যোগীদেরকে দেখতে চাও, তাহলে তাদেরকে শহরে দেখতে পাবে না _এমনকি গ্রামেও না ! যদি সত্যই তাঁদের দেখার ইচ্ছা তোমাদের থাকে, তাহলে তোমাদেরকে হিমালয়ের গুহায় গুহায় বা অন্য কোনো বন-জঙ্গলে খুঁজতে হবে । তাদের অধিকাংশই উলঙ্গ অবস্থায় থাকেন। তুষারপাতের সময় বা প্রচণ্ড ঠান্ডায় তারা নিজেদেরকে অনাবৃত রাখেন। তাঁরা তপস্যা করতে বসে সমাধিস্থ হয়ে যান । প্রায়শঃই তাঁরা কোনো বাহ্যিক খাবার খান না, তবে কখনো কখনো তাঁরা অল্প খাবার গ্রহন করেন। একজন করে শিষ্য তাঁদের পাহারা দেন এবং সযত্নে তাঁর পরিচর্যা করেন । সেই সেবক একান্ত ভক্তিভাবে গুরু সেবা করেন । কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, যদি তাঁরা সেবা দ্বারা গুরুকে সন্তুষ্ট করতে পারেন __তাহলে তাদের অভিষ্ঠ সিদ্ধ হবে।।
জলের উপর দিয়ে হাঁটা, শূন্যে ঘোরাফেরা করা, রোগ নিরাময় করা এবং জীবনের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করা ওই সমস্ত যোগীদের পক্ষে অনায়াসেই সম্ভব ।
1933 সালে নিজাম রাজ্যের পপি হিলের বনে “স্বামী ঈশ্বর* নামে এক স্বামীর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয় ! ওই এলাকায় “রেড্ডি” নামে এক পাহাড়ি আদিবাসী জনজাতি বাস করে । স্বামীজী ভারতবর্ষের সমস্ত স্থান পরিদর্শন করেছেন ।
বন বিভাগের প্রধান নবাব ইয়ার জং বাহাদুরের সঙ্গে বড়দিনে অর্থাৎ ক্রিসমাস ডে তে স্বামীজীকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
যখন আমরা তাকে দেখলাম, তখন তিনি প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় ছিলেন! পপি পাহাড় হতে যে ঝর্ণা নিচে নেমে আসছে সেই ঝর্ণার বরফের ন্যায় ঠাণ্ডা জলে তিনি তখন ডুব দিয়ে স্নান করছিলেন। স্বামীজীর বলিষ্ঠ দেহ সুন্দর মুখ,__ সুন্দর মানুষ তিনি!
সমস্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা বিশেষ করে তেলেগু ভাষী, যাঁরা ঐ অঞ্চলে চাকরি করতেন__ তাঁরা সকলে ওই সন্ন্যাসীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন । সাষ্টাঙ্গে অথবা পা ছুঁয়ে প্রণাম করাটাকে তাঁরা তাদের ভাগ্য বলে মনে করতেন । স্বামীজীর বেশি খাবারের প্রয়োজন হোতো না ! লোকে বলে __’তিনি নাকি কোনো খাবারই খান না!! কিন্তু স্বামীজি নিজে বলেছেন তিনি কখনো কখনো কিছু খাবার খান !
স্বামীজী একজন ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েট ছিলেন, ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন । কেন তিনি নিঃসঙ্গ জীবন পছন্দ করলেন __এরূপ প্রশ্ন করা হলে, তিনি কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর কবিতা হোতে দু লাইনের শ্লোক উচ্চারণ করে উত্তর দিয়েছিলেন ।
তাঁর অর্থের কোনো প্রয়োজন হয় না। তাঁর টাকাপয়সা স্পর্শ ‘না করার ইচ্ছা’_ আমার মত প্রাশ্চাত্যের লোককে মুগ্ধ করেছে ! লোকে বলে স্বামিজী অনেক মন্ত্র জানেন ! মন্ত্রবলে তিনি বেশ কিছু রোগ আরোগ্য করতে পারেন ! জন্তুদের বশীভূত করার অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর আছে ! তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার তিন চারদিন পরেই __তাঁর এই ক্ষমতা পরীক্ষা করার সুযোগ আমাদের হয়েছিল।”
===============©===========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………..
চিন্তা করে দ্যাখো—এই স্বার্থপরতা তথা ভালবাসার অভাবকে ক্ষমা করা যায় কিনা! মনে করো_ একটি পরিবারে পাঁচ ভাই আছে। যদি ঐ পাঁচ ভাই আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হয় এবং তাদের সূক্ষ্মচেতনা গুণগত এবং পরিমাণগত সূক্ষ্মশক্তির দ্বারা কাজ করে, তাহলে তারা প্রত্যেকেই একই পরিবারের লােক বলে অপর ভাই সম্বন্ধে গর্ব প্রকাশ করবে । ভালবাসার বন্ধনে তারা অাবদ্ধ হবে। প্রত্যেক ভাই অন্য ভাই-এর সুখ-দুঃখকে নিজের সুখ-দুঃখ বলে মনে করবে এবং সমানভাবেই সুখ-দুঃখ ভোগ করবে। একে অপরকে সাহায্য করবে, সহযোগিতা করবে। ঐক্যের মাধ্যমে তাদের মধ্যে গভীর ভালবাসা দানা বাঁধবে । জ্ঞানের বিকাশ হবে। শক্তি বিস্তৃত হবে। শত্রু তাদের দিকে কটাক্ষ করতে সাহস করবে না। তারা নিঃশত্রু হবে ।
অপরপক্ষে, যদি তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব না জাগে তাহলে তারা ক্রমাগত সঙ্কীর্ণমনা হয়ে যাবে। তাদের চিন্তা-ভাবনা সঙ্কীর্ণ হবে। সীমার বন্ধনে আবদ্ধ হবে। নীচতা দেখা দেবে। এই সকল ব্যক্তির মধ্যে ভালবাসা থাকে না। ঈর্ষা প্রবল হয় । জ্ঞানের পরিবর্তে ঈর্ষা এবং ঘৃণার সমন্বয়ে ঔদ্ধত্য বৃদ্ধি পায়। ঐক্যের অভাবে দুর্বলতা দেখা দেয় | একে অপরের প্রতি সন্ধিগ্ধপ্রবণ হয়। বিক্ষোভ বাড়ে। ফলে একে অপরের অনিষ্ট কামনা করে। পরস্পর পরস্পরকে নিধন করতে চায়। এই সমস্ত ভেদ হল ধর্ম-সম্প্রদায়ের। ঐরূপ ধর্মভুক্ত, পরিবারের ছোট ভাই যদি পরিবার বর্হিভূত হয়ে যায় তাহলে বড় ভাই কোনরূপ উদ্বিগ্ন হয় না। বড় ভাই সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে যে জিনিস ভোগ করছে তার অংশ ছােট ভাইকে দিতে চায় না। ক্ষুধার তাড়নায় ছােট ভাই যদি অখাদ্যকুখাদ্য খায় তাহলে বড় ভাই তাকে চণ্ডাল বলে দূরে সরিয়ে দেয়। যদি ছোট ভাই অন্য ধর্মাবলম্বী হয় তাহলে বড় ভাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সে ভাবতে থাকে যে তার অধিকার এখন নিরাপদে বজায় থাকবে। নিজের সুখ বৃদ্ধির জন্য, নিরাপত্তাকে কায়েম করার স্বার্থে এবং ঐশ্বর্য বৃদ্ধির স্বার্থে যদি সমাজে অন্য সকলে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে তার মনে কোন রেখাপাত করে না। এই হল সম্প্রদায়গত ধর্ম।
এই ধর্মকে যারা অবলম্বন করে তাদের হৃদয় নেই। তারা নিজেদের শরীর ছাড়া অপর কাউকে ভালবাসতে পারে না। যদি তারা স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, আত্মীয়স্বজন বা তাদের সঙ্গে যুক্ত কাউকে ভালবাসে তাহলে দেখা যাবে তারা এরূপ করছে কেবলমাত্র নিজের স্বার্থের জন্য । যতক্ষণ তাদের নিকট হতে নিজের সুখ পাওয়া যাবে, যতক্ষণ তারা ওদের সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে, নিরাপত্তার জন্য সহযােগিতা করবে, তাদের নাম-যশ বৃদ্ধির জন্য সহযোগিতা করবে, ততক্ষণ তাদেরকে ভালবাসবে। এসবের একটু ত্রুটি হলেই তাদের ভালবাসা লোপ পায়। যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণ তারা অপরের সঙ্গে মেলামেশা করবে। প্রয়োজন মিটে গেলেই অপরকে ঘৃণা করবে।
এই ধরনের আচরণ সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিকতার বিরােধী বা প্রকৃত ধর্ম নয় । রীতি, নীতি, প্রথার উপর ধর্ম (সম্প্রদায়) নির্ভর করে। এই ধর্মপথের মানুষ বিশেষ এক শ্রেণীর লােকের অধিকার এবং সুযােগ-সুবিধা রক্ষা করে চলে । এবং এই পথের লোকেরা ধর্মকে আঁকড়ে ধরে থাকে শুধু নিজের স্বার্থে । নিজের নিরাপত্তা এবং সুখের ব্যাঘাত ঘটলেই তারা ‘ঐক্য’-র কথা বলে । যখনই দেখে তারা সুপ্রতিষ্ঠিত তখনই তারা আবার পূর্বের খেলা শুরু করে।(ক্রমশঃ)
