স্বামী বাউলানন্দজীর জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ ও আলোচনা করা হচ্ছিলো। স্বামীজী যখন পেরেন্টাপল্লীতে সাধন-ভজন করছিলেন সেই সময়কালীন কথাই এখন বলা হচ্ছে! এই সময় স্বামীজীর _স্বামী বিবেকানন্দ সহ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এবং ✓রী মা জগদম্বার দর্শন হয়েছিল।
শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদ পেয়ে স্বামীজী পাহাড় থেকে নেমে এসেছিলেন । এরপর তাঁর জীবনধারায় এবং ভাবভঙ্গিতে এক বিরাট পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। পূর্বে যখন তিনি গ্রামের নিকট আশ্রমে ছিলেন, তখন তাঁর সারাদিনের কাজ ছিল মন্দিরে পূজা করা_ বাগানে কাজ করা এবং গাছে জল দেওয়া। রাত্রে তিনি মাত্র দু-এক ঘন্টা ঘুমাতেন । অন্য সময়ে তিনি কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকতেন । কারো সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ইচ্ছা হোতো না ! এই সময় থেকেই তাঁর হৃদয় এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হলো। যদিও তিনি রুটিনমাফিক সব কাজেই লিপ্ত ছিলেন, তথাপি তাঁর মন সর্বদা অন্যত্রই থাকতো ! সব সময় তিনি বিচারে লিপ্ত থাকতেন ! মে কোনো একটা বিষয়ের উপর চিন্তা করেই তিনি দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতেন!
কেমন করে নাম-রূপহীন সর্বেসর্বা ঈশ্বর নিজেকে অসংখ্য নাম-রূপে প্রকাশ করলেন__ এই সব বিচার এবং চিন্তন চলতো সারাক্ষণ ! তিনি নিজের ভিতর থেকেই তার উত্তরও পেয়ে যেতেন! “মেসেজ টু হিউম্যানিটি”_ পুস্তকে যে সমস্ত বিষয় লিপিবদ্ধ হয়েছে, সেগুলি সব __এই সময়েই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ! এই অবিরাম অনুধ্যান এবং বিচারের ফলে তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছিল ।
হঠাৎ একদিন তিনি ঈশ্বরের আদেশ পেলেন ! “এতদিন আমার লীলায় নিমগ্ন ছিলে _যথেষ্ট হয়েছে, এখন আমাতে নিমগ্ন হও!” _ এই আদেশ তাঁর ভিতর থেকেই বেরিয়ে এল !
ঈশ্বরের আদেশ উপলব্ধি করা এবং সেগুলি কার্যকরী করার জন্য তিনি চিন্তা করতে লাগলেন । ঈশ্বর এবং তাঁর লীলার মধ্যে পার্থক্য কি ? কেমন করে তা পৃথক করা যাবে ?
ঈশ্বর এবং তাঁর লীলাকে প্রদীপ ও তার আলোর সঙ্গে তুলনা করা যায় । প্রদীপ কে বাদ দিয়ে আলো হয় না, আবার আলো ছাড়াও প্রদীপ হয় না ! একটি অপরটিকে অনুসরণ করে !
ঠিক এইরূপ _এই মহাবিশ্ব হোলো সর্বেসর্বা ঈশ্বরের প্রকাশ ! জগত এবং এর সমস্ত জীব সর্বেসর্বা ঈশ্বরেরই প্রকাশ! প্রকৃতপক্ষে জীবই হোলো সর্বেসর্বা বা ঈশ্বর! জীব সেবাই ঈশ্বরের সেবা ! এইরূপ বিচারের ফলে ঈশ্বর কি তা তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল ! এবার তিনি ভাবতে লাগলেন তাহলে _লীলা কি? চূড়ান্তভাবে সর্বেসর্বায় মিশে যাওয়াই জীবের উদ্দেশ্য ও একমাত্র কাজ ! জীবজগতের এই কাজই হোল _ ঈশ্বরের লীলা ! যে সার্বজনীন নীতির কথা স্বামী বাউলানন্দ এতদিন চিন্তা করছিলেন সেগুলি সর্বেসর্বা ঈশ্বরের লীলার সঙ্গেই সম্বন্ধযুক্ত !
“আমার লীলায় নিমগ্ন না হয়ে আমাতে নিমগ্ন হও! সৃষ্টির পদ্ধতি চিন্তা না করে সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করো !” এই আদেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনের ধারা পাল্টে গেল।
ঈশ্বরের সমস্ত প্রকাশের মধ্যে কৃষ্ণ অবতারই সর্বোতভাবে পূর্ণ ! সেই সময় হোতে স্বামীজী চোখ বন্ধ করে বা চোখ খুলে _সব সময় কৃষ্ণকেই দেখতে পেতেন! আশ্রমের সর্বত্র শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি হাতে নিয়ে খেলা করতেন ! যে দিকেই স্বামীজী তাকাতেন _ সেদিকেই তিনি মূরলীধারী কৃষ্ণকে দেখতে পেতেন! তাঁর কাছে সমগ্র বিশ্ব তখন শ্যামসুন্দরের মোহিনীশক্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ! তিনি তখন যেখানেই যেতেন, সেখানেই শ্রীকৃষ্ণকেই দেখতে পেতেন!
(ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………
[একদিন এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ (দেশ বিভাগের সময়) একটি ক্যাম্পে আশ্রয়ের জন্য আসে। তার কি করুণ কাহিনী ! তাকে এবং তার পুত্রকে জানালায় বেঁধে তাদের সামনে মুসলমানরা তাদের মেয়ে এবং পুত্রবধূর ইজ্জত নষ্ট করে। পরে পিতার সামনে পুত্রকে হত্যা করে। গৃহের কর্তা হয়েও সে ওই দুই নারীর সতীত্ব রক্ষা করতে পারল না। কিন্তু সে ওই নারীদ্বয়কে জাতিচ্যুত করে দিল। কি আশ্চর্য ! ওই দুই অসহায় নারী বুঝতে পারলো এই ধরনের পুরুষের পাল্লায় পড়ে হিন্দুত্ব ধ্বংসের সম্মুখীন হচ্ছে। তারা নিরুপায় হয়ে সীমান্তে গিয়ে মঠে আশ্রয় নিল। মুসলমানেরা পুনরায় তার বাড়ি এসে তারই সামনে তার পালিত গরুটিকে হত্যা করে এবং তাকে গো-মাংস খেতে বাধ্য করে। ব্রাহ্মণ তখন সর্বস্বান্ত হয়ে মাঠে এসে আশ্রয় চাইলো। মঠের স্বামীজী তাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। তাঁরা তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা করলেন এবং তার সমস্যার সমাধান করবেন বলে আশ্বাস দিলেন। এখানে এসে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ভাবল গো-মাংস খেয়ে তার জাত গিয়েছে। এই সময় তার মনে পড়লো মেয়ে ও পুত্রবধূর কথা–যাদেরকে সে জাতিচ্যুত করে গৃহ হতে বিতাড়িত করেছিল। স্বামীজীদের সব কথা খুলে বলল। স্বামীজীরা তার নিকট ওদেরকে নিয়ে হাজির করবেন বলে আশ্বাস দিলেন।
একজন স্বামীজী তাকে বললেন, ” আমরা সকলেই হিন্দু। আমরা এক। তুমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও এবং ভয়ে গো-মাংস খেয়েছ। সুতরাং তোমার জাত খোয়া যায়নি। একইভাবে লোকে যখন বর্বরদের কবলে পড়ে তখন অনেক প্রতিকূল, পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। এই ধরনের ঘটনা ব্যক্তির ধর্মকে আঘাত করতে পারে না। যা ঘটেছে তা রাজনৈতিক এবং সামাজিক অনৈক্যের ফলে, ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসের ফলে নয় । সুতরাং তুমি বিচলিত হয়ো না—তােমার এবং তােমার লােকেদের জাত
খােয়া যায় নি।”
স্বামীজীর কথায় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আশ্বস্ত হল। সে পুনরায় নিজেকে একজন প্রথম শ্রেণীর ব্রাহ্মণ বলে ভাবতে লাগল।
সকলের যেখানে খাওয়ার ব্যবস্থা। হয়েছে সেখানে খাওয়ার জন্য মঠের স্বামীজী তাকে ডাকলেন। ব্রাহ্মণ তার চারদিক দেখে নিল । চারদিকের লােকেদের দেখে তার মনে হ’ল তারা সবাই নীচ জাতির। অন্য জাতির লােকের সঙ্গে খেতে তার দ্বিধা হল। তার মনে হতে লাগল একসঙ্গে খেলে সে জাতিচ্যুত হবে।
“আমি রান্না খাবার খাবাে না। আমাকে চিড়া দিন,” সে বলল । স্বামীজী তাতে রাজী হলেন। তিনি রান্নাঘরের একজন কর্মীকে চিড়ে ভিজিয়ে ব্রাহ্মণকে দিতে বললেন। “না, আমি নিজেই ভিজিয়ে নেব।” অব্রাহ্মণের হাতে ভেজানাে চিড়ে খেতে সে ইচ্ছুক নয়। যে লােক মুসলমানের দেওয়া গাে-মাংস খেল, সেই লােকই অব্রাহ্মণের হাতে ভেজানাে চিড়া খেতে অনিচ্ছুক। ক্যাম্পের প্রত্যেকেই তার এই হীনমন্যতার জন্য তাকে ভাল নজরে দেখল না। তাকে কিছু চিড়া দিয়ে ক্যাম্প হতে বিদায় দেওয়া হল। এই প্রসঙ্গে স্বামী জী (স্বামী বাউলানন্দ) আমাদের বলেছিলেন – “মহামায়ার কি খেলা ! যে লোক তার পরিবারের মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা করতে পারে না, সেই লোক জাতিচ্যুতির কথা চিন্ত করে। যে লােক মৃত্যুর ভয়ে গাে-মাংস খায়, সেই লােকই অব্রাহ্মণের হাতে চিড়া খেতে নারাজ। এই জাতি কোনদিন ঐক্যবদ্ধ হতে পারে ? যে লােক নিজেকে এবং পরিবারের সকলকে রক্ষা করতে পারে না, সহকর্মীদের উপর তার প্রভাব কেমন করে থাকতে পারে ? অজ্ঞতার ফলে এবং ভালবাসার অভাবে এরূপ ঘটে থাকে। ঐ ধরনের লােকেদের হৃদয় যখন প্রসারিত হয়ে সকলকে নিজের বলে গ্রহণ করতে পারবে একমাত্র তখনই এর প্রতিকার সম্ভব।”
আমরা নীরবে শুনছিলাম। স্বামীজী (স্বামী বাউলানন্দ) কিছুটা উত্তেজিত হয়ে আলোচনা করছিলেন | স্বামীজীর, এইরূপ আলোচনায় অামাদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হল। আমরা ঘর্মাক্ত হয়ে উঠলাম।
শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদ পেয়ে স্বামীজী পাহাড় থেকে নেমে এসেছিলেন । এরপর তাঁর জীবনধারায় এবং ভাবভঙ্গিতে এক বিরাট পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। পূর্বে যখন তিনি গ্রামের নিকট আশ্রমে ছিলেন, তখন তাঁর সারাদিনের কাজ ছিল মন্দিরে পূজা করা_ বাগানে কাজ করা এবং গাছে জল দেওয়া। রাত্রে তিনি মাত্র দু-এক ঘন্টা ঘুমাতেন । অন্য সময়ে তিনি কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকতেন । কারো সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ইচ্ছা হোতো না ! এই সময় থেকেই তাঁর হৃদয় এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হলো। যদিও তিনি রুটিনমাফিক সব কাজেই লিপ্ত ছিলেন, তথাপি তাঁর মন সর্বদা অন্যত্রই থাকতো ! সব সময় তিনি বিচারে লিপ্ত থাকতেন ! মে কোনো একটা বিষয়ের উপর চিন্তা করেই তিনি দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতেন!
কেমন করে নাম-রূপহীন সর্বেসর্বা ঈশ্বর নিজেকে অসংখ্য নাম-রূপে প্রকাশ করলেন__ এই সব বিচার এবং চিন্তন চলতো সারাক্ষণ ! তিনি নিজের ভিতর থেকেই তার উত্তরও পেয়ে যেতেন! “মেসেজ টু হিউম্যানিটি”_ পুস্তকে যে সমস্ত বিষয় লিপিবদ্ধ হয়েছে, সেগুলি সব __এই সময়েই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ! এই অবিরাম অনুধ্যান এবং বিচারের ফলে তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছিল ।
হঠাৎ একদিন তিনি ঈশ্বরের আদেশ পেলেন ! “এতদিন আমার লীলায় নিমগ্ন ছিলে _যথেষ্ট হয়েছে, এখন আমাতে নিমগ্ন হও!” _ এই আদেশ তাঁর ভিতর থেকেই বেরিয়ে এল !
ঈশ্বরের আদেশ উপলব্ধি করা এবং সেগুলি কার্যকরী করার জন্য তিনি চিন্তা করতে লাগলেন । ঈশ্বর এবং তাঁর লীলার মধ্যে পার্থক্য কি ? কেমন করে তা পৃথক করা যাবে ?
ঈশ্বর এবং তাঁর লীলাকে প্রদীপ ও তার আলোর সঙ্গে তুলনা করা যায় । প্রদীপ কে বাদ দিয়ে আলো হয় না, আবার আলো ছাড়াও প্রদীপ হয় না ! একটি অপরটিকে অনুসরণ করে !
ঠিক এইরূপ _এই মহাবিশ্ব হোলো সর্বেসর্বা ঈশ্বরের প্রকাশ ! জগত এবং এর সমস্ত জীব সর্বেসর্বা ঈশ্বরেরই প্রকাশ! প্রকৃতপক্ষে জীবই হোলো সর্বেসর্বা বা ঈশ্বর! জীব সেবাই ঈশ্বরের সেবা ! এইরূপ বিচারের ফলে ঈশ্বর কি তা তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল ! এবার তিনি ভাবতে লাগলেন তাহলে _লীলা কি? চূড়ান্তভাবে সর্বেসর্বায় মিশে যাওয়াই জীবের উদ্দেশ্য ও একমাত্র কাজ ! জীবজগতের এই কাজই হোল _ ঈশ্বরের লীলা ! যে সার্বজনীন নীতির কথা স্বামী বাউলানন্দ এতদিন চিন্তা করছিলেন সেগুলি সর্বেসর্বা ঈশ্বরের লীলার সঙ্গেই সম্বন্ধযুক্ত !
“আমার লীলায় নিমগ্ন না হয়ে আমাতে নিমগ্ন হও! সৃষ্টির পদ্ধতি চিন্তা না করে সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করো !” এই আদেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনের ধারা পাল্টে গেল।
ঈশ্বরের সমস্ত প্রকাশের মধ্যে কৃষ্ণ অবতারই সর্বোতভাবে পূর্ণ ! সেই সময় হোতে স্বামীজী চোখ বন্ধ করে বা চোখ খুলে _সব সময় কৃষ্ণকেই দেখতে পেতেন! আশ্রমের সর্বত্র শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি হাতে নিয়ে খেলা করতেন ! যে দিকেই স্বামীজী তাকাতেন _ সেদিকেই তিনি মূরলীধারী কৃষ্ণকে দেখতে পেতেন! তাঁর কাছে সমগ্র বিশ্ব তখন শ্যামসুন্দরের মোহিনীশক্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ! তিনি তখন যেখানেই যেতেন, সেখানেই শ্রীকৃষ্ণকেই দেখতে পেতেন!
(ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………
[একদিন এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ (দেশ বিভাগের সময়) একটি ক্যাম্পে আশ্রয়ের জন্য আসে। তার কি করুণ কাহিনী ! তাকে এবং তার পুত্রকে জানালায় বেঁধে তাদের সামনে মুসলমানরা তাদের মেয়ে এবং পুত্রবধূর ইজ্জত নষ্ট করে। পরে পিতার সামনে পুত্রকে হত্যা করে। গৃহের কর্তা হয়েও সে ওই দুই নারীর সতীত্ব রক্ষা করতে পারল না। কিন্তু সে ওই নারীদ্বয়কে জাতিচ্যুত করে দিল। কি আশ্চর্য ! ওই দুই অসহায় নারী বুঝতে পারলো এই ধরনের পুরুষের পাল্লায় পড়ে হিন্দুত্ব ধ্বংসের সম্মুখীন হচ্ছে। তারা নিরুপায় হয়ে সীমান্তে গিয়ে মঠে আশ্রয় নিল। মুসলমানেরা পুনরায় তার বাড়ি এসে তারই সামনে তার পালিত গরুটিকে হত্যা করে এবং তাকে গো-মাংস খেতে বাধ্য করে। ব্রাহ্মণ তখন সর্বস্বান্ত হয়ে মাঠে এসে আশ্রয় চাইলো। মঠের স্বামীজী তাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। তাঁরা তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা করলেন এবং তার সমস্যার সমাধান করবেন বলে আশ্বাস দিলেন। এখানে এসে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ভাবল গো-মাংস খেয়ে তার জাত গিয়েছে। এই সময় তার মনে পড়লো মেয়ে ও পুত্রবধূর কথা–যাদেরকে সে জাতিচ্যুত করে গৃহ হতে বিতাড়িত করেছিল। স্বামীজীদের সব কথা খুলে বলল। স্বামীজীরা তার নিকট ওদেরকে নিয়ে হাজির করবেন বলে আশ্বাস দিলেন।
একজন স্বামীজী তাকে বললেন, ” আমরা সকলেই হিন্দু। আমরা এক। তুমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও এবং ভয়ে গো-মাংস খেয়েছ। সুতরাং তোমার জাত খোয়া যায়নি। একইভাবে লোকে যখন বর্বরদের কবলে পড়ে তখন অনেক প্রতিকূল, পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। এই ধরনের ঘটনা ব্যক্তির ধর্মকে আঘাত করতে পারে না। যা ঘটেছে তা রাজনৈতিক এবং সামাজিক অনৈক্যের ফলে, ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসের ফলে নয় । সুতরাং তুমি বিচলিত হয়ো না—তােমার এবং তােমার লােকেদের জাত
খােয়া যায় নি।”
স্বামীজীর কথায় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আশ্বস্ত হল। সে পুনরায় নিজেকে একজন প্রথম শ্রেণীর ব্রাহ্মণ বলে ভাবতে লাগল।
সকলের যেখানে খাওয়ার ব্যবস্থা। হয়েছে সেখানে খাওয়ার জন্য মঠের স্বামীজী তাকে ডাকলেন। ব্রাহ্মণ তার চারদিক দেখে নিল । চারদিকের লােকেদের দেখে তার মনে হ’ল তারা সবাই নীচ জাতির। অন্য জাতির লােকের সঙ্গে খেতে তার দ্বিধা হল। তার মনে হতে লাগল একসঙ্গে খেলে সে জাতিচ্যুত হবে।
“আমি রান্না খাবার খাবাে না। আমাকে চিড়া দিন,” সে বলল । স্বামীজী তাতে রাজী হলেন। তিনি রান্নাঘরের একজন কর্মীকে চিড়ে ভিজিয়ে ব্রাহ্মণকে দিতে বললেন। “না, আমি নিজেই ভিজিয়ে নেব।” অব্রাহ্মণের হাতে ভেজানাে চিড়ে খেতে সে ইচ্ছুক নয়। যে লােক মুসলমানের দেওয়া গাে-মাংস খেল, সেই লােকই অব্রাহ্মণের হাতে ভেজানাে চিড়া খেতে অনিচ্ছুক। ক্যাম্পের প্রত্যেকেই তার এই হীনমন্যতার জন্য তাকে ভাল নজরে দেখল না। তাকে কিছু চিড়া দিয়ে ক্যাম্প হতে বিদায় দেওয়া হল। এই প্রসঙ্গে স্বামী জী (স্বামী বাউলানন্দ) আমাদের বলেছিলেন – “মহামায়ার কি খেলা ! যে লোক তার পরিবারের মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা করতে পারে না, সেই লোক জাতিচ্যুতির কথা চিন্ত করে। যে লােক মৃত্যুর ভয়ে গাে-মাংস খায়, সেই লােকই অব্রাহ্মণের হাতে চিড়া খেতে নারাজ। এই জাতি কোনদিন ঐক্যবদ্ধ হতে পারে ? যে লােক নিজেকে এবং পরিবারের সকলকে রক্ষা করতে পারে না, সহকর্মীদের উপর তার প্রভাব কেমন করে থাকতে পারে ? অজ্ঞতার ফলে এবং ভালবাসার অভাবে এরূপ ঘটে থাকে। ঐ ধরনের লােকেদের হৃদয় যখন প্রসারিত হয়ে সকলকে নিজের বলে গ্রহণ করতে পারবে একমাত্র তখনই এর প্রতিকার সম্ভব।”
আমরা নীরবে শুনছিলাম। স্বামীজী (স্বামী বাউলানন্দ) কিছুটা উত্তেজিত হয়ে আলোচনা করছিলেন | স্বামীজীর, এইরূপ আলোচনায় অামাদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হল। আমরা ঘর্মাক্ত হয়ে উঠলাম।
