স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। সাধনার একটা পর্যায়ে এসে স্বামীজী যেদিকে তাকাতেন, সেদিকেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দেখতে পাচ্ছিলেন।
ঐরূপ আনন্দ-উচ্ছ্বাস অভিজ্ঞতায় তাঁর অনেকদিন কেটে গেল, কিন্তু যেন মনে হোলো _ দিনগুলি কয়েক মিনিটের মতো অতিবাহিত হোল। এইভাবে চলার কিছুদিন পর কৃষ্ণ মূর্তি তাঁর চোখের সামনে থেকে অন্তর্হিত হয়ে গেল । কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র আকাশে যেন অসংখ্য কঙ্কালসার মনুষ্য আবির্ভূত হোলো । তাদের হাড় এবং চামড়ার মধ্যবর্তী স্থান মাংস দ্বারা পূর্ণ করতে হবে__ তার উপর এইরূপ আদেশ হোল । এর অর্থ হোল উপযুক্ত খাদ্যের অভাবে যে সমস্ত লোকের শরীর কঙ্কালসার হয়েছে_ তাদেরকে উপযুক্ত খাদ্য দিতে হবে এবং তাদের মধ্যে শক্তির পরিমাণ বাড়াতে হবে, যাতে করে তারা মানুষের মত বাঁচতে পারে !
মানুষের দুঃখ কষ্টের কি শেষ আছে ! সবসময় এই সবকথা চিন্তা করে__ স্বামীজী জগতের সমস্ত দুঃখ কষ্ট যেন নিজেই নিজের মধ্যে ভোগ করতেন ! সমস্ত মানবের মধ্যে প্রেম,জ্ঞান এবং শক্তি এই তিনটি রয়েছে! কতক লোকের মধ্যে এই তিনটের সবগুলোই বীজাকারে বিরাজ করছে, আবার কতক লোকের মধ্যে এই গুনগুলির একটা, দুটো বা সবগুলোই বিকশিত রয়েছে । এইসব শক্তির যত বিকাশ হবে, মানুষের তত‌ই অগ্রগতি বা উন্নতি হবে ।
স্বামীজী লক্ষ্য করেছিলেন যে, আদিবাসীদের অধিকাংশের মধ্যেই ওই তিন শক্তি বীজাকারে রয়েছে । কি করে ওই শক্তিগুলির বিকাশ ঘটিয়ে প্রসারিত করা যাবে? কি রকম ধরনের পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে?
যথেষ্ট পরিমাণে ভালো খাবার ___শক্তি সৃষ্টি করে! আদিবাসী গনকে কর্মে উন্নত হতে হলে এবং আনন্দ পেতে হলে__তাদের শক্তিশালী হতে হবে । তাদেরকে যথেষ্ট পরিমাণে খাবার খেতে হবে ! কিন্তু কি করে তা পাওয়া যাবে?
অভিজ্ঞতা এবং কৃপাতে জ্ঞান লাভ হয়। কিন্তু খালি পেটে মানুষ কি চিন্তা করতে পারে ? খাদ্য ছাড়া তাদের আর কোনো জিনিসের দরকার নাই । এই আদিবাসী মানুষরা খাদ্য চায় ! পেট ভর্তি হোলেই তাদের যেন স্বর্গপ্রাপ্তি ! এটাই যেন তাদের কাছে মুক্তি ! তাই প্রথমে এদের উদরপূর্তি করাতে হবে । তাহলেই তারা ঈশ্বর সম্বন্ধে চিন্তা করতে বা জ্ঞান লাভ করতে পারবে ।
মানবের রূপান্তর হতে প্রেমের উদ্ভব হয়। রূপান্তরের পূর্বে বিচারের প্রয়োজন । বিচার করার আগে শক্তি দরকার । ক্ষুধা পেলে উদরপূর্তির কথাই চিন্তা হয়, ভালো-মন্দের বিচার করা যায়না ! ক্ষুধা নিবৃত্ত না হওয়া পর্যন্ত বিচার হয় না। যদি তাদের মধ্যে প্রেমের বিকাশ ঘটাতে হয় তাহলে প্রথমে তাদেরকে যথেষ্ট পরিমাণে আহার্য দিতে হবে । তারপর দিতে হবে বিচার করার সুযোগ ।
জীব ঈশ্বরের প্রকাশ। জীবের সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হবে। প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তি এই তিন গুণের মধ্যে যেটির অভাব সেটির বিকাশ ঘটাতে হবে ।
আশ্রমের চারপাশে যে সমস্ত আদিবাসী আছে _তাদের এই তিন গুণের বিকাশ সাধন প্রয়োজন ‌ এই তিন গুণ‌ই তাদের মধ্যে রয়েছে,তবে তা বীজাকারে রয়েছে। যদি তাদের মধ্যে এই শক্তির বিকাশ ঘটাতে হয়, তাহলে তাদেরকে যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য দিতে হবে । ওই খাদ্য শুধু সরবরাহ করলেই চলবে না _ওই খাদ্য ক্রয় করার মতো ক্ষমতা তাদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে ‌। আধ্যাত্মিক প্রকৃতির নয় এমন মানুষের কার্যাবলী আদিবাসীদের উন্নতির অন্তরায় হয়ে রয়েছে _ তাদের কার্যাবলী রোধ করতে হবে !
শোষনকারীদের কবল হতে যাতে আদিবাসীরা উদ্ধার পেতে পারে, সে বিষয়ে তাদেরকে সাহায্য করতে হবে । তাদের মধ্যে সমাজচেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে । এজন্য তাদেরকে সেই সমস্ত লোকের সংস্পর্শে আসতে হবে _যাদের মধ্যে অন্তত পক্ষে আংশিক পরিমাণেও ইতিমধ্যে প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তির বিকাশ ঘটেছে!
কেউ যদি মানুষের সেবা করতে চায়, তাহলে প্রথমে তাকে ঈশ্বরের সেবা করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে । যারা ঈশ্বরের সেবা করে নাই, তারা মানুষের সেবা করতে পারে না । ঈশ্বরের সেবার মাধ্যমে যাদের মধ্যে প্রেমের বিকাশ ঘটেছে_ একমাত্র তারাই মানুষকে সেবা করার কথা চিন্তা করতে পারে ! ঈশ্বরের সেবার মাধ্যমে প্রথমে তাদেরকে অনুমতি পেতে হবে ! যখন তারা যোগ্য হবে, তখন তারা ঈশ্বর এবং মানুষের (সেব্য এবং সেবকের) মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পাবে না। তখনই ‘ঈশ্বরের সেবা’_ মানুষের সেবায় রূপ নেবে!
অপরপক্ষে ঈশ্বরের সেবার মাধ্যমে প্রেম অর্জন না করে যদি কেউ মানুষের সেবা করতে চায়, তাহলে তাদের স্বার্থপর হয়ে পড়ার বিপদ দেখা যায় ! তাদের কাজ__ ‘কর্তব্যের খাতিরে কর্তব্য’- হয়ে দাঁড়ায় ! কিন্তু তাদের লক্ষ্য ঈশ্বরের জন্য কর্তব্য হওয়া উচিত।৷
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
…………………………………………………………….
জিজ্ঞাসা :– “ঘটোবা মৃৎপিণ্ড…..পরমাশক্তি।”–এর অর্থ হল ঘট আগে, না এর উৎস মৃত্তিকা আগে ? গাছ আগে, না বীজ আগে ?
মীমাংসা :– এরূপ আলোচনার কোনো যুক্তি নেই। এতে শুধু সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু হয় না। এই ধরনের শ্লোক শঙ্করাচার্য লেখেন নি। তাঁর কোন ভক্ত হয়তো লিখেছেন। পরে তিনি শঙ্করাচার্যের নাম দিয়ে তা প্রকাশ করেছেন। এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না যে, তিনি (শঙ্করাচার্য) এর ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
কোনটি আগে—গাছ না বীজ ? এই সম্বন্ধে আলােচনা করা যাক্।
যদি তুমি বীজ বপন কর, তাহলে সেই বীজ হতে গাছ হবে। গাছ বড় হবে। তাতে ফুল ধরবে। ফুল হতে ফল হবে। ফল হতে বীজ হবে। কিন্তু বীজ পুঁতলেই সব বীজ হতে গাছ হয় না। বীজ যদি পুরানাে হয় অথবা রােগাক্রান্ত হয় বা জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলে, তাহলে তা হতে গাছ জন্মাবে না। মনে কর, কোন বীজ নেই, তাহলে কি গাছ হবে না ?–হ্যাঁ হবে। অনেক গাছ আছে যেগুলি বীজ হতে জন্মায় না। তারা গাছের ডাল থেকে জন্মায়। কোন কোন গাছ পাতা থেকে জন্মায়। সুতরাং বীজ না হলে গাছ হবে না—একথা বলা যাবে না। সব গাছের বীজ হয় না।
ঠিক যেমন কতকগুলাে গাছ আছে যাদের বীজের প্রয়ােজন হয় না, তেমনি কতক গাছ আছে যাদের বীজ হয় না। এ সব গাছের জন্মানাের জন্য বীজের প্রয়ােজন হয় না। সুতরাং গাছ ছাড়া বীজ হয় আবার বীজ ছাড়াও গাছ হয় । এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল ‘সহজাত শক্তি’। এই শক্তির বলেই বীজ হতে গাছ জন্মায় এবং ক্রমান্বয়ে গাছ, ফল ও বীজ হয়।
সুতরাং শক্তিই হল এর একমাত্র উৎস। যদিও নিখুঁত বিচার না করলে এ সব রহস্য বুঝতে পারবে না। যাঁরা গুরুর কৃপা পেয়েছে তাঁরা এগুলি ধারণা করতে সক্ষম হবেন। অন্যরা শুধু তর্কই করবে– রহস্য ভেদ করতে পারবে না। তাই বীজের অঙ্কুরিত হওয়ার জন্য যেমন শক্তির প্রয়ােজন, সেইরূপ জ্ঞানপ্রাপ্তির জন্য গুরুর কৃপা প্রয়ােজন।
এইরূপভাবে জগদ্গুরুর বাণী ও তার জীবনের ঘটনা সম্বন্ধে এমন অনেক অদ্ভুত গল্প আছে, যেগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেক সহ বিচার না করলে ঠিক বুঝতে পারবে না তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বা এগুলির সত্যাসত্য।
কয়েকটা ঘটনা সম্বন্ধে বলছি :–
একদিন জগদ্গুরু বারাণসীতে ঘুরছেন। কিছু ভক্ত তাঁর আগে আগে যাচ্ছেন এবং কিছু ভক্ত তাঁর পিছনে পিছনে চলেছেন। তাঁরা দেখলেন একজন চণ্ডাল বিপরীত দিক হতে তাঁদের দিকে আসছে। তার পাশে পাশে কয়েকটা কুকুর। এখন কেউ কেউ বলেন জগদ্গুরু নিজে চণ্ডালকে রাস্তা থেকে সরে যেতে বললেন আবার অন্য কেউ কেউ বলেন যে, যে শিষ্যরা তাঁর আগে আগে যাচ্ছিলেন, তাঁরা ঐ ব্যক্তিকে রাস্তা থেকে সরে যেতে বলেছিলেন। তবে একথা সত্য, যে কেউ তাকে রাস্তা থেকে সরে যেতে বলুন না কেন, চণ্ডালের নিকট এলে তিনি অপবিত্র হতেন না।
তারপর চণ্ডাল জগদগুরুকে বলল, “আপনি অদ্বৈত দর্শনের শিক্ষা দিচ্ছেন, আপনি আমাকে সরে যেতে বলেছেন ? আপনি দয়া করে বলুন– আমি কে ? আপনিই বা কে ? কোথা হতে আমরা এসেছি এবং কোথায় আমাদেরকে যেতে হবে ?”
জগদ্গুরু তখন বললেন, “তােমার আমার মধ্যে এবং কাশীশ্বরের মধ্যে কোন ভেদ নেই। শিষ্যরা তােমাকে বর্ণাশ্রম রক্ষার জন্য সরে যেতে বলেছে।” এই কথা বলে জগদ্গুরু চণ্ডালকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। চণ্ডাল অদৃশ্য হয়ে গেল । লােকে বলে জগদগুরু চণ্ডালকে কাশীশ্বর জেনেই প্রণাম করেছিলেন।
এখন আমরা বিচার করে এইটাই বুঝি যে, বর্ণ ধর্ম রক্ষা করার জন্য অগ্রে গমনকারী শিষ্যরা চণ্ডালকে সরে যেতে বলেছিলেন। তাঁরা গুরুর আদেশ না নিয়েই তাকে সরে যেতে বলেছিলেন। জগদ্গুরুর জীবন-ইতিহাসের আরও অনেক ঘটনা আছে। … (ক্রমশঃ)