স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো। স্বামীজীর সর্বত্র কষ্ণদর্শনের অবস্থা কেটে যাওয়ার পর তাঁর অন্তর্জগতে নানারকম অনুপ্রেরণা আসতে শুরু করেছিল_এখন সেই সব ব্যাপারে আলোচনা চলছিল।
এই সমস্ত দিক বিচার করে স্বামীজি স্থির করলেন যে, আদিবাসীদের উন্নতির জন্য যে সেবা তাই ঈশ্বরের সেবার মাধ্যমে হওয়াই উচিত ! আদিবাসীদের উচিত __যে সমস্ত লোকের(যারা আদিবাসী নয়) মধ্যে তিন গুণের কিঞ্চিত মাত্র বিকশিত হয়েছে _তাদের নিবিড় সংস্পর্শে আসা! এইজন্য প্রয়োজন _ উন্নত অর্থাৎ তিন গুণের অধিকারী লোকেরা যেন তাদের কাছে চার পাঁচ দিন ধরে থাকে এবং তাদের উভয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে! তারা যাতে একে অপরকে জানতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে !
সেই সমস্ত মানুষরা যদি চার পাঁচ দিন ধরে আশ্রমে থাকতে চায়, তাহলে ওই কয়দিন আশ্রমে কিছু ক্রিয়াকর্ম থাকা উচিত ! এই জন্য তিনি চাইলেন ওই চার পাঁচদিন দশেরা, মুকুঠি, একাদশী এবং মহা শিবরাত্রি উৎসব পালিত হোক ! এই উৎসবগুলিতে পাক করা অন্ন দিয়ে অন্নপূর্ণার অভিষেক এবং ঈশ্বরের উপাসনা করা হবে।
একদিন রাত্রে অন্নপূর্ণার অভিষেক দর্শন হলো স্বামীজীর! যে চাল দিয়ে আশ্রম দেবতা শিব লিঙ্গ কে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, সেই চাল লাল, হলুদ এবং সাদা রঙ-এ পরিণত হয়ে গেল ! লাল কর্মের প্রতীক ! প্রথমদিন লাল চাল দিয়ে দেবতাকে পূজা করতে হবে । হলুদ পবিত্রতার প্রতীক ! দ্বিতীয় দিন হলুদ চাল দিয়ে দেবতাকে পূজা করতে হবে । সাদা শান্তির প্রতীক! সুতরাং তৃতীয় দিন দেবতাকে সাদা চাল দিয়ে পুজো করতে হবে। চতুর্থ দিন বিল্বপত্র দিয়ে দেবতাকে পূজা করা হবে।
উৎসবের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস ভক্তবৃন্দ কতৃক সংগৃহীত হোতো ।
স্বামীজীর কাজের সহযোগী সুব্রহ্মনিয়ামের সঙ্গে অনেক ভক্ত আসতেন__ তারা সাত দিন ধরে উৎসব করতে চাইলেন । সব কদিনই ওই এলাকার আদিবাসীদের অন্ন ভোগ খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করা হোতো। পূজার পর আদিবাসীদের অন্ন দিয়ে সেবা করাই ছিল মূল কর্ম ।
সমতল থেকে যে সমস্ত মেয়েরা আসতো, তারা কুমকুম এবং হলুদ মিশিয়ে রঙিন খাবার তৈরি করতো।
সমতল ভূমি থেকে আসা( চেতনায় উন্নত) লোকেরা উৎসবের একদিন আগে আশ্রমে চলে আসতো এবং উৎসব মিটে যাবার একদিন পরে তারা চলে যেত । উৎসবের দিন তারা ভোর তিনটেয় নদীতে স্নান করতো। স্নান সেরে তারা মন্দিরে পূজা, রান্না এবং আদিবাসীসহ সমস্ত যাত্রীদের খাওয়ানোর কাজে ব্যস্ত থাকতো । প্রথম বৎসর রাঁধুনি নিয়োগ করা হয়েছিল, পরের উৎসব থেকে ভক্তরা নিজেরাই রান্না কোরতো । পরে কয়েকজন আদিবাসী ছেলেকেও ‘রান্না করা’ শেখানো হয়েছিল ! তারপর থেকে ওই ছেলেরাই রান্না কোরতো। সমতল ভূমি থেকে আগত ভক্তরা বিনা দ্বিধায় আদিবাসীদের রান্না করা খাবার সবার সাথে গ্রহণ কোরতো।
উৎসবের শেষে, রাত্রিতে ভক্তরা কথা শোনার জন্য স্বামীজীকে ঘিরে বসতো। স্বামীজী তাদের কাছে আদিবাসীদের ভয়াবহ অবস্থার কথা বর্ণনা করতেন । স্বামীজী করুণ সুরে যেসব কথা বর্ণনা করতেন_ সে সব কথা শুনে মাঝে মাঝে সমতল থেকে আগত ভক্তরা কেঁদে ফেলতো। তাদের একটাই চিন্তা ছিল কেমন করে আদিবাসীদের সাহায্য করা যায় ! কেমন করে তাদের দুঃখ মোচন করা যায় !
স্বামীজীর নাম যত সুদূরপ্রসারী হতে লাগলো_ রাজ্যের বিভিন্ন স্থান হোতে তত বেশি ভক্ত আশ্রমে আসতে লাগলো। আদিবাসীদের সমস্যার প্রতি এই সমস্ত ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হোলো।
এইরূপে স্বামীজী স্বতন্ত্র এবং নীরবতার আওতা হতে বেরিয়ে এসে কর্মী হয়ে উঠলেন ! চতুর্দিক হতে স্বামীজি ভক্তদের আকর্ষণ করতে লাগলেন । আধ্যাত্মিকতায় উন্নত হওয়ার জন্য তাদেরকে সাহায্য করতে লাগলেন। তাদেরকে নিষ্কাম কর্মে প্রবৃত্ত করতে লাগলেন। তাদের সামর্থ্য এবং অর্থকে আদিবাসীদের সেবার কাজে লাগালেন। প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তির প্রবাহ প্রতিষ্ঠিত হোল।
স্বামীজী সর্বেসর্বা ঈশ্বরের কাছ থেকে শক্তি আকর্ষণ করে ভক্তদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতেন। তাঁর অপার্থিব প্রেম, বিভিন্ন আকারে বইতে লাগলো এবং তা আদিবাসীদের নিকট পৌঁছে গেল । পেরেন্টাপল্লীর আদিবাসীদের কাছে স্বামীজী যেন শক্তি ও প্রেমের মূর্ত প্রতীক রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন !(ক্রমশঃ)
================©==========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………..
‘অনুগামী’ ও ‘শিষ্য’—এই দুটি কথার মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করতে হবে। জগদ্গুরুর অনেক অনুগামী ছিলেন। কিন্তু শিষ্য ছিলেন কয়েকজন। অনুগামীদের মধ্যে কয়েকজন খুব বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। তারা ছিলেন বেশ পণ্ডিত ব্যক্তি। আর জগদ্গুরুর শিষ্যরা পণ্ডিত ছিলেন না এবং তাঁরা জনগণের নিকট হতে সেইরূপ শ্রদ্ধাও পেতেন না। জগদ্গুরু এটা জানতেন। তিনি এও জানতেন তার অনুগামীরাই তাঁর শিষ্যদের যথােচিত শ্রদ্ধা করে না। তিনি তাদের অনুগামীদের এই ত্রুটি প্রায়ই সংশােধন করে দিতেন। এ সম্বন্ধে একটা ঘটনা আছে –
তােটক নামে জগদ্গুরুর একজন শিষ্য ছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে বদ্রিকাশ্রমের আচার্য হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পণ্ডিত ছিলেন না। একদিন তিনি আশ্রমের বাইরে ছিলেন। জগদ্গুরু আলােচনা শুরু করবেন। অন্য সকলে উপস্থিত ছিলেন। তারা তাঁকে আলােচনা শুরু করার জন্য অনুরােধ করলেন। তখন তিনি রাজী হলেন না। অনুগামীরা পুনরায় তাঁকে অনুরােধ করলেন। তিনি বললেন, “তােটকের জন্য অপেক্ষা কর।” তখন একজন অনুগামী বললেন “ওর কোন বিদ্যা নেই, ওর জন্য কেন অপেক্ষা করব ?”
ঐ সময়ে তােটক নদীর অপর প্রান্তে ছিলেন। কোন নৌকা না পাওয়ায় তিনি এপারে আসতে পারছিলেন না। তার সঙ্কটের কথা জগদ্গুরু বুঝতে পারলেন । তিনি অনুগামীদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে চাইলেন। তিনি ‘তােটক’ বলে ডাকলেন । এই ডাকই তােটকের কাছে যথেষ্ট। সেই মুহূর্তে কি করা উচিত তা চিন্তা না করে তিনি হেঁটে নদী পার হয়ে এলেন। তিনি নিরাপদে গুরুর কাছে এসে পৌঁছুলেন। তখন শঙ্করাচার্য বললেন, “তােমরা দেখলে তােটক কেমন জলের উপর দিয়ে হেঁটে এল। এই জন্যই আমরা অপেক্ষা করছিলাম।” এই কথা শুনে সকলে হতবাক হয়ে গেলেন।
মণ্ডন মিশ্রের গল্পকাহিনী এরকম আর একটা ঘটনা। আচার্যশঙ্কর এবং পণ্ডিত মণ্ডন মিশ্রের মধ্যে খুব তর্ক-বিতর্ক চলছিল। শঙ্কর বললেন, সন্ন্যাসই হল সর্বোচ্চ অবস্থা । সকল কর্মের শেষে এই অবস্থা লাভ হয়। পণ্ডিত বললেন, কর্ম সন্ন্যাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ইত্যাদি। এই সময় এই শর্তে তর্ক চলছিল যে, যে পরাজিত হবে, সে বিজেতার শিষ্যত্ব বরণ করবে।
মণ্ডন মিশ্র হেরে গেলেন। তখন তিনি আচার্যের নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করে তাঁর সঙ্গে থাকতে চাইলেন। এই সময় মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয় ভারতী এই ঘটনা শুনলেন। তিনি আচার্যের নিকট এসে বললেন, ” আমি পণ্ডিতের স্ত্রী–অর্ধাঙ্গিনী। আমাকে পরাস্ত না করে আপনি ‘জয়’ দাবি করতে পারেন না। আমাকে পরাস্ত করুন।” আচার্য শঙ্কর পণ্ডিতের স্ত্রীর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান গ্রহণ করলেন। তর্ক আরম্ভ হল। মিশ্রের স্ত্রী আচার্যকে বললেন, “আপনি একজন যুবক ব্রহ্মচারী। বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে আপনার কোন ধারণা নেই। আপনি কামসূত্র সম্বন্ধে কিছু জানেন না। সুতরাং আপনি তর্ক করার উপযুক্ত নন। ফিরে গিয়ে বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এখানে আসবেন। তারপরে তর্ক হবে।” শঙ্করাচার্য সম্মত হলেন। তর্ক থেমে গেল।
এখন এই ঘটনা বা কথা কতদূর যুক্তিযুক্ত তা আমরা বিচার করে দেখি। উভয় ভারতী আচার্যকে বললেন, “আপনি যুবক।” কিন্তু আচার্যের যুক্তিতে তিনি আত্মা। তিনি জন্ম-মৃত্যুর অতীত। জন্ম-মৃত্যু শরীরের হয়, আত্মার নয়। বয়স শরীরের। সুতরাং যুবক কথাটা শরীরের ক্ষেত্রে প্রযােজ্য। এই ধরনের যুক্তি জগদ্গুরুর। তিনি কেমন করে ঐ মহিলার কথা মেনে নিতে পারবেন ?
বরং তিনি বললেন, “মাতাজী, আপনি বয়সের উল্লেখ করছেন। ইহা শরীরের ক্ষেত্রে প্রযােজ্য। আমি শরীর নই। সুতরাং আমি যুবকও নই। আপনি আমাকে তর্ক করার অনুপযুক্ত বলতে পারেন না। আপনি এও বললেন যে, বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই। এও সত্য নয়। বিগত জন্মে আমি এই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সুতরাং এ বিষয়েও আমার অভিজ্ঞতা আছে। তা না হলে বাল্যকালেই কেমন করে সন্ন্যাস গ্রহণ করলাম? অহংকার, অভিমান, ‘আমি’-‘আমার’ এবং কামনা-বাসনা আমার বন্ধন হয়ে দাঁড়াত। যদি পূর্ব জন্মে কাম প্রবৃত্তির নিরসন না ঘটত, তাহলে আমি মেয়েদের কামনা করতাম। আপনি বলতে চান যে, শরীর ধারণ করলে সব রকমের অভিজ্ঞতা থাকা উচিৎ । কিন্তু আপনার এই ধারণা ভুল। তাই আমি আপনার সঙ্গে তর্ক করার উপযুক্ত।”
কিন্তু গল্পে আছে অন্যরকম। যা কখনোই বিশ্বাস করা যায় না। তিনি নাকি রাজার মৃত শরীরে প্রবেশ করতেই রাজা বেঁচে উঠলেন। তিনি রাজার শরীর দিয়ে বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলেন। –এই ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য নয়। জগদ্গুরুর কয়েকজন অনুগামী এই মত প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যে, গৃহস্থ আশ্রমই উৎকৃষ্ট আশ্রম। গৃহস্থ আশ্রম জীবনযাপন না করে কেউই সন্ন্যাস নেওয়ার উপযুক্ত হতে পারে না। তাঁরা চিরাচরিত প্রথা মেনে চলে আসছেন।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব জাতির দুর্বলতা। স্বার্থপর লোকে বিন্দুমাত্র সুখ-স্বচ্ছন্দ ত্যাগ করতে রাজি নয়। স্বার্থপরতাই জীবনের দুঃখ-কষ্টের কারণ। স্বার্থপরতা ত্যাগ করতে হবে। তা না হলে জাতির কোন অস্তিত্ব থাকবে না।(ক্রমশঃ)
এই সমস্ত দিক বিচার করে স্বামীজি স্থির করলেন যে, আদিবাসীদের উন্নতির জন্য যে সেবা তাই ঈশ্বরের সেবার মাধ্যমে হওয়াই উচিত ! আদিবাসীদের উচিত __যে সমস্ত লোকের(যারা আদিবাসী নয়) মধ্যে তিন গুণের কিঞ্চিত মাত্র বিকশিত হয়েছে _তাদের নিবিড় সংস্পর্শে আসা! এইজন্য প্রয়োজন _ উন্নত অর্থাৎ তিন গুণের অধিকারী লোকেরা যেন তাদের কাছে চার পাঁচ দিন ধরে থাকে এবং তাদের উভয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে! তারা যাতে একে অপরকে জানতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে !
সেই সমস্ত মানুষরা যদি চার পাঁচ দিন ধরে আশ্রমে থাকতে চায়, তাহলে ওই কয়দিন আশ্রমে কিছু ক্রিয়াকর্ম থাকা উচিত ! এই জন্য তিনি চাইলেন ওই চার পাঁচদিন দশেরা, মুকুঠি, একাদশী এবং মহা শিবরাত্রি উৎসব পালিত হোক ! এই উৎসবগুলিতে পাক করা অন্ন দিয়ে অন্নপূর্ণার অভিষেক এবং ঈশ্বরের উপাসনা করা হবে।
একদিন রাত্রে অন্নপূর্ণার অভিষেক দর্শন হলো স্বামীজীর! যে চাল দিয়ে আশ্রম দেবতা শিব লিঙ্গ কে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, সেই চাল লাল, হলুদ এবং সাদা রঙ-এ পরিণত হয়ে গেল ! লাল কর্মের প্রতীক ! প্রথমদিন লাল চাল দিয়ে দেবতাকে পূজা করতে হবে । হলুদ পবিত্রতার প্রতীক ! দ্বিতীয় দিন হলুদ চাল দিয়ে দেবতাকে পূজা করতে হবে । সাদা শান্তির প্রতীক! সুতরাং তৃতীয় দিন দেবতাকে সাদা চাল দিয়ে পুজো করতে হবে। চতুর্থ দিন বিল্বপত্র দিয়ে দেবতাকে পূজা করা হবে।
উৎসবের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস ভক্তবৃন্দ কতৃক সংগৃহীত হোতো ।
স্বামীজীর কাজের সহযোগী সুব্রহ্মনিয়ামের সঙ্গে অনেক ভক্ত আসতেন__ তারা সাত দিন ধরে উৎসব করতে চাইলেন । সব কদিনই ওই এলাকার আদিবাসীদের অন্ন ভোগ খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করা হোতো। পূজার পর আদিবাসীদের অন্ন দিয়ে সেবা করাই ছিল মূল কর্ম ।
সমতল থেকে যে সমস্ত মেয়েরা আসতো, তারা কুমকুম এবং হলুদ মিশিয়ে রঙিন খাবার তৈরি করতো।
সমতল ভূমি থেকে আসা( চেতনায় উন্নত) লোকেরা উৎসবের একদিন আগে আশ্রমে চলে আসতো এবং উৎসব মিটে যাবার একদিন পরে তারা চলে যেত । উৎসবের দিন তারা ভোর তিনটেয় নদীতে স্নান করতো। স্নান সেরে তারা মন্দিরে পূজা, রান্না এবং আদিবাসীসহ সমস্ত যাত্রীদের খাওয়ানোর কাজে ব্যস্ত থাকতো । প্রথম বৎসর রাঁধুনি নিয়োগ করা হয়েছিল, পরের উৎসব থেকে ভক্তরা নিজেরাই রান্না কোরতো । পরে কয়েকজন আদিবাসী ছেলেকেও ‘রান্না করা’ শেখানো হয়েছিল ! তারপর থেকে ওই ছেলেরাই রান্না কোরতো। সমতল ভূমি থেকে আগত ভক্তরা বিনা দ্বিধায় আদিবাসীদের রান্না করা খাবার সবার সাথে গ্রহণ কোরতো।
উৎসবের শেষে, রাত্রিতে ভক্তরা কথা শোনার জন্য স্বামীজীকে ঘিরে বসতো। স্বামীজী তাদের কাছে আদিবাসীদের ভয়াবহ অবস্থার কথা বর্ণনা করতেন । স্বামীজী করুণ সুরে যেসব কথা বর্ণনা করতেন_ সে সব কথা শুনে মাঝে মাঝে সমতল থেকে আগত ভক্তরা কেঁদে ফেলতো। তাদের একটাই চিন্তা ছিল কেমন করে আদিবাসীদের সাহায্য করা যায় ! কেমন করে তাদের দুঃখ মোচন করা যায় !
স্বামীজীর নাম যত সুদূরপ্রসারী হতে লাগলো_ রাজ্যের বিভিন্ন স্থান হোতে তত বেশি ভক্ত আশ্রমে আসতে লাগলো। আদিবাসীদের সমস্যার প্রতি এই সমস্ত ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হোলো।
এইরূপে স্বামীজী স্বতন্ত্র এবং নীরবতার আওতা হতে বেরিয়ে এসে কর্মী হয়ে উঠলেন ! চতুর্দিক হতে স্বামীজি ভক্তদের আকর্ষণ করতে লাগলেন । আধ্যাত্মিকতায় উন্নত হওয়ার জন্য তাদেরকে সাহায্য করতে লাগলেন। তাদেরকে নিষ্কাম কর্মে প্রবৃত্ত করতে লাগলেন। তাদের সামর্থ্য এবং অর্থকে আদিবাসীদের সেবার কাজে লাগালেন। প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তির প্রবাহ প্রতিষ্ঠিত হোল।
স্বামীজী সর্বেসর্বা ঈশ্বরের কাছ থেকে শক্তি আকর্ষণ করে ভক্তদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতেন। তাঁর অপার্থিব প্রেম, বিভিন্ন আকারে বইতে লাগলো এবং তা আদিবাসীদের নিকট পৌঁছে গেল । পেরেন্টাপল্লীর আদিবাসীদের কাছে স্বামীজী যেন শক্তি ও প্রেমের মূর্ত প্রতীক রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন !(ক্রমশঃ)
================©==========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………..
‘অনুগামী’ ও ‘শিষ্য’—এই দুটি কথার মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করতে হবে। জগদ্গুরুর অনেক অনুগামী ছিলেন। কিন্তু শিষ্য ছিলেন কয়েকজন। অনুগামীদের মধ্যে কয়েকজন খুব বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। তারা ছিলেন বেশ পণ্ডিত ব্যক্তি। আর জগদ্গুরুর শিষ্যরা পণ্ডিত ছিলেন না এবং তাঁরা জনগণের নিকট হতে সেইরূপ শ্রদ্ধাও পেতেন না। জগদ্গুরু এটা জানতেন। তিনি এও জানতেন তার অনুগামীরাই তাঁর শিষ্যদের যথােচিত শ্রদ্ধা করে না। তিনি তাদের অনুগামীদের এই ত্রুটি প্রায়ই সংশােধন করে দিতেন। এ সম্বন্ধে একটা ঘটনা আছে –
তােটক নামে জগদ্গুরুর একজন শিষ্য ছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে বদ্রিকাশ্রমের আচার্য হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পণ্ডিত ছিলেন না। একদিন তিনি আশ্রমের বাইরে ছিলেন। জগদ্গুরু আলােচনা শুরু করবেন। অন্য সকলে উপস্থিত ছিলেন। তারা তাঁকে আলােচনা শুরু করার জন্য অনুরােধ করলেন। তখন তিনি রাজী হলেন না। অনুগামীরা পুনরায় তাঁকে অনুরােধ করলেন। তিনি বললেন, “তােটকের জন্য অপেক্ষা কর।” তখন একজন অনুগামী বললেন “ওর কোন বিদ্যা নেই, ওর জন্য কেন অপেক্ষা করব ?”
ঐ সময়ে তােটক নদীর অপর প্রান্তে ছিলেন। কোন নৌকা না পাওয়ায় তিনি এপারে আসতে পারছিলেন না। তার সঙ্কটের কথা জগদ্গুরু বুঝতে পারলেন । তিনি অনুগামীদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে চাইলেন। তিনি ‘তােটক’ বলে ডাকলেন । এই ডাকই তােটকের কাছে যথেষ্ট। সেই মুহূর্তে কি করা উচিত তা চিন্তা না করে তিনি হেঁটে নদী পার হয়ে এলেন। তিনি নিরাপদে গুরুর কাছে এসে পৌঁছুলেন। তখন শঙ্করাচার্য বললেন, “তােমরা দেখলে তােটক কেমন জলের উপর দিয়ে হেঁটে এল। এই জন্যই আমরা অপেক্ষা করছিলাম।” এই কথা শুনে সকলে হতবাক হয়ে গেলেন।
মণ্ডন মিশ্রের গল্পকাহিনী এরকম আর একটা ঘটনা। আচার্যশঙ্কর এবং পণ্ডিত মণ্ডন মিশ্রের মধ্যে খুব তর্ক-বিতর্ক চলছিল। শঙ্কর বললেন, সন্ন্যাসই হল সর্বোচ্চ অবস্থা । সকল কর্মের শেষে এই অবস্থা লাভ হয়। পণ্ডিত বললেন, কর্ম সন্ন্যাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ইত্যাদি। এই সময় এই শর্তে তর্ক চলছিল যে, যে পরাজিত হবে, সে বিজেতার শিষ্যত্ব বরণ করবে।
মণ্ডন মিশ্র হেরে গেলেন। তখন তিনি আচার্যের নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করে তাঁর সঙ্গে থাকতে চাইলেন। এই সময় মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয় ভারতী এই ঘটনা শুনলেন। তিনি আচার্যের নিকট এসে বললেন, ” আমি পণ্ডিতের স্ত্রী–অর্ধাঙ্গিনী। আমাকে পরাস্ত না করে আপনি ‘জয়’ দাবি করতে পারেন না। আমাকে পরাস্ত করুন।” আচার্য শঙ্কর পণ্ডিতের স্ত্রীর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান গ্রহণ করলেন। তর্ক আরম্ভ হল। মিশ্রের স্ত্রী আচার্যকে বললেন, “আপনি একজন যুবক ব্রহ্মচারী। বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে আপনার কোন ধারণা নেই। আপনি কামসূত্র সম্বন্ধে কিছু জানেন না। সুতরাং আপনি তর্ক করার উপযুক্ত নন। ফিরে গিয়ে বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এখানে আসবেন। তারপরে তর্ক হবে।” শঙ্করাচার্য সম্মত হলেন। তর্ক থেমে গেল।
এখন এই ঘটনা বা কথা কতদূর যুক্তিযুক্ত তা আমরা বিচার করে দেখি। উভয় ভারতী আচার্যকে বললেন, “আপনি যুবক।” কিন্তু আচার্যের যুক্তিতে তিনি আত্মা। তিনি জন্ম-মৃত্যুর অতীত। জন্ম-মৃত্যু শরীরের হয়, আত্মার নয়। বয়স শরীরের। সুতরাং যুবক কথাটা শরীরের ক্ষেত্রে প্রযােজ্য। এই ধরনের যুক্তি জগদ্গুরুর। তিনি কেমন করে ঐ মহিলার কথা মেনে নিতে পারবেন ?
বরং তিনি বললেন, “মাতাজী, আপনি বয়সের উল্লেখ করছেন। ইহা শরীরের ক্ষেত্রে প্রযােজ্য। আমি শরীর নই। সুতরাং আমি যুবকও নই। আপনি আমাকে তর্ক করার অনুপযুক্ত বলতে পারেন না। আপনি এও বললেন যে, বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই। এও সত্য নয়। বিগত জন্মে আমি এই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সুতরাং এ বিষয়েও আমার অভিজ্ঞতা আছে। তা না হলে বাল্যকালেই কেমন করে সন্ন্যাস গ্রহণ করলাম? অহংকার, অভিমান, ‘আমি’-‘আমার’ এবং কামনা-বাসনা আমার বন্ধন হয়ে দাঁড়াত। যদি পূর্ব জন্মে কাম প্রবৃত্তির নিরসন না ঘটত, তাহলে আমি মেয়েদের কামনা করতাম। আপনি বলতে চান যে, শরীর ধারণ করলে সব রকমের অভিজ্ঞতা থাকা উচিৎ । কিন্তু আপনার এই ধারণা ভুল। তাই আমি আপনার সঙ্গে তর্ক করার উপযুক্ত।”
কিন্তু গল্পে আছে অন্যরকম। যা কখনোই বিশ্বাস করা যায় না। তিনি নাকি রাজার মৃত শরীরে প্রবেশ করতেই রাজা বেঁচে উঠলেন। তিনি রাজার শরীর দিয়ে বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলেন। –এই ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য নয়। জগদ্গুরুর কয়েকজন অনুগামী এই মত প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যে, গৃহস্থ আশ্রমই উৎকৃষ্ট আশ্রম। গৃহস্থ আশ্রম জীবনযাপন না করে কেউই সন্ন্যাস নেওয়ার উপযুক্ত হতে পারে না। তাঁরা চিরাচরিত প্রথা মেনে চলে আসছেন।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব জাতির দুর্বলতা। স্বার্থপর লোকে বিন্দুমাত্র সুখ-স্বচ্ছন্দ ত্যাগ করতে রাজি নয়। স্বার্থপরতাই জীবনের দুঃখ-কষ্টের কারণ। স্বার্থপরতা ত্যাগ করতে হবে। তা না হলে জাতির কোন অস্তিত্ব থাকবে না।(ক্রমশঃ)
