স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখানে উনি পাহাড়ের উপরে কুটির নির্মাণ করে বেশ কিছুদিন সাধন-ভজন করেছিলেন এবং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ অনেকেরই কৃপা লাভ করেছিলেন।
এখন স্বামীজীর ভক্ত সুব্বারাও এবং তার স্ত্রীর কথা নিয়ে আলোচনা চলছিল।সুব্বা রাও বা সুব্রহ্মনিয়াম এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই স্বামীজীর পরিপূর্ণ কৃপা লাভ করেছিলেন । তাঁদের ইচ্ছা মাত্র গুরুর দর্শন হোত! গুরু তাদের সমস্ত সংশয় দূর করে দিতেন এবং কখনো কখনো তাদেরকে_’কখন কি করতে হবে’- সেই নির্দেশও দিতেন ! একদিন রাত্রে ওই দম্পতি খাবার খেয়ে শুতে যাবেন _এমন সময় সুব্রামণি অর্থাৎ সুব্বারাওয়ের স্ত্রী একটা আদেশ পেলেন ! ছয় জন সদস্য বিশিষ্ট এক পরিবারের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে খাবার রান্না করে এক নির্দিষ্ট বাড়িতে পাঠানোর আদেশ হোলো। দ্বিতীয়বার আদেশের অপেক্ষা না করেই তিনি রান্না করলেন এবং সেই খাবার নির্দিষ্ট বাড়িতে নিয়ে গেলেন ! ওই পরিবারটি ছিল খুবই দুস্থ। ওই দিন তাদের কোনো খাবার জোটে নাই । তারা অবাক হোলো _কি করে এই মহিলাটি তাদের সংকটের কথা জানতে পারলো! তারা ওই দান গ্রহণ করতে খুব লজ্জা বোধ কোরলো । মহিলাটি জানালেন যে, এটা তাঁর গুরুর আদেশ ! এই বলে তিনি তাদেরকে ওই খাবার গ্রহণ করালেন !
অন্য এক সময় সুব্রামণি কোনো এক পরিবারকে হাফব্যাগ চাল পাঠানোর আদেশ পেলেন ! তিনি তা পাঠিয়েও দিয়েছিলেন। আরও একবার তিনি আদেশ পেলেন _বাড়তি 12 জনের খাবার রান্না করার! কোনো রকম সন্দেহ না রেখে তিনি ওই পরিমাণ খাবার রান্না করলেন। সেদিন গভীর রাত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে 12 জন অতিথি এসে হাজির হোল এবং তারা রান্না করা খাবার খেতে পেয়ে খুবই আনন্দিত হোল। এগুলি ছাড়াও ওই দম্পতি তাদের নিজের বাড়িতে অনেকবার স্বামীজীর দর্শনও পেয়েছিলেন!!
একবার ওনারা অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েই গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন ! তাঁদের সেবা-শুশ্রূষা করার কেউ ছিল না । বাড়িতে একটি গাভী ছিল, কেউ গিয়ে দুধ না দোহালে, তাঁরা দুধ খেতে পারছিলেন না, কারণ তাঁদের নড়াচড়া করারই ক্ষমতা ছিল না! তাই তাঁরা সবকিছুই ঈশ্বরের উপর ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ পড়ে রইলেন!
করুণাময় ঈশ্বর তাঁর সন্তানদের উপবাসী রাখতে পারলেন না ! ঈশ্বর তাঁর ভক্তের ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারেন না! তিনি স্বামী বাউলানন্দের রূপ ধরে আবির্ভূত হোলেন –কিন্তু পূজা নেওয়ার জন্য নয়, ভক্তকে সেবা করার জন্য তিনি এসেছিলেন ! স্বামীজী ওই বাড়িতে আবির্ভূত হয়ে গাভীটির নিকট গিয়ে দুধ দোয়ালেন, তারপরে তা গরম করে ভক্তদেরকে খাওয়ালেন ! ওদের খাওয়া হয়ে গেলেই উনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন ! ভক্ত দম্পতির জন্য কি মহৎ কাজ ! ঐ ভক্তগণ তাঁদের ভক্তি এবং ভালোবাসার দড়ি দিয়ে তাঁদের গুরুকে বাঁধতে পেরেছিলেন! প্রতিদানে গুরুকে স্বয়ং এসে সন্তানের ন্যায় কর্ম, মায়ের মত সেবা এবং বাবার মত আশীর্বাদ করতে হোলো ! কি সুন্দর এই ঘটনা !
ওই সময় পোডাগাটোলাপল্লী থেকে শ্রী সুব্বারাজু নামে এক ভক্ত প্রায়ই আশ্রম দর্শন করতে আসতো ! সে অবিবাহিত ছিল । ঈশ্বরের জ্যোতিঃ দর্শন করার মানসে সে গৃহ ত্যাগ করেছিল ! আশ্রমে এসে যখন সে স্বামীজীকে প্রণাম করলো __তখন স্বামীজীর পায়ে সে সেই জ্যোতিঃ দেখতে পেল ! এরপর সে এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করার পরিকল্পনা ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে পেরেন্টাপল্লী আশ্রমে থাকতে চাইল। স্বামীজী কিন্তু তাকে প্রথমেই থাকার অনুমতি দিলেন না ! একদিন সে তার মাকে সঙ্গে করে আশ্রমে নিয়ে এলো এবং মাকে বলল _ স্বামীজীকে অনুরোধ করার জন্য, যাতে স্বামীজী তাকে আশ্রমে থাকার অনুমতি দেন ! ছেলের কথা মতো মা স্বামীজীকে অনুরোধ করলেন ! স্বামীজী মায়ের কথা শুনে, তাঁর দুটিহাত ধরে বললেন _”মা! সুব্বারাজু এই আশ্রমেরই লোক ! শুধু তোমাকে এখানে আনার জন্য তাকে বাড়ি পাঠিয়ে ছিলাম ! তুমি ভাগ্যবতী _এমন সুন্দর একটা ছেলে পেয়েছো!”
মা খুব খুশি হয়ে বললেন _”স্বামীজী! আমি খুবই বৃদ্ধ হয়ে গেছি, সেজন্য এখানে থাকতে পারছি না ! আমি বাড়ি ফিরে যাবো ! কিন্তু আমার প্রার্থনা __আমার শরীর ছাড়ার সময় আপনি সশরীরে উপস্থিত হয়ে আমাকে আশীর্বাদ ও বিদায় জানাবেন !” স্বামীজী বললেন _”তাই হবে !” মৃত্যুর দিন মহিলাটি বাড়ির লোকজনকে, তাঁকে তুলসী তলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বললেন! তারপর তিনি পূর্বমুখী হয়ে বসে ঈশ্বরকে স্মরণ করতে লাগলেন ! কিছুক্ষণ পর তিনি আর একটা বসার চৌকি নিয়ে আনতে বললেন ! তিনি জানালেন _’স্বামীজী করুণা করে তাঁর অনুরোধ রেখেছেন এবং তাঁকে বিদায় জানাতে এসেছেন!’ স্বামীজী সেই চৌকিতে এসে বসেছিলেন, তিনি স্বামীজীর পায়ে ফুল দিয়ে পূজাও করেছিলেন, শেষে বলেছিলেন _”আমি যাচ্ছি, আশীর্বাদ করুন _যাতে আমি নারায়ণের সঙ্গে মিশে যেতে পারি!” এই কথা বলে পিছন দিকে ঝুঁকে পড়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ে তিনি শরীর ছেড়ে ছিলেন। … (ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………..
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ষষ্ঠ ধাপে, মানুষ কোনো খাবার পাক না করে খেতে পারতো না। সেজন্য তারা ফল-মুল সংগ্রহ করে বাড়ীতে নিয়ে আসতো, তারপর রান্না করে খেতো। তারা পরিবারের সকল লােকের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সংগ্রহ করতে লাগলো। প্রথমে পরের দিনের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতো। পরে সারা বছরের জন্য খাদ্য মজুত করে রাখতে শুরু করলো। এই ‘মজুত’ পদ্ধতির ফলে অন্য সকলে তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়ােজন মেটাতে পারতো না। তখন দেখা দিল সম্পত্তি করায়ত্ত করার মানসিকতা। এইভাবে জমির মালিকানা শুরু হোল।
সপ্তম ধাপে, খাদ্য মজুত করার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হোল। প্রয়ােজনমতো সারা বছরের খাবার মজুত করা স্বাভাবিক। কিন্তু অপরকে বঞ্চিত করে প্রয়ােজনের অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করার মনােভাব এই সময় থেকেই দেখা দিল। পরিবারের যতটুকু জমি দরকার, তার অতিরিক্ত জমি অধিকার করে অপরকে বঞ্চিত করে আত্মসুখ লাভের প্রবণতা দেখা দিল। এটা বিশৃঙ্খল-জীবনের সমতুল্য। এইভাবে মানব সমাজে __ভাবনা-চিন্তা, কথাবার্তা, যােগাযােগের ক্ষেত্রে অধঃপতন শুরু হল।
আদি পিতা-মাতার সময়ে এবং এই সময়ের ঠিক পরে কিছুদিন একমাত্র চিন্তা ছিল নিজেদেরকে সমষ্টি সত্তায় নিয়ে যাওয়া। যােগাযােগের কোনো প্রয়ােজন ছিল না। সকল জীবের অনুভব এবং চিন্তা একই ছিল।
দ্বিতীয় ধাপে দেখা দিল সচেতনভাবে ভাবের আদান প্রদান করা; অপরকে কোন বিষয় সম্বন্ধে জানানো। এই সময়ে একে অন্যের ইচ্ছার প্রবাহ গ্রহণ করতে পারতো।
তৃতীয় ধাপে ব্যক্তিকে মনােসংযােগ করে একাগ্রচিত্তে ইচ্ছাপ্রবাহ ক্ষেপণ করতে হোতাে।
কিন্তু চতুর্থ ধাপে দীর্ঘ মনােসংযােগের প্রয়ােজন হোল।
প্রথমে ধাপে ধাপে গতিবিধি-অন্যস্থানে যাওয়া এবং সঙ্কেত দ্বারা ভাবের আদান প্রদানের প্রয়োজন ছিল। এই সময়ের সঙ্গে যে সময় ফলমূল সংগ্রহ করে খাওয়া হতাে এবং প্রজননের জন্য মৈথুন ক্রিয়া হতাে–সেই সময়ের সাদৃশ্য আছে।
ষষ্ঠ ধাপে দেখা গেল পঞ্চম ধাপের কার্যবিধি কলুষিত হয়েছে ।
সপ্তম ধাপে দেখা গেল সঙ্কেত, কথাবার্তা, পত্ৰ-লিখন। এই ধাপে মানবের মানসিকতার আরও অবনতি দেখা গেল । এই সময়ে যত্নশীল লেখকও তার বক্তব্য বিষয় ঠিকমত প্রেরণ করতে পারতো না এবং পত্রপ্রাপক বুঝতে পারতো না লেখক চিঠিতে কি বলতে চেয়েছে।
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে খাদ্য অভ্যাস, ভাবের আদান-প্রদান, প্রজনন ইত্যাদি যে সমস্ত সুযােগ-সুবিধা আদি পিতা-মাতার ছিল সেগুলি এই অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের মানসিকতার অবনতি হয়েছে এবং ক্রমশ আমরা আদি পিতা-মাতা হতে আরও দূরে সরে যাচ্ছি।
একটি দৃষ্টান্ত দিলে আমাদের কেমন অবনতি হয়েছে তা বুঝতে কারও অসুবিধা হবে না। যােগাযােগের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যার উন্নতিতে বার্তা প্রেরণ করা সম্ভব। এগুলি এখন কতিপয় ধনী ব্যক্তির পক্ষে সুবিধাজনক। কিন্তু স্মরণাতীত কালে প্রত্যেক ব্যক্তিই মনােসংযােগের দ্বারা বার্তা প্রেরণ করতে পারতো। অধিকতর ধনী হওয়াতে বহির্মুখী উন্নতি হচ্ছে। এই বহির্মুখী উন্নতি স্বার্থপরতা হতে জাত। এটা স্বার্থসর্বস্ব উন্নতি। এতে লোককল্যাণ হয় না। স্বার্থপরতার উপর নির্ভর করে যে উন্নতি __তা প্রকৃত উন্নতি নয়। মানসিকতার ঊর্ধ্বপ্রগতিই প্রকৃত উন্নতি। বর্তমানকালে যে উন্নতি তা পুরােপুরি বহির্মুখী, স্বার্থজড়িত। এতে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কলহ হচ্ছে। ঈর্ষা এবং ঘৃণার একটা বাতাবরণ সৃষ্টি হচ্ছে।
সুতরাং এই অবনত অবস্থাতে প্রতিদ্বন্দ্বী চিন্তা এবং শক্তির মধ্যে অবিরত সংগ্রাম হচ্ছে। এর ফলে অস্বাভাবিকভাবে, ক্রোধ বাড়ছে এবং বিশ্বশান্তি ব্যাহত হচ্ছে। (ক্রমশঃ)
এখন স্বামীজীর ভক্ত সুব্বারাও এবং তার স্ত্রীর কথা নিয়ে আলোচনা চলছিল।সুব্বা রাও বা সুব্রহ্মনিয়াম এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই স্বামীজীর পরিপূর্ণ কৃপা লাভ করেছিলেন । তাঁদের ইচ্ছা মাত্র গুরুর দর্শন হোত! গুরু তাদের সমস্ত সংশয় দূর করে দিতেন এবং কখনো কখনো তাদেরকে_’কখন কি করতে হবে’- সেই নির্দেশও দিতেন ! একদিন রাত্রে ওই দম্পতি খাবার খেয়ে শুতে যাবেন _এমন সময় সুব্রামণি অর্থাৎ সুব্বারাওয়ের স্ত্রী একটা আদেশ পেলেন ! ছয় জন সদস্য বিশিষ্ট এক পরিবারের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে খাবার রান্না করে এক নির্দিষ্ট বাড়িতে পাঠানোর আদেশ হোলো। দ্বিতীয়বার আদেশের অপেক্ষা না করেই তিনি রান্না করলেন এবং সেই খাবার নির্দিষ্ট বাড়িতে নিয়ে গেলেন ! ওই পরিবারটি ছিল খুবই দুস্থ। ওই দিন তাদের কোনো খাবার জোটে নাই । তারা অবাক হোলো _কি করে এই মহিলাটি তাদের সংকটের কথা জানতে পারলো! তারা ওই দান গ্রহণ করতে খুব লজ্জা বোধ কোরলো । মহিলাটি জানালেন যে, এটা তাঁর গুরুর আদেশ ! এই বলে তিনি তাদেরকে ওই খাবার গ্রহণ করালেন !
অন্য এক সময় সুব্রামণি কোনো এক পরিবারকে হাফব্যাগ চাল পাঠানোর আদেশ পেলেন ! তিনি তা পাঠিয়েও দিয়েছিলেন। আরও একবার তিনি আদেশ পেলেন _বাড়তি 12 জনের খাবার রান্না করার! কোনো রকম সন্দেহ না রেখে তিনি ওই পরিমাণ খাবার রান্না করলেন। সেদিন গভীর রাত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে 12 জন অতিথি এসে হাজির হোল এবং তারা রান্না করা খাবার খেতে পেয়ে খুবই আনন্দিত হোল। এগুলি ছাড়াও ওই দম্পতি তাদের নিজের বাড়িতে অনেকবার স্বামীজীর দর্শনও পেয়েছিলেন!!
একবার ওনারা অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েই গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন ! তাঁদের সেবা-শুশ্রূষা করার কেউ ছিল না । বাড়িতে একটি গাভী ছিল, কেউ গিয়ে দুধ না দোহালে, তাঁরা দুধ খেতে পারছিলেন না, কারণ তাঁদের নড়াচড়া করারই ক্ষমতা ছিল না! তাই তাঁরা সবকিছুই ঈশ্বরের উপর ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ পড়ে রইলেন!
করুণাময় ঈশ্বর তাঁর সন্তানদের উপবাসী রাখতে পারলেন না ! ঈশ্বর তাঁর ভক্তের ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারেন না! তিনি স্বামী বাউলানন্দের রূপ ধরে আবির্ভূত হোলেন –কিন্তু পূজা নেওয়ার জন্য নয়, ভক্তকে সেবা করার জন্য তিনি এসেছিলেন ! স্বামীজী ওই বাড়িতে আবির্ভূত হয়ে গাভীটির নিকট গিয়ে দুধ দোয়ালেন, তারপরে তা গরম করে ভক্তদেরকে খাওয়ালেন ! ওদের খাওয়া হয়ে গেলেই উনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন ! ভক্ত দম্পতির জন্য কি মহৎ কাজ ! ঐ ভক্তগণ তাঁদের ভক্তি এবং ভালোবাসার দড়ি দিয়ে তাঁদের গুরুকে বাঁধতে পেরেছিলেন! প্রতিদানে গুরুকে স্বয়ং এসে সন্তানের ন্যায় কর্ম, মায়ের মত সেবা এবং বাবার মত আশীর্বাদ করতে হোলো ! কি সুন্দর এই ঘটনা !
ওই সময় পোডাগাটোলাপল্লী থেকে শ্রী সুব্বারাজু নামে এক ভক্ত প্রায়ই আশ্রম দর্শন করতে আসতো ! সে অবিবাহিত ছিল । ঈশ্বরের জ্যোতিঃ দর্শন করার মানসে সে গৃহ ত্যাগ করেছিল ! আশ্রমে এসে যখন সে স্বামীজীকে প্রণাম করলো __তখন স্বামীজীর পায়ে সে সেই জ্যোতিঃ দেখতে পেল ! এরপর সে এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করার পরিকল্পনা ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে পেরেন্টাপল্লী আশ্রমে থাকতে চাইল। স্বামীজী কিন্তু তাকে প্রথমেই থাকার অনুমতি দিলেন না ! একদিন সে তার মাকে সঙ্গে করে আশ্রমে নিয়ে এলো এবং মাকে বলল _ স্বামীজীকে অনুরোধ করার জন্য, যাতে স্বামীজী তাকে আশ্রমে থাকার অনুমতি দেন ! ছেলের কথা মতো মা স্বামীজীকে অনুরোধ করলেন ! স্বামীজী মায়ের কথা শুনে, তাঁর দুটিহাত ধরে বললেন _”মা! সুব্বারাজু এই আশ্রমেরই লোক ! শুধু তোমাকে এখানে আনার জন্য তাকে বাড়ি পাঠিয়ে ছিলাম ! তুমি ভাগ্যবতী _এমন সুন্দর একটা ছেলে পেয়েছো!”
মা খুব খুশি হয়ে বললেন _”স্বামীজী! আমি খুবই বৃদ্ধ হয়ে গেছি, সেজন্য এখানে থাকতে পারছি না ! আমি বাড়ি ফিরে যাবো ! কিন্তু আমার প্রার্থনা __আমার শরীর ছাড়ার সময় আপনি সশরীরে উপস্থিত হয়ে আমাকে আশীর্বাদ ও বিদায় জানাবেন !” স্বামীজী বললেন _”তাই হবে !” মৃত্যুর দিন মহিলাটি বাড়ির লোকজনকে, তাঁকে তুলসী তলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বললেন! তারপর তিনি পূর্বমুখী হয়ে বসে ঈশ্বরকে স্মরণ করতে লাগলেন ! কিছুক্ষণ পর তিনি আর একটা বসার চৌকি নিয়ে আনতে বললেন ! তিনি জানালেন _’স্বামীজী করুণা করে তাঁর অনুরোধ রেখেছেন এবং তাঁকে বিদায় জানাতে এসেছেন!’ স্বামীজী সেই চৌকিতে এসে বসেছিলেন, তিনি স্বামীজীর পায়ে ফুল দিয়ে পূজাও করেছিলেন, শেষে বলেছিলেন _”আমি যাচ্ছি, আশীর্বাদ করুন _যাতে আমি নারায়ণের সঙ্গে মিশে যেতে পারি!” এই কথা বলে পিছন দিকে ঝুঁকে পড়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ে তিনি শরীর ছেড়ে ছিলেন। … (ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………..
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ষষ্ঠ ধাপে, মানুষ কোনো খাবার পাক না করে খেতে পারতো না। সেজন্য তারা ফল-মুল সংগ্রহ করে বাড়ীতে নিয়ে আসতো, তারপর রান্না করে খেতো। তারা পরিবারের সকল লােকের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সংগ্রহ করতে লাগলো। প্রথমে পরের দিনের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতো। পরে সারা বছরের জন্য খাদ্য মজুত করে রাখতে শুরু করলো। এই ‘মজুত’ পদ্ধতির ফলে অন্য সকলে তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়ােজন মেটাতে পারতো না। তখন দেখা দিল সম্পত্তি করায়ত্ত করার মানসিকতা। এইভাবে জমির মালিকানা শুরু হোল।
সপ্তম ধাপে, খাদ্য মজুত করার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হোল। প্রয়ােজনমতো সারা বছরের খাবার মজুত করা স্বাভাবিক। কিন্তু অপরকে বঞ্চিত করে প্রয়ােজনের অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করার মনােভাব এই সময় থেকেই দেখা দিল। পরিবারের যতটুকু জমি দরকার, তার অতিরিক্ত জমি অধিকার করে অপরকে বঞ্চিত করে আত্মসুখ লাভের প্রবণতা দেখা দিল। এটা বিশৃঙ্খল-জীবনের সমতুল্য। এইভাবে মানব সমাজে __ভাবনা-চিন্তা, কথাবার্তা, যােগাযােগের ক্ষেত্রে অধঃপতন শুরু হল।
আদি পিতা-মাতার সময়ে এবং এই সময়ের ঠিক পরে কিছুদিন একমাত্র চিন্তা ছিল নিজেদেরকে সমষ্টি সত্তায় নিয়ে যাওয়া। যােগাযােগের কোনো প্রয়ােজন ছিল না। সকল জীবের অনুভব এবং চিন্তা একই ছিল।
দ্বিতীয় ধাপে দেখা দিল সচেতনভাবে ভাবের আদান প্রদান করা; অপরকে কোন বিষয় সম্বন্ধে জানানো। এই সময়ে একে অন্যের ইচ্ছার প্রবাহ গ্রহণ করতে পারতো।
তৃতীয় ধাপে ব্যক্তিকে মনােসংযােগ করে একাগ্রচিত্তে ইচ্ছাপ্রবাহ ক্ষেপণ করতে হোতাে।
কিন্তু চতুর্থ ধাপে দীর্ঘ মনােসংযােগের প্রয়ােজন হোল।
প্রথমে ধাপে ধাপে গতিবিধি-অন্যস্থানে যাওয়া এবং সঙ্কেত দ্বারা ভাবের আদান প্রদানের প্রয়োজন ছিল। এই সময়ের সঙ্গে যে সময় ফলমূল সংগ্রহ করে খাওয়া হতাে এবং প্রজননের জন্য মৈথুন ক্রিয়া হতাে–সেই সময়ের সাদৃশ্য আছে।
ষষ্ঠ ধাপে দেখা গেল পঞ্চম ধাপের কার্যবিধি কলুষিত হয়েছে ।
সপ্তম ধাপে দেখা গেল সঙ্কেত, কথাবার্তা, পত্ৰ-লিখন। এই ধাপে মানবের মানসিকতার আরও অবনতি দেখা গেল । এই সময়ে যত্নশীল লেখকও তার বক্তব্য বিষয় ঠিকমত প্রেরণ করতে পারতো না এবং পত্রপ্রাপক বুঝতে পারতো না লেখক চিঠিতে কি বলতে চেয়েছে।
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে খাদ্য অভ্যাস, ভাবের আদান-প্রদান, প্রজনন ইত্যাদি যে সমস্ত সুযােগ-সুবিধা আদি পিতা-মাতার ছিল সেগুলি এই অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের মানসিকতার অবনতি হয়েছে এবং ক্রমশ আমরা আদি পিতা-মাতা হতে আরও দূরে সরে যাচ্ছি।
একটি দৃষ্টান্ত দিলে আমাদের কেমন অবনতি হয়েছে তা বুঝতে কারও অসুবিধা হবে না। যােগাযােগের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যার উন্নতিতে বার্তা প্রেরণ করা সম্ভব। এগুলি এখন কতিপয় ধনী ব্যক্তির পক্ষে সুবিধাজনক। কিন্তু স্মরণাতীত কালে প্রত্যেক ব্যক্তিই মনােসংযােগের দ্বারা বার্তা প্রেরণ করতে পারতো। অধিকতর ধনী হওয়াতে বহির্মুখী উন্নতি হচ্ছে। এই বহির্মুখী উন্নতি স্বার্থপরতা হতে জাত। এটা স্বার্থসর্বস্ব উন্নতি। এতে লোককল্যাণ হয় না। স্বার্থপরতার উপর নির্ভর করে যে উন্নতি __তা প্রকৃত উন্নতি নয়। মানসিকতার ঊর্ধ্বপ্রগতিই প্রকৃত উন্নতি। বর্তমানকালে যে উন্নতি তা পুরােপুরি বহির্মুখী, স্বার্থজড়িত। এতে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কলহ হচ্ছে। ঈর্ষা এবং ঘৃণার একটা বাতাবরণ সৃষ্টি হচ্ছে।
সুতরাং এই অবনত অবস্থাতে প্রতিদ্বন্দ্বী চিন্তা এবং শক্তির মধ্যে অবিরত সংগ্রাম হচ্ছে। এর ফলে অস্বাভাবিকভাবে, ক্রোধ বাড়ছে এবং বিশ্বশান্তি ব্যাহত হচ্ছে। (ক্রমশঃ)
