স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো। শিবরাত্রির উৎসবের সময় বাইরে থেকে আসা দ্রব্যসামগ্রীর উপরে নিজাম সরকারের নিযুক্ত একজন মুসলমান করণিক ‘শুল্ক’ বসিয়েছিলো ! বাউলানন্দজী এই ঘটনার প্রতিবাদ করেছিলেন । এখন সেই নিয়েই আলোচনা চলছিল।
পরেরদিন অফিসারটি আশ্রমে গিয়ে গাছের নিচে বসে স্বামীজীর নিকট একই যুক্তি বারবার পেশ করতে লাগলেন ! স্বামীজী তাঁর অনুরোধ অগ্রাহ্য করছিলেন ! এটা দেখে ঐ অফিসার একটু উত্তেজিত হোয়ে পড়েছিলেন । তিনি বললেন _”স্বামীজী ! আমি শুল্ক অফিসের কমিশনার, আমার নাম জে.সি! বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে আপনার কথা শুনেছি, আপনি যে ভাল করছেন তাও শুনেছি ! কিন্তু দেখুন_আমরা কি করতে পারি ? সরকার আদেশ জারি করেছেন যে, সকলের নিকট হতে শুল্ক আদায় করতে হবে ! আপনি ও তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন ! আমি আপনার বলিষ্ঠ মতাদর্শের কথা শুনেছি ! এই বিষয়টা আমি আমার নিম্নতর কর্মচারীর হাতে ন্যস্ত করতে চাই নাই ! পাছে তারা আপনার বা এই আশ্রমের শান্তি ভঙ্গ করে ! সেইজন্য আমি নিজেই এসেছি !
এই সীমান্ত গ্রামে হিন্দু ধর্মের যথার্থ উন্নতি হচ্ছে ! আমার ইচ্ছা বিনা বাধায় এর আরো অগ্রগতি হোক্। দয়া করে আমার কথা শুনুন, আমাকে বিশ্বাস করুন !”
স্বামীজী বললেন_” আপনি যা বললেন তা সবই সত্য ! কিন্তু শুল্ক দেওয়া অযৌক্তিক ! প
অফিসার বললেন _”স্বামীজী! আমার কথার মর্যাদা যদি মর্যাদা না দেন, তাহলে অন্তত আমার এই যজ্ঞোপবীতকে সম্মান দিন ;” স্বামীজী বললেন _”আপনার কথার মর্যাদাই দিচ্ছি, আপনার যজ্ঞোপবীতকে নয়!” এই কথার পর স্বামীজী উঠে গেলেন ।
রাত্রির নটার পরে আবার দুজনের দেখা হোল । অফিসার শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন _” স্বামীজী! আপনার কোনোরকম টানাহেঁচড়া হবেনা ! করণিকের সঙ্গে আপনার কথা বলার দরকার নাই। সে সমস্ত দ্রব্য-সামগ্রী আপনার কাছে নিয়ে আসা হয়েছে বা হবে _ দয়া করে প্রদেয় শুল্কটা দিয়ে দেবেন ! যদি আপনি সম্মত না হ’ন, তাহলে আমাকে বাধ্য হয়ে বিষয়টি আমার অফিসের অন্যান্য কর্মচারীদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে ! তারা মুসলমান, ফলে তারা কিন্তু আপনার শান্তি ভঙ্গ করতে পারে ! এর ফলাফল সম্বন্ধে আমি উদ্বিগ্ন _ তাই দয়া করে আমার উদ্বেগের গুরুত্ব দিন ! দয়া করে আমার এই advise-টা শুনুন !”
স্বামীজী বললেন _”আগামীকাল অপরাহ্ণে আমাদের আবার দেখা হবে !” সেই রাত্রেই স্বামীজী ঈশ্বরের আদেশ পেলেন _’ নিজাম রাজ্য হোল গরল সমুদ্র, কয়েক ফোঁটা (টাকা রূপ) অমৃত তাতে দাও ! তাতেই সমস্ত গরল নষ্ট হয়ে যাবে । তোমার বা আর কারও কাছে হোতে আর শুল্ক নেওয়া হবে না !’
ঈশ্বরের আদেশ পেয়ে স্বামীজী পরের দিন ওই অফিসারকে 100 টাকা শুল্ক হিসাবে দিয়ে দিলেন। অফিসারটি তৎক্ষণাৎ সেই টাকা গ্রহণ করলেন। স্বামীজী অফিসারকে ঐ 100 টাকা দিয়ে বললেন_” করণিক এই টাকা থেকে সমস্ত প্রদেয় শুল্ক গ্রহণ করুক এবং ভবিষ্যতে যা প্রদেয় শুল্ক হবে তাও যেন ওই টাকা থেকে নিয়ে নেয়! এতে না হোলে আরো একশো টাকা দেবো ! কিন্তু একটা শর্ত নিশ্চিত করতে হবে যে, সে যেন আমাদের দ্রব্যসামগ্রী আসা বন্ধ না করে বা সেগুলি তার নিজের গোডাউনে না নিয়ে যায়! সরাসরি দ্রব্যগুলো যেন আমাদের কাছে আসে!”
অফিসারটি সানন্দে সেই শর্ত মেনে নিলেন করণিককে কড়া নির্দেশ দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে তিনি চলে গেলেন। পরের বছর শুল্ক তুলে নেওয়া হোলো । পরে এই নিজাম-রাজ্যের অবসান হোলো । ভারত সংযুক্ত রাজ্যের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।।
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………….
… কেউ যদি জগদম্বাকে উপলব্ধি করতে পারে তাহলে তার জ্ঞান ও ভক্তি দুই-ই লাভ হয়। সবিকল্প সমাধিতে তার ঈশ্বরের রূপ দর্শন হবে। নির্বিকল্প সমাধিতে তার সচ্চিদানন্দের বােধেবোধ হবে। এই স্থিতিতে কোন নামরূপ থাকবে না।
নামরূপের মাধ্যমে ভক্ত ঈশ্বরকে জানতে পারে। তীর্থভ্রমণ তার এই বিশ্বাস দৃঢ় করার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক। আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে তীর্থক্ষেত্র রয়েছে। প্রত্যেক স্থানেরই মাহাত্ম্য রয়েছে । ঐ সমস্ত স্থানে মহর্ষিগণ কঠোর সাধনা করে ঈশ্বর উপলব্ধি করেছেন। যে আধ্যাত্মিক শক্তি তাঁরা অর্জন করেছিলেন তা তাঁরা ঐ সমস্ত স্থানে মজুত রেখেছেন। তাঁদের চিন্তা-ধারা ঐ সকল স্থানে স্পন্দিত হচ্ছে । এর ফলে স্থানগুলি পবিত্র এবং আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। ভক্তগণ নিয়মিত ঐ সকল স্থানে গিয়ে যখন নিঃস্বার্থ প্রার্থনা করে তখন ঐ সকল স্থানের পবিত্রতা এবং আধ্যাত্মিক শক্তি আরও প্রবল হয়। এইভাবে ঐ সকল স্থান দিনের পর দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে। যে সমস্ত লােক ঐ সকল স্থান ভক্তিভরে দর্শন করে তারাও ঐ শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের পিতা ক্ষুদিরাম গয়া দর্শন করে গদাধরের দর্শন পান। সেইরকম বিবেকানন্দের মা কাশীতে গিয়ে বিশ্বেশ্বরের দর্শন পেয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন দর্শন করে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে যা বিশেষ প্রয়ােজন তা হল ভক্তি। একমাত্র ভক্তিমান তীর্থযাত্রীই তীর্থযাত্রায় ফল পায়। যদি কেউ বিনা ভক্তিতে তীর্থদর্শন করে তাহলে সে কেবলমাত্র ওখানকার পাণ্ডাদের চাটুবাক্য ছাড়া আর কিছু পায় না। ভক্তি বিনা তীর্থভ্রমণ বৃথা। ভক্তিমান লােক তীর্থভ্রমণ না করেও ফল পায়। তুমি কিছুক্ষণ আগে যে গান (‘গয়া গঙ্গা প্রভাসাদি… ‘) শুনলে তার এই তাৎপর্য । ঐ গানের অর্থ—যাদের ঠিক ঠিক ভক্তি আছে তাদের তীর্থযাত্রার প্রয়ােজন নেই। কলকাতার রানী রাসমণি শতখানেক নৌকায় তাঁর দলবল নিয়ে কাশীতে তীর্থভ্রমণ করতে চেয়েছিলেন । যাত্রার পূর্বে একরাত্রে মা জগদম্বা স্বপ্নে তাঁকে দর্শন দিয়ে তীর্থযাত্রা করতে নিষেধ করলেন । তিনি বললেন, “গঙ্গার ধারে আমার একটি মন্দির তৈরী করে দাও। তীর্থযাত্রার যা ফল তা তুমি পাবে।” রাসমণি দেবী তীর্থযাত্রা বন্ধ রাখলেন। তিনি দক্ষিণেশ্বরে কালী মন্দির নির্মাণ করলেন।
সুতরাং বুঝতে পারছ—যারা নানা ঝামেলায় তীর্থদর্শন করতে পারে না তাদের কখনই ভাবা উচিত নয় যে, তাদের জীবন ব্যর্থ হয়ে গেল। যারা বিনা ভক্তিতে তীর্থযাত্রা করে সকল স্থানের সৌন্দর্য উপভােগ করে মাত্র। আমাদের বিশ্বাস ভগবান বাসুদেব সমগ্র বিশ্বজুড়ে রয়েছেন। দেখবে তীর্থস্থানগুলিতে বাসুদেবই রয়েছেন। তিনি নানা ভাষায় কথা বলছেন, বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছেন। তীর্থস্থানে মানুষ আধ্যাত্মিক ব্যক্তির সঙ্গে যােগাযােগ করতে পারে। সেখানে বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ব জেগে ওঠে। এই ভাবনাটাই বাসুদেবের পূজার ফুল ।
তুমি তীর্থে যেতে পার, কিন্তু যেখানেই যাও সেখানেই তােমার অভিজ্ঞতা একই ধরণের হবে । যে নারায়ণ তােমার হৃদয়ে রয়েছেন। তাকেই তুমি সর্বত্র বিভিন্ন মূর্তিতে দেখতে পাবে । যে নারায়ণকে তুমি গৃহে বসে দর্শন করবে সেই নারায়ণকেই বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মানুষ, জন্তু-জানােয়ার, পশু-পক্ষী, গাছ-গাছড়া এবং বিভিন্ন মূর্তির মধ্যে দর্শন করবে। তােমার এই বিশ্বাস দৃঢ় হবে যে তােমার ইষ্ট সমগ্র বিশ্বজুড়ে নিজেকে বিস্তার করে বিরাজ করছেন। এর ফলে তাঁর প্রতি তােমার বিশ্বাস আরও তীব্র হবে। তবে সম্বশিব(এক ভক্ত), তুমি তীর্থ করতে যাও। খুশীমতো বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে পারবে। বিভিন্ন আধ্যাত্মিক পুরুষের সঙ্গ করতে পারবে। তীর্থযাত্রা সফল তােমার হবে।
পরেরদিন অফিসারটি আশ্রমে গিয়ে গাছের নিচে বসে স্বামীজীর নিকট একই যুক্তি বারবার পেশ করতে লাগলেন ! স্বামীজী তাঁর অনুরোধ অগ্রাহ্য করছিলেন ! এটা দেখে ঐ অফিসার একটু উত্তেজিত হোয়ে পড়েছিলেন । তিনি বললেন _”স্বামীজী ! আমি শুল্ক অফিসের কমিশনার, আমার নাম জে.সি! বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে আপনার কথা শুনেছি, আপনি যে ভাল করছেন তাও শুনেছি ! কিন্তু দেখুন_আমরা কি করতে পারি ? সরকার আদেশ জারি করেছেন যে, সকলের নিকট হতে শুল্ক আদায় করতে হবে ! আপনি ও তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন ! আমি আপনার বলিষ্ঠ মতাদর্শের কথা শুনেছি ! এই বিষয়টা আমি আমার নিম্নতর কর্মচারীর হাতে ন্যস্ত করতে চাই নাই ! পাছে তারা আপনার বা এই আশ্রমের শান্তি ভঙ্গ করে ! সেইজন্য আমি নিজেই এসেছি !
এই সীমান্ত গ্রামে হিন্দু ধর্মের যথার্থ উন্নতি হচ্ছে ! আমার ইচ্ছা বিনা বাধায় এর আরো অগ্রগতি হোক্। দয়া করে আমার কথা শুনুন, আমাকে বিশ্বাস করুন !”
স্বামীজী বললেন_” আপনি যা বললেন তা সবই সত্য ! কিন্তু শুল্ক দেওয়া অযৌক্তিক ! প
অফিসার বললেন _”স্বামীজী! আমার কথার মর্যাদা যদি মর্যাদা না দেন, তাহলে অন্তত আমার এই যজ্ঞোপবীতকে সম্মান দিন ;” স্বামীজী বললেন _”আপনার কথার মর্যাদাই দিচ্ছি, আপনার যজ্ঞোপবীতকে নয়!” এই কথার পর স্বামীজী উঠে গেলেন ।
রাত্রির নটার পরে আবার দুজনের দেখা হোল । অফিসার শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন _” স্বামীজী! আপনার কোনোরকম টানাহেঁচড়া হবেনা ! করণিকের সঙ্গে আপনার কথা বলার দরকার নাই। সে সমস্ত দ্রব্য-সামগ্রী আপনার কাছে নিয়ে আসা হয়েছে বা হবে _ দয়া করে প্রদেয় শুল্কটা দিয়ে দেবেন ! যদি আপনি সম্মত না হ’ন, তাহলে আমাকে বাধ্য হয়ে বিষয়টি আমার অফিসের অন্যান্য কর্মচারীদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে ! তারা মুসলমান, ফলে তারা কিন্তু আপনার শান্তি ভঙ্গ করতে পারে ! এর ফলাফল সম্বন্ধে আমি উদ্বিগ্ন _ তাই দয়া করে আমার উদ্বেগের গুরুত্ব দিন ! দয়া করে আমার এই advise-টা শুনুন !”
স্বামীজী বললেন _”আগামীকাল অপরাহ্ণে আমাদের আবার দেখা হবে !” সেই রাত্রেই স্বামীজী ঈশ্বরের আদেশ পেলেন _’ নিজাম রাজ্য হোল গরল সমুদ্র, কয়েক ফোঁটা (টাকা রূপ) অমৃত তাতে দাও ! তাতেই সমস্ত গরল নষ্ট হয়ে যাবে । তোমার বা আর কারও কাছে হোতে আর শুল্ক নেওয়া হবে না !’
ঈশ্বরের আদেশ পেয়ে স্বামীজী পরের দিন ওই অফিসারকে 100 টাকা শুল্ক হিসাবে দিয়ে দিলেন। অফিসারটি তৎক্ষণাৎ সেই টাকা গ্রহণ করলেন। স্বামীজী অফিসারকে ঐ 100 টাকা দিয়ে বললেন_” করণিক এই টাকা থেকে সমস্ত প্রদেয় শুল্ক গ্রহণ করুক এবং ভবিষ্যতে যা প্রদেয় শুল্ক হবে তাও যেন ওই টাকা থেকে নিয়ে নেয়! এতে না হোলে আরো একশো টাকা দেবো ! কিন্তু একটা শর্ত নিশ্চিত করতে হবে যে, সে যেন আমাদের দ্রব্যসামগ্রী আসা বন্ধ না করে বা সেগুলি তার নিজের গোডাউনে না নিয়ে যায়! সরাসরি দ্রব্যগুলো যেন আমাদের কাছে আসে!”
অফিসারটি সানন্দে সেই শর্ত মেনে নিলেন করণিককে কড়া নির্দেশ দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে তিনি চলে গেলেন। পরের বছর শুল্ক তুলে নেওয়া হোলো । পরে এই নিজাম-রাজ্যের অবসান হোলো । ভারত সংযুক্ত রাজ্যের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।।
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………….
… কেউ যদি জগদম্বাকে উপলব্ধি করতে পারে তাহলে তার জ্ঞান ও ভক্তি দুই-ই লাভ হয়। সবিকল্প সমাধিতে তার ঈশ্বরের রূপ দর্শন হবে। নির্বিকল্প সমাধিতে তার সচ্চিদানন্দের বােধেবোধ হবে। এই স্থিতিতে কোন নামরূপ থাকবে না।
নামরূপের মাধ্যমে ভক্ত ঈশ্বরকে জানতে পারে। তীর্থভ্রমণ তার এই বিশ্বাস দৃঢ় করার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক। আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে তীর্থক্ষেত্র রয়েছে। প্রত্যেক স্থানেরই মাহাত্ম্য রয়েছে । ঐ সমস্ত স্থানে মহর্ষিগণ কঠোর সাধনা করে ঈশ্বর উপলব্ধি করেছেন। যে আধ্যাত্মিক শক্তি তাঁরা অর্জন করেছিলেন তা তাঁরা ঐ সমস্ত স্থানে মজুত রেখেছেন। তাঁদের চিন্তা-ধারা ঐ সকল স্থানে স্পন্দিত হচ্ছে । এর ফলে স্থানগুলি পবিত্র এবং আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। ভক্তগণ নিয়মিত ঐ সকল স্থানে গিয়ে যখন নিঃস্বার্থ প্রার্থনা করে তখন ঐ সকল স্থানের পবিত্রতা এবং আধ্যাত্মিক শক্তি আরও প্রবল হয়। এইভাবে ঐ সকল স্থান দিনের পর দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে। যে সমস্ত লােক ঐ সকল স্থান ভক্তিভরে দর্শন করে তারাও ঐ শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের পিতা ক্ষুদিরাম গয়া দর্শন করে গদাধরের দর্শন পান। সেইরকম বিবেকানন্দের মা কাশীতে গিয়ে বিশ্বেশ্বরের দর্শন পেয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন দর্শন করে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে যা বিশেষ প্রয়ােজন তা হল ভক্তি। একমাত্র ভক্তিমান তীর্থযাত্রীই তীর্থযাত্রায় ফল পায়। যদি কেউ বিনা ভক্তিতে তীর্থদর্শন করে তাহলে সে কেবলমাত্র ওখানকার পাণ্ডাদের চাটুবাক্য ছাড়া আর কিছু পায় না। ভক্তি বিনা তীর্থভ্রমণ বৃথা। ভক্তিমান লােক তীর্থভ্রমণ না করেও ফল পায়। তুমি কিছুক্ষণ আগে যে গান (‘গয়া গঙ্গা প্রভাসাদি… ‘) শুনলে তার এই তাৎপর্য । ঐ গানের অর্থ—যাদের ঠিক ঠিক ভক্তি আছে তাদের তীর্থযাত্রার প্রয়ােজন নেই। কলকাতার রানী রাসমণি শতখানেক নৌকায় তাঁর দলবল নিয়ে কাশীতে তীর্থভ্রমণ করতে চেয়েছিলেন । যাত্রার পূর্বে একরাত্রে মা জগদম্বা স্বপ্নে তাঁকে দর্শন দিয়ে তীর্থযাত্রা করতে নিষেধ করলেন । তিনি বললেন, “গঙ্গার ধারে আমার একটি মন্দির তৈরী করে দাও। তীর্থযাত্রার যা ফল তা তুমি পাবে।” রাসমণি দেবী তীর্থযাত্রা বন্ধ রাখলেন। তিনি দক্ষিণেশ্বরে কালী মন্দির নির্মাণ করলেন।
সুতরাং বুঝতে পারছ—যারা নানা ঝামেলায় তীর্থদর্শন করতে পারে না তাদের কখনই ভাবা উচিত নয় যে, তাদের জীবন ব্যর্থ হয়ে গেল। যারা বিনা ভক্তিতে তীর্থযাত্রা করে সকল স্থানের সৌন্দর্য উপভােগ করে মাত্র। আমাদের বিশ্বাস ভগবান বাসুদেব সমগ্র বিশ্বজুড়ে রয়েছেন। দেখবে তীর্থস্থানগুলিতে বাসুদেবই রয়েছেন। তিনি নানা ভাষায় কথা বলছেন, বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছেন। তীর্থস্থানে মানুষ আধ্যাত্মিক ব্যক্তির সঙ্গে যােগাযােগ করতে পারে। সেখানে বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ব জেগে ওঠে। এই ভাবনাটাই বাসুদেবের পূজার ফুল ।
তুমি তীর্থে যেতে পার, কিন্তু যেখানেই যাও সেখানেই তােমার অভিজ্ঞতা একই ধরণের হবে । যে নারায়ণ তােমার হৃদয়ে রয়েছেন। তাকেই তুমি সর্বত্র বিভিন্ন মূর্তিতে দেখতে পাবে । যে নারায়ণকে তুমি গৃহে বসে দর্শন করবে সেই নারায়ণকেই বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মানুষ, জন্তু-জানােয়ার, পশু-পক্ষী, গাছ-গাছড়া এবং বিভিন্ন মূর্তির মধ্যে দর্শন করবে। তােমার এই বিশ্বাস দৃঢ় হবে যে তােমার ইষ্ট সমগ্র বিশ্বজুড়ে নিজেকে বিস্তার করে বিরাজ করছেন। এর ফলে তাঁর প্রতি তােমার বিশ্বাস আরও তীব্র হবে। তবে সম্বশিব(এক ভক্ত), তুমি তীর্থ করতে যাও। খুশীমতো বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে পারবে। বিভিন্ন আধ্যাত্মিক পুরুষের সঙ্গ করতে পারবে। তীর্থযাত্রা সফল তােমার হবে।
