স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো। কোন্ডা রেড্ডি উপজাতিদের উপর বনিক(সহুকার)-এর অত্যাচারের কথা আলোচনা করা হচ্ছিলো। স্বামীজী এর একটা প্রতিবিধানের চেষ্টা করেছিলেন।
মুকোটি উৎসব উপলক্ষে বস্তা বস্তা চাল রান্না হচ্ছিলো । নদীর ধারে সমস্ত গ্রাম হতে পারে পরিবারগুলি এসে দল করে গাছের ছায়ায় খাবার জন্য বসেছিল । যখন উৎসবের রমরমা চলছে, তখন বণিক লঞ্চ হতে নামলো। বণিক দেখলো__ যে চালের বস্তাগুলো তারা পাঠিয়েছিল, সেগুলি নদীর ধারে পড়ে আছে । সে বুঝতে পারলো স্বামীজী ওর দান প্রত্যাখ্যান করেছেন । বণিক আশ্রমে গিয়ে দেখলো তখন আরাধনার সময় ! স্বামীজী নারকেল ভাঙলেন, নারকেল এবং রাশিকৃত ভাত মন্দিরের দেবতার উদ্দেশ্যে ভোগ দিলেন । তারপর কর্মীদের বললেন পরিবেশন করতে !
স্ত্রী পুরুষ সকলেই বড় বড় সারিতে বসে পড়লো। প্রত্যেকে দশ-বারোটা পাতা বিছিয়ে বসেছে, যাতে একটা পাতার ভাত খেয়ে বাকি পাতার খাবার গুলো ভালো করে মুড়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় ! প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিবারের সংখ্যা অনুযায়ী পাতা বিছিয়ে রেখে ছিল । পরিবেশন আরম্ভ হওয়ার আগে বণিক তার লোকজন নিয়ে উপজাতিদের সারির মাঝে ঘোরাফেরা করছিল। সে ওদেরকে বুঝাতে চাইছিল যে, সেই সেখানকার কর্তা ! বণিক আদেশ কোরলো _”প্রত্যেকে একটা করে পাতা নেবে, বাকি পাতা সরিয়ে দাও !” সারিতে বসা মেয়েরা বণিকের ভয়ে আতঙ্কিত হোলো, তারা করুন দৃষ্টিতে স্বামীজীর দিকে তাকালো যাতে স্বামীজী কিছু বলেন। স্বামীজী গর্জন করে বললেন _”কোনো পাতা সরাবে না !” কর্মীদের বলা হোলো সব পাতাতেই ভাত দিতে ! স্বামীজীর নির্দেশমতো পরিবেশন চলতে লাগলো।
বণিকের অহংকারে বড় রকমের ঘা লাগলো। সে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চেয়েছিল কিন্তু পরিবেশকরা তার নির্দেশ গ্রাহ্যই করলো না । সেজন্য গ্রামবাসীদের মাঝখানে এসে সে নিজের হাতে করে পাতা তুলতে লাগলো । স্বামীজী তার নিকট গিয়ে বললেন, “আপনি পাতা সরাচ্ছেন কেন ? উৎসবের জন্য আপনার কাছে তো কোনো টাকা পয়সা নেওয়া হয় নাই ? এই স্থানের রীতি পাল্টাবার চেষ্টা করবেন না !” বণিক রেগে গেল এবং দৃঢ়ভাবে বলল _”স্বামীজী ! এটা আমার কর্তৃত্ব ! এখানকার রীতিনীতি আলাদা! আমাদের বাধা দেওয়া আপনার উচিত নয়! সাবধান ;” স্বামীজী বললেন _”প্রথমে পাতা ফেরত দিন !” বণিক বলল-“না, দেব না!” গ্রামবাসীরা হতবাক হয়ে গেল ; তারা খুব ভয় পেয়েছিল । তারা পাতা রাখবে না সরিয়ে নেবে বুঝতে পারছিল না।
স্বামীজি অনুভব করলেন __এই পরিস্থিতিতে একমাত্র উপায় হল বণিককে এখান থেকে বের করে দেওয়া ! স্বামীজী তার কাছে গিয়ে দুই হাত দিয়ে তার গলা ধরলেন, তারপর এক ধাক্কা দিয়ে তাকে বের করে দিলেন ! ধাক্কাটা এতো জোর হয়েছিল যে, সে শুকনোপাতার স্তুপের উপর দিয়ে নিকটবর্তী ঝর্ণায় গিয়ে পড়লো ! তার সঙ্গীরা পিছু পিছু ছুটলো তাকে তোলার জন্য !
গ্রামবাসীদের মধ্যে পুরুষরা এদিক-ওদিক পালিয়ে গেল ! মেয়েরা এবং ছোট ছেলেরা অবিচল হয়ে যে যেখানে ছিল, সে সেখানেই বসে রইলো । তাদের দেখে মনে হোল, যেন কি ঘটেছে_ সে বিষয়ে কোনো খেয়ালই তাদের নেই ! পাতা যেমন পড়েছিল তেমনি পড়ে রইলো। পরিবেশনের কাজ চলতে থাকলো, আর কোন উপদ্রব হয় নাই । গ্রামবাসীরা তৃপ্তি ভরে খেলো।
বিভিন্ন স্থান হোতে বহুজনে খাদ্য সম্ভার পাঠিয়েছে, যারা অধীর আগ্রহে এই খাবারের প্রত্যাশা করছিল তাদেরকে খাবার দেওয়া হয়েছে __ তাহলে বণিকের এত হিংসা হচ্ছে কেন ? কেনই বা সে এতে বাধা সৃষ্টি করছিল ? কেন সে এমন রুঢ় এবং অমানবিক আচরণ করছিল ?
হতদরিদ্র ক্ষুধার্ত উপজাতিদেরকে খাওয়াবার মুরোদ নাই, তাহলে এই অন্নদান উৎসব সে সহ্য করতে পারছিল না কেন ? গ্রামবাসীরা খাদ্য অপচয় বা নষ্ট করে না, পরিবারের যে সমস্ত সদস্য আসতে পারেনি __এরা তাদের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছিলো। গ্রামবাসীরা খাদ্যের যে মূল্য দিচ্ছে নিষ্ঠুর এবং অত্যাচারী বণিক তার মূল্য কেমন করে বুঝবে ? খিদে কি তা বণিক জানেনা ! খিদের তীব্র জ্বালা যারা জানেনা তারা ক্ষুধার্ত লোককে খাওয়াতেও পারে না ! স্বামীজী বণিককে সহ্য করার চেষ্টা করেছেন । কিন্তু তার কার্যকলাপ যখন সীমা ছাড়ালো _ তখন তিনি তা বরদাশ্ত করতে পারলেন না এবং তাকে গলাধাক্কা দিয়ে আশ্রম থেকে বের করে দিলেন।
ঐ দিনের বাকি সময়ের কাজ নির্বিঘ্নে চলতে লাগলো সমস্ত গ্রামের পুরুষদের ডেকে স্বামীজী বললেন _”তোমরা পালালে কেন ?” তারা বলল _”বণিক পুলিশ এনে আমাদের মারবে!” স্বামীজী তাদেরকে আশ্বাস দিয়ে বললেন _”কোনো ভয় নাই! পুলিশ তোমাদের কিছু করবে না।”
স্বামীজীর বিরাট শক্তির পরিচয় পেয়ে তারা খুব খুশি হলো। (ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………
[ সৃজনী শক্তি ]
” সকল কর্মের উৎস হল শক্তি। শক্তি বিভিন্ন ধরণের হয়। যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এবং সর্বত্র বিদ্যমান সেই ঈশ্বর হলেন প্রেম, জ্ঞান এবং চৈতন্যশক্তির সমষ্টি। প্রেম-শক্তি অপরকে আকর্ষণ করে। প্রেমের বশবর্তী হয়ে একটি কণা আর একটি কণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহদাকার ধারণ করে। বস্তুর প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশই মৌল পদার্থের কতকগুলি কণার সমন্বয়।
মানব শরীরে সৃজন এবং পুনঃসৃজনশক্তি বর্তমান। তারা যে খাদ্য খাচ্ছে তা হতে শরীরের পুষ্টি হচ্ছে। পুষ্টি হতে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। এ ছাড়া যে শক্তি তাদের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে তা থেকেও তারা শক্তি সঞ্চয় করছে।
বিভিন্ন শরীর হতে চিন্তার স্রোত বেরিয়ে এসে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। নিজ শরীরের শক্তির প্রকার (Kind) এবং গুণের সঙ্গে যদি বাইরে প্রবাহিত শক্তির ঐক্য থাকে একমাত্র তখনই ব্যক্তি বাইরের শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়। যদি দুই শক্তির মধ্যে গুণগত ঐক্য না থাকে তাহলে শক্তি শােষণ করা সম্ভব নয়। সুতরাং নির্দিষ্ট পরিমাণ গুণগত যােগ্যতা অবশ্যই প্রয়ােজন।
কীট-পতঙ্গের ক্ষুদ্র শক্তি পেয়ে উদ্ভিদ সত্তার চেতনা এবং শক্তি বলশালী হচ্ছে এবং মৃত্যুর পর ক্ষুদ্র চেতনাযুক্ত কীট-পতঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করছে। একইভাবে ক্ষুদ্র চেতনাযুক্ত কীট-পতঙ্গ অধিক চেতনাযুক্ত পশুর শক্তি অর্জন করে এবং মৃত্যুর পর অধিক চেতনাযুক্ত পশু হয়ে জন্মগ্রহণ করে। পশু মানবীয় শরীর হতে বিচ্ছুরিত উচ্চশক্তি অর্জন করে এবং মৃত্যুর পর মানব চেতনা ছাড়াও কাণ্ডজ্ঞান পেয়ে থাকে |
এইভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি সমস্ত জীবশরীর শক্তি ছড়াচ্ছে এবং তাদের চেতনাকে বলশালী করার জন্য বায়ুমণ্ডল হতে তারা আবার শক্তি গ্রহণ করছে এবং এর ফলে উচ্চ ধরণের শরীর গ্রহণের যােগ্য হচ্ছে। নিম্ন প্রকৃতি হতে উচ্চ প্রকৃতির যে অভিব্যক্তি তা নির্ভর করে শক্তির বিচ্ছুরণ এবং গ্রহণের উপর।
পুনঃসৃজন শক্তি রূপান্তরিত হয়ে সৃজন শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। খদ্য-বস্তু হতে পুনঃসৃজন (recreative) শক্তি সৃষ্টি হচ্ছে। তাই সেই সমস্ত খাদ্য খাওয়া উচিত যেগুলির মধ্যে গুণগত শক্তি আছে। সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ গুণের মধ্যে যেটি অর্থাৎ যে গুণটি রাঁধুনীর মধ্যে প্রবল, সেইটি খাদ্য প্রস্তুতের সময় খাদ্যে প্রবেশ করে। ঐ খাদ্য খেলে রাঁধুনীর চিন্তা খাদকের মনোজগতে প্রভাব প্রভাব ফেলে। সুতরাং খাদ্যের মধ্যে দুটো গুণ থাকে। একটি শরীরকে শক্তিশালী করে, অপরটি খাদকের মনােজগতে প্রভাব ফেলে।
রাঁধুনীকে অন্ততঃপক্ষে স্নেহশীল এবং প্রীতিপূর্ণ হতে হবে। তাহলে খাদ্য প্রস্তুতের সময় ঐ স্নেহ-প্রীতি খাদ্যের মধ্যে সঞ্চারিত হবে। যদি পেশাদারী রাঁধুনী স্নেহ ও প্রীতিভাব নিয়ে রান্না করা শিক্ষা লাভ করে, তাহলে দশ বছরের মধ্যে একটা বিরাট পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে সমাজে। [ক্রমশঃ]
মুকোটি উৎসব উপলক্ষে বস্তা বস্তা চাল রান্না হচ্ছিলো । নদীর ধারে সমস্ত গ্রাম হতে পারে পরিবারগুলি এসে দল করে গাছের ছায়ায় খাবার জন্য বসেছিল । যখন উৎসবের রমরমা চলছে, তখন বণিক লঞ্চ হতে নামলো। বণিক দেখলো__ যে চালের বস্তাগুলো তারা পাঠিয়েছিল, সেগুলি নদীর ধারে পড়ে আছে । সে বুঝতে পারলো স্বামীজী ওর দান প্রত্যাখ্যান করেছেন । বণিক আশ্রমে গিয়ে দেখলো তখন আরাধনার সময় ! স্বামীজী নারকেল ভাঙলেন, নারকেল এবং রাশিকৃত ভাত মন্দিরের দেবতার উদ্দেশ্যে ভোগ দিলেন । তারপর কর্মীদের বললেন পরিবেশন করতে !
স্ত্রী পুরুষ সকলেই বড় বড় সারিতে বসে পড়লো। প্রত্যেকে দশ-বারোটা পাতা বিছিয়ে বসেছে, যাতে একটা পাতার ভাত খেয়ে বাকি পাতার খাবার গুলো ভালো করে মুড়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় ! প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিবারের সংখ্যা অনুযায়ী পাতা বিছিয়ে রেখে ছিল । পরিবেশন আরম্ভ হওয়ার আগে বণিক তার লোকজন নিয়ে উপজাতিদের সারির মাঝে ঘোরাফেরা করছিল। সে ওদেরকে বুঝাতে চাইছিল যে, সেই সেখানকার কর্তা ! বণিক আদেশ কোরলো _”প্রত্যেকে একটা করে পাতা নেবে, বাকি পাতা সরিয়ে দাও !” সারিতে বসা মেয়েরা বণিকের ভয়ে আতঙ্কিত হোলো, তারা করুন দৃষ্টিতে স্বামীজীর দিকে তাকালো যাতে স্বামীজী কিছু বলেন। স্বামীজী গর্জন করে বললেন _”কোনো পাতা সরাবে না !” কর্মীদের বলা হোলো সব পাতাতেই ভাত দিতে ! স্বামীজীর নির্দেশমতো পরিবেশন চলতে লাগলো।
বণিকের অহংকারে বড় রকমের ঘা লাগলো। সে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চেয়েছিল কিন্তু পরিবেশকরা তার নির্দেশ গ্রাহ্যই করলো না । সেজন্য গ্রামবাসীদের মাঝখানে এসে সে নিজের হাতে করে পাতা তুলতে লাগলো । স্বামীজী তার নিকট গিয়ে বললেন, “আপনি পাতা সরাচ্ছেন কেন ? উৎসবের জন্য আপনার কাছে তো কোনো টাকা পয়সা নেওয়া হয় নাই ? এই স্থানের রীতি পাল্টাবার চেষ্টা করবেন না !” বণিক রেগে গেল এবং দৃঢ়ভাবে বলল _”স্বামীজী ! এটা আমার কর্তৃত্ব ! এখানকার রীতিনীতি আলাদা! আমাদের বাধা দেওয়া আপনার উচিত নয়! সাবধান ;” স্বামীজী বললেন _”প্রথমে পাতা ফেরত দিন !” বণিক বলল-“না, দেব না!” গ্রামবাসীরা হতবাক হয়ে গেল ; তারা খুব ভয় পেয়েছিল । তারা পাতা রাখবে না সরিয়ে নেবে বুঝতে পারছিল না।
স্বামীজি অনুভব করলেন __এই পরিস্থিতিতে একমাত্র উপায় হল বণিককে এখান থেকে বের করে দেওয়া ! স্বামীজী তার কাছে গিয়ে দুই হাত দিয়ে তার গলা ধরলেন, তারপর এক ধাক্কা দিয়ে তাকে বের করে দিলেন ! ধাক্কাটা এতো জোর হয়েছিল যে, সে শুকনোপাতার স্তুপের উপর দিয়ে নিকটবর্তী ঝর্ণায় গিয়ে পড়লো ! তার সঙ্গীরা পিছু পিছু ছুটলো তাকে তোলার জন্য !
গ্রামবাসীদের মধ্যে পুরুষরা এদিক-ওদিক পালিয়ে গেল ! মেয়েরা এবং ছোট ছেলেরা অবিচল হয়ে যে যেখানে ছিল, সে সেখানেই বসে রইলো । তাদের দেখে মনে হোল, যেন কি ঘটেছে_ সে বিষয়ে কোনো খেয়ালই তাদের নেই ! পাতা যেমন পড়েছিল তেমনি পড়ে রইলো। পরিবেশনের কাজ চলতে থাকলো, আর কোন উপদ্রব হয় নাই । গ্রামবাসীরা তৃপ্তি ভরে খেলো।
বিভিন্ন স্থান হোতে বহুজনে খাদ্য সম্ভার পাঠিয়েছে, যারা অধীর আগ্রহে এই খাবারের প্রত্যাশা করছিল তাদেরকে খাবার দেওয়া হয়েছে __ তাহলে বণিকের এত হিংসা হচ্ছে কেন ? কেনই বা সে এতে বাধা সৃষ্টি করছিল ? কেন সে এমন রুঢ় এবং অমানবিক আচরণ করছিল ?
হতদরিদ্র ক্ষুধার্ত উপজাতিদেরকে খাওয়াবার মুরোদ নাই, তাহলে এই অন্নদান উৎসব সে সহ্য করতে পারছিল না কেন ? গ্রামবাসীরা খাদ্য অপচয় বা নষ্ট করে না, পরিবারের যে সমস্ত সদস্য আসতে পারেনি __এরা তাদের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছিলো। গ্রামবাসীরা খাদ্যের যে মূল্য দিচ্ছে নিষ্ঠুর এবং অত্যাচারী বণিক তার মূল্য কেমন করে বুঝবে ? খিদে কি তা বণিক জানেনা ! খিদের তীব্র জ্বালা যারা জানেনা তারা ক্ষুধার্ত লোককে খাওয়াতেও পারে না ! স্বামীজী বণিককে সহ্য করার চেষ্টা করেছেন । কিন্তু তার কার্যকলাপ যখন সীমা ছাড়ালো _ তখন তিনি তা বরদাশ্ত করতে পারলেন না এবং তাকে গলাধাক্কা দিয়ে আশ্রম থেকে বের করে দিলেন।
ঐ দিনের বাকি সময়ের কাজ নির্বিঘ্নে চলতে লাগলো সমস্ত গ্রামের পুরুষদের ডেকে স্বামীজী বললেন _”তোমরা পালালে কেন ?” তারা বলল _”বণিক পুলিশ এনে আমাদের মারবে!” স্বামীজী তাদেরকে আশ্বাস দিয়ে বললেন _”কোনো ভয় নাই! পুলিশ তোমাদের কিছু করবে না।”
স্বামীজীর বিরাট শক্তির পরিচয় পেয়ে তারা খুব খুশি হলো। (ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
………………………………………………………………
[ সৃজনী শক্তি ]
” সকল কর্মের উৎস হল শক্তি। শক্তি বিভিন্ন ধরণের হয়। যিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এবং সর্বত্র বিদ্যমান সেই ঈশ্বর হলেন প্রেম, জ্ঞান এবং চৈতন্যশক্তির সমষ্টি। প্রেম-শক্তি অপরকে আকর্ষণ করে। প্রেমের বশবর্তী হয়ে একটি কণা আর একটি কণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহদাকার ধারণ করে। বস্তুর প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশই মৌল পদার্থের কতকগুলি কণার সমন্বয়।
মানব শরীরে সৃজন এবং পুনঃসৃজনশক্তি বর্তমান। তারা যে খাদ্য খাচ্ছে তা হতে শরীরের পুষ্টি হচ্ছে। পুষ্টি হতে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। এ ছাড়া যে শক্তি তাদের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে তা থেকেও তারা শক্তি সঞ্চয় করছে।
বিভিন্ন শরীর হতে চিন্তার স্রোত বেরিয়ে এসে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। নিজ শরীরের শক্তির প্রকার (Kind) এবং গুণের সঙ্গে যদি বাইরে প্রবাহিত শক্তির ঐক্য থাকে একমাত্র তখনই ব্যক্তি বাইরের শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়। যদি দুই শক্তির মধ্যে গুণগত ঐক্য না থাকে তাহলে শক্তি শােষণ করা সম্ভব নয়। সুতরাং নির্দিষ্ট পরিমাণ গুণগত যােগ্যতা অবশ্যই প্রয়ােজন।
কীট-পতঙ্গের ক্ষুদ্র শক্তি পেয়ে উদ্ভিদ সত্তার চেতনা এবং শক্তি বলশালী হচ্ছে এবং মৃত্যুর পর ক্ষুদ্র চেতনাযুক্ত কীট-পতঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করছে। একইভাবে ক্ষুদ্র চেতনাযুক্ত কীট-পতঙ্গ অধিক চেতনাযুক্ত পশুর শক্তি অর্জন করে এবং মৃত্যুর পর অধিক চেতনাযুক্ত পশু হয়ে জন্মগ্রহণ করে। পশু মানবীয় শরীর হতে বিচ্ছুরিত উচ্চশক্তি অর্জন করে এবং মৃত্যুর পর মানব চেতনা ছাড়াও কাণ্ডজ্ঞান পেয়ে থাকে |
এইভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি সমস্ত জীবশরীর শক্তি ছড়াচ্ছে এবং তাদের চেতনাকে বলশালী করার জন্য বায়ুমণ্ডল হতে তারা আবার শক্তি গ্রহণ করছে এবং এর ফলে উচ্চ ধরণের শরীর গ্রহণের যােগ্য হচ্ছে। নিম্ন প্রকৃতি হতে উচ্চ প্রকৃতির যে অভিব্যক্তি তা নির্ভর করে শক্তির বিচ্ছুরণ এবং গ্রহণের উপর।
পুনঃসৃজন শক্তি রূপান্তরিত হয়ে সৃজন শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। খদ্য-বস্তু হতে পুনঃসৃজন (recreative) শক্তি সৃষ্টি হচ্ছে। তাই সেই সমস্ত খাদ্য খাওয়া উচিত যেগুলির মধ্যে গুণগত শক্তি আছে। সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ গুণের মধ্যে যেটি অর্থাৎ যে গুণটি রাঁধুনীর মধ্যে প্রবল, সেইটি খাদ্য প্রস্তুতের সময় খাদ্যে প্রবেশ করে। ঐ খাদ্য খেলে রাঁধুনীর চিন্তা খাদকের মনোজগতে প্রভাব প্রভাব ফেলে। সুতরাং খাদ্যের মধ্যে দুটো গুণ থাকে। একটি শরীরকে শক্তিশালী করে, অপরটি খাদকের মনােজগতে প্রভাব ফেলে।
রাঁধুনীকে অন্ততঃপক্ষে স্নেহশীল এবং প্রীতিপূর্ণ হতে হবে। তাহলে খাদ্য প্রস্তুতের সময় ঐ স্নেহ-প্রীতি খাদ্যের মধ্যে সঞ্চারিত হবে। যদি পেশাদারী রাঁধুনী স্নেহ ও প্রীতিভাব নিয়ে রান্না করা শিক্ষা লাভ করে, তাহলে দশ বছরের মধ্যে একটা বিরাট পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে সমাজে। [ক্রমশঃ]
