স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে থাকাকালীন সময়ের কথা বলা হচ্ছিলো। সহুকার স্বামীজীকে হত্যা করার যে চেষ্টা চালাচ্ছিল প্রথমদিকে সেগুলি সব বিফল হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু স্বামীজীকে হত্যা করার প্রচেষ্টা তার থেমে যায় নাই । অন্য ভাবে প্রচেষ্টা চলছিল । একদিন সন্ধ্যার সময় স্বামিজী আশ্রমের পিছনে গেটের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন __তিনি দেখলেন আশ্রমের অপরদিকে খাল কাটা হোচ্ছে । তিনি লোকটিকে চিনতে পারলেন না । তিনি চিন্তা করলেন ‘এই সময়ে খাল কাটছে কেন?’ তৎক্ষণাৎ দৈব আদেশ হোল _”তোমার জন্যই খাল কাটা হোচ্ছে!” স্বামীজী কুটিরে ফিরে এলেন এবং পূজার কাজ সেরে নিলেন ।
গ্রীষ্মের রাত্রি ! মৃদুমন্দ বাতাস বইছিল ! স্বামীজী আশ্রমের বাইরে ফাঁকায় শুয়েছিলেন ! তাঁর ঘুম আসছিল না ! ওই গ্রামে একটা বোবা লোক ছিল। গ্রামের লোক তাকে “ভাষা বাদু” বলে ডাকতো। সে প্রায়ই আশ্রমে আসতো এবং আশ্রমের সব রকম কাজকর্ম কোরতো। নারকেল এবং তালের গুড় তার খুব প্রিয় ছিল। সে ওই সব খেয়ে আনন্দে নানা রকম অঙ্গিভঙ্গি কোরতো‌ । ঐদিন মধ্যরাত্রে পুরো মাতাল হয়ে সে আশ্রমে এলো । সে নেশায় টলছিলো। সে স্বামীজীর পাশে এসে বসলো। এর কয়েক মিনিট আগে একজন লোক লন্ঠন হাতে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরছিল ! “ভাষা বাদু” আশ্রমে ঢোকার পরেও আলোটা দেখা গেল !
টলতে টলতে তার পড়ে যাবার উপক্রম হচ্ছিলো। সে অঙ্গভঙ্গি করে স্বামীজীকে কিছু বলতে চাইছিল ! সে ভয়ে কাঁপছিল ! স্বামীজী ঘরে ঢুকে নারকেল এবং তালগুড় নিয়ে এলেন । সে নিল কিন্তু খেতে পারলো না, সরিয়ে রাখলো। স্বামীজী তাকে একটা চটের বস্তা দিয়ে তাতে শুতে বললেন । সে শুয়ে পড়লো ! কিন্তু শুয়ে এদিক ওদিক করতে লাগলো, সে ভীষণ অঙ্গভঙ্গি করছিল ! স্বামীজীর নিকট হতে মাত্র দেড় ফুট দূরে সে শুয়ে ছিল !
স্বামীজীও শুয়ে ঘুমিয়ে গেলেন । হঠাৎ স্বামীজীর নিচে হোতে মাটি সরে গেল ! প্রায় 1 ফুট নিচে স্বামীজী ঢুকে গেলেন !যেন তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছে ! স্বামীজী চোখ খুলে দেখালেন “ভাষা বাদু” তখন সেখানে ছিল না ; সে অন্যত্র গিয়েছিল! সে একটা ছুরি নিয়ে এসে স্বামীজীর পাশে বসে পড়লো। স্বামীজিও উঠে বসলেন । ভাষা বাদু বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো। সে কিছু বলার চেষ্টা করছিল। ঝরনার ধারে একজন লোক লন্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে ! স্বামীজী বুঝতে পারলেন যে, ভাষা বাদু তাকে বলছে যে_ তিনি যদি বাইরে যান, তাহলে তাকে কুড়ুলে করে কুপিয়ে মারা হবে !
স্বামীজি তার হাতে তাল গুড়, নারকেল এবং ছুরি টা দিলেন ! তাঁকে সঙ্গে করে আশ্রমের পিছনে নিয়ে গিয়ে বললেন _”সকাল পর্যন্ত কোনো এক জায়গায় লুকিয়ে পড়ো! তারপর কয়েক দিনের জন্য নদীর ওপারে চলে যেও !” স্বামীজীকে প্রণাম করে সে চলে গেল। পরে “ভাষা বাদু” নিয়মিত আশ্রমে আসা যাওয়া কোরতো । উপজাতিদের মধ্যে একমাত্র সে-ই স্বামীজীকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম কোরতো । পরে সে প্রায় স্বামীজীর দেহরক্ষী হয়ে গিয়েছিল। সহুকার দু-দুবার স্বামীজীকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু জগদম্বার কৃপায় দুটো প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল।
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………..
এ প্রসঙ্গে আমরা আগেও উল্লেখ করেছি যে, অনেক সময় হয়তো কোনো কোনো নেতা তাদের এলাকায় জনস্ফীতি রোধে বহুবার ব্রতী হয়েছেন । কিন্তু তার ফলে কোন একটি বিশেষ স্থানে জনসংখ্যা কমেছে এবং ফলস্বরূপ একটি জাতি হয়তো লুপ্ত হতে বসেছে। এভাবে পৃথিবীর জনসংখ্যা কমানো যাবে না। পৃথিবীর সব মানুষ যদি একই সাথে একই নীতি গ্রহণ করে _তবেই এটা হতে পারে, কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সেটাও সম্ভব নয় ।
তর্কের খাতিরে যদি সেটা সম্ভব বলে ধরে নেওয়া যায় _তবুও তার দ্বারা যথার্থ সমাধান হবে না বরং সমস্যা আরো জটিল হবে। কৃত্রিম ভাবে জন-নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে স্থুল শরীর গ্রহণ না হয় আটকানো গেল কিন্তু যারা সূক্ষ্ম বাসনা নিয়ে অপেক্ষা করছে তাদের সংখ্যা কমানো যাবে না। এভাবে হলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হবে, স্থুল শরীর কমে যাবে সংখ্যায়, কিন্তু অশরীরী বাসনার সংখ্যা ও চাহিদা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাবে। মনুষ্যেতর প্রাণী থেকে যারা প্রথমবার মানুষের শরীর পাওয়ার যোগ্য তাদের সে সুযোগ দিতেই হবে এবং ক্ষেত্র বিশেষে কিছু অভিজ্ঞদের উপস্থিতি প্রয়োজন _সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য ।
সারা পৃথিবীতে জন-নিয়ন্ত্রণের এই কৃত্রিম নীতি শেষ পর্যন্ত মানবজাতির অবলুপ্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেটা সম্ভবও নয়, বাঞ্ছনীয়‌ও নয়। কারণ সৃষ্টি ও প্রকৃতি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন নয়। বিবর্তনের ধারা বজায় রাখতে মানবশরীর অপরিহার্য ও অনিবার্য! কারণ সেই শরীরেই পূর্ণতার সম্ভাবনা বিদ্যমান। জীবনের উদ্দেশ্যই হল ঈশ্বরপ্রাপ্তি এবং মানুষকে বাদ দিলে সৃষ্টি অকারণ হয়ে ওঠে।
এতো প্রতিকুলতা থাকা সত্ত্বেও সমস্যার সমাধান প্রয়োজন, নাহলে সৃষ্টির যাত্রাপথ ব্যাহত হবে। স্থুল উদ্দেশ্যের তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে। সেগুলি হোল_ এক) ঈশ্বরতত্ত্বের বোধ,অপরোক্ষ সাক্ষাৎকার এবং আদি কারণে লয় হয়ে যাওয়া।_ দুই) মনুষ্যেতর প্রাণী যাতে সুষ্ঠুভাবে মানব শরীর ধারণ করতে পারে এবং _তিন) বাসনা শরীর যেন স্থুল শরীর পায়।
এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্তগুলি কিছুটা পূরণ হচ্ছে, কিন্তু প্রথম শর্তটা সম্পূর্ণ অবহেলিত থাকছে । প্রথম শর্ত পূরণের ওপর কিন্তু বাকি দুটো নির্ভর করছে, এই দিক থেকে সমস্যাকে বিচার করতে হবে ।এটাকে একটা জাগতিক জনসংখ্যার সমস্যা না ভেবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত।
সামগ্রিকভাবে সমস্যাটা আধ্যাত্মিক এবং সমাধানের রাস্তাটাও সেই পথে খুঁজতে হবে। আগেও বলেছি চিন্তা করার প্রবণতা নিয়ে কোন সমস্যা নেই, চিন্তার বিষয় ও চরিত্র নিয়েই সমস্যা! চিন্তায় স্বার্থপরতা আছে বলেই বারংবার শরীর নেওয়ার প্রবণতা আছে! স্বার্থপরতা মানুষকে বস্তু ও শরীরের প্রতি মোহগ্রস্ত করে আর তাই তাদের অতৃপ্তি দূর হয় না! মানুষের চিন্তার রাজ্যে পরিবর্তন ও রূপান্তর প্রয়োজন, যাতে তার পুনরায় শরীর গ্রহণের বাসনা না জাগে। মনে রাখতে হবে যে, মানুষের স্বার্থপরতা তার পূর্ব পাশবিক প্রকৃতিরই পরিণাম ! সেই পাশবিক প্রকৃতিকে মানবিক প্রকৃতিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই রূপান্তর সম্ভব যদি মানুষের কান্ডজ্ঞান জাগ্রত হয় এবং উন্নত ব্যক্তিদের সাথে সংযোগ ও শক্তির আদান প্রদান ঘটে। [ক্রমশঃ]