নোরি সীতান্মা
__________0________0_______
নােরি সীতাম্মা’র নাম ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি প্রায়ই আশ্রমে আসতেন। আসার সময় আশ্রমের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে আসতেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, তিনিই প্রথম মহিলা যিনি এখানকার আশ্রমে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিলেন। তিনি ছিলেন খুব বিচক্ষণ এবং বিদুষী মহিলা। তাঁর সংকল্প ছিল দৃঢ়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সীতাম্মা অংশগ্রহণ করেছিলেন। ঐ সময় পােলাভরমের বহুলোক বন্দী হয়ে স্থানীয় জেলে বিচারাধীন ছিল। তাদের সেবার ভার পড়ল তাঁর উপর। সাবজেল পােলাভরম গ্রাম হতে প্রায় দুই মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। প্রত্যেকদিন তিনি সেখানে খাবার বয়ে নিয়ে যেতেন। গরুর গাড়ী যোগাড় করতে পারতেন না। কারণ গাড়ােয়ান পুলিশকে ভয় কোরতো। সেজন্য সীতাম্মা সাইকেল চালানো শিখলেন । প্রত্যেকদিন তিনি সাইকেলে করে সাবজেলে খাবার বয়ে নিয়ে যেতেন। এই রকম ছিল তাঁর দৃঢ় সঙ্কল্প। নীতিতে তিনি ছিলেন অবিচল।
এই রকম দৃঢ় সঙ্কল্প এবং অবিচল লক্ষ্য ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক ক্রিয়া কর্মে। সৎসঙ্গ করে ঈশ্বর কি তা তিনি ধারণা করতে পেরেছিলেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁর মনকে নাড়া দিত। তাঁর কাজের মধ্যে একটা মানবােচিত দৃষ্টি ভঙ্গি প্রবল হয়ে উঠত ।
উত্তরাধিকার সূত্রে মা-বাবার কিছু সম্পত্তি তিনি পেয়েছিলেন। স্বামীর সম্পত্তিরও তিনি উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। তার স্বামী অল্প বয়সে মারা যান। সীতাম্মার বয়স তখন খুবই অল্প। গরীবের সাহায্যার্থে তিনি তাঁর সমস্ত অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তাঁর দয়ার কোন সীমা ছিল না। বর্ণবৈষম্য তাঁর কাছে কোন প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে নাই। তাঁর দয়াদাক্ষিণ্য হরিজনদের নিকট পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছিল ।
একবার গ্রামে এক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সমস্ত ইরিজনদের ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অন্য অনেক হীনসম্প্রদায় এবং কিছু ধনী লোকও গৃহহারা হয়ে পড়ে। ধনী লোকের অল্প কিছু খোয়া যায়। কিন্তু গরীবেরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে।
ধনী লোকেরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। গরীবকে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে এল না। সীতাম্মার হৃদয় ছিল বিরাট। এই ঘটনার কয়েক মাস আগে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে কিছু অর্থ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। নিজের জন্য কিছু না রেখে সমস্ত টাকা-পয়সা তিনি গৃহহারাদের জন্য খরচ করেছিলেন। সমস্ত অর্থ শেষ হওয়ার পর তিনি স্বামীজীর সংস্পর্শে আসেন। আশ্রমে তিনি প্রায়ই আসতেন। এই ঘন ঘন যাতায়াতের ফলে পেরেন্টাপল্লীর গ্রামবাসীদের সঙ্গে তিনি ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হলেন । তিনি গ্রামবাসীদের সঙ্গে একাত্ম বােধ করতে লাগলেন। যখনই তিনি পেরেন্টাপল্লী অাশ্রমে যেতেন তখনই তিনি গ্রামবাসীদের মধ্যে বিতরণের জন্য শাড়ি নিয়ে যেতেন।
একবার তাঁর হাতে কোনো টাকা পয়সা ছিল না । যাদেরকে টাকা ধার দিয়েছিলেন, তাদের নিকট হতে টাকা আদায় করতে পারেন নাই। তিনি স্বামীজীর নিকট গিয়ে করুণ সুরে বললেন,“স্বামীজী! আমার সমস্ত টাকা পয়সা খরচ হওয়ার পর আপনার এখনে আসা শুরু করেছি। এখন আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নাই। অনেকে আমার কাছে টাকা ধার নিয়েছে, কিন্তু এখনই সে টাকা পাওয়ার কোনো সুযোগও নাই । ‘মূকােটি’ উৎসবে শাড়ি কেনার টাকা আমার নাই। সেজন্য আমি ঐ উৎসবে এ বছর আসছি না।”
স্বামীজী দয়াদ্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,“মা, নিরুৎসাহিত হয়ো না। অাশ্রমে যা কিছু আনার চিন্তা করছো, তার সবই তোমার কাছে অনায়াসে পৌছে যাবে। কারও নিকট কিছু চাওয়ার দরকার নাই। যারা তোমার কাছে টাকা ধার করেছে তাদেরকে জোর কোরাে না। আশ্রমে না আসার কোনো কথা যেন ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে ৷”
সীতাম্মা এই আশ্বাস পেয়ে পােলভরম চলে গেলেন। [ক্রমশঃ]
=============©===========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………….
[ চরৈবেতিতে প্রকাশিত আঃ বেঙ্কট রাও-এর লেখা থেকে প্রাপ্ত স্বামী বাউলানন্দজীর “আধ্যাত্মিক আলোচনা” আজকেই শেষ অংশ পরিবেশিত হচ্ছে। তবে,জীবনীর অংশ চলতে থাকবে।]
যারা নবীন, তারা যেহেতু পূর্বজন্মে পশুর শরীরে ছিল _তাই মানব শরীরে শরীরে প্রাথমিকভাবে তাদের মধ্যে স্বার্থপরতা থাকা স্বাভাবিক। কিছুটা সময়ের জন্য থাকলেও কিন্তু পুরো এক জন্মের জন্য নয় । প্রথম মানুষ শরীরেই তার নিঃস্বার্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু বিনা সাহায্যে সেটা হবার নয়। তাই তাদের অনুপ্রাণিত করা দরকার । প্রথমাবস্থায় তাদের বেঁচে থাকার জন্য যে ন্যূনতম প্রয়োজনগুলি যেমন আহার বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। উৎপাদনক্ষমতা যেন তৈরি হয়, তার জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সে যেন আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে । এইভাবে কিছুদিন ভোগ করতে পারলে তার জগত-তৃষ্ণা মিটবে, তখন নতুন শরীর নেওয়ার বাসনা তার আর থাকবে না।
নবীনদের মধ্যে এই শুভ রূপান্তর ঘটাতে গেলে অভিজ্ঞদের স্বার্থপরতা দূর করতে হবে । পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে বলেই জাগতিক জ্ঞান তাদের অনেক বেশি। সমস্ত সুযোগ-সুবিধা তারা ভোগ করে বলেই নবীনেরা বঞ্চিত থেকে যায় । এইজন্য বেশিরভাগ লোকের মধ্যে একটা ধারনা তৈরি হয়েছে যে মুক্তি পেতে গেলে বহুবার মানব শরীর ধারণ করতে হবে, জন্ম-মৃত্যুর চক্র কে তারা অনন্ত অনিবার্য মনে করে।
এই ধারণা ভুল এবং এর সংশোধন প্রয়োজন !কারণ একমাত্র মনুষ্যেতর চেতনায় পুনঃপুনঃ শরীর নেওয়ার প্রয়োজন আছে, যাতে সে মনুষ্য চেতনায় প্রবেশ করতে পারে। একবার মানব শরীর প্রাপ্ত হলে এই পুনরাবৃত্তি আবশ্যিক নয় । মানুষ শরীরের একটাই উদ্দেশ্য এবং সেজন্য তার শরীর প্রথম থেকেই উপযুক্ত। মানুষের যা উদ্দেশ্য জীবনেরও সেখানেই গন্তব্য, সৃষ্টিরও সেখানেই সার্থকতা!
যারা একাধিকবার শরীর গ্রহণ করেও জগতে অবস্থান করছেন, প্রথমেই সেই অভিজ্ঞতাকে তাদের কাজে লাগানো উচিত_ নিজেদের নিঃস্বার্থ করার জন্য ! তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতার ফসল হোক মানবতা! তাঁদের সাথে সংযোগ ও সম্পর্ক হোলে নবীনরাও স্বার্থের গন্ডিকে অতিক্রম করার উৎসাহ ও প্রেরণা পাবে । এইভাবে উভয়েরই স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, আর এর ফলে মনুষ্যেতর সংস্কারগুলি মানব শরীরে আসার পথ প্রশস্ত হবে এবং সূক্ষ্ম-বাসনা-শরীরের সংখ্যা কমবে।স্থুল অর্থে_ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যে কোন বিকৃতি হবে না । একমাত্র এই ভাবেই সার্বিকভাবে জনসংখ্যা সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান সম্ভব।
জিজ্ঞাসা:– আমরা এ প্রসঙ্গে আরো জানতে আগ্রহী!
মীমাংসা:– অভিজ্ঞরা যখন জানতে পারবেন যে, পূর্ণ তৃপ্তি পেতে গেলে একাধিকবার জন্ম নেওয়ার প্রয়োজন নেই, এক শরীরেই বাসনা মুক্তি হওয়া সম্ভব, তখন জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণা আমূল পাল্টে যাবে । তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের স্বার্থপর প্রবণতাগুলি নিঃস্বার্থপরতার দিকে মোড় নেবে । লোভ ও অধিকারবোধ কমে গেলেই বন্টনে সমতা আসবে । তাঁর যাবতীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নবীনদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে। এই নবীনরা তখন কিছুদিন ভোগ করবে কিন্তু উদারচেতা অভিজ্ঞদের সংস্পর্শে এসে তাদের খুব দ্রুত ভোগস্পৃহা হ্রাস পাবে। প্রথম শরীরেই তখন স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত হবার সম্ভাবনা প্রবল হবে। পুনরায় জগতে মানুষের শরীর নিয়ে আসার বাসনা আর কাজ করবে না।
*~ সমাপ্ত ~*
__________0________0_______
নােরি সীতাম্মা’র নাম ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি প্রায়ই আশ্রমে আসতেন। আসার সময় আশ্রমের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে আসতেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, তিনিই প্রথম মহিলা যিনি এখানকার আশ্রমে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিলেন। তিনি ছিলেন খুব বিচক্ষণ এবং বিদুষী মহিলা। তাঁর সংকল্প ছিল দৃঢ়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সীতাম্মা অংশগ্রহণ করেছিলেন। ঐ সময় পােলাভরমের বহুলোক বন্দী হয়ে স্থানীয় জেলে বিচারাধীন ছিল। তাদের সেবার ভার পড়ল তাঁর উপর। সাবজেল পােলাভরম গ্রাম হতে প্রায় দুই মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। প্রত্যেকদিন তিনি সেখানে খাবার বয়ে নিয়ে যেতেন। গরুর গাড়ী যোগাড় করতে পারতেন না। কারণ গাড়ােয়ান পুলিশকে ভয় কোরতো। সেজন্য সীতাম্মা সাইকেল চালানো শিখলেন । প্রত্যেকদিন তিনি সাইকেলে করে সাবজেলে খাবার বয়ে নিয়ে যেতেন। এই রকম ছিল তাঁর দৃঢ় সঙ্কল্প। নীতিতে তিনি ছিলেন অবিচল।
এই রকম দৃঢ় সঙ্কল্প এবং অবিচল লক্ষ্য ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক ক্রিয়া কর্মে। সৎসঙ্গ করে ঈশ্বর কি তা তিনি ধারণা করতে পেরেছিলেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁর মনকে নাড়া দিত। তাঁর কাজের মধ্যে একটা মানবােচিত দৃষ্টি ভঙ্গি প্রবল হয়ে উঠত ।
উত্তরাধিকার সূত্রে মা-বাবার কিছু সম্পত্তি তিনি পেয়েছিলেন। স্বামীর সম্পত্তিরও তিনি উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। তার স্বামী অল্প বয়সে মারা যান। সীতাম্মার বয়স তখন খুবই অল্প। গরীবের সাহায্যার্থে তিনি তাঁর সমস্ত অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তাঁর দয়ার কোন সীমা ছিল না। বর্ণবৈষম্য তাঁর কাছে কোন প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে নাই। তাঁর দয়াদাক্ষিণ্য হরিজনদের নিকট পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছিল ।
একবার গ্রামে এক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সমস্ত ইরিজনদের ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অন্য অনেক হীনসম্প্রদায় এবং কিছু ধনী লোকও গৃহহারা হয়ে পড়ে। ধনী লোকের অল্প কিছু খোয়া যায়। কিন্তু গরীবেরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে।
ধনী লোকেরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। গরীবকে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে এল না। সীতাম্মার হৃদয় ছিল বিরাট। এই ঘটনার কয়েক মাস আগে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে কিছু অর্থ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। নিজের জন্য কিছু না রেখে সমস্ত টাকা-পয়সা তিনি গৃহহারাদের জন্য খরচ করেছিলেন। সমস্ত অর্থ শেষ হওয়ার পর তিনি স্বামীজীর সংস্পর্শে আসেন। আশ্রমে তিনি প্রায়ই আসতেন। এই ঘন ঘন যাতায়াতের ফলে পেরেন্টাপল্লীর গ্রামবাসীদের সঙ্গে তিনি ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হলেন । তিনি গ্রামবাসীদের সঙ্গে একাত্ম বােধ করতে লাগলেন। যখনই তিনি পেরেন্টাপল্লী অাশ্রমে যেতেন তখনই তিনি গ্রামবাসীদের মধ্যে বিতরণের জন্য শাড়ি নিয়ে যেতেন।
একবার তাঁর হাতে কোনো টাকা পয়সা ছিল না । যাদেরকে টাকা ধার দিয়েছিলেন, তাদের নিকট হতে টাকা আদায় করতে পারেন নাই। তিনি স্বামীজীর নিকট গিয়ে করুণ সুরে বললেন,“স্বামীজী! আমার সমস্ত টাকা পয়সা খরচ হওয়ার পর আপনার এখনে আসা শুরু করেছি। এখন আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নাই। অনেকে আমার কাছে টাকা ধার নিয়েছে, কিন্তু এখনই সে টাকা পাওয়ার কোনো সুযোগও নাই । ‘মূকােটি’ উৎসবে শাড়ি কেনার টাকা আমার নাই। সেজন্য আমি ঐ উৎসবে এ বছর আসছি না।”
স্বামীজী দয়াদ্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,“মা, নিরুৎসাহিত হয়ো না। অাশ্রমে যা কিছু আনার চিন্তা করছো, তার সবই তোমার কাছে অনায়াসে পৌছে যাবে। কারও নিকট কিছু চাওয়ার দরকার নাই। যারা তোমার কাছে টাকা ধার করেছে তাদেরকে জোর কোরাে না। আশ্রমে না আসার কোনো কথা যেন ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে ৷”
সীতাম্মা এই আশ্বাস পেয়ে পােলভরম চলে গেলেন। [ক্রমশঃ]
=============©===========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
……………………………………………………………….
[ চরৈবেতিতে প্রকাশিত আঃ বেঙ্কট রাও-এর লেখা থেকে প্রাপ্ত স্বামী বাউলানন্দজীর “আধ্যাত্মিক আলোচনা” আজকেই শেষ অংশ পরিবেশিত হচ্ছে। তবে,জীবনীর অংশ চলতে থাকবে।]
যারা নবীন, তারা যেহেতু পূর্বজন্মে পশুর শরীরে ছিল _তাই মানব শরীরে শরীরে প্রাথমিকভাবে তাদের মধ্যে স্বার্থপরতা থাকা স্বাভাবিক। কিছুটা সময়ের জন্য থাকলেও কিন্তু পুরো এক জন্মের জন্য নয় । প্রথম মানুষ শরীরেই তার নিঃস্বার্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু বিনা সাহায্যে সেটা হবার নয়। তাই তাদের অনুপ্রাণিত করা দরকার । প্রথমাবস্থায় তাদের বেঁচে থাকার জন্য যে ন্যূনতম প্রয়োজনগুলি যেমন আহার বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। উৎপাদনক্ষমতা যেন তৈরি হয়, তার জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সে যেন আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠে । এইভাবে কিছুদিন ভোগ করতে পারলে তার জগত-তৃষ্ণা মিটবে, তখন নতুন শরীর নেওয়ার বাসনা তার আর থাকবে না।
নবীনদের মধ্যে এই শুভ রূপান্তর ঘটাতে গেলে অভিজ্ঞদের স্বার্থপরতা দূর করতে হবে । পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে বলেই জাগতিক জ্ঞান তাদের অনেক বেশি। সমস্ত সুযোগ-সুবিধা তারা ভোগ করে বলেই নবীনেরা বঞ্চিত থেকে যায় । এইজন্য বেশিরভাগ লোকের মধ্যে একটা ধারনা তৈরি হয়েছে যে মুক্তি পেতে গেলে বহুবার মানব শরীর ধারণ করতে হবে, জন্ম-মৃত্যুর চক্র কে তারা অনন্ত অনিবার্য মনে করে।
এই ধারণা ভুল এবং এর সংশোধন প্রয়োজন !কারণ একমাত্র মনুষ্যেতর চেতনায় পুনঃপুনঃ শরীর নেওয়ার প্রয়োজন আছে, যাতে সে মনুষ্য চেতনায় প্রবেশ করতে পারে। একবার মানব শরীর প্রাপ্ত হলে এই পুনরাবৃত্তি আবশ্যিক নয় । মানুষ শরীরের একটাই উদ্দেশ্য এবং সেজন্য তার শরীর প্রথম থেকেই উপযুক্ত। মানুষের যা উদ্দেশ্য জীবনেরও সেখানেই গন্তব্য, সৃষ্টিরও সেখানেই সার্থকতা!
যারা একাধিকবার শরীর গ্রহণ করেও জগতে অবস্থান করছেন, প্রথমেই সেই অভিজ্ঞতাকে তাদের কাজে লাগানো উচিত_ নিজেদের নিঃস্বার্থ করার জন্য ! তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতার ফসল হোক মানবতা! তাঁদের সাথে সংযোগ ও সম্পর্ক হোলে নবীনরাও স্বার্থের গন্ডিকে অতিক্রম করার উৎসাহ ও প্রেরণা পাবে । এইভাবে উভয়েরই স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, আর এর ফলে মনুষ্যেতর সংস্কারগুলি মানব শরীরে আসার পথ প্রশস্ত হবে এবং সূক্ষ্ম-বাসনা-শরীরের সংখ্যা কমবে।স্থুল অর্থে_ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যে কোন বিকৃতি হবে না । একমাত্র এই ভাবেই সার্বিকভাবে জনসংখ্যা সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান সম্ভব।
জিজ্ঞাসা:– আমরা এ প্রসঙ্গে আরো জানতে আগ্রহী!
মীমাংসা:– অভিজ্ঞরা যখন জানতে পারবেন যে, পূর্ণ তৃপ্তি পেতে গেলে একাধিকবার জন্ম নেওয়ার প্রয়োজন নেই, এক শরীরেই বাসনা মুক্তি হওয়া সম্ভব, তখন জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণা আমূল পাল্টে যাবে । তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের স্বার্থপর প্রবণতাগুলি নিঃস্বার্থপরতার দিকে মোড় নেবে । লোভ ও অধিকারবোধ কমে গেলেই বন্টনে সমতা আসবে । তাঁর যাবতীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নবীনদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে। এই নবীনরা তখন কিছুদিন ভোগ করবে কিন্তু উদারচেতা অভিজ্ঞদের সংস্পর্শে এসে তাদের খুব দ্রুত ভোগস্পৃহা হ্রাস পাবে। প্রথম শরীরেই তখন স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত হবার সম্ভাবনা প্রবল হবে। পুনরায় জগতে মানুষের শরীর নিয়ে আসার বাসনা আর কাজ করবে না।
*~ সমাপ্ত ~*
