সর্প দংশন
উৎসবের সময় শত শত লোক আশ্রম দর্শন করতে আসে কিন্তু কেউ স্থায়ীভাবে সেখানে থাকে না। উৎসব শেষ হলে সকলে আশ্রম ছেড়ে চলে যায়। কয়েকজন মা এবং কয়েকজন পুরুষ প্রায়ই আসে। কিন্তু কয়েকদিন থাকার পর স্বামীজী তাদেরকে বাড়ী পাঠিয়ে দেন।
কিছু কিছু ভ্রাম্যমাণ সন্ন্যাসী পেরেন্টাপল্লী দেখার জন্য আসতেন এবং কয়েকদিন থেকে চলে যেতেন। মৌন স্বামী নামে একজন সন্ন্যাসী ঐ সময় ২/১ বছর ছিলেন। তিনি কাউকে কোন কথা বলতেন না। তাকে যে কাজের ভার দেওয়া হত সেই কাজ তিনি নীরবে করে যেতেন। স্বামীজী এবং তাঁর মধ্যে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আলোচনা চলত। তৎকালে সাপের গর্ত, লতা এবং ঝোপে ভর্তি ছিল আশ্রম। ঐ গর্তে সাপ থাকত। তারা অবাধে চলাফেরা করত। কখন কখন তারা কুটীরে এসে থাকত। স্বামীজী তাদেরকে কালো টুকরাে কাপড় দিয়ে ঢাকা দিতেন। সাপেদের কোন বাধা না দেওয়ার জন্য তিনি ভক্তদের নির্দেশ দিতেন। কোন ব্যক্তি সাপেদের কোন বাধা দিত না। এ পর্যন্ত কোন সর্প দংশনের ঘটনা শোনা যায় নাই।
স্বামীজীর ঘরের কাছে এটা শুকনাে গাছ ছিল। সেই গাছে একটি ফোকর ছিল। স্বামীজী ঐ ফোকরে এক রকম গাছের শুকনো পাতা এবং তামাক পাতা রাখতেন। লোকে ঐ বিশেষ রকম গাছের পাতায় তামাক পাতা মুড়ে ধূমপান করত। মৌন স্বামীও যখন ইচ্ছা করতেন তখন ঐ গাছের ফোকর হতে পাতা নিতেন। একদিন রাত্রে মৌন স্বামী কিছু পাতা নেওয়ার জন্য ঐ ফোকরে হাত ঢােকাতে যাচ্ছেন এমন সময় স্বামীজী (স্বামী বাউলানন্দ) একটা আদেশ পেলেন “ওকে ফোকরে হাত ঢােকাতে দিও না। ” স্বামীজী তৎক্ষণাৎ ঐ স্থানে ছুটে গিয়ে মৌন স্বামীকে সরিয়ে দিলেন। তারপর স্বামীজী নিজের বাঁ হাত ঐ ফোকরে ঢােকালেন। একটা সাপ তাঁকে দংশন করল। যাই হােক তিনি হাত বের করে নিলেন। আঙুল দিয়ে কয়েক ফোঁটা রক্ত পড়ল। স্বামীজী বললেন, “আমাকে সাপে কেটেছে।” মৌন স্বামী খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তিনি চারিদিক খোঁজাখুঁজি করেও কোন সাপ দেখতে পেলেন না। হাতে যন্ত্রণা হচ্ছে। কাটা জায়গার উর্ধ্বে স্বামীজী শক্ত করে একটা দড়ি বাঁধলেন। দড়ি বাঁধার পর যন্ত্রণা আরও তীব্র হল। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে স্বামীজী মৌন স্বামীকে বাঁধন খুলে
দিতে বললেন। মৌন স্বামী বাঁধন খুলে দিলেন। ঝাঁকুনি দিয়ে যন্ত্রণা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। যন্ত্রণা এত তীব্র হল যে স্বামীজীর শরীর জ্বালা করতে লাগল। অসহ্য যন্ত্রণা। স্বামীজীর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। ঐদিন কয়েকজন মা আশ্রমে ছিলেন। পরের দিন খুব সকালে অন্নপূর্ণা নামে এক মা গাছের ফোকর হতে সাপটাকে বেরিয়ে যেতে দেখলেন ।
নানা রকমের ওষুধ প্রয়ােগ করা হল । কয়েকরকম গাছের রস দেওয়া হল। কিছু গুল্ম পাথরের উপর ছেঁচে ঐ রস লাগান হল। কিন্তু যন্ত্রণার উপশম হল না। এভাবে এক সপ্তহ কেটে গেল। তারপর ক্রমশঃ যন্ত্রণার উপশম হল। কিন্তু স্বামীজীর গায়ের রঙ কালাে হয়ে যেতে লাগল ।
এক সপ্তাহ পরে স্বামীজীর একটা দর্শন হল। তিনি দেখলেন, পারদ আছে এমন যে কোন ওষুধ প্রয়ােগ করলে গায়ের রঙ ফিরে আসবে। এই ধরনের ওষুধের সন্ধান চলতে লাগল। সীতাম্মার প্রচেষ্টায় এই ওষুধ অনায়াসে পাওয়া গেল। সীতাম্মার আনা ওষুধ প্রয়ােগ করার ফলে ধীরে ধীরে গায়ের রঙের পরিবর্তন হল। যদিও পূর্বের গৌরবর্ণ ফিরে এল না–তথাপি কালাে রঙটা চলে গেল।
এই ঘটনার কয়েকদিন পরে শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাসম আশ্রমে এলেন। ঈশ্বরের কৃূপায় স্বামীজীর জীবন রক্ষা পেয়েছে দেখে তারা সুখী হলেন। তারা লক্ষ্য করলেন দংশনটা খুব মারাত্মক ধরনের হয়েছিল। তা না হলে এইরকম এক বিরাট যােগীর গায়ের রঙ কখনই বদলে যেত না।
যাইহােক, তাঁরা উপলব্ধি করলেন, সাপের গর্ত এখানে থাকা ভাল নয়। এখানটা জঙ্গল করে রাখাও ঠিক হবে না। তারা স্বামীজীকে বুঝালেন, দিন পালটে গেছে।
আশ্রম এখন আর ২/১ জন সন্ন্যাসীর বাসস্থান নয়। শত শত তার্থযাত্রী এখানে আসছে এবং ৫/৬ দিন ধরে থাকছে। সুতরাং আশ্রমপ্রাঙ্গণ নিরাপদ রাখা অবশ্যাই দরকার।
স্বামীজী এই প্রস্তাবে সম্মত হলেন। তৎক্ষণাৎ শ্ৰদ্ধা, মৌন স্বামী এবং কয়েকজন গ্রামবাসী মিলে সমগ্র এলাকা পরিষ্কার করে ফেললেন ।