{রেড্ডিজাতির সমাজব্যবস্থা}
‌ যে মেয়েটি নদীর ধারে কাঁদছিল সে বেল্লামামিডির কোন্ডা পরিবারের মেয়ে । তার নাম বীরাম্মা, বয়স 14 বছর পূর্ণ হয় নাই। স্বামীজীকে দেখে সে তার দুঃখ সম্বরন করতে পারলো না । যদি কোনো ব্যক্তি কারো দুঃখের কারণ জানতে চায় এবং তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসে, তখন ওই ব্যক্তির দুঃখ উথলে পড়ে ! স্বামীজী তাকে মিষ্ট কথায় ভোলালেন, তাকে রক্ষার আশ্বাস দিয়ে আশ্রমে নিয়ে গেলেন। স্বামীজী তাকে আশ্রমে নিয়ে গিয়ে মায়েদের তত্ত্বাবধানে রাখলেন। স্নানের জন্য মায়েরা তাকে গরম জল এবং পড়ার জন্য একটি শাড়ি দিল। মন্দিরে পূজা এবং ভোগ হওয়ার পর তাকে খেতেও দেওয়া হোল । তারপর তাকে বিশ্রাম করতে বলা হোলো । কিছুক্ষণ পর সকলের খাওয়া হোলে মায়েরা বীরাম্মাকে সান্তনা দিয়ে জিজ্ঞেস করল_ কেন সে কাঁদছিল ?
মেয়েটি তার দুর্ভাগ্যের কথা বর্ণনা করলো। সে বেল্লামামিডি গ্রামে থাকে। একদিন সে তাদের বাড়ির সামনে চোলাম(cholam) গুঁড়ো করছিল । গ্রামের অন্যান্য লোকের সাথে তার বাবা-মা কাজ করতে বনে গিয়েছিল । কোনখান থেকে একটা বুড়ো লোক এসে তার হাত ধরে জোর করে তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। সে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধা,ঐ লোকটিকে বাধা দিল। তাকে ঝাঁটাপিটে করে তার গতি রোধ করার চেষ্টা করলো । সাধ্যমত তারা বাধা দেবার চেষ্টা করলো । কিন্তু বুড়ো হার মানলো না। সে মেয়েটিকে ছাড়লো না ‌। টানতে টানতে বুড়ো তাকে গ্রামের শেষ সীমানায় নিয়ে এলো। বুড়োই বিজয়ী হোল।
বীরাম্মা রাজি হোক বা না হোক, তাকে ওই বুড়োর স্ত্রী হতেই হবে ! তারা স্বামী-স্ত্রী হবে এটাই ছিল ওদের পরম্পরাগত প্রথা! এই ধরনের বিবাহ রাক্ষস দের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এটা আদিবাসীদের বিশেষ কোন প্রথা নয়, হিন্দুদের মধ্যেও কোথাও কোথাও এই প্রকার প্রথার প্রচলন ছিল । পুরাণেও এরকম অনেক ঘটনা আছে_ যেখানে এই ধরনের বিবাহ প্রথাকে মেনে নেওয়া হয়েছে । আধুনিক ইতিহাসেও এই ধরনের ঘটনা আছে । বর্তমানে গিরিজানদের(এক আদিবাসী জাতি) মধ্যে এই প্রথা চালু আছে। গিরিজানদের বিবাহ ব্যবস্থার মধ্যে কনে এবং তার মা বাবার মতামতের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। পুরুষ যা বলবে সেটাই মানতে হয় !
বীরাম্মার ক্ষেত্রে তার এবং তার মা-বাবার সম্মতি নেওয়া হয় নাই। ঐ বুড়ো এবং তার বয়সের মধ্যে বিরাট পার্থক্য‌ও ছিল। বুড়ো, গ্রামের বৃদ্ধাদের প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করে টানতে টানতে তাকে গ্রামের বাইরে নিয়ে এসেছে, সুতরাং তাকে ওই বুড়োর খেলার পুতুল হিসাবে জীবন উৎসর্গ করতে হবে _এটাই প্রথা ! কিছুক্ষণ পর তার মা-বাবা বন থেকে ফিরে এসে সমস্ত ঘটনা এবং বুড়োর জয়লাভের কাহিনী শুনলো ! তারা খুবই মর্মাহত হয়ে পড়লো। বুড়োর সঙ্গে তাকে পাঠাতে তাদের ইচ্ছা নয় কিন্তু সমাজব্যবস্থা তাদেরকে করতে বাধ্য করলো মেয়েকে পাঠাতে । গ্রামের বয়স্ক পুরুষেরা বুড়োর এই কাজকে স্বীকৃতি জানালো। মা-বাবা বুড়োকে গালিগালাজ করল কিন্তু সেই বুড়োকে তার পরিকল্পনা থেকে টলাতে পারলো না ।
ওই সমাজে কেবলমাত্র অবিবাহিত মেয়েরাই নয়, বিধবারাও এই রকম বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। যে কোনো পুরুষ জোর করে কোনো মেয়েকে গ্রাম থেকে বের করে নিয়ে যেতে পারলেই সে তার স্বামী হয় ।মেয়েটির মতের অপেক্ষা রাখে না!
গ্রামের বয়স্ক লোকেরা বুড়োর পয়সায় মদ খেয়ে বললো _’বুড়োর সঙ্গেই এই মেয়ে বীরাম্মার যাওয়া উচিত !’ সেই মতো বীরাম্মাকে পাঠিয়ে দেওয়া হোল ।
যে বুড়ো বীরাম্মাকে লাভ করলো, তার তিন পুত্র ছিল । পুত্ররা বিবাহিত। তাদের সন্তান-সন্ততি হয়েছে। বুড়ো তার পুত্র পুত্রবধূদের সঙ্গে বাস করতো না। তারা পৃথক থাকতো। বুড়োর স্ত্রী মারা যাওয়ায় সে বীরাম্মাকে তার বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু বিবাহের জন্য কিছু টাকা দরকার। কোনো জায়গা হতে ধারদেনা করে সে টাকা জোগাড় করেছিল।
বুড়োর সঙ্গে বাস করতে বীরাম্মার মন সায় দিল না। সে বুড়োকে তার মৃত্যুর যন্ত্র হিসাবে দেখলো‌। চিরাচরিত সমাজব্যবস্থা তার বিরোধী। সমাজব্যবস্থা এবং গ্রামের বয়স্ক লোকেরা তার শত্রু। বীরাম্মা পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাইল না । সে বুড়োর কবল হতে পালাবার পরিকল্পনা করেছিল এবং সেজন্যই সে নদীর ধারে মৃত্যুবরণ করতে চেয়েছিল। [ক্রমশঃ]