{রেড্ডিজাতির সমাজব্যবস্থা}
স্বামীজীর কথায় অনেকে রাজি হলেও বিজু প্রবৃত্তি গ্রামের ধর্মীয় নেতারা এই প্রস্তাব মেনে নিলোনা । তারা বুঝতে পারলো প্রথার মধ্যে শিথিলতা দেখা দিলে সমাজে তাদের প্রভাব কমে আসবে ।
কিন্তু বাকি সমস্ত পুরুষ রাজি হোল । তখন স্বামীজী বললেন _’বিজু প্রভৃতি ধর্মীয় নেতারা যখন তাদের মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে চিন্তা করবে, তখন তারাও এই প্রস্তাব মেনে নেবে । কোনো ভয় নাই। এখন বীরাম্মার জন্য উপযুক্ত পাত্র দেখো, খুব তাড়াতাড়ি তার বিয়ে দিতে হবে ।
ওখানকার লোকেরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে পাত্র ঠিক করলো। বীরাম্মার পছন্দ হল পাত্রকে । স্বামীজী 35 টাকা দিলেন । বিয়ের সমস্ত ব্যবস্থা করা হোলো।
এদিকে পরের দিন নেশা ভাঙার পর বুড়ো লোকটি দেখল বীরাম্মা তার বাড়ি থেকে পালিয়েছে । সে সোজা বেল্লামামিডি গ্রামে চলে গেল। গিয়ে দেখলো গ্রামে কেউ নাই । সকলে আশ্রমে গিয়েছে জানতে পেরে, সেও আশ্রমে এসে হাজির হোলো ।
গ্রামের সমস্ত লোককে জোর করে তাদের সামনে সে তার অভিযোগ তুলে ধরলো। সে বলল যে, সে বীরাম্মাকে জয় করেছে এবং বীরাম্মা তার‌ই। গ্রামের বয়স্ক পুরুষরা বলল _”তুমি খুবই বুড়ো হয়েছো। তোমাকে বীরাম্মা বিয়ে করতে রাজি নয়।” বুড়ো বলল _”আমি বীরাম্মাকে আমার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম । আমার বাড়িতেই তাকে থাকতে হবে । পুরুষরা ভাবলো _এটা যুক্তিযুক্ত কথা! তারা মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বলে সম্মতি জানাতে যাবে _এমন সময় মেয়েরা তীব্র প্রতিবাদ জানালো। তারা জোর দিয়ে বললো _ “স্বামীজী যে টাকা দিয়েছেন, তাই দিয়ে আজ‌ই বীরিম্মার বিয়ে দেওয়া উচিত !”
ঐ বুড়োর প্রতিবাদ সত্ত্বেও ওই দিনই বীরাম্মার বিয়ে হয়ে গেল । বিজুরা এবং সেই বুড়ো নীরবে চলে গেল ।
ঐদিন হোতে চিরাচরিত প্রথার পরিবর্তন হোলো। ক্রমশই ঐ প্রথা অন্যান্য গ্রামেও ছড়িয়ে পড়লো।উপজাতিদের আর্থিক উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রম হোতে দান গ্রহণ করার প্রথা বন্ধ হোলো।
হেমনডরফ(!) মন্তব্য করেছিলেন _স্বামীজী অর্থবলে এবং তার প্রভাবের মাধ্যমে উপজাতিদের পুরাতন প্রথার উপর অনধিকার হস্তক্ষেপ করেছেন। স্বামীজী কিন্তু তার সঙ্গে একমত হতে পারলেন না। তিনি বললেন _” সভ্য সমাজেও চিরাচরিত প্রথার মধ্যে পরিবর্তন আসে । ক্ষত্রিয়দের মধ্যে গান্ধর্ব মতে বিবাহ চালু ছিল কিন্তু এখন তা অপ্রচলিত । সেরূপ আইন করে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে । প্রচলিত প্রথার মন্দ দূরীকরণ পাপ নয়। 35 টাকা দান হিসেবে দেওয়াটাও অন্যায় নয় । চর্মরোগের জন্য ইনজেকশন নেওয়াটা, চাল এবং তাদের উপহার দেওয়াটা _যদি ভাল হয়, তাহলে বিয়েতে এই দান দেওয়াটাও ভালো !”
হেমনডরফ তখন অন্য যুক্তি দেখালো_” আগে উপজাতিরা অল্প আয়ে জীবনধারণ করছিল। তাদের চাহিদা অল্প ছিল। ‘এটা পেতে হবে’, ‘ওটা পেতে হবে’_ এরকম আকাঙ্ক্ষা তাদের ছিল না। এখন তাদেরকে আরো টাকা দিয়ে আপনি তাদের চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিলেন । এখন প্রয়োজনীয় জিনিস না পেলে তাদের মনে কষ্ট হবে । সুতরাং আপনি সরাসরি তাদের দুঃখ সৃষ্টি করছেন । সুতরাং যে অতিরিক্ত টাকা আপনি ওদেরকে দিচ্ছেন_ তা ব্যাংকে জমা রাখুন!”
স্বামীজী এই যুক্তিরও প্রতিবাদ করলেন_ “নাগালের বাইরে কোনো জিনিস না পেলেই হতাশা আসে, সন্তুষ্টি আসে না। সুতরাং তারা অর্ধনগ্ন থাকে আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য নয়, দারিদ্রের চাপে এবং প্রয়োজনীয় কাপড় না পাওয়ার জন্য। সুতরাং তাদেরকে প্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়া দেওয়া উচিত !
এতে ওদের প্রয়োজন বাড়বে ঠিকই কিন্তু প্রয়োজন‌ই তাদেরকে আরো কাজ করতে এবং আরো অর্থোপার্জন করতে উৎসাহ দেবে । প্রয়োজন না থাকলেই কাজে শীতলতা আসবে এবং অলসতা তাদেরকে পেয়ে বসবে ।
তিনি আরো বললেন, _”অন্য সকলের মতো তাদেরও ভালো খাবার পাওয়া দরকার। চোলাম এবং চাল‌ও তাদের অনেকের দরকার । তাহলে তাদেরকে আর জিলুগু চূর্ণ খেয়ে থাকতে হবে না । এখন তারা উন্নত মানের যথেষ্ট খাবার পাচ্ছে । যথা সময়ে তারা অধিক অর্থ উপার্জনের জন্য চেষ্টা করবে, যখন তারা ভোগ্য জিনিস ক্রয় করার প্রয়োজন অনুভব করবে । প্রয়োজন যত বাড়বে _আকাঙ্ক্ষা এবং প্রচেষ্টা ততই বাড়বে। আকাঙ্ক্ষার নিরসনে সন্তুষ্টি আসে জীবনে। সুতরাং প্রথমে তাদেরকে আনন্দ উপভোগ করতে দিতে হবে । তাদের আকাঙ্খার নিরসন হোলে অতিরিক্ত টাকা জমানোর কথা চিন্তা করা যাবে । পূর্বে তারা যা পায় নাই এখন তারা তা ভোগ করুক ! এই আনন্দটা অর্থ অপচয় নয় !
পরিপূর্ণ অথবা আংশিক পার্থিব ভোগ শেষ হলে ভগবানের দিকে মন যাবে,তারা তখন ভগবানকে খুঁজবে । যাদের ক্ষুধার জ্বালা আছে তাদেরকে ধর্মোপদেশ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই। [ক্রমশঃ]