[লেখকের দ্বিতীয়বার আশ্রম দর্শন]
স্বামীজীর কাছে কিছুক্ষণ সৎসঙ্গ শোনার পর আমরা গ্রাম ঘুরতে গেলাম। দেখলাম_গ্রামের মানুষজনের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে।
বিকালের দিকে বহুদূর থেকে দুজন লোক আশ্রম এলো। তারা স্বামীজীকে তাদের দুঃখের কথা জানাতে লাগলো। স্বামীজী তাদেরকে কিছু খেতে দিলেন । খাওয়া হোলে তারা আমাদের সামনে এসে তাদের অভিযোগ জানালো। তাদের অভিযোগ হচ্ছে যে, বনরক্ষক তাদের উপর খুব অত্যাচার করছে। প্রতিবছর চাষ করার জন্য তারা বন রক্ষককে বকশিস স্বরূপ কিছু টাকা দেয় ! তা সত্ত্বেও সে দু-সের অতিরিক্ত “চোলাম” দাবি করছে ! তাই ওরা জিজ্ঞাসা করছে যে, তারা কি করবে !
আমি বললাম_’ওরা রেঞ্জ অফিসারের কাছে রিপোর্ট করেছে না কেন?’
স্বামীজী উত্তর দিলেন _”রেঞ্জ অফিসার এখান থেকে বহু দূরে থাকে । এরা যদি রেঞ্জ অফিসারের কাছে রিপোর্ট করে তাহলে বনরক্ষক এদের নাজেহাল করবে। কারণ প্রতিদিন কিছু না কিছু প্রয়োজনে ওদেরকে বনরক্ষকের কাছে যেতে হয় ।” নীলাদ্রি রায় নিজেও একজন তহশীলদার । তাই তিনি চুপ করে রইলেন। স্বামীজী ঐ দুজনকে বললেন _”তোমরা বন রক্ষককে তোমাদের বকশিশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করবে । সে যেন তোমাদেরকে কাঠ নেওয়ার জন্য অনুমতি দেয় । আর বলবে _শস্য কাটার পর ‘চোলাম’ দেওয়া হবে । যদি সে রাজি না হয়, তাহলে তাকে বলবে _’স্বামীজীর নিকট গেলে স্বামীজী তাকে “চোলাম” দেবে’ ‌। এইরূপ উত্তরে তারা সন্তুষ্ট হোল । স্বামীজী তাদেরকে রাস্তায় খাওয়ার জন্য কিছু খাবার দিলেন । তারা স্বামীজীর নিকট হোতে বিদায় নিল ।
ওরা চলে যাওয়ার পর স্বামীজী বলতে লাগলেন _”তোমরা এই এলাকার অফিসার ! তোমরা সরকারের প্রতিনিধি! সুতরাং জনগণের সুখ-সুবিধা দেখার দায়িত্ব তোমাদের ! তোমরা যা করছ _সবই জনগণের মনে রেখাপাত করছে! তোমরা তোমাদের কাজের ভুলত্রুটি ভালোভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করবে! স্বেচ্ছাচারিতার যন্ত্র হওয়া তোমাদের উচিত নয় !
এই পরিপ্রেক্ষিতে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করছি । পেরেন্টাপল্লীর বিপরীত দিকে এক গ্রামে 5/6 জন রেড্ডি বনে কোনো একটা অপরাধে সরকারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল । ভদ্রাচলম আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছিল। আদালতে হাজিরা দেওয়ার জন্য তাদেরকে 50 মাইল লঞ্চে যেতে হবে । সহুকার ভাড়ার জন্য কোনো টাকা দিল না । রেড্ডিরা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতেও পারলো না । সুতরাং তাদেরকে হেঁটে নির্দিষ্ট দিনে আদালতে বেলা এগারোটায় হাজির হোতে হয়েছিল । শুনানি 14 দিন মুলতুবি থাকলো _এই রায় শোনার জন্য তাদেরকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আদালতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সমস্ত রাস্তা তারপরে তারা পায়ে হেঁটে ফিরে এসেছিল। আদালতে যেতে দুদিন এবং আদালত হতে ফিরতে তাদের আরো দুদিন সময় লেগেছিল এবং আদালতে একদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল । এই পাঁচ দিনে তাদের খাবার দেবে কে ? এই পাঁচ দিন তাদের পরিবারের লোকদেরকেই বা কে খাওয়াবে? ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তাদের এই সমস্যা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নন। এই স্থগিতাদেশ _আদালতের একটা রেওয়াজ কিন্তু সেটাই এইসব গরীব মক্কেলদের পক্ষে জীবন-মরণ সমস্যা ! এই ধরনের ঘটনা গত ছয় মাস ধরে চলছে! অন্তত আরও ছয় মাস এভাবে চলবে ! কাজ করার সময় তোমাদের এগুলো অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।”
মিঃ নীলাদ্রি রাও লজ্জায় মাথা হেঁট করলেন। তিনি বললেন_” স্বামীজী, আপনার কথায় আমার চোখ খুলে গেল। আমি কখনোই জানতাম না এদের এত দুর্গতি! কেউ কোনদিন আমাকে এদের দুঃখ দুর্দশার কথা বলেনি। অতঃপর উপজাতিদের কোন মামলার শুনানি যাতে তাদের গ্রামের নিকটবর্তী কোন বড় গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় সে বিষয়ে নজর রাখবো। উকিল দের মধ্যে হৈচৈ শুরু হয়ে যাবে, যেহেতু তাদেরকে অনেক রাস্তা ভ্রমণ করতে হবে। দেখা যাক কতদূর কি হয়!”
তারপর স্বামীজী উল্লেখ করলেন, উপজাতিরা কিভাবে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে এবং ঋণের টাকার সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পেয়ে বিরাট অংকে দাঁড়ায় _ যখন অফিসাররা এ বিষয়ে তদন্ত করে ! এক বছরের হিসাব নিকাশ দেখেই তাদের সন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয় । দশ-বারো বছরের হোলেও গোড়া থেকে ঋণের হিসাব করে নেওয়া ভালো । যদিও এ কাজ খুব কঠিন তথাপি উপজাতিদের সাহায্য করতে গেলে এরূপ করা দরকার । স্বামীজী আলোচনা বন্ধ করলেন। উপজাতিদের এই সমস্যাগুলি দেখা –নীলাদ্রি রাওয়ের‌ই দায়িত্ব _যেহেতু তিনি তহশিলদার ! তিনি মাথা হেঁট করে বললেন _”এবার থেকে আমি এসব দেখবো!” স্বামীজী তাঁর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। স্বামীজী বললেন,”বাড়ি ফেরার পথে কুনাভরমে হরির সঙ্গে দেখা কোরো। তার কাছে রামতীর্থের কয়েকখানা বই আছে, ঐগুলি নিয়ে গিয়ে পড়বে। ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ কিনে পড়বে !” স্বামীজীকে প্রণাম করে আমরা বিদায় নিলাম ।