সন্ন্যাস সম্বন্ধে স্বামী বাউলানন্দের ভাবধারা ছিল খুব দৃঢ় । ওই সময়ের একটা ঘটনা হোতে আমরা এটা সম্যকভাবে বুঝতে পারবো । একদিন প্রায় দুপুর একটায় রাজামুন্দ্রি থেকে একটা লঞ্চ এলো। একজন স্বামীজী এবং তাঁর কয়েকজন অনুগামী লঞ্চ হতে নামলেন । কয়েকজন শিষ্য তাদের পরিবারসহ তার সঙ্গে ভদ্রাচলম যাচ্ছিলেন। সম্ভবত তারা আশ্রমের কুটীরে একদিন কাটাতে চাইলেন। তাদের মালপত্র রাখার জন্য জায়গা দেখিয়ে দেওয়া হোল । ওই সময় ওদের জন্য খাবার প্রস্তুত ছিলনা! স্বামীজী মায়েদের রান্না করার জন্য বললেন। অভিনন্দন বিনিময়ের পর নবাগত স্বামীজী পুরুষ ভক্তদের নিয়ে নদীতে স্নান করতে গেলেন। তিনি বলে গেলেন তর্পণাদি সেরে তিনি শীঘ্রই ফিরে আসবেন ।
দর্শনার্থীদের অধিকাংশই ছিল মহিলা এবং শিশু । এদের মধ্যে কেউ কেউ কুয়োর জলে এবং কেউ কেউ ঝর্ণার জলে স্নান সেরে নিলেন। কাপড় ছেড়ে তাঁরা মন্দিরে গিয়ে পূজা করলেন। পূজার পর তারা খেতে বসলেন । কলার পাতায় ওদেরকে খেতে দেওয়া হোলো । কিন্তু নবাগত স্বামীজী এবং তার পুরুষ ভক্তরা তখনো স্নান সেরে ফেরেন নি ! বয়স্ক মহিলারা কোনরকমে নিজেদের সংযত করলেন, কিন্তু ছোট ছোট শিশুরা ক্ষুধার তাড়নায় কান্না শুরু করে দিল । মায়েরা কোনরকমেই তাদের শান্ত করতে পারছিলেন না। একজন লোক নদীতে গেল সেখানে কি হচ্ছে দেখতে _ সে ফিরে এসে বলল, স্বামীজীর তাড়াতাড়ি ফেরার কোনো লক্ষণই নাই। অথচ এদিকে স্বামীজীকে ব্যতিরেকে মায়েরা প্রসাদ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নন। তাদের ভয় _গুরুকে বাদ দিয়ে প্রসাদ গ্রহণ করলে হয়তো তিনি রূষ্ট হবেন !
স্বামী বাউলানন্দজী এই পরিস্থিতি সহ্য করতে পারলেন না । ছেলেমেয়েরা এবং মায়েরা কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন! যদি ঐ স্বামীজী সন্ধ্যা পর্যন্ত জপ করেন, তাহলে কি তাদের ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? বরং তাঁর তো বলা উচিত ছিল যে, তাঁকে ছাড়াই তারা যেন প্রসাদ গ্রহণ করে !
বাচ্চা ছেলে মেয়েদের কান্না সহ্য করতে না পেরে স্বামীজী মায়েদের বললেন _”তোমাদের গুরু ফিরলে যজ্ঞশালায় তাঁর জন্য আমরা আলাদা খাওয়ার ব্যবস্থা করবো!” ছেলেমেয়েদের এবং মায়েদের প্রসাদ পরিবেশন করা শুরু হোলো কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবেশন শেষ হোলো। নবাগত মায়েরা কিন্তু উভয় সংকটে পড়লেন। আশ্রমের স্বামীজীর বাক্য‌ও উপেক্ষা করতে পারছেন না, আবার তাদের গুরু না ফেরা পর্যন্ত প্রসাদ গ্রহণ করতেও পারছেন না ! কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ছেলেমেয়েদের শান্ত করতে না পেরে তাঁরা খাওয়া শুরু করলেন।
তাঁরা খেতে সবে শুরু করেছেন _এমন সময় তাঁদের গুরু শিষ্যসহ আশ্রমে ফিরলেন । যাঁরা খাচ্ছিলেন, তাঁরা লজ্জা এবং ভয়ে মাথা হেঁট করে বসে রইলেন। নবাগত স্বামীজী অপমানিত বোধ করলেন এবং তিনি তাঁদের প্রতি ক্রুদ্ধ‌ও হোলেন। তিনি তাঁদের দিকে কটমট করে তাকালেন। তিনি কখনোই ভাবেননি যে, তাঁর শিষ্যরা তাকে এমনভাবে হেয় করবে! তাঁর মুখ লাল হয়ে গেল।যে শিষ্যরা তাঁর সঙ্গে নদীতে গিয়েছিল _তারাও খুব রেগে গেল।
স্বামী বাউলানন্দজী পুরো দৃশ্যটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং নবাগত স্বামীজীকে তাঁর কুটীরে নিয়ে গেলেন। তিনি তাঁকে বললেন _”ছেলেমেয়েরা ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে কাঁদছিল। তা প্রসাদ যখন তৈরি হয়ে গেছে _তখন তাদের আমরা খাদ্য দেবো না কেন ? তাই মন্দিরে ভোগ দিয়ে ওদেরকে প্রসাদ গ্রহণ করতে বলেছি ! এখন আপনিও আপনার অন্যান্য শিষ্যসহ সকলে যজ্ঞশালায় বসে প্রসাদ গ্রহণ করুন ! দয়া করে এখনি খেয়ে নিন ! পরে এ বিষয়ে আলোচনা হবে !”
নবাগত স্বামীজী কিন্তু স্বামীজীর কথায় সন্তুষ্ট হলেন না কিন্তু অন্য জায়গা বলে কিছু বলতেও পারলেন না। নীরবে যজ্ঞশালায় গিয়ে খাবার খেয়ে নিলেন।