স্বামী বাউলানন্দজীর জীবনীকার আপ্পা বেঙ্কট রাও _স্বামীজীর শ্রীমুখ থেকে শুনেই তাঁর সম্বন্ধে কথাগুলি লিখেছিলেন,এটা আশা করাই যায়! আপ্পাজী স্বীকার করেছিলেন যে, একেবারে প্রথম দিকে স্বামীজী “স্বামী বাউলানন্দ”_ নামেই সাক্ষর করতেন। কিন্তু “বাউল”_এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবে বাংলা র culture, দক্ষিণের লোকেরা বিশেষত তেলেগু ভাষা-ভাষীরা ‘বাউল’ শব্দটির সাথে পরিচিত ছিল না_তাই বাউলানন্দের জায়গায় বালানন্দ উচ্চারণ কোরতো_ফলে স্থানীয়ভাবে উনি স্বামী বালানন্দ নামেই পরিচিত ছিলেন।
গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের সাথে আলাপ হবার পর আপ্পাজী প্রকৃত ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। উনি লিখেছিলেন_”আমার গুরুজীর প্রকৃতসত্তা বোধে বোধ করে স্বামী পরমানন্দজী যে সত্যের উদঘাটন করলেন_তাতে সমস্ত জিনিসগুলি আমার মনে পড়ে গেল এবং প্রকাশ্যভাবে স্বামীজীর নাম “বাউলানন্দ”স্বীকার করলাম”!
এর পর থেকেই পেরেন্টাপল্লীর স্বামীজীর নাম যে “স্বামী বাউলানন্দ”_তা স্থানীয় মানুষেরাও জেনে যায়। আপ্পাজী এটাও জানতেন যে স্বামীজী বাউল সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী ছিলেন এবং তিনি ঋষি অরবিন্দের সাথে কোন না কোনভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন। গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের কাছে আমরা শুনেছিলাম উনি বাঙালি ছিলেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বীর সৈনিক ছিলেন। পরে উনি শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবাদর্শের অনুসারী হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলেন এবং কঠিন সাধনার উপযুক্ত স্থান খুঁজতে খুঁজতে গোদাবরীর তীরে পপি হিলসের পাদদেশে দূর্গম জঙ্গলের মধ্যে তাঁর নির্দিষ্ট স্থান খুঁজে পান !
কিভাবে স্থানটি নির্দিষ্ট হয়_তার‌ও একটা ঘটনা রয়েছে! স্বামীজীর ঐকান্তিক প্রার্থনায় মা জগদম্বা তাঁকে দর্শন দিয়ে পেরেন্টাপল্লীর যে স্থানটিতে এখন “শ্রীরামকৃষ্ণ তপোবন আশ্রম”_সেখানটিতে একটি শিবলিঙ্গের মধ্যে অন্তর্হিত হয়ে যান।(ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :–মানুষ যতদিন জগতের প্রতি আসক্ত ততদিন তাকে ফিরে ফিরে আসতে হবে। আসক্তি কাটলে তবেই সে জগতের মঙ্গলের জন্য কাজ করার অধিকার অর্জন করবে। এই আসক্তি কাটে কিভাবে ?
মীমাংসা :– যারা আর আসক্ত নন এবং জগতহিতায় নিজেদের নিয়ােজিত করেছেন, তাদের সাথে সঙ্গ করলে সংসারাসক্তি কাটে। তাদের মধ্যে থেকে শুভ শক্তি নির্গত হয়ে সাধারণ মানুষেরচেতনাকে উত্তরণমুখী করে ।
জিজ্ঞাসা :–যারা জগতে বা সংসারে আসক্ত নন, তাঁদেরও কি নিজেদের উন্নত করার কোন উদ্দেশ্য থাকে ?
মীমাংসা :– পুনর্বার শরীর গ্রহণ করার বাসনা আর থাকে না।
জিজ্ঞাসা :–শরীর গ্রহণের বাসন কেটে যাওয়ার পর এদের কি আর কোন ভূমিকা থাকে ?
মীমাংসা :– হ্যাঁ। মহাবিশ্বে সূক্ষ্ম ও কারণ অবস্থায় সাম্যরক্ষা করার ভূমিকা তাঁদের পালন করতে হয় ।
জিজ্ঞাসা :–কিভাবে এই সাম্যরক্ষা হয় ?
মীমাংসা :–শরীর গ্রহণের বাসনা একবার অতিক্রম হয়ে গেলে সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর, কারণ ও আধ্যাত্মিক বৃত্তিগুলি প্রথমে আংশিক ও পরে পূর্ণরূপে শক্তিশালী ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এইভাবে পাঞ্চভৌতিক উপাদানে গঠিত এই মহাবিশ্বে সংহতি থাকে। চেতনার উত্থান যত সূক্ষ্ম থেকে অধ্যাত্মের দিকে যাবে মহাজাগতিক ভাবপুঞ্জ তত পুষ্ট হবে, সমৃদ্ধ হবে । এরও পরে আধ্যাত্মিক বৃত্তিগুলি সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়ে ওঠে। তখন সৃষ্টির মূল তত্ত্বের সাথে একাত্মবোধ হয়। উৎসের সাথে বিলীন হয়ে যেতে যেতে সে নিজেই উৎস হয়ে যায় ।
জিজ্ঞাসা :–এর পরেও কি আর কোন অবস্থা থাকে ?
মীমাংসা :–এর পরে আর ব্যক্তিসত্তা থাকে না। তত্ত্বের সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া মানে বিশ্বসত্তায় একীভূত হওয়া। অর্থাৎ দৃশ্য ও অদৃশ্য জগতের অন্তরাত্মা যে তত্ত্ব তার সাথে সে অভিন্ন। সে তখন শাশ্বত ও সার্বিক। ব্যক্তি-অহং এতদিন অবচেতনে ও সচেতনে যে অপার আনন্দ ও আত্মিক নিরাপত্তা খুজেছে সে তা প্রাপ্ত হয়েছে। জীবনের উদ্দেশ্য তার সার্থক হয়েছে। ব্রহ্মে বিলীন হওয়ার আগে পর্যন্ত ‘আমিত্ব’ থাকে। ধীরে ধীরে সেটাও সরে যায়।
জিজ্ঞাসা :– তখন কি তিনি ঈশ্বরের সাথে এক হয়ে যান ?
মীমাংসা :—এই জিজ্ঞাসা নিয়ে সঠিক বিচারের প্রয়ােজন। অনেক ঝর্ণা এসে নদীর সাথে মেশে এবং নদীগুলি সমুদ্রের সাথে মিশে যায় । ঝর্ণাগুলি নদীমুখী –নদীগুলি সাগরমুখী, কিন্তু সাগর নিত্য –কোনকিছুর দিকে প্রবাহিত নয়। ধরে নাও ঈশ্বর হচ্ছেন সেই সমুদ্র, মহাজাগতিক ইচ্ছা বা সত্তা হচ্ছে নদী এবং মানুষ হচ্ছে ঝর্ণা।
তুমি তেমনই এক ঝর্ণা। তােমার ইন্দ্রিয় ও বৃত্তিগুলির সূক্ষ্ম রূপান্তর ঘটে গেছে বলে ধরে নাও ৷ শুধু ধারণা নয়, জীবন ও জগত সম্বন্ধে বাস্তব জ্ঞান তুমি লাভ করেছ। ঝর্ণা হয়েও নদীর সাথে একাত্মতা তুমি প্রত্যক্ষভাবে জানাে এবং নদীর সাথে সাগরের যে সম্পর্ক তাও তুমি জ্ঞাত। যতক্ষণ তুমি ঝর্ণা হয়ে আছে অর্থাৎ নিজস্ব সত্তা নিয়ে আছে ততক্ষণ এই জানা বা বােঝার প্রশ্নগুলাে উঠছে। ঝর্ণা থেকে নদী, নদী থেকে সমুদ্র যতক্ষণ উত্তরণমুখীনতা বা গতিময়তা, ততক্ষণ পর্যন্ত আমিত্বের বােধ থাকবে। কিন্তু সমুদ্রে মিশে গেলে তুমি সমুদ্রই হয়ে গেলে, বােধ আর বােধীর ভিন্নতা থাকে না।
জিজ্ঞাসা :–আপনার এই বিশ্লেষণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবু একটু সংশয় থেকে যায় । কারণ সাধকদের মুখে সেই বহু প্রচলিত উক্তি এখনও শােনা যায়, ‘আমি ঈশ্বরের সাথে এক হতে চাই’।
মীমাংসা :–এই সংশয়ের কোন ভিত্তি নেই। চেতনার যত বিস্তার হবে, তত দেখবে তােমার ‘তুমি-ত্ব’ বা ‘তুমি-বােধ’ হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঈশ্বরের সাথে কোথায় তুমি এক হয়ে যাবে ? কোথাও না। যখন তুমি বনস্পতি ছিলে তখন থেকেই তােমার অন্তরে একটাই প্রবণতা মূলে কাজ করে গেছে সেটা হচ্ছে—তুমি নিরাপদ হতে চেয়েছ, আনন্দে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছ। এই মৌলিক প্রবণতা মনুষ্যতর প্রাণী অবস্থাতেও তােমার মধ্যে কাজ করে গেছে এবং এখন মানুষ অবস্থাতেও ঐ প্রবণতা তােমাকে তােমার গন্তব্য বা উদ্দেশ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেটা হচ্ছে –বিশ্বসত্তায় তােমার বিলীন হয়ে যাওয়া। সেই সত্তাও তার নিজের ধর্মে ঈশ্বরের সাথে এক হয়ে যায়। এখানে তােমার একটা মানবিক অহং নিয়ে ঈশ্বরের সাথে একাত্ম হবার প্রশ্নটাই উঠছে না। ঠিক যেমন, ঝর্ণা নদীর দিকে আর নদী সাগরের দিকে প্রবাহিত হয়। কিন্তু ঝর্ণার তার নিজস্ব চরিত্র নিয়ে সরাসরি সাগরে মিশে যাওয়ার বিচারটাই ভুল ।
জিজ্ঞাসা :–এই যে আমরা আনন্দ বা নিরাপত্তা চাইছি এবং মহতের সাথে একাত্ম হতে চাইছি, এই উত্তরণ কিভাবে ঘটানাে সম্ভব ?
মীমাংসা :– বিশ্বসত্তা সমস্ত সৃষ্টির মূল তত্ত্ব বা প্রেরণা। সুতরাং ব্যক্তির আনন্দ বা নিরাপত্তাবােধে সেই সত্তাতেও আনন্দ ও নিরাপত্তা বােধ আসে। আবার উল্টোটাও সত্য। অর্থাৎ তার আনন্দ ও নিরাপত্তা আমারও আনন্দ ও নিরাপত্তার কারণ ।
জিজ্ঞাসা :–ধারণাটা পরিষ্কার হল। এখন জানতে ইচ্ছা হচ্ছে যে, সমস্ত সৃষ্টির প্রেরণাস্বরূপ সেই ঈশ্বরের অবস্থান বা স্থিতিটা ঠিক কি ?
মীমাংসা :—সমস্ত সৃষ্টি সেই তত্ত্বেই ওতােপ্রােত এবং সম্পূর্ণ সাম্যে অবস্থিত। ধরে নাও ফাঁপা সিলিণ্ডারজাতীয় কিছু ছােট ছােট বস্তু সমুদ্রের জলে ভাসছে। এগুলাের গায়ে অনেক ফুটো এবং এদের আকার ও রূপে অনেক বৈচিত্র্য ও ভিন্ন । এগুলো ডুববে না শুধু ভেসে থাকবে । এদের ভিতরেও সমুদ্রের জল রয়েছে। এরা কখনও খুব দ্রুত ভেসে যাচ্ছে, কখন ধীরে, আবার কখনও এক জায়গাতেই পড়ে আছে। বস্তুগুলাের শুধু স্থান পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু সমুদ্রের জলের কোন পরিবর্তন বা রূপান্তর হচ্ছে না। বস্তুগুলাের ভেতরে বাইরে শুধু জল কিন্তু সমুদ্র এবং তার জলঅপরিবর্তিত। আবার দেখ, এক জায়গায় কিছুক্ষণ থাকার পর বস্তুগুলো যখন অন্যদিকে ভেসে যাচ্ছে, ভেতরের জলটা কিন্তু ওরা নিয়ে যাচ্ছে না। সেটাও পাল্টাচ্ছে, অথচ সমুদ্র একই থাকছে।
সমুদ্রকে তাই এক্ষেত্রে ঈশ্বরের সাথে তুলনা করা চলে। বস্তু থেকে ব্যক্তি—এই সৃষ্ট জগতে শুধু দশার পরিবর্তন হতে পারে, স্থান পাল্টাতে পারে কিন্তু সকলের অন্তরাত্মা সেই তত্ত্ব বা ঈশ্বর অপরিবর্তনীয়, শাশ্বত, সনাতন।
জিজ্ঞাসা :–বিশ্বসত্তা যাকে বলছেন, তাঁর অবস্থান কি ?
মীমাংসা :—বিশ্বমন ও বিশ্বঅহং-এর সমষ্টিগত অবস্থান হল বিশ্বসত্তায়। একটা অবস্থার পরে অহং আর মন পৃথক হয়ে যায়—দ্রষ্টাস্বরূপ সত্তায়, তখন আর বিশ্বসত্তার আমিত্ব থাকে না এবং শেষে বিশ্বমন ঈশ্বরে বিলীন হয়।
জিজ্ঞাসা :–আর বিশ্ব অহং-এর কি হয় ?
মীমাংসা : –মহাকাশে অবস্থান করে।
জিজ্ঞাসা :—কোন অবস্থায় বিশ্বমন আর বিশ্ব-অহং পৃথক হয়ে যায় ?
মীমাংসা :—যখন কল্পের অন্তে এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের তত্ত্বে লয় হয়ে যাবার কাল আসে তখন হয়। … [ক্রমশঃ]