স্বামী বাউলানন্দজী ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই পাকাপাকিভাবে পেরেন্টাপল্লীতে থেকে গেলেন। কারণ তার আগে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এবং স্বয়ং বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে দর্শন দিয়ে এইরকমই নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে হোল কি _ধীরে ধীরে স্বামীজী তাঁর কর্মময় জীবনে ফিরে আসতে শুরু করলেন। তিনি তাঁর চারপাশের হতদরিদ্র, দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত উপজাতিদের উন্নতির কাজে লেগে গেলেন।
প্রথমেই উনি খেয়াল করলেন যে_কিছু অসৎ-ধনী-শক্তিশালী মানুষ এই সহজ সরল,দূর্বল, হতদরিদ্র, সমস্ত রকমের সু্যোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত__মানুষগুলোকে ঠকাচ্ছে-অকারণে উৎপীড়ন করছে! স্বামী বাউলানন্দজী ঐ মানুষগুলির কাছে কাছে গিয়ে _তাঁদেরকে খুবই অনুনয় বিনয় করে অনুরোধ করেছিলেন, যাতে তারা ঐ অসহায় মানুষগুলির উপর আর কোন অন্যায় না করে! কিন্তু তা তো হবার নয় _’চোরা না মানে ধর্মের কাহিনী’! তারা স্বামীজী কে শুধু হাতে ফিরিয়ে দিল।
আগেই বলা হয়েছিল যে, স্বামীজী প্রথম জীবনে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন এবং নেতাজী সুভাষ ও ঋষি অরবিন্দের সাথে উনি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন। কিন্তু যে কোন কারণে উনি সেই পথ ছেড়ে সন্ন্যাস নিয়ে আত্মদর্শনের আকাঙ্ক্ষায় গভীর সাধনায় অনেকগুলি বছর অতিবাহিত করেন! এখন এইরকম একটা সংকটময় পরিস্থিতিতে ওনার মধ্যে সেই বিপ্লবী সতর্কতা জেগে উঠল_উনি চ্যালেন্জটা accept করলেন! তিনি “Poverty Relief Society”_ নামে একটি ত্রাণ সমিতি তৈরি করে ফেললেন।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*** *আধাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– কেন মানুষের চিন্তা ও ইচ্ছা থামছে না ? এবং এর সমাধান কি ?
মীমাংসা :– যথাযথ বিচার করলে নেতারা বুঝবেন যে, স্থূল জগতের সাথে সূক্ষ্ম জগতের ওতপ্রােত সম্পর্ক আছে এবং জনসংখ্যা কমাতে গেলে সেটা সূক্ষ্ম জগতে করতে হবে। তখন তারা এও বুঝবেন যে, সৃষ্টির পেছনে আধ্যাত্মিক নিয়ম কাজ করছে এবং অধ্যাত্ম পথেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাদের জানতে হবে জগতে কারা আছে ও কেন তারা আছে ।
জিজ্ঞাসা :—ধরে নেওয়া যাক যে, আধ্যাত্মিক নীতি দ্বারাই তারা সমাধানের পথে এগােলেন। কিন্তু কিভাবে সেই নীতি তারা প্রয়ােগ করবেন ?
মীমাংসা :—তাদের এইভাবে ভাবতে হবে, আমাদের উদ্দেশ্য জনসংখ্যা কমানাে। শরীর কিন্তু ব্যক্তি নয়। শরীর হল ব্যক্তির প্রতিনিধি । শরীর নেবার আগেও ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব থাকে । সম্পূর্ণ নিজেদের প্রচেষ্টায় শরীরের জন্ম হয় না। ইচ্ছা থেকে ক্ষেত্র তৈরী হয় এবং বাবা ও মা’র সাহায্যে শরীর গঠন হয় ও জন্ম হয়।
এই সমস্ত সূক্ষ্ম ব্যক্তিত্ব যে চিন্তা করছে, সেই চিন্তা শরীর গ্রহণের মূল কারণ । তাদের আগের ভাবনা ও ইচ্ছার পরিণতি তাদের স্থূল শরীর ও জাগতিক অবস্থান। কালে এই শরীরের মৃত্যু হবে। তাতে ব্যক্তির স্কুল কর্ম বন্ধ হবে, কিন্তু তার চিন্তার গতি অব্যাহত থাকবে। চিন্তা থাকবে বলেই পুনর্বার জন্মগ্রহণ করার ইচ্ছাও থাকবে।
সূক্ষ্ম সত্তায় চিন্তা বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। সে প্রচেষ্টা আমাদের সামর্থ্যের বাইরে। সে চেষ্টা করে কোন লাভও নেই। আমাদের উদ্দেশ্য স্থূল জগতে জনসংখ্যা কমানাে, যারা চিন্তা এবং কর্ম, দুটোই করছে। কিন্তু সূক্ষশরীরে যারা চিন্তা করছে তাদের সংখ্যা কমানাের দরকার নেই, কারণ তারা কোন কাজ করতে পারে না। শরীর থাকুক বা না থাকুক, চিন্তা যেহেতু সবসময় থাকছে, আমাদের দেখতে হবে, সেই চিন্তার ধরণ কি পাল্টে দেওয়া যায় ? তার গুণগত রূপান্তর কি ঘটানাে যায়, যাতে সে আর শরীর নেবার জন্য ব্যস্ত হবে না।
মানুষ কেন ভাবে ? কি ভাবে সে? তার সমস্ত ভাবনার উৎস এবং উদ্দেশ্য কি ? –আনন্দ ও নিরাপত্তা। আনন্দ ও নিরাপত্তা সম্বন্ধে মানুষের ধারণা ঠিক হােক্ বা ভুল হােক, সে কিন্তু ঐ দুটোই চায়, সবক্ষেত্রে, সবসময়। তার কাণ্ডজ্ঞান আছে এবং শরীরের সাহায্যে সে তার অভীষ্ট পথে এগােনাের চেষ্টা করছে। মৃত্যুর সময়েও যদি তার আনন্দ ও নিরাপত্তা বােধ না আসে, তবে মৃত্যুর পরেও তার সেই চিন্তাই চলবে। এবং এই জন্যেই পুনরায় শরীর গ্রহণের ইচ্ছা জাগে। এইভাবে, পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আছে যারা বহুবার শরীর নিয়েছে এবং এখনাে অতৃপ্ত ।
এটা তারা চিন্তা করে বলে হয় না। তারা কি চিন্তা করে ? সেটাই বিবেচ্য। যখন তারা বনস্পতি বা পশু ছিল তখন প্রকৃতিগত ভাবেই তাদের গতি ছিল উর্ধ্বমুখী। কিন্তু মানুষের শরীর পেয়ে সে অর্জন করল এক ধরনের চিন্তা করার ক্ষমতা, যেটা অহংপ্রসূত। পূর্বের পশু-সংস্কার তাদের মধ্যে কাজ করে চলেছে, যার জন্য তাদের উর্ধ্বমুখী গতি আটকে যাচ্ছে। বহির্মুখী গতি তাদের বাধ্য করছে বার বার শরীর নিতে। বনস্পতি থেকে মানব শরীরে আসতে গেলে অজস্রবার জন্মাতে হয়—এটা স্বাভাবিক এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে যথার্থ। কিন্তু মনুষ্যশরীরে বারবার আসা-যাওয়া করা—এটা অস্বাভাবিক এবং আধ্যাত্মিক নীতিবিরােধী।
মনুষ্যেতর প্রাণীর মধ্যে স্বার্থ থাকে এবং সেটা তাকে সাহায্য করে মনুষ্যশরীর প্রাপ্ত হতে। কিন্তু মানুষের উদ্দেশ্য মহাজীবনের পথে পা দেওয়া এবং তার জন্য তাকে নিঃস্বার্থ হতে হবে। মানুষের কাণ্ডজ্ঞান, মন ও শরীরের বৈশিষ্ট্য এমনি যে, তার মধ্যে নিঃস্বার্থ মানবিকতার বিকাশ সম্ভব। সুতরাং মানুষের চিন্তাজগতে রূপান্তর ঘটাতে হবে। স্বার্থপর মানুষকে নিঃস্বার্থ মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যাতে মৃত্যুর আগেই জগতের প্রতি মােহ তাদের কেটে যায় এবং এই মােহ কাটাতে তারা যেন তাদের উত্তরসূরিদের অনুপ্রাণিত করে। কারণ সেই পথেই প্রকৃত নিরাপত্তা ও আনন্দের খোঁজ তারা পাবে। … [ক্রমশঃ]