গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের শিক্ষাগুরু স্বামী বাউলানন্দজীর পেরেন্টাপল্লীতে আগমন এবং সেখানে তাঁর কর্মযজ্ঞের কিছু কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিল। ঐ অঞ্চলটি হায়দ্রাবাদের নিজামের অধীনে ছিল।নিজাম স্টেটে কয়েকজন ইউরোপীয় চাকরি করতেন _যাঁরা মাঝে মাঝেই কর্মোপলক্ষে পেরেন্টাপল্লী আসা যাওয়া করতেন। তাঁরা যখন‌ই স্বামীজীর সংস্পর্শে আসেন_তখন‌ই তাঁরা বাউলানন্দজীর অলৌকিক ক্ষমতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হয়ে যান। তাঁরা এতটা impressed হয়েছিলেন যে স্বামীজির সম্বন্ধে ওঁরা সেই সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন। ইউরোপীয় শাসনাধীনে থাকা ভারতবর্ষে_এই ব্যাপারটা কিন্তু খুব তুচ্ছ ঘটনা ছিল না!
সেই সময় স্বামীজীর__ স্থানীয় উপজাতিদের দু্ঃখদুর্দশা দূর করার চেষ্টায় ব্রতী হ‌ওয়ার ব্যাপারটা শিক্ষিত মানুষেরা খুব একটা ভালো ভাবে নিতে পারে নি,তাদের ধারণা ছিল _সাধু-সন্ত মানেই হচ্ছে একাকী কোথাও থেকে একান্তে সাধনা করবে_লোকের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলবে! কিন্তু স্বামীজীর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তাদের উন্নতি করার কাজে আত্মনিয়োগের ব্যাপারটা _সাধুসূলভ আচরণ নয়__এটাই ছিল তৎকালীন শিক্ষিতদের অভিযোগ।
স্বামীজী দৃঢ়কন্ঠে এইসব অভিযোগের উত্তর দিয়েছিলেন_”একজন সন্ন্যাসী যখন আপন স্বার্থ, পরিবার,ব্যক্তিগত বিষয়-সম্পত্তি এবং ভোগ-সুখের ইচ্ছা ত্যাগ করে__তখন থেকেই তিনি সার্বজনীন স্বার্থকে গ্রহণ করেন।সন্ন্যাসী হয়েছেন বলে তিনি কখনোই তাঁর চারপাশের জনগনের দুঃখ-দূর্দশা দেখেও চুপ করে বসে থাকতে পারেন না”! ‘মানব সেবাই মাধব সেবা’_ এই তত্ত্বের সার্থক রূপকার ছিলেন স্বামী বাউলানন্দজী!(ক্রমশঃ)
============= ============
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– যারা বার বার শরীর নিচ্ছেন (অভিজ্ঞরা), তাদের কি ভাবে পুনরায় শরীর নেওয়া থেকে বিরত করা যায় এবং যারা প্রথম শরীর নিয়েছেন (নবীনেরা) তাদেরও কিভাবে নতুন শরীর নেওয়ার বাসনা থেকে মুক্ত করা যায় ?
মীমাংসা :– জনস্ফীতির সমস্যা যে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে, তার সমাধান যে প্রয়ােজন এবং কী উপায়ে সেই সমাধান সম্ভব–এ ব্যাপারে উভয়কেই সঠিক শিক্ষা দেওয়া উচিত।
সমস্যাটার দুটো দিক আছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মনুষ্যেতর প্রাণীর সময় হলে মানবশরীর পাচ্ছে। বাকীরা এক বা একাধিকবার মানবশরীর পেয়েও তৃপ্ত হচ্ছে না ও বারবার শরীর নিচ্ছে অধরা তৃপ্তির অন্বেষণে। এই অবস্থার পুনরাবৃত্তি চলছে বলেই সমস্যাটা আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাধান কেন প্রয়ােজন ? প্রয়ােজন এই কারণে নয় যে, অন্ন, বস্ত্র, সংস্থানের অভাব দেখা দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এগুলো যোগানাে অসম্ভব হয়ে উঠবে। কারণটা আধ্যাত্মিক । কি উপায়ে সমাধান সম্ভব ? আধ্যাত্মিক উপায়ে। মানুষকে তার প্রথম শরীরেই পূর্ণ তৃপ্তি পেতে হবে। মানুষের শরীরে প্রথম থেকেই এই সম্ভাবনা বিদ্যমান। অভিজ্ঞরা বারবার শরীর নেন বলেই, তাদের জাগতিক অভিজ্ঞতা বাড়ে। কিভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে হবে, সম্পদ সংগ্রহ করতে হবে, উৎপাদন ক্ষমতা তৈরী করতে হবে, সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে— এসব ক্ষেত্রে তাদের সহজাত দক্ষতা এসে যায়। যেহেতু তারা অতৃপ্ত, তাই তাদের বস্তুর প্রতি লােভ যেতে চায় না। অতি সঞ্চয় করতে করতে অতি-লােভী হয়ে ওঠেন তারা ৷ জগৎ সম্বন্ধে নবীনদের কোন অভিজ্ঞতা নেই, নিজেদের ন্যূনতম প্রয়ােজনগুলির জন্যেও তাদের নির্ভর করতে হয় অভিজ্ঞদের উপর। পরিণামে এরা কোনমতে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করেন, প্রগতির সুযােগ পান না। অভিজ্ঞরা যে প্রগতির সুযােগ পান, সেটা তারা কাজে লাগান। অমানবিক বা স্বার্থপর কাজে। এই বহির্মুখী স্বার্থকেন্দ্রিক প্রগতিকেই উন্নতি মনে করতে শেখেন নবীনেরাও এবং পরবর্তী কালে অগ্রজদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন।
বনস্পতি বা প্রাণী অবস্থায় যে গতি স্বাভাবিকভাবেই উর্ধ্বমুখী ছিল, মানুষ অবস্থায় সেই গতি হয়ে যাচ্ছে বহির্মুখী। মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা ক্রমশই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে ৷ স্থুল পরিসংখ্যানের সাহায্যে মানুষকে ভয় দেখালে হবে না, সমস্যাটার তাৎপর্য বুঝিয়ে সাধারণকে আধ্যাত্মিকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে যাতে পুরো পৃথিবীতে এক সময়ে সমস্ত মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন হয়। নেতা বা সমাজ-বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনায় অনেক ত্রুটি আছে।
এ প্রসঙ্গে আমরা আগেও উল্লেখ করেছি যে, নেতারা তাদের এলাকায় জনস্ফীতি রোধে ব্রতী হয়েছেন বহুবার । কিন্তু তার ফলে কোন একটি বিশেষ স্থানে
জনসংখ্যা কমছে এবং ফলস্বরূপ একটি জাতিই হয়তো লুপ্ত হতে বসেছে । এভাবে পৃথিবীর জনসংখ্যা কমানো যাবে না ৷ পৃথিবীর সব মানুষ যদি একই সাথে এই নীতি গ্রহণ করে; তবে হতে পারে, কিন্তু ব্যবহারিকে সেটাও সম্ভব নয়।
তর্কের খাতিরে যদি সেটা সম্ভব বলে ধরেও নিই, তবুও তার দ্বারা যথার্থ সমাধান হবে না, বরং সমস্যাটা আরও জটিল হবে। কৃত্রিমভাবে জন নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে স্থূল শরীর গ্রহণ নাহয় আটকানাে গেল, কিন্তু যারা সূক্ষ্ম বাসনা নিয়ে অপেক্ষা করছে, তাদের সংখ্যা তো কমানো যাবে না। এভাবে হলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হবে, স্থূল শরীর কমে যাবে সংখ্যায়, কিন্তু সূক্ষ্ম অশরীরী বাসনার সংখ্যাও চাহিদা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাবে। মনুষ্যেতর প্রাণী থেকে যারা প্রথমবার মানুষের শরীর পাওয়ার যােগ্য, তাদের সে সুযােগ দিতেই হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে কিছু অভিজ্ঞদের উপস্থিতি প্রয়ােজন, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য ।
সারা পৃথিবীতে জন-নিয়ন্ত্রণের এই কৃত্রিম নীতি শেষ পর্যন্ত মানবপ্রজাতির অবলুপ্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। সেটা সম্ভবও নয়, বাঞ্ছনীয়ও নয়। কারণ সৃষ্টি ও প্রকৃতি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন নয়। বিবর্তনের ধারা বজায় রাথতে মানবশরীর অপরিহার্য ও অনিবার্য কারণ, সেই শরীরেই পূর্ণতার সম্ভাবনা বিদ্যমান। জীবনের উদ্দেশ্যই ঈশ্বরপ্রাপ্তি এবং মানুষকে বাদ দিলে সৃষ্টিই অকারণ হয়ে ওঠে।
এত প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও সমস্যার সমাধান প্রয়োজন, নাহলে সৃষ্টির যাত্রাপথ ব্যাহত হবে। মূল উদ্দেশ্যের তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে, সেগুলি হল– ১) ঈশ্বরতত্ত্বর বােধ, অপরােক্ষ সাক্ষাৎকার এবং আদি কারণে লয় হয়ে যাওয়া । ২) মনুষ্যেতর প্রাণী যাতে সুষ্ঠভাবে মানবশরীর ধারণ করতে পারে এবং ৩) বাসনা শরীর যেন স্থূল শরীর পায়। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্তগুলি কিছুটা পূরণ হচ্ছে। কিন্তু প্রথম শর্তটা সম্পূর্ণ অবহেলিত থাকছে। প্রথম শর্ত পূরণের উপর কিন্তু বাকী দুটো নির্ভর করছে, এই দিক থেকে সমস্যাকে বিচার করতে হবে এটাকে একটা জাগতিক জনসংখ্যার সমস্যা না ভেবে, প্রাকৃতিক ভারসাম্যের সমস্যা হিসাবে দেখা উচিত।
সামগ্রিকভাবে সমস্যাটা আধ্যাত্মিক এবং সমাধানের রাস্তাটাও সেই পথে খুঁজতে হবে । আগেও বলেছি, চিন্তা করার প্রবণতা নিয়ে কোন সমস্যা নেই, চিন্তার বিষয় ও চরিত্র নিয়েই সমস্যা। চিন্তায় স্বার্থপরতা আছে বলেই বারংবার শরীর নেবার প্রবণতা আছে। স্বার্থপরতা মানুষকে বস্তু ও শরীরের প্রতি মােহগ্রস্ত করে আর তাই তাদের অতৃপ্তি দূর হয় না। মানুষের চিন্তার রাজ্যে পরিবর্তন ও রূপান্তর প্রয়ােজন যাতে তার পুনরায় শরীর গ্রহণের বাসনা না জাগে। মনে রাখতে হবে যে মানুষের স্বার্থপরতা তার পূর্ব পাশবিক প্রকৃতিরই পরিণাম। সেই পাশবিক প্রকৃতিকে মানবিক প্রকৃতিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে । এই রূপান্তর সম্ভব যদি মানুষের কাণ্ডজ্ঞান জাগ্রত হয় এবং উন্নত ব্যক্তিদের সাথে সংযােগ, সঙ্গ ও শক্তির আদান-প্রদান ঘটে ।
যারা নবীন, তারা যেহেতু পূর্বজন্মে পশুশরীরে ছিল তাই মানবশরীরে প্রাথমিকভাবে তাদের মধ্যে স্বার্থপরতা থাকা স্বাভাবিক। কিছুটা সময়ের জন্য থাকলেও কিন্তু পুরাে এক জন্মের জন্য নয়। প্রথম মানুষ শরীরেই তার নিঃস্বার্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু বিনা সাহায্যে সেটা হবার নয়। তাই তাদের অনুপ্রাণিত করা দরকার। প্রথমাবস্থায় তাদের বেঁচে থাকার জন্য যে নূন্যতম প্রয়ােজনগুলি – যেমন আহার, বস্ত্র ও সংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। উৎপাদন ক্ষমতা যেন তৈরী হয় তার, জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সে যেন আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠে। এইভাবে কিছুদিন ভােগ করতে পারলে তার জগৎতৃষ্ণা মিটবে, তখন নতুন শরীর নেওয়ার বাসনা তার আর থাকবে না।
নবীনদের মধ্যে এই শুভ রূপান্তর ঘটাতে গেলে অভিজ্ঞদের স্বার্থপরতা দূর করতে হবে । পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে বলেই জাগতিক জ্ঞান তাদের অনেক বেশি। সমস্ত সুযােগ-সুবিধা তারা ভােগ করে বলেই নবীনেরা বঞ্চিত থেকে যায় । এইজন্য বেশিরভাগ লােকের মধ্যে একটা ধারণা তৈরী হয়েছে যে, মুক্তি পেতে গেলে বহুবার মানবশরীর ধারণ করতে হবে, জন্মমৃত্যুর চক্রকে তারা অনন্ত অনিবার্য মনে করে। এই ধারণা ভুল এবং এর সংশােধন প্রয়ােজন, কারণ, একমাত্র মনুষ্যেতর চেতনায় পুনঃপুনঃ শরীর নেওয়ার প্রয়ােজন আছে, যাতে সে মনুষ্য চেতনায় প্রবেশ করতে পারে। একবার মানবশরীর প্রাপ্ত হলে এই পুনরাবৃত্তি আবশ্যিক নয়। মানুষ শরীরের একটাই উদ্দেশ্য এবং সেজন্য তার শরীর প্রথম থেকেই উপযুক্ত। মানুষের যা উদ্দেশ্য, জীবনেরও সেখানেই গন্তব্য, সৃষ্টির ও সেখানেই সার্থকতা।
যারা একাধিকবার শরীর গ্রহণ করেও জগতে অবস্থান করছেন, প্রথমেই সেই অভিজ্ঞতাকে তাদের কাজে লাগানাে উচিত নিজেদের নিঃস্বার্থ করার জন্য। তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার ফসল হােক মানবতা। তাদের সাথে সংযোগ ও সম্পর্ক হলে নবীনরাও স্বার্থের গণ্ডিকে অতিক্রম করার উৎসাহ ও প্রেরণা পাবে । এইভাবে উভয়েরই স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, আর এরফলে মনুষ্যেতর সংস্কারগুলির মানবশরীরে আসার পথ প্রশস্ত হবে এবং সূক্ষ্ম-বাসনা-শরীরের সংখ্যা কমবে। স্থূল অর্থে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যে কোন বিকৃতি হবে না। একমাত্র এইভাবেই সার্বিক ভাবে জনসংখ্যা সংক্রান্ত সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব।
জিজ্ঞাসা :— আমরা এ প্রসঙ্গে আরও জানতে আগ্রহী ?
মীমাংসা :– অভিজ্ঞরা যখন জানতে পারবেন যে, পূর্ণ তৃপ্তি পেতে গেলে একাধিকবার জন্ম নেওয়ার প্রয়ােজন নেই, এক শরীরেই বাসনা মুক্তি হওয়া সম্ভব, তখন জীবন সম্বন্ধে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী ও ধারণা আমূল পাল্টে যাবে। তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের স্বার্থপর প্রবণতাগুলি নিঃস্বার্থপরতার দিকে মােড় নেবে। লােভ ও অধিকারবােধ কমে গেলেই বণ্টনে সমতা আসবে। তার যাবতীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নবীনদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে। এই নবীনরা তখন কিছুদিন ভােগ করবে কিন্তু উদারচেতা অভিজ্ঞদের সংস্পর্শে এসে তাদেরওখুব দ্রুত ভােগস্পৃহা হ্রাস পাবে। প্রথম শরীরেই তখন স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত হবার সম্ভাবনা প্রবলহবে। পুনরায় জগতে মানুষের শরীর নিয়ে আসার বাসনা আর কাজ করবে না। … [ক্রমশঃ]