স্বামী বাউলানন্দ তাঁর শিষ্যদের কাছে এবং তাঁর কাছে আসা মানুষজনের কাছে ধীরে ধীরে প্রকৃত মহাত্মা–মহাপুরুষ হিসাবে প্রকাশিত হোতে শুরু করলেন! তিনি অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদেরকেও নিজ শক্তিবলে শুধরে দিতেন, তাঁর দয়ালু হৃদয়ে পাপী-তাপী সবার জন্য স্থান ছিল।
স্বামী বাউলানন্দজী সবসময় তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ এবং পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান সম্বলিত কথাই বলতেন। ফলে যে কেউ তাঁর মুখ থেকে কথা শুনতো_সেই স্বামীজীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেতো। তাঁর হৃদয়ের প্রসারতা, তাঁর অতলস্পর্শী সহানুভূতি, সকলকে নিজের মতো করে গ্রহণ করার তাঁর সীমাহীন প্রেম _এইগুলো দেখে তাঁর অতি বড় সমালোচক‌ও তাঁর ভক্ত হয়ে যেতো।(ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :–আপনি কি ইঙ্গিত করতে চাইছেন যে, পূর্বজন্মে একবার দীক্ষা হয়ে গেলে বর্তমান জন্মে আবার দীক্ষা নেবার প্রয়ােজন নেই ।
মীমাংসা :– হ্যাঁ, অবশ্যই। দীক্ষা একবারই হতে পারে, আধ্যাত্মিক প্রগতি সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তার প্রভাব থাকার কথা। দীক্ষার পর এক ব্যক্তি যতবারই জন্ম ও মৃত্যুর চক্রের মধ্যে দিয়ে যাক্, তাতে এই নিয়ম পাল্টায় না।
অপরপক্ষে, ধরে নাও এই জন্মে তােমার দীক্ষা হােল । নিত্যস্থিতি বােধ হওয়ার আগেই বর্তমান শরীরের হয়ত মৃত্যু হল । তাহলে আর একটি শরীর নিয়ে তােমাকে পুনর্বার জন্ম নিতে হবে। নতুন শরীরে আবার দীক্ষা নিলে, তখনও যদি অমৃতের বােধ না হয়, আবার জন্ম, আবার দীক্ষা। অর্থাৎ যতবার শরীর নেবে ততবার দীক্ষা হবে। এটা কিন্তু সম্পূর্ণভাবে গুরুপরম্পরার বিরােধী।
অতএব পূর্বজন্মে দীক্ষা হয়ে থাকলে, এই জন্মে পুনর্বার দীক্ষা নেওয়ার প্রয়ােজন নেই। কারণ তােমার দীক্ষাগুরু তােমার আধ্যাত্মিক উন্নতির সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছেন। তােমাকে আগেই বলেছি যে, তােমার একমাত্র কাজ হল সেই গুরুকে অন্তরে চিনে নেওয়া। অবশ্য আচার্যদের কাছ থেকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও নির্দেশ পাওয়ার প্রয়ােজন তােমার এই জন্মেও থাকতে পারে । পূর্ণতাপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এই নির্দেশ ও শিক্ষার প্রয়ােজন হতেও পারে, নাও হতে পারে। এটা নির্ভর করে স্থান-কাল-পাত্রের উপরে।
জিজ্ঞাসা :–দীক্ষার সময়ে সাধারণতঃ বীজমন্ত্রের সাথে কিছু বিশেষ সাধনপ্রণালী দেওয়া হয় যেগুলো রােজ অভ্যাস করা প্রয়ােজন। এই বিশেষ নির্দেশের ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট আস্থা আছে। প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে তার গুরুর কাছ থেকেই এই মন্ত্র ও নির্দেশ পান। এই অবস্থায় আমাদের কি করা উচিত ?
মীমাংসা :—ঠিকই বলেছ। স্বভাব অনুযায়ী কিছু বিশেষ সাধন প্রণালী দেওয়া হয়, যেগুলাে নিত্য অভ্যাস করা প্রয়ােজন এবং সেগুলাের প্রতি তােমার আস্থা ও বিশ্বাস যথার্থ। তবে ব্যক্তিগতভাবে গুরুর কাছে বর্তমান শরীরে দীক্ষা নেওয়া সম্বন্ধে তােমার যে ধারণা সেটা সঠিক নয় । কারণ অতীতে দীক্ষা নেওয়ার সাথে সাথে গুরুর কাছে বিশেষ সাধনপ্রণালীর নির্দেশও তােমার পাওয়া হয়ে গেছে। সেই নির্দেশ তােমার স্মৃতিপটে আছে ঠিক যেমন গুরুর শক্তি তােমার মধ্যে প্রেরণা হয়ে কাজ করে চলেছে। সেই স্মৃতি সুপ্ত থাকলে ঠিক সময়ে তা জাগ্রত হবে এবং তখন তােমার অন্তরে আনন্দের স্ফুরণ হবে । কোন দৃশ্য বা কোন শব্দ, কোন লেখা বা কোন ভাবনা এই স্মৃতিগুলােকে জাগিয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে সেগুলাের সাথে যদি দীক্ষাগুরু ও তাঁর বিশেষ নির্দেশের কোন যােগসূত্র থাকে । তখনই তােমার নিত্য অভ্যাস পুনরায় শুরু করতে পারাে, দেখবে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই অনুশীলনে মগ্ন হয়ে যাবে। অন্য কোন সাধনপন্থা তােমাকে সেই আনন্দ দেবে না, করতে গিয়ে দেখবে যেন তােমার জন্য নির্ধারিত প্রকৃত সাধন-অভ্যাস তােমার অবচেতন থেকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। অতএব তােমার কাজ হল নিজের সুপ্ত স্মৃতিকে জাগিয়ে গুরু-নির্দেশটুকু সনাক্ত করা ও সেই অনুযায়ী সাধনা করে যাওয়া।
প্রতি জন্মেই নতুন করে দীক্ষা নেওয়া দরকার, এই মতে তুমি বিশ্বাসী হয়ে তুমি যদি আবার নতুন সাধনপ্রণালী নাও এবং সেই পদ্ধতি যদি আগের থেকে ভিন্ন হয় তবে অভ্যাস করতে গিয়ে তােমার মধ্যে অবসাদ আসবে। এতে তােমার স্বাভাবিক প্রগতি ব্যাহত হবে, মৃত্যুর পর আবার জন্ম নিতে হবে, তখন আবার নতুন করে দীক্ষা নিতে হবে, তখন আবার নতুন দীক্ষা ও নতুন সাধন-নির্দেশ। আর তার সাথে তােমাকে প্রতিবার নতুন কোন গুরুর কাছে আশ্রয় নিতে হবে । শরীরে পরিবর্তন হয়, কিন্তু সত্তায় তাে তুমি সেই একই আছাে। এইভাবে প্রতিবার গুরু ও মন্ত্র পাল্টানাে কি অধর্ম নয় ?
জিজ্ঞাসা :–এই আলােচনা থেকে বােঝা গেল যে, যারা দীক্ষিত তাদের মধ্যে গুরুপ্রদত্ত শক্তি কাজ করছে এবং অন্যের সাহায্য ছাড়াই তারা নিজেদের ভুল-ত্রুটি বুঝতে পারে । গুরু দেন ও শিষ্য গ্রহণ করে। বীজমন্ত্রের সাথে সাধনকৌশলও গুরু দেখিয়ে দেন। একজন ব্যক্তির একবারই দীক্ষা হতে পারে। তার সাধনাও স্বতন্ত্র ও নিজস্ব । আধ্যাত্মিক উন্নতির ক্ষেত্রে শিষ্যের চেয়েও গুরুর দায়িত্ব বেশি। গুরুই তার শিষ্যকে খুঁজে নেন। গুরুকে খোঁজার প্রয়ােজন নেই শিষ্যের, তাকে শুধু চিনে নিতে হয় গুরুকে। চেনার উপায় হল আগ্রহ সহকারে সৎসঙ্গ ও সাধুসঙ্গ করা, অধ্যয়ন এবং নিজের অন্তর্জগতে দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ্য রাখা, কার নাম বা রূপ বা বাণী তাকে উদ্দীপ্ত করে । এই বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা আমাদের হােল ।
কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন মানুষও আছে, যারা নিজেরা নিজেদের ভুল-ত্রুটি বুঝতে পারে না, অপরে দেখিয়ে দিলে তখন বােঝে। আপনার মতে তারা পূর্বে দীক্ষিত নয় তবে আধ্যাত্মিক শিক্ষা তারা অল্প-বিস্তর পেয়েছে। দীক্ষার ব্যাপারে তাদেরও আগ্রহ আছে। এক্ষেত্রে তাদের কি করা উচিত ?
মীমাংসা :– তারা নিশ্চয়ই প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে তােমাদের সংযােগ বা সান্নিধ্যে আসছে এবং সেটা চলতে থাকলে অচিরেই তারা দীক্ষার অধিকারী হয়ে উঠবে।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ তার গুরু বর্তমানে শরীরেই আছেন ?
মীমাংসা :—অবশ্যই আছেন। আগেই বলা হয়েছে যে, পৃথিবী কখনােই গুরুশূন্য হয় না। তিনি ছিলেন, আছেন ও থাকবেন প্রলয়কাল পর্যন্ত। অপরে ধরিয়ে না দিলে যারা নিজেদের ভুল-ত্রুটি বুঝতে পারে না, তাদের এমন লােকেদের.সাথে যােগাযােগ থাকবে যারা শুভাকাক্ষী হয়ে শুধরে দেবার চেষ্টাটুকু করে যাবে। এইভাবে ধীরে ধীরে আগ্রহ তৈরী হবে এবং পরে এরা আরও সতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আধ্যাত্মিক শিক্ষার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠবে ।
জিজ্ঞাসা :—আধ্যাত্মিক শিক্ষা ছাড়া কি দীক্ষা পাওয়া যায় না ?
মীমাংসা :– পাওয়া যায়, আগ্রহ যদি অান্তরিক হয়। তবে সংযােগ ও সান্নিধ্যের গুণে এই আগ্রহ গড়ে ওঠে, তখন আর হঠকারিতার আশংকা থাকে না।
জিজ্ঞাসা :– অর্থাৎ এর থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, নির্দিষ্ট কিছু সময়ে নির্জনবাস ও আত্মসমীক্ষার প্রয়ােজন নেই নিজের মধ্যে মানবিক ও আধ্যাত্মিক বৃত্তিগুলাে জাগিয়ে তােলার জন্য। আমাদের এই ধারণা কি সঠিক ?
মীমাংসা :– না, ভুল। দীক্ষার উদ্দেশ্য হােল.তােমার মধ্যে এক প্রক্রিয়া শুরু করে দেওয়া, যার পরিণতিতে আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অবশ্যম্ভাবী। দীক্ষার দ্বারা তুমি উদ্দীপ্ত হবে, যাতে তােমার দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা, আচরণ ও অভ্যাস অধ্যাত্মমুখী হয়ে ওঠে। নির্জনবাস ও আত্মসমীক্ষা এই দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা, আচরণ ও অভ্যাসেরই
একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
জিজ্ঞাসা :– আচার ও নিয়মপালনের মাধ্যমে কি নিজের শক্তিকে উর্ধ্বমুখী করা সম্ভব ?
মীমাংসা :– না, ওভাবে হয় না। আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে শক্তিটুকু আসে তাতে ভাঙ্গন ও ধ্বংসের কাজ হতে পারে, সাফল্য ও ক্ষমতা আসতে পারে, যার দ্বারা তােমার গতি হবে বর্হিমুখী। যে সমস্ত অসুর ও রাক্ষসদের স্বার্থপরতার বিবরণ শাস্ত্রে পাওয়া যায়, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন আচারসিদ্ধ।
জিজ্ঞাসা :—শক্তির গুণগত রূপান্তর হওয়ার পর কেউ যদি আচার পালন করে, তাতে কি উর্ধ্বমুখী প্রগতি সম্ভব ?
মীমাংসা :—গুণগত রূপান্তর হওয়ার পর, সাধারণতঃ আচার-বিচার-এর প্রতি প্রবণতা থাকে না। কোন কোন ব্যক্তি হয়তাে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দু-একটা নিয়ম পালন করেন স্থান-কাল-পাত্রের মর্যাদা রাখতে। কিন্তু এই সমস্ত নিয়ম ও আচারের জন্য নানা রকম বিরােধ ও দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। আচারে যার বিশ্বাস নেই, তার পক্ষে ঐ অভ্যাস করে যাওয়া কষ্টকর। কারণ স্বার্থপর মানসিকতা না থাকলে যথার্থ আচারী হওয়া যায় না। উদার মানুষ নিজেকে কিছুতেই স্বার্থের গণ্ডিতে বাধাতে পারে না।
জিজ্ঞাসা :– তারা যদি তবু আচারপালন করে যায় তবে তারা কিভাবে প্রভাবিত হবে ?
মীমাংসা :– তাদের উর্ধ্বগতি স্তব্ধ হয়ে যাবে । .চিন্তার জটিলতা ও বিভ্রান্তি বাড়বে। জীবন, জগৎ সম্পর্কে ও ঈশ্বর সম্বন্ধে তাদের ধারণা অস্বচ্ছ হয়ে যাবে ।
জিজ্ঞাসা :– এই প্রভাবের পরিণতি কি হতে পারে ?
মীমাংসা – উর্ধ্বগতি বন্ধ হয়ে গেলে একটা গােটা জীবন নষ্ট হয়ে যায় । শক্তির গুণগত রূপান্তর যার হয়ে গেছে, তার পক্ষে আচার পালন করা প্রগতি-বিরােধী এবং অধঃপতনের কারণ হয়ে উঠতে পারে। স্থান-কাল-পাত্রের কারণে অনেকে বাধ্য হয় কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারে না। নিজের এই সম্ভাবনাকে নষ্ট করা আরও বড় ক্ষতি।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে শাস্ত্রে এত আচার ও নিয়ম-পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেন ?
মীমাংসা :— উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও স্বার্থপর কিছু লােক নিজেদের সুবিধের জন্য এসব কথা বলে গেছে।
জিজ্ঞাসা :– পশুবলি, নরবলির মত আচার কি ধর্মে স্বীকৃত ?
মীমাংসা :– না। শুধু জীববলি নয়, ধর্ম-অনুশীলনের সাথে জড়িত কোন আচার বা অনুষ্ঠানই আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে স্বীকৃত নয় । যে সমস্ত অনুভূতি বা কার্য ; যা মানবিকতাবিরােধী, তা মহাজনদের দ্বারা স্বীকৃত নয়। এই সমস্ত ক্রিয়াকলাপের একটাই হেতু ও পরিণাম, তা হল স্বার্থপরতা। … [ক্রমশঃ]