স্বামী বাউলানন্দজী সম্বন্ধে আপ্পা বেঙ্কট রাও অনেক কিছু লিখেছেন_আমরা সেখান থেকেই কিছু কথা আপনাদের সামনে পরিবেশন করা হচ্ছিল। বেঙ্কটজী বাউলানন্দজী সম্বন্ধে এবং তাঁর কর্মময় জীবন সম্বন্ধে পুরো একটা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। আমরা চেষ্টা করবো_সেখান থেকে নানা কথা তুলে আনার! তাহলে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই অসাধারণ মহাপুরুষটি সম্পর্কে আপনারা অনেকটাই জানতে পারবেন।। স্বামী বাউলানন্দজী সম্বন্ধে তো আমাদের জানা দরকার-ই! কারণ_এই সেই মহাপুরুষ _যাঁকে স্বয়ং ভগবান পরমানন্দ তাঁর নিজের গুরু হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে গিয়েছেন! যাঁর শ্রীচরণে তিনি পানীয় জল ঠেকিয়ে “গুরু পাদোদকং” বলে পান করেছিলেন !(ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– শ্রেষ্ঠ মনীষীদের মতে ঈশ্বর এবং ঈশ্বর-সাক্ষাৎকার সম্বন্ধে মত ও পথের যে ভিন্নতা, সেটা মানবজাতির প্রগতির সহায়ক । কিন্তু এই আলােচনায় মত এবং পথের ঐক্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অন্যান্যরা তাদের ধারণাকে পুষ্ট করার জন্য অনেক উদাহরণও দিয়েছেন, তার মধ্যে একটা তাে অত্যন্ত জোরালাে। বহু নদীর বিভিন্ন উৎসস্থল, তাদের আলাদা দিশা, আলাদা গতিপথ, কিন্তু সবাই গিয়ে মিশছে সেই একই সাগরে। অর্থাৎ শুরুটা যেখান থেকেই হােক, চলার পথটা যাই হােক, একই ঠিকানায় সবাই পৌঁছে যাবে। ঈশ্বর সম্বন্ধে মানুষের মনে, পরস্পর বিরোধী ধারণা থাকতে পারে, পূর্ণতাসাধনের জন্য আলাদা আলাদা প্রক্রিয়া হতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকেই শেষে সেই ঈশ্বর-তত্ত্বেই লয় হবে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্য তাহলে খারাপ নয়। সব ব্যাপারে সবাই একমত হলে সভ্যতায় আর উর্বরতা থাকত না। এই বিষয়টি নিয়ে একটু বিস্তারিতভাবে আলােচনা করতে হবে।
মীমাংসা :– হ্যাঁ, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের তত্ত্ব সম্বন্ধে আমরা সকলেই অবহিত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক। এখন এটা ধর্ম প্রচারের হাতিয়ার। মূল ধর্ম-ভাবনা থেকে সরে গিয়ে যখন নানা ধর্মমত এসে গেল জগতে, তখন থেকে এই তত্ত্বটি ব্যবহার করা হয়েছে আপােসের স্বার্থে। সাম্প্রদায়িক গােষ্ঠী ও দলগত অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে। এটা এখন মুখে বলা হয়, এর সাথে মানবতার অগ্রগতি বা পূর্ণতাসাধনের কোন সম্পর্ক নেই। এই ধারণার পরিণতি তুমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছাে তােমার চারপাশে। বিশৃঙ্খলা এবং গ্লানিতে ভরে গেছে জগৎ ! বিভিন্ন মতাবলম্বী গােষ্ঠীগুলাের মধ্যেও আবার ছােট ছােট দল তৈরী হয়েছে, যারা এই তত্ত্বকে ব্যবহার করে নিজেদের উদারপন্থী বলছে। সুতরাং বিভ্রান্তি আরও বেড়ে গেছে।
জিজ্ঞাসা :– প্রতিটি ধর্মেই দেখা যায় কিছু মানুষ আছেন, যারা বলেন, ‘সব ধর্মেই কিছু সত্য আছে, যা শাশ্বত ও সার্বিক । বাহ্যিক ভিন্নতা থাকলেও, মূল তত্ত্বে কোন বিরােধ নেই’। তাদের এই বিচার কি সঠিক?
মীমাংসা :– হ্যাঁ, সঠিক।
জিজ্ঞাসা :– সেক্ষেত্রে, আমাদের ধারণা যে– প্রতিটি ধর্মমতের যে মন্দ দিকটা, সেটাকেই আগে বর্জন করতে হবে। ধর্মের কল্যাণকর দিকটাকে লালন করতে হবে, তবেই ধর্মজীবনে আর গ্লানি থাকবে না। সম্ভবতঃ একেই বলে সংস্থাপন। এই রকম চিন্তাধারা নিয়ে যদি কাজ করা যায়, তবে সাফল্য আসবেই। আপনার কি মনে হয় ?
মীমাংসা :– আলােচনার এই পর্বে এসে তােমার মধ্যে সঠিক ও সর্বজনগ্রাহ্য বিচার ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা আসা উচিৎ, সেটা এখনও আসেনি দেখছি। বিষয়টিকে পুনরায় বিশ্লেষণ করাে। অনেকের মতে ধর্মের দুটো দিক আছে, ভাল দিক, যা মানুষের কল্যাণ করে এবং মন্দ দিক, যা মানুষের ক্ষতি করে। তাদের মতে এই ভাল দিকটা সব ধর্মেই এক এবং সেখানেই ধর্মের ঐক্য।
প্রতিটি ধর্মমতেই একদল লােক আছে যারা এই কথা বলে। তারা চায় তাদের নিজের নিজের ধর্মের ভাল দিকটাকে ধরে রাখতে ও প্রচার করতে। কিন্তু সংস্থাপনের কথা যখন বলছো, তখন এক-একটা ধর্মমতের যে সত্যের দিকটা, সেটাকে রেখে বাকিটাকে বর্জন করার কথা বলছে। অর্থাৎ সংস্কারের পর দেখা যাবে যে, অনেকগুলাে প্রকৃত ধর্ম আছে পৃথিবীতে। সংখ্যার বিচারে দেখবে যে, ঠিক যতগুলাে ভালােয়-মন্দে মেশানাে ধর্মমত ছিল জগতে, ঠিক ততগুলােই ভাল ধর্ম আছে। প্রত্যেকটা ধর্মমত নিজের স্বাতন্ত্র ঘােষণা করছে অথচ বলছে যে মূলে খুব ঐক্য আছে। কি করে সম্ভব ? অনেকগুলাে প্রকৃত ধর্মের অস্তিত্ব কি করে স্বীকার করা যায় ? মিথ্যার দিকটাকে সরিয়ে দিলে ধর্মের সত্যের দিকটাই তাে থাকার কথা। বহু সত্য বা একাধিক সত্য তো হতে পারে না। সত্য এক এবং শাশ্বত। অদ্বিতীয়। সত্যের সংজ্ঞা পাল্টায় না। সত্য এক ছিল, আছে এবং চিরকাল থাকবে।
প্রতিটি সাম্প্রদায়িক গােষ্ঠী যখনই নিজের স্বাতন্ত্র ঘােষণা করছে, তার মানে তখনই সে মতভেদ ও মতপার্থক্যের উপাদানগুলােকে জিইয়ে রাখতে চাইছে। ধর্মের যে মিথ্যা এবং মন্দের দিক সেটাই হচ্ছে তার রসদের উৎস। তাই মন্দ দিকটাকে সরিয়ে দিতে পারলে আর মত-পথের ভিন্নতা বা গােষ্ঠী-অস্তিত্বের প্রশ্নই ওঠে না। ভিন্নতার কারণ হােল মানুষের মনে ঈশ্বর, ঈশ্বর-সাক্ষাৎকার, মূল্যবােধ, জীবন ইত্যাদি সম্বন্ধে আলাদা আলাদা বিশ্বাস ও ধারণা রয়েছে। প্রতিটি ধর্মের নেতিবাচক দিকটা তৈরী হয়েছে এই ভিন্নতার কারণেই। এই নেতিবাচক দিকটাকে সংস্কার করতে গেলে আগে মানুষের মন থেকে এই আলাদা বিশ্বাস ও মতবাদকে মুছে ফেলে সেই এক সত্যের পথে নিয়ে আসতে হবে। এই আলােচনায় প্রথম থেকেই সেই চেষ্টাই করা হয়েছে। ধর্মের মিথ্যার দিকটাকেই সাম্প্রদায়িক ধর্মমত বলা হয়েছে । জীবনের উদ্দেশ্য হােল প্রকৃত ধর্মকে গ্রহণ করা এবং সত্যের পথে এগিয়ে যাওয়া। এই আলােচনায় একমাত্র তাকেই আধ্যাত্মিকতা বলা হয়েছে।
জিজ্ঞাসা :– তাহলে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য কি ছিল ?
মীমাংসা :– যতদিন না পর্যন্ত মানুষ মানবিকতা এবং পরবর্তীকালে আধ্যাত্মিকতায় উত্তীর্ণ হতে পারছে, ততদিন পর্যন্ত ঈশ্বর, আত্মজ্ঞান, মূল্যবোেধ, জীবন ইত্যাদি সম্বন্ধে আলাদা মত এবং দৃষ্টিভঙ্গী থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মনুষ্যত্বের বােধ একবার হলে, ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গী ও আচরণে আর বৈষম্য থাকার প্রশ্ন ওঠে না। কারণ ততদিনে, সূক্ষ্ম তত্ত্বে নিজের ভিতরে ও বাইরে যে ঐক্য সেটা বােধে বােধ হয়েছে এবং সেই বােধটাই তখন তার পক্ষে স্বাভাবিক, যে কোন ধরণের বৈষম্য তখন তার চোখে কৃত্রিম ও আরােপিত। তাই সাংস্কৃতিক ভিন্নতা ততদিনই স্বীকৃত, যতদিন না মানুষ চেতনায় প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠছে।
জিজ্ঞাসা :– নদী ও সাগরের উপমা প্রয়ােগ হিসাবে খুব সার্থক, কিন্তু আজকের এই আলােচনা ও মীমাংসার নিরিখে এই উপমাকে কি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব ?
মীমাংসা :– বহু নদী বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে সাগরে মিশছে, এই প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে চারটি মূল বৈশিষ্ট্য আছে। সেগুলাে হােল, উৎস, দিশা, স্রোত এবং মিলন। এর মধ্যে উৎস, দিশাপথ ও মিলনস্থল প্রতিটি নদীর ক্ষেত্রে আলাদা। একটা ব্যাপারেই সবার মিল, স্রোত। প্রত্যেকের স্রোত আছে। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই স্রোতই নদীকে নিয়ে যায় তার গন্তব্যে। বাকি তিনটে বৈশিষ্ট্য এই স্রোতের ওপর নির্ভরশীল, সে নিজে কিন্তু অন্য তিনটে নিয়মের ওপর নির্ভরশীল নয়। স্রোতের জন্যই নদীর চলা ও গতিপথ নির্ণয় হয়, ওটাই আধার আর তাই ওটাই মূল । স্রোত যদি না থাকে, বাকি তিনটে বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকলেও সাগরে পৌছানাে যাবে না। ধরে নাও, এই স্রোতই হচ্ছে মনুষ্যত্ব বা আধ্যাত্মিকতা বা নিঃস্বার্থতা। সুতরাং যতই সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ভিন্নতা থাকুক মনুষ্যত্বের জাগরণ না ঘটলে প্রগতি অসম্ভব। নিঃস্বার্থতাই হচ্ছে প্রকৃত মানব-সংস্কৃতি যা দেশ-কাল-পাত্র অতিক্রম করে সবাইকে এক সূত্রে গাঁথে। অতএব ঈশ্বরবােধ হতে গেলে বা সাগরে মিশতে গেলে আগে ঐ স্রোত দরকার, নাহলে বদ্ধ জলাশয়ের মত আটকে যাবে। এই স্রোত একবার এসে গেলে দেখবে ধীরে ধীরে মনের সংস্কারগুলাে ভেঙে যাচ্ছে। দৃষ্টিভঙ্গী, আচরণ ও মানসিকতা পাল্টে যাচ্ছে। যতদিন স্বার্থ আছে, সংকীর্ণতা আছে, ততদিনই এই ‘বৈচিত্র্যে ঐক্যের’ তত্ত্ব বলতে হয় মানুষকে। পরে আর এর প্রয়ােজন হয় না। স্বভাবদোষে মানুষ স্বার্থপর হয়। পশু শরীরের সংস্কারগুলােকে ভুলতে পারে না। পশুত্বকে দেবত্বে রূপান্তরিত করতে হবে। সেটাকেই বলা উচিত “সংস্কৃতি”। তার আগে মানুষ যা কিছু করে সব অভ্যাসে। পাশবিক অভ্যাস ! চেতনার উর্ধ্বমুখী যাত্রার পরিপন্থী এটা ! মত-পথের বৈচিত্র্য নিয়ে যে এত কথা বলছো, এগুলাে আসলে পাশবিক স্তরের কথা, মানব সভ্যতার কথা নয়। এছাড়াও নদী, নদীর স্রোত এবং সাগর, এগুলাে সব উপমার দিক দিয়ে অসম্পূর্ণ। কারণ প্রাকৃতিক ঘটনাগুলাে আঞ্চলিক, স্থান-কাল-পাত্রে সীমাবদ্ধ। ঈশ্বর কখনও উপমা বা তুলনায় ধরা দেন না। তিনি সর্বভূতের সত্তা-স্বরূপ, জগতের সবকিছু তাতেই ওতপ্রােত! একমাত্র মানব শরীরেই তাকে বােধেবােধ করা সম্ভব। সেই প্রচেষ্টাই সভ্যতার পথ। এটা সর্বকালে, সবার ক্ষেত্রেই সত্য।
জিজ্ঞাসা :– খাদ্যাভ্যাস বা পােষাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও কি একই ধরণের নিয়ম বা শৃঙ্খলা পালন করা উচিত।
মীমাংসা :– না, প্রয়ােজন নেই। ধারণা এবং বিশ্বাস নিয়ে বিরােধ যখন কেটে যাবে, তখন অন্তরে সাম্যতা আসবে। সেটা হলেই বাহ্যিক জগতেও বিভ্রান্তি ও সংঘাতের কারণ থাকবে না। সেটাই দরকার। পােষাক-পরিচ্ছদ বা খাদ্যাভ্যাসের রুচি ব্যক্তিগত হতে পারে, সেটা গৌণ।
জিজ্ঞাসা :– পৃথিবীর সমস্ত উপাসনা-স্থলগুলোতেও কি একই নিয়ম এবং রীতি চালু করা উচিত ?
মীমাংসা :– নিষ্প্রয়ােজন। সেটাও ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। … [ক্রমশঃ]