স্বামী বাউলানন্দজীর কাছে তাঁর পূর্বাশ্রমের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি কৌশলে তা এড়িয়ে যেতেন। একবার তাঁর এক অতি প্রিয় অধ্যাপিকা ভক্ত তাঁকে খুব করে চেপে ধরেছিলেন_’আপনি আপনার জীবনের গুহ্যাতিগুহ্য আধ্যাত্মিক রহস্যসমূহ আমাদের কাছে নিঃসংকোচে বলতে পারেন_আর আপনার মা-বাবার পরিচয় অথবা জন্মভূমির পরিচয় দিতে পারেন না কেন?” উত্তরে স্বামীজী বলেছিলেন_”আমার সাধন জীবনের কথা,বা আমার আধ্যাত্মিক উপলব্ধির কথা আমি অকপটে তোমাদের কাছে বলছি এইজন্য যে_ যাতে করে সেইসব কথা শুনে তোমাদের মধ্যেও আধ্যাত্মিক পথে চলার জন্য মনে একটা দৃঢ়তা তৈরি হয়।
অপরপক্ষে, আমার পারিবারিক জীবনের ইতিহাস শুনে যদি তোমাদের কারো কোন আধ্যাত্মিক কল্যান হোত বা অন্য কোন রকম উপকার হোত_তাহলে আমি তোমাদের কাছে তা নিশ্চয়ই বলতাম। কিন্তু আমি জানি_ সেগুলি আলোচনা করলে তোমাদের কোন মঙ্গল তো হবেই না বরং তোমাদের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা রয়েছে! দ্যাখো_ সাধারণ মানুষ সাধু-সন্তদের ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে _তারা কাম-কাঞ্চন ত্যাগী এবং জাতি-ধর্মমত-সামাজিক বন্ধনসমূহ ত্যাগ করেছে বলেই তো! আর একজন সাধুও সমস্ত জনগণকে ‘একাত্ম’ বলে ভাবে_সকলকে সর্বব্যাপী বাসুদেব হিসাবেই দেখে! এখন যদি আমি ঘোষণা করি __আমি বিশেষ কোন বর্ণের- জাতির বা ধর্মের, বিশেষ কোন অঞ্চলের বা বিশেষ ভাষাভাষীর মানুষ– তাহলে যারা ঐসব শ্রেনীভূক্ত নয় _ তারা নিরাশ হবে, দূরত্ব বজায় রেখে চলবে_আমাকে আত্মার আত্মীয় ভাবতে পারবে না!”(ক্রমশঃ)
~“~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
: *** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
মীমাংসা :– তুমি কি ছিলে, এ সম্বন্ধে বলতে গেলে বলতে হয়—তুমি এক সময় অমানবীয় অবস্থায় ছিলে। এটা তােমার বর্তমান অস্তিত্বের পূর্ব অবস্থা বা বলা যেতে পারে তারও পূর্ব অবস্থা! ঐ অবস্থায় তােমার অস্তিত্বে শুধুমাত্র সূক্ষ্ম এবং স্থূল অনুভূতি এবং ‘ব্যক্তি অহং’ নিয়ে গড়ে উঠে ছিল। এরপর যখন তুমি শরীরধারণ করলে, তখন তােমার মধ্যে ঐগুলি ছাড়াও সৃজনক্ষমতা, পুনঃসৃজনক্ষমতা এসে গেল। তাহলে শরীরধারণের আগে তােমার অস্তিত্বে ঐ অহংবােধ ও সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলি বর্তমান ছিল এবং শরীরধারণের পর তােমার অস্তিত্বে সৃজন এবং পুনঃসৃজনক্ষমতা এল_ আর তখন থেকে তুমি ব্যক্তিসত্তায় পরিণত হলে। তার আগে পর্যন্ত তোমার কোন ব্যক্তিসত্তা ছিল না অর্থাৎ ততক্ষণ পর্যন্ত তােমার কোনও সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠেনি, তার কারণ এর পূর্বে তুমি শরীরী ছিলে না। আসলে তখন পর্যন্ত তুমি একটা বৈশিষ্ট্যহীন সত্তা ছিলে । শরীরধারণকারী নয় এমন সত্তার সাথে তােমাকে আলাদা ভাবা অসম্ভব ছিল। তােমাকে আলাদা করে ভাবা তখনই সম্ভব হ’ল, যখন তুমি ব্যক্তিসত্তায় উপনীত হলে। সুতরাং ‘সূক্ষ্মসত্তা’ শব্দটা, শরীরধারণকারী নয় এমন কিছুকে বোঝায়, আর ‘ব্যক্তিসত্তা’ শব্দটা প্রযােজ্য হয় তখনই যখন কোন কিছু শরীরধারণ করল। শরীরধারণ করল অর্থাৎ তারা বিশ্বজনীনতা লাভ করল অর্থাৎ লতা-গুল্ম-উদ্ভিদরূপে বা মনুষ্যেতর প্রাণীরূপে বা মনুষ্যরূপে তাদের অস্তিত্ব প্রকাশিত হ’ল। তাহলে বুঝতে পারলে, কিভাবে মানবীয়সত্তা তার পূর্বরূপ অমানবীয় সত্তায় ছিল এবং তা আবার তার পূর্বরূপ শরীরবিহীন সূক্ষ্মসত্তায় ছিল। তাহলে বলা যেতে পারে যে, ‘ব্যক্তিসত্তা’ লাভের পূর্বে তুমি “বিশ্বজনীন সত্তায়” ( বিশ্বমন ও বিশ্বঅহং যুক্ত হয়ে ) ছিলে। সব ব্যক্তিসত্তার ক্ষেত্রেই ঐ একই অবস্থা হয় জানবে ।
এবার তুমি কি ছিলে এবং এখন তুমি কি আছ–এই দুই অবস্থার মধ্যে সীমারেখা টানতে গেলে বলতে হয় যে, মনুষ্যেতর অবস্থার পূর্বে অর্থাৎ ব্যক্তিসত্তালাভের পূর্ব পর্যন্ত তােমার কোন সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য ছিলনা। তােমার তখন শুধু একটা প্রবণতা ছিল প্রকৃত অবস্থায় পৌঁছানাের বা সম্প্রসারণতা লাভের । এর ফলে সৃজন এবং পুনঃসৃজনক্ষমতার সহায়ে তুমি উদ্ভিদরূপে পরিণত হলে এবং এর ফলে যে সামান্য সম্প্রসারণতা তােমার লাভ হ’ল, তাতেই নিজেকে সুখীৰােধ করতে আরম্ভ করলে। ক্রমশ তােমারমধ্যে ‘ব্যক্তিঅহং’-বােধ ক্রিয়াশীল হ’ল তুমি ‘ব্যক্তিসত্তা’য় পরিণত হলে।
তারপর তােমার ব্যক্তিঅহং তােমার অনুভূতিগুলিকে উন্নত করল এবং বারবার শরীরত্যাগ ও পুনরায় শরীরগ্রহণের আবর্তনের মধ্য দিয়ে তুমি অল্প পরিমাণ শক্তি লাভ করলে। এই শক্তিলাভের ফলে তােমার সূক্ষ্ম-অনুভূতিগুলির বিকাশলাভ হ’ল, এগুলি পরিপুষ্ট হ’ল এবং তুমি অমানবীয় নিম্নতর প্রাণীশরীর লাভ করলে ! ‘অহং’ এবং এর দ্বারা লব্ধ শক্তি, অগ্রগতির প্রবণতা, সৃজনক্ষমতা ও পুনঃসৃজনক্ষমতার পরিপুষ্টিই তােমাকে ঐ উদ্ভিদ অবস্থা থেকে এই অমানবীয় নিম্নতর প্রাণীসত্তায় উত্তরণ ঘটাল। এই অবস্থাতেও তুমি আর একটু বেশী সম্প্রসারণমুখী হওয়ায় নিজেকে সুখী এবং নিরাপদ ভাবলে। এরপর অসংখ্যবার শরীর ত্যাগ ও শরীর গ্রহণের আবর্তনের মাধ্যমে তােমার ‘অধিক শক্তি’ লাভ হ’ল এবং অনুভূতিগুলিও বিকাশলাভের জন্য যথেষ্ট পুষ্ট হ’ল এবং তুমি উন্নততর প্রাণীর শরীর লাভ করলে। এইভাবে তুমি আরও বেশী সম্প্রসারণমুখী–বিশ্বসত্তা অভিমুখী হলে এবং আগের মতােই নিজেকে সুখী ও নিরাপদ মনে করতে থাকলে।
তুমি কিন্তু সুখী বা নিরাপদ এখনও হ’লে না, তাই আবার জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে তােমার উচ্চতর শক্তিলাভ হ’ল। আর তােমার এই লব্ধশক্তিকে কাজে লাগানাের জন্য তােমার মধ্যে জাগ্রত হ’ল সাধারণ জ্ঞান । উচ্চতর শক্তিলাভ করার পর এবং এই জ্ঞানলাভ করার পর তােমার শরীরটির যখন মৃত্যু হ’ল, তখন সঙ্গে-সঙ্গেই তোমার আর নতুন শরীরধারণ করা হ’ল না। কারণ তুমি কিছুকাল অশরীরী অবস্থায় এই বিশ্ব বিরাটে অবস্থান করতে থাকলে, শুধু বিশ্বেই সীমাবদ্ধ থাকলে না। এই অশরীরী অবস্থায় যেহেতু তােমার মধ্যে সাধারণ জ্ঞান ছিল, তুমি তােমার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন ছিলে–তাই এটাই হ’ল তােমার পরবর্তী ‘প্রগতি’-র শর্ত, তবে তুমি, তােমার এই ‘প্রগতি’র পথে তােমার সুখ ও নিরাপত্তার ব্যাপারেও সচেতন ছিলে এবং তােমার আত্মোন্নতির ব্যাপারেও সচেতন ছিলে। কিন্তু এই অবস্থায় ‘প্রগতি কি’ অথবা ‘কিভাবে তা অর্জন করা যায়’–এ ব্যাপারে তুমি সচেতন ছিলে না।
যাইহােক, তোমার সাধারণ জ্ঞান ও আত্মােন্নতির প্রবণতা থাকার ফলে তুমি সূক্ষ্মশক্তির অধিকারী হলে অথবা বলা যায় সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বা সূক্ষ্মতম আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী হলে। তােমার অস্তিত্বের এই অবস্থায় তােমার অনুভূতি গুলির প্রভূত উন্নতি হ’ল। এইভাবে যে তুমি একদা উদ্ভিদসত্তা ছিলে তা থেকে পরবর্তীতে তুমি অমানবীয় সত্তায় পরিণত হলে এবং অবশেষে তুমি সূক্ষ্ম মানবসত্তায় রূপলাভ করলে। কিন্তু এখনও তুমি স্থূল মানবশরীর পাওনি। তুমি মানবীয় সূক্ষ্মসত্তা লাভের পর–তুমি অশরীরী হয়ে বিশ্ব-বিরাটে অবস্থান করছিলে, তারপর যখন তুমি তােমার প্রগতির শর্ত সম্বন্ধে সচেতন হলে বা তােমার আত্মােন্নতি সম্বন্ধেও সচেতন হলে এবং এসবকিছুর জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করলে, তখন তুমি স্থূল মানবশরীর লাভ করলে এবং এখন তুমি যেমন আছ—সেইরকম শরীরে পৃথিবীতে প্রকট হলে। একথা বলা যায় যে, এভাবেই হল পৃথিবীতে তােমার প্রথম মানবশরীরধারণ বা বলা যায় যে, এভাবেই তোমার পুনঃশরীরধারণও হয়ে চলেছে। সুতরাং এই পদ্ধতিতেই ( বিবর্তনের মাধ্যমে ) সমগ্র মানবজাতি আজকের অবস্থায় এসেছে–একথা বলা যায়। … [ক্রমশঃ]