স্বামী বাউলানন্দজীর ছোটবেলাকার জীবন জানার জন্য তাঁর ওখানকার (পেরেন্টাপল্লী) ভক্তদের আগ্রহের অন্ত ছিল না! স্বামীজী কৌশলে এই ব্যপারটা এড়িয়ে গেলেও সবটা এড়াতে পারেন নি। তাই যেটুকু জানা গিয়েছিল_তাতে বোঝা যায় যে তিনি খুব বড়ঘরের বা অভিজাত পরিবারের সদস্য ছিলেন। তাঁর বাড়িতে বড় উঠোন ছিল এবং সেখানে হাতি চলাচল করতো।
প্রতিদিন বালক স্বামীজী কে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাবার জন্য নির্দিষ্ট লোক ছিল। ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কাছ থেকে বালক স্বামীজী জীবন এবং জগতের অনেক রহস্যের কথা জিজ্ঞাসার মাধ্যমে জেনে নিতেন। ভগবান বুদ্ধের মতোই স্বামী বাউলানন্দজীর জীবনেও বাল্যকালে মৃতদেহ (শবদেহ)দেখে নানান জিজ্ঞাসার উদয় হয়েছিল। তাঁর সঙ্গী যতটা পেরেছিল_তার উত্তর দিয়েছিল_বাকি উত্তর দিয়েছিলেন ওনার মা।
প্রথাগতভাবে বিদ্যাশিক্ষা গ্রহণ স্বামী বাউলানন্দজীর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু উনি সংস্কৃত, ইংরেজি, তামিল, তেলেগু ইত্যাদি নানান ভাষায় অসাধারন পারদর্শী ছিলেন। কি করে তিনি এই গুলি করায়ত্ত করেছিলেন_সেটা কি ওনার অধ্যাবসায়ের ফল অথবা সাধনলব্ধ ফল সেই নিয়ে ডভক্তদের মধ্যেও একটা ধন্দ কাজ কোরতো! কিন্তু তিনি যে একজন মহাপুরুষ এবং অলৌকিক শক্তির অধিকারী_এটা ভক্ত এবং অভক্ত_সকলেই মেনে নিয়েছিল অথবা বলা যায়, মানতে বাধ্য হয়েছিল।।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~©~~~~~~~~~
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ এবারে এই সহিষ্ণুতা সম্বন্ধে কিছু উদাহরণ দিয়ে সহজ করে বুঝিয়ে দিন।
মীমাংসা :— মনে কর কিছু লোক একটি হলঘরে বসে খাবার খাচ্ছে, এমন সময় আরও কিছু লােক শরীরে ঘা ও চুলকানি নিয়ে ঐ হলঘরে প্রবেশ করল এবং তাদের শরীরের ঘা থেকে রস বেরুতে শুরু করল। তাদের ঐ অবস্থা দেখে যারা খাবার খাচ্ছিল, তাদের মধ্যে কয়েকজন আর খাবার খেতে পারছিল না। আবার তাদের মধ্যেই কয়েকজন খুব বিতৃষ্ণা নিয়ে খাবার খেতে লাগল, এর ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বমি করতে শুরু করল । আবার দেখ, যারা ঐ রােগাক্রান্ত ব্যক্তিদের দেখে খাবার খেতে পারছিল না—তারা ঐ বমিকরা লােকেদের দেখে নিজেরাও বমি করতে শুরু করল। আর তারা নিজেদের শরীরের মধ্যে কেমন যেন একটা চুলকানিভাব অনুভব করতে লাগল। আবার দেখ যারা প্রথমে খাবার খাচ্ছিল, তাদের কিন্তু ঐ গা ঘিনঘিন, চুলকানি ও বমিভাব— কিছুই ছিল না। অথচ মজার ব্যাপার হল, যাদের ঐ ঘা ও চুলকানি ও রস নিঃসরণ হতে লাগল, তারা কিন্তু কোনরূপ বিতৃষ্ণা বা বমিভাব ছাড়াই খাবার খেতে লাগল। এমনকি যে হাতে ওদের ঘা আছে, সেই হাতেই স্বচ্ছন্দে খেয়ে যাচ্ছিল –তা এগুলি কি সহিষ্ণুতা নয় ?
আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক্। ধর কিছু লােক কোন অনুষ্ঠান উপলক্ষে এক জায়গায় একত্রে খাবার খাচ্ছে, এমন সময় তাদের নিকটেই কিছু বাচ্ছা ছেলে-মেয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে পায়খানা করে দিল । যারা খাবার খাচ্ছিল, তারা ভাবল ঐ ছেলে-মেয়েগুলাে কোন দাস-দাসীর হবে, তখনই তাদের একটা বিতৃষ্ণা জন্মালো এবং পরে বমিবমিভাব অনুভব করতে লাগল । কিন্তু বমি করার ঠিক আগে যখন জানতে পারল ঐ বাচ্ছা ছেলেমেয়েগুলো দাসদাসীদের নয়, ওদের নিজেদেরই, তখনই কিন্তু ওদের সেই বমিভাব বন্ধ হয়ে গেল এবং তারা স্বাভাবিক হয়ে গেল আর স্বাভাবিকভাবেই খাবার খেতে লাগল ।
আবার দেখ ঘটনা ভেদাভেদে সহিষ্ণুতা কি রূপ নেয় এবং কেমন করে কোন অবস্থাতে এই সহিষ্ণুতার উৎপত্তি হয়। উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারবে। অনেক সময়ে দেখবে অনেক মানুষই রেলগাড়ীতে অসম্ভব ভিড়ে গােলমালের মধ্যে রেলের ঝাঁকুনি সত্ত্বেও ধুলােময়লা সমেত গভীরভাবে নিদ্রা যায়, তারা কোন বিব্রত বােধ করে না—তাদের নিদ্রায় ব্যাঘাতও হয় না, অথচ তারাই তাদের নিজেদের বাড়ির বিছানা অপরিষ্কার থাকলে এবং নিকটে কোনরূপ আওয়াজ শুনতে পেলে আর গভীরভাবে নিদ্রা যেতে পারে না ৷ এটা কেমন করে হয় ?
এটা আসলে একটা অভ্যাসবশত হয়–সেখানে কোন স্বার্থ থাক বা না থাক। এইভাবেই সহিষ্ণুতা ও অসহিষ্ণুতা মানুষের মধ্যে প্রকাশ পায়।
যাদের ভালবাসার মধ্যে কোন স্বার্থ থাকে না, কোন শর্ত থাকে না অর্থাৎ নিঃস্বার্থ ভালবাসা থাকে, তারা যে কোন অবস্থাতেই সহিষ্ণু হয়। আর যাদের ভালবাসার মধ্যে কোনরূপ স্বার্থ থাকে, তারা অপছন্দের বা ভাল না লাগার পরিস্থিতিতে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। এই হচ্ছে মানুষের মধ্যে সহিষ্ণুতা ও অসহিষ্ণুতার অবস্থান–যেগুলি তাদের স্বার্থ ও নিঃস্বার্থ ভালবাসা থেকেই আলাদা আলাদাভাবে গড়ে ওঠে।
সুতরাং নিঃস্বার্থ ভালবাসা থেকে যে সহিষ্ণুতার উৎপত্তি, তা মানুষের মধ্যে কমবেশী মাত্রায় বিদ্যমান। আর এটা মানুষের শক্তির গুণগত রূপান্তরের ওপর নির্ভরশীল।
জিজ্ঞাসা-আচ্ছা মহারাজ, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রয়ােজনীয়তার ওপর কিছু ধারণা দিন। কারণ এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয় যে, কোন প্রয়াত ব্যক্তির এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন না হলে সেই প্রয়াত ব্যক্তি অশরীরী (শরীরহীন ) অবস্থায় নাকি দুঃখ ভােগ করে। আরও বলা হয় যে, কেবল পুত্রগণই এই ক্রিয়া সম্পাদন করবে। যাইহােক ঐ সব প্রথাকে আমরা কেমনভাবে গ্রহণ করবাে?
মীমাংসা :— এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রধান উদ্দেশ্যই হল—প্রয়াত ব্যক্তি, যে নাকি সূক্ষ্ম অবস্থায় সূক্ষ্মজগতে বিরাজ করছে তাকে স্মরণে ধরে রাখার ধারাকে অব্যাহত রাখা। যারা পার্থিব জগতে মানবশরীরে রয়েছেন, তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মনে করিয়ে চালিত করার জন্যই এই ক্রিয়ার প্রচলন করে থাকেন। এটা বর্তমান প্রজন্মের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আবার এই স্মরণ রাখার ধারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও প্রয়ােজনীয় অর্থাৎ যারা অমানব অবস্থায় আছে এবং যারা শরীরবিহীন অবস্থায় এই বিশ্বে রয়েছে। এটার আরেকটা উদ্দেশ্য হল প্রয়াত ব্যক্তি, যিনি সূক্ষ্মশরীরে এই ব্রহ্মাণ্ডে রয়েছেন, তার সঙ্গে—যারা মনুষ্যশরীর ধারণ করে আছেন এবং যারা অমানব অবস্থায় কিন্তু শরীরধারণ করে আছেন আবার যারা শরীরবিহীন অবস্থায় শরীরধারণ করার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এই জগতে প্রথম আত্মপ্রকাশ করতে চলেছেন –তাদের সঙ্গে একটা যােগাযােগ স্থাপন করা। এইভাবেই বর্তমান প্রজন্ম তাদেরকে মাঝে মাঝে স্মরণে রাখার ধারাটি অব্যাহত রাখবে। এই স্মরণে রাখা এই জগতে প্রত্যেককে করতে হবে এবং অবশ্যই করতে হবে। যিনি প্রয়াত হয়েছেন, তিনি যেমন বর্তমান প্রজন্মের সহায়তায় স্মরণে থাকছেন, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বর্তমান প্রজন্মের কাছ থেকে আরও বেশী গুরুত্ব সহকারে সহায়তা পাবেন। যেমন আজ এবং আগামীকাল গতকালের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান অতীত থেকে যা নেবার নেবে এবং আরও বেশী করে ভবিষ্যৎকে দেবে। বর্তমান হল অতীত এবং ভবিষ্যতের মধ্যে একটা যােগসূত্র এবং আরও বলা যায় যে, বর্তমান হল অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝে একটা সন্ধিক্ষণ। সুতরাং বর্তমান অতীত থেকে নেবে এবং সঙ্গে আরও কিছু যােগ করে ভবিষ্যৎকে দেবে। এইভাবে ভবিষ্যৎকে দেবার এই ধারাকে অব্যাহত রাখার অবস্থা হল একটা চলমান বা গতিশীল প্রক্রিয়া ৷
তাহলে এখন বুঝতে পারছো তো যে, এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করার মূল উদ্দেশ্যই হল অতীত প্রজন্মকে স্মরণে রাখার ধারাকে অব্যাহত রাখা এবং তা বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই । আর এই ক্রিয়া প্রয়াত ব্যক্তির জন্য যেভাবে – যতটা যত্নসহকারে করা হয়, তার চেয়ে আরও বেশি যত্ন ও গুরুত্ব দিয়ে করা করা উচিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে ও লক্ষ্য রেখে । … [ক্রমশঃ]