স্বামী বাউলানন্দজীর ছোটবেলাকার ঘটনা নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমরা আগেই জানিয়েছিলাম যে, স্বামীজীর মায়ের নাম ছিল অঞ্জলি। ওনার মা খুবই ধর্মপ্রাণা মহিলা ছিলেন ‌। রাত্রিতে সব কাজ সেরে ওনার মা ইষ্ট মন্ত্র জপ করতে বসতেন। তাঁর হাতে একটি পুঁতির মালা থাকতো, আর থাকতো কতকগুলি পাথরখণ্ড। এক একবার মালার সমস্ত পুঁতি জপা হয়ে গেলে_ উনি একটি করে পাথর একটা ছোট বাক্সে ফেলতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না সব পাথরখণ্ড গুলি বাক্সে জমা পড়তো ততক্ষণ তিনি জপের আসন ছেড়ে উঠতেন না। কোন কোন সময় জপ সারতে মধ্যরাত্রি হয়ে যেতো_ সেই রাত্রে ওনার মা কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়তেন।
ছোটবেলাকার আর একটা ঘটনা স্বামীজীর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল । ওনাদের বাড়ির পাশে একটা বিরাট ফাঁকা জায়গা দীর্ঘদিন ধরে পতিত অবস্থায় পড়ে ছিল । আর তার পাশেই ছিল একটি পুষ্করিণী। ফলে গ্রামের লোক দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যুষ কালে ওই ফাঁকা জায়গাটিতে মল ত্যাগ করতো এবং পুস্কুরিণীটিতে শৌচ কার্য সম্পন্ন করতো। স্বামীজিও একটি নির্দিষ্ট স্থানে একটি উঁচু ঢিবির উপর বসে নিয়মিত মলত্যাগ করতেন। কিন্তু কিছুদিন পর ওই স্থানে _স্থানীয় মানুষদের উদ্যোগে একটি দেবস্থান নির্মিত হলো এবং মন্দিরের যে স্থানটিতে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হলো _ স্বামীজি হিসাব করে দেখেছিলেন যে তিনি পূর্বে ঠিক ওই স্থানেই প্রত্যহ মল ত্যাগ করতেন! প্রত্যেকদিন বহু মানুষ দলে দলে সেই মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা কোরতো। কোন কোন লোক মানত করে আকাঙ্খিত ফলও লাভ কোরতো । এই ব্যাপারটি ছোটবেলায় স্বামীজীকে খুব অবাক করেছিল _ এমনটা কি করে হলো!!!(ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ, যদি ঐ সমস্ত অপরাধকারী ব্যক্তিদের শাস্তিস্বরূপ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে শরীরকে হত্যা করা না হয় এবং তাদেরকে মুক্ত ও স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও বাঁচতে দেওয়া হয় তাহলে ওরা অবশ্যই ঐ ধরণের ঘৃণ্যতম অপরাধ করতেই থাকবে। এবং তাদের দেখাদেখি অন্যরাও এই শিথিলতার সুযােগ নিয়ে ঐ ধরণের নীচ অপরাধগুলি সম্পাদন করতে সাহসী ও প্রভাবিত হবে। তাই আমাদের মনে হয়—ঐ ধরণের অপরাধের জন্য শাস্তিহিসেবে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে হত্যার আইনের প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে।
মীমাংসা :– হ্যাঁ – হ্যাঁ – অবশ্যই। এই প্রয়ােজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই তাে এই শাস্তির আইন প্রণীত হয়েছে। তবে এবারে আমরা এই শাস্তির ফলটা একটু বিশ্লেষণ করে দেখি। বস্তুত এই ধরণের অপরাধ ও তজ্জনিত শাস্তি দেখে ও শুনে কিন্তু খুব কম লােকেই এটাকে অমানবিক ভাবে। আসলে এটা এখন এজগতে একটা স্বাভাবিক ও নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে ?
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ এই বিষয়টা এবারে একটু সব দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে বলুন না !
মীমাংসা :— আসলে দ্যাখো—শরীর কিন্তু নিজের এই ধরণের অপরাধ সম্পাদন করতে পারে না ৷ তারা কোনাে কিছুই করতে পারে না। এটা কিন্তু ব্যক্তিমানসেরাই করে। তারা সবকিছুই করে। এই ব্যক্তিমানসেরা ন্যায়-অন্যায়, ঠিক, বেঠিক বা ভুল সব কিছুই নিজেদের চিন্তাধারা ও সংস্কার অনুযায়ী করে থাকে – তার শরীরের কথা না ভেবেও করে, আবার ভেবেও করে এবং শরীরবিহীন অবস্থায়ও করে। এই ব্যক্তিমানসেরা তাদের শরীরের মাধ্যমেই এই ধরণের অপরাধগুলি করে থাকে। তাই তাদের শরীরকে হত্যা করে বস্তুত তুমি কিন্তু সেই ব্যক্তিমানসকে হত্যা করতে পারছ না বরং যার মাধ্যমে তারা ঐ অপরাধগুলি করে—সেই শরীরকেই হত্যা করা হয় । এইভাবে কিন্তু ব্যক্তিমানসেরা শাস্তি পায় না। বরং সেই সমস্ত ব্যক্তিমানসেরা ঐ ধরণের অপরাধ করতেই থাকে। তা শরীরবিহীন অবস্থায়ও করে—আবার পুনঃশরীর ধারণ করেও করে থাকে। তারা এগুলি তাদের সংস্কার বা অভ্যাসবশতই করে থাকে। অতএব মৃত্যুদণ্ড দিয়ে শরীরকে হত্যা করা হলে সেই ব্যক্তিমানসেরা—যাদের শরীরকে হত্যা করা হ’ল—তারা ঐ ধরণের অপরাধ কিছুদিনের জন্য পিছিয়ে দেয় বই কি।
সুতরাং আজকে যে সমস্ত ব্যক্তিমানসের শরীরকে হত্যা করা হোল—তা যে কোন অপরাধের জন্যই হােক এবং তা যদি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সুরক্ষার জন্যও করা হয়ে থাকে—তবে সে সমস্ত অপরাধগুলি আবার বহুগুণে বর্ধিত হয়ে এবং আগামী দিনে সেই অপরাধগুলির সঙ্গে আরও অপরাধ যুক্ত হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভীতি ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে –ধরো, কিছু বাড়ীতে কিছু লােক বাস করে এবং তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করে, সেইহেতু ঐ বাড়ীগুলি ভেঙে দেওয়া হ’ল—কিন্তু ভেবে দেখা হল না যে, ঐ লােকগুলিই আবার অন্যবাড়ীতে বাস করে কিছু সময় বাদে আবার ঐ ধরণের অপরাধ করে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করতে থাকবে। সুতরাং মৃত্যুদণ্ড দিয়ে শরীরকে হত্যার আইন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদেরকে আরও ঐ ধরণের অপরাধ করার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং পরবর্তী জন্মেও কিন্তু ঐ ব্যক্তিমানসের আরও বেশী জঘন্যতম অপরাধ করবে এবং আবার মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি পাবে।
অতএব দেখা যাচ্ছে যে, এই মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির আইনের ফল আরও মারাত্মক হতে পারে । পূর্বজন্মে যে সমস্ত ব্যক্তিমানসের শরীরকে হত্যা করা হোল_ পুনঃশরীর ধারণে তারা সেই অপরাধ প্রবণতা নিয়ে বেশী শক্তি ও ক্ষমতা অর্জন করে সেই শক্তি ও ক্ষমতার বলে আরও বেশী করে অপরাধ করতে প্রলুব্ধ হয় এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে। ফলে ঐ সাধারণ ও সরল মানুষের একাংশ ওদের অপরাধ প্রবণতার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে অপরাধজনিত কাজ করতে থাকে যা নাকি আইনের চক্ষে মৃত্যুদণ্ড-শাস্তির যােগ্য। সুতরাং দেখা যাচ্ছে এই মৃত্যুদণ্ড-আইন কিন্তু আসলে অপরাধ করার প্রবণতাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে তােলে এবং আইনই এর জন্য দায়ী। সুতরাং আজকের এই আইনের শাস্তি কিন্তু ভবিষ্যতের অপরাধ করার বীজ বপন করে তাকে বহুগুণে বাড়তে ও ছড়াতে সাহায্য করে। এবং এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং অপরাধও বাড়তে থাকে। সেইহেতু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন ও শাস্তিতে সমাজ, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির প্রকৃত স্বার্থ রক্ষিত হয়না। … [ক্রমশঃ]