স্বামী বাউলানন্দজীর ছোটবেলাকার জীবন নিয়ে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিল । আমরা আগের সংখ্যায় দেখেছিলাম যে, স্বামীজিদের বাড়ির পাশে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল যেখানে গ্রামের লোক মলত্যাগ করতো। পরবর্তীকালে সেইখানে একটা মন্দির গড়ে উঠেছিল এবং ঠিক যে নির্দিষ্ট স্থানটিতে স্বামীজি নিজে পায়খানা করতেন_ ঠিক সেখানটাতেই মন্দিরের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল! এই ব্যাপারটা ছোটবেলায় স্বামীজীকে খুব চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল! ‘এমনটা কিভাবে হওয়া সম্ভব’_ সেই চিন্তা নিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে ছোটবেলাতেই তিনি এই ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। উনি বুঝতে পারলেন যে__ কোন স্থান হয়তো সাময়িকভাবে অপরিষ্কার বা আবর্জনা পূর্ণ ছিল কিন্তু সেই স্থানটিকে যদি আবর্জনা মুক্ত করে, পরিষ্কার করে, পবিত্র জল ছিটিয়ে সুন্দর করে গড়ে তোলা যায়(মানুষের দেহ মন্দিরের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য_কেউ জীবনে কিছু খারাপ কাজ করেছে তো কি হয়েছে? যখন থেকে সে আবার বহুজনহিতায় চিন্তা করতে শুরু করবে_তখন থেকেই সে পবিত্র)এবং সেখানে যদি একটি দেব মন্দির নির্মিত হয় __তাহলে ঐ স্থান আর অপবিত্র, অপরিষ্কার, আবর্জনা পূর্ণ বলে মানুষের মনোজগতে কোনো ক্রিয়া হবে না। বরং ওই স্থানে যে কোনো মানুষ গেলে _তখন তার মধ্যে একটা পবিত্র ভাব-শান্তির ভাব-স্বস্তির ভাব গড়ে উঠবে ! উনি চিন্তা করে আরো বুঝতে পারলেন যে, সর্বেসর্বা বা ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান _সুতরাং তিনি ওই দেব বিগ্রহেও বিরাজমান। মন্দির প্রতিষ্ঠার পূর্বে প্রতিষ্ঠাতা এবং আরো অনেকের যে শুভ সংকল্প, সদিচ্ছা, নিঃস্বার্থপরতা ও ত্যাগের ভাব বিদ্যমান ছিল __এই শুভশক্তিগুলি সহ মন্দির প্রতিষ্ঠার পরেও বহু মানুষের প্রার্থনা সেই মূর্তির মধ্যে বা বিগ্রহের মধ্যে ঈশ্বরীয় শক্তিতে রূপ পরিগ্রহ করে। যত বেশি বেশি ভক্ত সেই মন্দিরে আসতে থাকে এবং তাদের নিষ্কাম প্রার্থনা জানায় __সেই মূর্তি ততবেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে! যতো বেশি আধ্যাত্মিক মানুষ সেই স্থানে পদার্পণ করে __সেই স্থানের পবিত্রতা, আধ্যাত্মিকতার পরিবেশ ততো বেশি বেশি করে গড়ে ওঠে । আর এর ফলেই আধ্যাত্মিক মনোভাবাপন্ন ভক্তরা তাদের মনোবাঞ্ছা জানিয়ে সেই মুর্তির নিকট প্রার্থনা জানালে __প্রতিষ্ঠিত মূর্তির মধ্যে থেকেই তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ হয় । এইভাবে ক্রমেই দেখা যায় ওই মূর্তিটি ভক্তকুলের অভীষ্ট পূরণের শক্তির উৎস হয়ে ওঠে । ভক্তরা তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হচ্ছে দেখে আবার বেশি বেশি করে প্রার্থনা জানায় এবং ওই মূর্তির মধ্য থেকে ঐশ্বরিক শক্তি আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। (ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– আচ্ছা মহারাজ ! কঠিন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে শরীরকে হত্যা করার যে শাস্তি রয়েছে–তা যদি ব্যক্তি তথা সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাহলে এ অবস্থার সমাধান কোন্ পথে?
মীমাংসা :– এই সমস্ত অপরাধীদের কিছু সময়ের জন্য একটা জায়গায় আবদ্ধ বা বন্দী করে রাখতে হবে এবং আবদ্ধ থাকাকালীন অবস্থায় এদেরকে কতিপয় মানবতা ও নিঃস্বার্থ ভালবাসা-সম্পন্ন মহান ব্যক্তি তথা সাধু, প্রজ্ঞাবান ও জ্ঞানীজনের দেখার ও সঙ্গলাভের সুযােগ করে দিতে হবে। এই সুযােগ যদি মাঝে মাঝে করে দেওয়া সম্ভব নাও হয়–অন্তত মাসে একবার এই সমস্ত মহান ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের কথা-বার্তা, আলাপ-আলােচনা ও সঙ্গলাভের সুযােগ করে দিতে হবে যাতে এই সঙ্গলাভের ফলে তারা বুঝতে পারে কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ এবং কোনটা ঠিক বা কোনটা ভুল আর আধ্যাত্মিক পথে গেলে মানুষের কী ধরণের আত্মিক-উন্নতি সম্ভব । এই আবদ্ধ থাকাকালীন অবস্থায় তাদের নিকট আবার আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনদের খবরাখবর সরবরাহ করতে হবে এবং মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযােগ করে দিতে হবে। সাথে সাথে তাদের স্বাস্থ্যের প্রতিও যত্ন নিতে হবে।
দেখা যাবে এই সমস্ত সুযােগ-সুবিধা লাভের এবং মহান ব্যক্তিদের সঙ্গলাভের ফলে দশ বছরের মধ্যেই ঐ সমস্ত অপরাধী—যাদের শরীরকে মৃত্যু দণ্ড দিয়ে হত্যা করা হবার কথা, তাদের মধ্যে একটা উন্নত ধরণের মানসিক পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে গেছে। তখন তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে-ই কাজ করে যাবে। এরকম যখন অবস্থা _তখন তাদেরকে আর আবদ্ধ না রেখে ছেড়ে দিতে হবে। আবার এদের মধ্যে যাদের খুব তাড়াতাড়ি এই উন্নত মানসিক রূপান্তর লক্ষ্য করা যাবে, তাদেরকে দশ বছর অতিক্রান্ত হবার আগেই মুক্ত করে দিতে হবে। তাছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রের একটা বিরাট দায়িত্ব ও কর্তব্য হল যতক্ষণ পর্যন্ত না এই মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত অপরাধীদের মনে উন্নত ধরণের একটা রূপান্তর ঘটছে এবং নিঃস্বার্থতা লাভ হচ্ছে _তার আগে যেন তাদের শরীরকে হত্যা করা না হয়। আর এটা বর্তমান প্রজন্ম, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সমাজের স্বার্থের নিমিত্তেই করা দরকার। এ ধরণের সংস্কার ও সংশােধন নীতি প্রয়ােগের ফলে দেখা যাবে আগামী দশ দশকের মধ্যেই জঘন্যতম অপরাধগুলি যা নাকি মৃত্যুদণ্ড পাবার উপযুক্ত, সেগুলি আর ঘটছে না, অপরাধগুলি তখন জগতের অতীত ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার এই সংস্কার-সাধনের সুফলগুলিও চারিদিকে প্রকাশ হয়ে পড়ছে।
জিজ্ঞাসা :— বর্তমানে দেখা যাচ্ছে—এই বিশ্বের কিছু কিছু দেশে এই সমস্ত অপরাধী—যাদেরকে আবদ্ধ করে বা বন্দী করে রাখা হয়েছে–তাদের শুদ্ধিকরণ ও সংস্কারের জন্য বিভিন্ন ধরণের পদ্ধতির প্রচেষ্টা চলছে এবং আমাদের মনে হয় এ ধরণের প্রচেষ্টা একটা সমাধানের পথ দেখাতে পারে। আচ্ছা, এ ধরণের প্রচেষ্টা যদি সর্বদেশে সমানভাবে প্রয়ােগ করা হয়, তাহলে কি এটা ঐ শাস্তির সমস্যার একটা বিকল্প সমাধান নয় ?
মীমাংসা :– না। ঐভাবে ঐ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ঐ পদ্ধতিগুলি কেবলমাত্র একটা সাধারণ পদ্ধতিরই সামিল। এই সংস্কার সাধনের প্রচেষ্টাগুলি সাধারণ বন্দী অর্থাৎ যাদের শরীরকে হত্যা করার জন্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়নি _সেইসব অপরাধীদের জন্য করা হয়েছে। এই শুদ্ধিকরণ ও সংস্কারসাধনের প্রচেষ্টাগুলি যাদের শরীরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে হত্যা করা হবে, তাদের জন্য করা হয়নি। তাছাড়া এই সংস্কারসাধনের প্রচেষ্টাগুলি আবদ্ধকৃত অপরাধীদের জন্য কোনাে ঈপ্সিত সুফল আনতে পারে না। বড়জোর শতকরা এক বা দুই ভাগ সুফল আশা করা যায়। কারণ যে সমস্ত ব্যক্তিরা এই সংস্কারসাধনের সঙ্গে যুক্ত তাদের মধ্যে নিঃস্বার্থতা ও নিখাদ ভালবাসার অভাব রয়েছে।
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ, যদি আপনার মত-ই মেনে নেওয়া যায় তাহলে বলতে হয়, এই বিশ্বে কাউকে দিয়েই সংস্কারসাধনের মাধ্যমে এই অপরাধীদের উন্নত মানসিক রূপান্তর ঘটানাে সম্ভব নয়। সুতরাং এই ধরণের অপরাধ ঘটতে থাকবে এবং ফলতঃ অপরাধী যেমন থাকবে তেমনি সমাজের দুঃখ-দুর্গতিও চলতে থাকবে আর এর সাথে সাথে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তিও বহাল থাকবে। এটাই আমাদের মনে হয় ।
মীমাংসা :— না। এর সমাধানও সম্ভব যদি উপরে উল্লিখিত পদ্ধতিগুলি যা পূর্বে বলেছি সেগুলি সঠিকভাবে প্রয়ােগ করা যায় ।
জিজ্ঞাসা :— তাহলে ঐ সমস্ত মহৎ লােক তথা সাধু-সন্ত ও প্রজ্ঞাবান ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের কোথায় পাওয়া যাবে—যাঁদেরকে দিয়ে অপরাধীদের মানসিক উন্নয়ন করানাে যাবে এবং যাঁরা অন্তত মাসে একবার অপরাধীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে ও সঙ্গ দিয়ে ভাল-মন্দ বুঝিয়ে সৎ ও উন্নত জীবন-যাপনে প্রভাবিত করতে পারে। রাষ্ট্র নাহয় তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে পারে, কিন্তু অপর কাজগুলি কাদের দ্বারা সম্ভব অর্থাৎ ঐ ধরণের নিঃস্বার্থ ও নিখাদ ভালবাসা-সম্পন্ন ব্যক্তি পৃথিবীতে আছে কি ?–আমাদেরকে এই সম্বন্ধে আপনার মতামত কিছু ব্যক্ত করুন।
মীমাংসা :– নিশ্চয়ই আছে । ঐ ধরণের মহৎ ব্যক্তি তথা সর্বত্যাগী নিঃস্বার্থ নিখাদ ভালবাসাযুক্ত ব্যক্তিত্ব পৃথিবীর সর্ব প্রান্তেই আছে । যাঁদের সংস্পর্শে, সঙ্গলাভে, সহযােগিতায় ও উপদেশে ঐ সমস্ত অপরাধীদের মধ্যে একটা সুস্থ জ্ঞানের আলো ও শক্তি প্রবাহিত হবে। আর তাদের শরীর ও মন সে সমস্ত আলো ও শক্তি গ্রহণ করতে সমর্থ হবে। এরকম যখন কয়েকবার ঘটবে তখন দেখা যাবে ঐ জ্ঞানের আলাে ও শক্তির প্রভাবে দশ বছরের মধ্যেই তাদের উন্নত মানসিক রূপান্তর ঘটবে–যা আমি পূর্বেই বলেছি।
জিজ্ঞাসা :—কারা সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যাঁদেরকে পৃথিবীর সর্ব প্রান্তেই দেখা যায় এবং যাঁরা ঐ সমস্যাগুলির সুন্দর সমাধান করতে পারেন?
মীমাংসা :— পৃথিবীর সর্বপ্রান্তেই কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে প্রজ্ঞাবান, আলােকপ্রাপ্ত, শুভানুধ্যায়ী পবিত্র ও দেবতুল্য মহান ব্যক্তিত্বরা রয়েছেন এবং তাঁরা এই সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে পারেন, কিন্তু তা তাঁরা করছেন না। তাঁদের প্রচুর আধ্যাত্মিক সম্পদও রয়েছে। মানুষ এঁদেরকে যথেষ্ট শ্রদ্ধাভক্তি করে এবং এঁদের ওপর মানুষের বিরাট আস্থাও রয়েছে। লােকেরা তাঁদেরকে পথ-প্রদর্শক ও রক্ষক হিসেবেই গণ্য করে। লােকেরা তাঁদের মধ্যে একটা ঐশ্বরিক শক্তি ও জ্যোতি দেখতে পায় এবং ভাবে যে, এই সমস্ত দেবতুল্য ব্যক্তিদের সান্নিধ্য ও সঙ্গলাভে তাদের প্রভূত উপকার হবে। কারণ তাঁরা লােকদিগকে জগৎ ও জগতের সমস্যা সম্বন্ধে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলেন এবং সুন্দর জীবন-যাপনের কলা কি তা বলে দেন এবং কিভাবে সমস্যার সমাধান করা যাবে, তারও পথনির্দেশ দিয়ে থাকেন। এমন কি যে সমস্ত অপরাধীরা বন্দী অবস্থায় আছে এবং যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং মৃত্যুর অপেক্ষায় রয়েছে, তাদেরও এই সমস্ত মহান ব্যক্তিদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, পবিত্রতা, শুচিতা, দাক্ষিণ্য ও সিদ্ধির ওপর প্রগাঢ় আস্থা রয়েছে। তারাও যদি এই সর্ব সিদ্ধ পুরুষের দর্শনলাভ, সান্নিধ্য, সঙ্গ ও তদুপরি উপদেশ—তা যদি মাসে অন্তত এক বারও পেতে পারে তাহলে তাদের প্রভূত উপকার হবে। আর এই দর্শন ও সান্নিধ্যলাভে তাদের মধ্যে একটা শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং উন্নত মানসিক রূপান্তর ঘটবে, যার ফলে তারা সুস্থ সুন্দর জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ হবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থেই তখন কাজ করে যাবে—যা কি না প্রকারান্তরে তাদের নিজেদেরও স্বার্থ রক্ষিত হবে। … [ক্রমশঃ]