_স্বামী বাউলানন্দজীর ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা নিয়ে কথা হচ্ছিল। বাউলানন্দজী খুব ছোটবেলাতেই মন্দির, বিগ্রহ এবং বিগ্রহকে কেন্দ্র করে মানুষের আকাঙ্ক্ষা মেটার রহস্য অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ওনার এই উপলব্ধি শুধু মন্দির‌ই নয়, গির্জা-গুরুদ্বার-মসজিদ-বৌদ্ধ উপাসনালয়,জৈন উপাসনালয় __সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য!
পরবর্তীকালে স্বামী বাউলানন্দজী এই ব্যাপারটাকে একটা ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা করে_তাঁর ভক্ত-শিষ্যদেরকে বুঝিয়েছিলেন। ওনার ব্যাখাটা বোঝানোর চেষ্টা করছি। ধরুন__কয়েকজন ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এবং তাদের সঞ্চিত অর্থানুকুল্যে একটা ব্যাংক গড়ে উঠলো। তাহলে ঐ সঞ্চিত অর্থ‌ই _প্রাথমিকভাবে ব্যাংকের মূলধন হোল। এবার অনেক মানুষ তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ ঐ ব্যাংকে জমা করতে লাগলো।এতে মূলধন ক্রমেই বেড়ে গিয়ে একটা huge amount হয়ে গেলো।
এরপর কিছু মানুষ লোনের জন্য দরখাস্ত করে টাকা তুলতে লাগলো এবং মেয়াদান্তে সুদ সমেত টাকা ফেরত দিলো।এর ফলে ঐ ব্যাংকের প্রাথমিক মূলধন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকলো।।
ঠিক তেমনি কোথাও হয়তো বহুপূর্বে কোনো (একজন বা একাধিক) সহৃদয় ব্যক্তির দ্বারা কোনো মন্দির নির্মিত হয়েছিল, পরে সেই মন্দির ধীরে ধীরে বিখ্যাত হয়ে ওঠে । ফলে বহু মানুষ পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে সেই মন্দিরে দলে দলে যোগদান করে_সেখানে তারা ধ্যান-জপ-পূজাপাঠ-ভক্তি নিবেদন, প্রার্থনা ইত্যাদি করে এবং তারা সেখান থেকে কিছু শক্তিও লাভ করে। এইভাবে ভক্তরা কিছু লাভ করে ঠিকই_কিন্তু বিনিময়ে তারাও কিছু (ধ্যান-জপ-ভক্তি-প্রার্থনা রূপী সুদ) deposit করে।
এইজন্যেই স্বামীজি তার ভক্তদের যে কোনো এই রূপ মন্দির বা তীর্থস্থান দর্শনের জন্য সবসময় উপদেশ দিতেন। যেহেতু এই ধরনের মন্দিরগুলি বহু শান্তিকামী সাধু মহাত্মাদের আশীর্বাদপুষ্ট_ তাই সেখানে পোঁছাতে পারলে মানুষ অবশ্যই শান্তি পাবে।।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ, এখন আমরা বুঝতে পারলাম কারা সেইসব মহান ব্যক্তিত্ব, যাঁরা নাকি ঐ সমস্ত ভুল পথে চালিত ব্যক্তিদের উন্নত মানসিক রূপান্তর ঘটাতে সমর্থ। কিন্তু এ ব্যাপারেও আমাদের একটা গভীর সংশয় আছে। এই জগতে বর্তমান মানবিকতার মাপকাঠিতে আমরা সবাই মােটামুটিভাবে—ভালোভাবে চলি ও ব্যবহার করে থাকি এবং ঐসব মহান ব্যক্তিরাও আমাদের সামনে শান্তির দূত হিসেবেই পরিগণিত হন। এই বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাও ঐ সমস্ত মহান ব্যক্তিদের সান্নিধ্য ও সাহচর্য পেতে আগ্রহী হয় এবং তাঁদের দর্শনপূর্বক শ্রীমুখ-নিঃসৃত বাণী শ্রবণ করার সুযােগ গ্রহণ করে। বস্তুত আমরাও এই ধরণের সুযােগ নিয়ে উপকৃত হই। ঐ সমস্ত মহান ব্যক্তিগণ এই বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ও রাজনীতিবিদদের পথ-নির্দেশ দিয়ে বিশ্বের নানারকম জটিল সমস্যার সমাধানেও সাহায্য করে থাকেন। কিন্তু যখন ঐ সমস্ত মহান ব্যক্তিগণ ভুলপথে চালিত ব্যক্তিদের মানসিক রূপান্তরের কাজে ব্যাপৃত ও নিযুক্ত থাকবেন, তখন আমরা অর্থাৎ সাধারণ লােকেরা তাঁদের সান্নিধ্য, দাক্ষিণ্য ও বাণী-শ্রবণের সুযােগ থেকে বঞ্চিত হব। এই পরিস্থিতিতে আমরা যারা সৎপথে চলি, তাদের এবং সেই সমস্ত নেতৃবৃন্দ ও রাজনীতিবিদদের কী অবস্থা দাড়াবে। এই ব্যাপারে আমরা একটু উদ্বিগ্ন !
মীমাংসা :– ১) আসলে এ ব্যাপারে অতটা উদ্বিগ্ন হবার কোন কারণ নেই। বস্তুত যখন ঐ সমস্ত পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের উন্নততর মানসিক রূপান্তর ঘটবে, তখন তারা নিজেদের কল্যাণের জন্য তাে বটেই—সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ ও স্বার্থের জন্যই কাজ করে যাবে। আর তােমরা যখন সেই সমাজেরই একটা অংশ, সেইহেতু সেই কল্যাণ থেকে তােমরাও উপকৃত হবে। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সেই কল্যাণ থেকে উপকার লাভ করবে। ২) মােটামুটি ভাবে তােমরা সবাই সজ্জন ব্যক্তি ধরে নিতে হবে। আর নেতৃস্থানীয় ও রাজনীতিবিদরাও সজ্জন। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সেই সমস্ত পথভ্রষ্ট ও ভুলপথে চালিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরণের জঘন্যতম অপরাধ সংঘটিত করতে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সজ্জন ও ভাল লােকেদের ভালভাবে থাকা ও সৎপথে চলাও দুরূহ হয়ে উঠবে। এই পরিস্থিতিতে ঐ সমস্ত মহান ব্যক্তিদের সংস্পর্শ ও সান্নিধ্যলাভ করে তােমরা যারা তাঁদের আশীর্বাদে ধন্য হয়ে উন্নততর জীবন-যাপনে ইচ্ছুক এবং ভালভাবে চলতে আগ্রহী–তােমাদের সামনে কিন্তু ঐ পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরা বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে এবং তােমরা ভাল থাকতে চাইলেও তাদের অস্তিত্বই তোমাদের ভাল থাকতে দেবে না। ৩) এই জগতে সর্ববিষয়ে, সর্বক্ষেত্রে সব ব্যক্তিরাই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং একে অপরের উপর নির্ভরশীল ও ঐ ব্যাপারে একটা সামঞ্জস্য ও সমতা রয়েছে । এটা সমস্ত দেশের সমস্ত মানবজাতির ক্ষেত্রেই প্রযােজ্য। মহান প্রতিষ্ঠানগুলিতে মহান ব্যক্তি ও সাধু-সন্তদের অবস্থান, তাদের প্রজ্ঞা, শিক্ষা, দাক্ষিণ্য, পবিত্রতা ও শুচিতা এবং সর্বোপরি তাদের দেবর্ষিভাব সাধারণ লােকেদের জন্য মঙ্গলময়, বিশেষ করে সেইসমস্ত পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের—যারা নাকি ঘৃণ্যতম অপরাধ করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত, তাদের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সুফলদায়ক এবং অতি অবশ্যই প্রয়ােজন। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় মঙ্গল সেই সমস্ত পথভ্রষ্টদের মঙ্গলের উপরই নির্ভরশীল। এই সব কারণেই ঐ মহান ব্যক্তিগণ বিভিন্নভাবে বিভূষিত ও অলংকৃত এবং তারা জগতের মহৎ উদ্দেশ্যেই নিজেদের নিয়ােজিত রাখেন। ৪) অধিকন্তু দ্যাখাে, এই পৃথিবীতে যখন এই ধরণের ঘৃণ্যতম অপরাধ ঘটছে এবং তজ্জনিত মৃত্যু দণ্ডের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে এবং যা নাকি প্রায় রােজই সংঘটিত হচ্ছে আর ঐ অপরাধীদের শরীরকে হত্যা করা হচ্ছে, তখন যারা সততাকে আঁকড়ে আছে এবং যারা ঐ সমস্ত মহান ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে এসে তাঁদের আশীর্বাদধন্য হয়ে সৎপথে চলার চেষ্টা করছে—উন্নততর জীবন-যাপনের চেষ্টা করছে, এই অবস্থায় কী ঐ সততার কোন মূল্য আছে ? আর মৃত্যদণ্ড দিয়ে শরীরকে হত্যা করারও কী কোন প্রয়ােজনীয়তা আছে। কারণ যাদের শরীরকে হত্যা করা হল, তারা তাে আরও বেশী ক্ষমতা নিয়ে পুনর্জন্ম গ্রহণ করে আরও বেশী ও জঘন্যতম অপরাধ করতে থাকবে এবং ভবিষ্যতেও করবে এবং ভাল ও সৎ লােকেদের সন্তান-সন্ততিদের ঐ ধরণের অপরাধ করার জন্য প্রভাবিত করবে।
জিজ্ঞাসা :– কিন্তু মহারাজ, তাহলে আমরা যারা ঐ সমস্ত মহান ব্যক্তিদের সান্নিধ্য ও সঙ্গলাভে নিজেদের রক্ষা ও মুক্ত করতে চাইছি—সেটা কী ভুল প্রত্যাশা ?
মীমাংসা :– না, তােমাদের প্রত্যাশা ঠিকই আছে। তবে যে পথে ও পদ্ধতিতে তােমাদের প্রত্যাশা পূরণ হওয়া উচিত—তা কিন্তু বর্তমান পথ ও পদ্ধতির থেকে ভিন্নতর। তােমরা ও দেশের নেতৃবৃন্দ ও রাজনীতিবিদরা অধিকাংশই ভাল এবং সবারই উদ্দেশ্য মােটামুটি ভাল আর সবাই চাইছে তারা এবং তাদের ভবিষ্যৎ বংশধররাও সৎ হয়ে সদাচার পালন করে উন্নততর জীবন-যাপন করুক। কিন্তু এই মানবজাতিরই একটা অংশ আবার সেই ধরণের সমাজবিরােধী ও ঘৃণ্যতম অপরাধ করে চলেছে এবং করছে। এই অবস্থায় তােমাদের ভেবে দেখা উচিত, যে পরিস্থিতিতে কাউকে এই মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দিয়ে শরীরকে হত্যা করা হত, তা কিন্তু কোন সুফল আনতে পারেনি। বরং অপরাধ ও অপরাধ করার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই শরীর-হত্যা একেবারে বা চিরদিনের জন্য বন্ধ হওয়া উচিত এবং ঐ সমস্ত পথভ্রষ্ট অপরাধীদের ঐ মহান ব্যক্তিদের সান্নিধ্য ও সাহচর্যে নিয়ে এসে উন্নততর মানসিক রূপান্তর করে সৎ ও সুন্দর জীবন-যাপনে উদ্বুদ্ধ করেই এই অপরাধ প্রবণতার—সমস্যার সমাধান হতে পারে। … [ক্রমশঃ]