স্বামী বাউলানন্দজীর ছোটবেলাকার ঘটনাবলী এখানে আলোচনা করা হচ্ছিল। আমরা আগে বলেছিলাম যে স্বামীজীর ছোটবেলা কেটেছিল বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলার একটি গ্রামে । তাঁর মায়ের নাম ছিল কল্যাণী এবং তিনি মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন । তাঁর মায়ের খুবই ইচ্ছা ছিল তাঁকে অনেক লেখাপড়া শেখাবেন কিন্তু মায়ের সে ইচ্ছা পূরণ হয় নাই, কারণ তাঁর মা অকালেই দেহত্যাগ করেন ।
স্বামীজী তাঁর শিষ্যদের কাছে এটাও বলেছিলেন যে, তাঁর মায়ের মৃতদেহের সঙ্গে ঐ বয়সেই তাঁকে শ্মশান ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁকে দিয়ে মায়ের মুখাগ্নি বা ঐ ধরণের কাজও করানো হয়েছিল। চিতায় আগুন ধরানোর পর _তাঁর বয়স কম বলে তাঁকে চিতার আগুনের কাছে থেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু দূর থেকে ওই বালক চিতার অগ্নিশিখা লক্ষ্য রাখছিলেন এবং তিনি দেখছিলেন যে _তাঁর মায়ের সুন্দর মুখটি আগুনে পুড়ে কিভাবে ধীরে ধীরে কালো হয়ে যাচ্ছে ! এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে সেই বালক, সেখানেই অচৈতন্য হয়ে পড়েন । এরপর তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন বটে কিন্তু কিছুতেই তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছিলেন না। মায়ের মৃত্যুর পর বালক যেন একটা উদ্দেশ্যহীন জীবন যাপন করতে থাকেন __দিনের অধিকাংশ সময় তিনি ব্যাট নিয়ে বা বল নিয়ে খেলা করতেন। মায়ের মৃত্যুর কিছু দিন পর __কিশোর বয়সেই ওই বালক, বাড়ির সকলের অজ্ঞাতে চিরদিনের মত গৃহত্যাগ করেন এবং একদল ভ্রাম্যমান সন্ন্যাসীর দলে যোগ দিয়ে তাঁদের সাথে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
ভারতীয় সন্ন্যাসীরা বিভিন্নভাবে তাদের জীবন যাপন করেন । তাদের কেউ কেউ লোকালয়ের মধ্যেই কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে কুটিয়া স্থাপন করে সাধন-ভজন করেন, কেউ উত্তরভারতে হিমালয়ের কোলে অবস্থিত গঙ্গা বা যমুনার তীরে অথবা মধ্যভারতে নর্মদার তীরে অর্থাৎ কোনো নির্জন স্থানে বসবাস করে যোগোভ্যাস বা ধ্যানাভ্যাস করেন, আবার অনেক সন্ন্যাসী পরম্পরা রয়েছে যাঁরা সারা জীবন ধরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন তীর্থে তীর্থে ভ্রমণ করেই জীবনটা কাটিয়ে দেন। স্বামী বাউলানন্দজী এইরকমই একদল ভ্রাম্যমান সন্ন্যাসীর দলে পড়েছিলেন।।(ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ, শুদ্ধচিত্ত মহান ব্যক্তিদের পক্ষে কি বিপথগামী অপরাধীদের শুদ্ধিকরণ করে তাদের উন্নততর মানসিক উত্তরণ ঘটানো সম্ভব ? এ বিষয়ে কিন্তু আমাদের একটু সংশয় আছে ।
মীমাংসা :– দ্যাখাে, তােমাদের নিজেদের অবস্থার ওপরই কিন্তু তোমাদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। এ সমস্ত বিপথগামীদের নিশ্চয়ই শুদ্ধিকরণ ও উন্নততর মানসিক উত্তরণ ঘটানাে সম্ভব, আর যদি সম্ভব না হয় তাহলে তােমরা যেমনটি ভাবছো ও সংশয় করছে—চাইলে ঐ শুদ্ধিকরণের ব্যাপারটা ঐ সব মহান ব্যক্তিদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে ছেড়ে দাও না। অন্যথায় শুধু পথভ্রষ্ট অপরাধীরাই নয়, তাদের সংস্পর্শ ও সান্নিধ্যে এসে বহু মানুষই ঐ ধরণের অপরাধ সংঘটিত করতে থাকবে—যার ফলস্বরূপ প্রকারান্তরে সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষে অমঙ্গল হবে। সেইসঙ্গে সেইসব অপরাধী মানুষদের শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে তাদের শরীরকে হত্যা করা হবে এবং এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। এর ফলস্বরূপ তােমাদের এবং সেই সঙ্গে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে যে সততা ও পবিত্রতার সদগুণ আছে, তার বিলুপ্তি ঘটবে এবং আস্তে আস্তে সামাজিক অবক্ষয় শুরু হয়ে যাবে।
প্রকৃতপক্ষে ঐ সমস্ত পবিত্র, শুদ্ধচিত্ত ও সত্যনিষ্ঠ মহান ব্যক্তিরাই কিন্তু ঐ অশুভ প্রভাবের আগমনকে দূরে সরিয়ে দিতে সমর্থ হবে। দ্যাখাে, ঐ উদ্দেশ্য নিয়েই কিন্তু বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঐ সব মহান প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে উঠছে আর ঐ প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকারীবৃন্দ যাঁরা, তাঁদের মধ্যে শুচিতা, পবিত্রতা, সাধুতা, ঔদার্য ও দেবর্ষিভাব রয়েছে। তাঁরাই কিন্তু দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করে ঐ সমস্ত বিপথগামী তথা পথভ্রষ্টদের শুদ্ধিকরণ করে উন্নততর মানসিক রূপান্তর ঘটাতে সমর্থ । তােমাদের আরও ভাবতে হবে যে, ঐ সমস্ত আলােকপ্রাপ্ত শুদ্ধচিত্ত মহান ব্যক্তিরাই কিন্তু তােমাদের তথা সমাজকে সঠিক পথনির্দেশ দিয়ে আলোকিত করতে পারবে। তােমরা ঐ কথাটা ভাবছো না কেনো যে, যাঁরা সমাজকে সঠিক পথনির্দেশ দিয়ে সামগ্রিকভাবে সামাজিক মঙ্গল আনবেন, সেই সামাজিক মঙ্গলের পথে যে অন্তরায়গুলি আছে, তাও তাঁদেরই দূর করতে হবে ।
ঐ অন্তরায়গুলি হল এ সমস্ত অপরাধীদের জঘন্যতম কার্যাবলী । তাই প্রথমেই তাঁদের ঐ বিপথগামী অপরাধীদের শুদ্ধিকরণ করতে হবে এবং তারপরই তাঁদের পথনির্দেশেই সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল আসবে
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ, আসলে এ পর্যন্ত আমরা যে ধারণাগুলি পােষণ করে আসছি, তা-হল শুদ্ধিকরণের পথে যে অন্তরায়গুলি আছে, তা কেবল রাষ্ট্রগুলির দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে এবং এখনও তাই ভাবছি। আর এই কারণেই আমাদের মধ্যে ঐ ধরণের একটা আশংকাজনিত সংশয় ছিল এবং আছে। এটা আমাদের আস্থার ওপর অনাস্থা নয়।
মীমাংসা :— হ্যাঁ, এটা তােমাদের মনে হতে পারে, তবে এখন তােমরা সেই ধারণাকে পরিবর্তন করে নিতে পারো, কারণ কোন রাষ্ট্রের পক্ষেই সেই অন্তরায়গুলি দূর করা সম্ভব নয়–এ বিষয়টা এখন তােমাদের পরিষ্কার করে নিতে হবে। কারণ রাষ্ট্র কেবল তাদের শরীরকে স্পর্শ করতে শাস্তি দিতে পারে—ব্যক্তিসত্তা ও জীবাত্মাকে স্পর্শ বা শাস্তি দিতে পারে না। যেহেতু এই অন্তরায়গুলি কিছু সময় বিরতির পর মাঝে মাঝেই সংঘটিত হবে, সেইহেতু অন্তরায়গুলি সমাজ ও রাষ্ট্রের মঙ্গলের পক্ষে বাধাস্বরূপ হবে । আর এখন এই বিষয়টা পরিষ্কার যে, কেবলমাত্র – ঐ শুদ্ধচিত্ত, সত্যনিষ্ঠ, সর্বত্যাগী ব্যক্তিরাই সেই অন্তরায়গুলি দূর করতে সমর্থ হবেন এবং সামাজিক মঙ্গলের পথে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অন্তরায়গুলিও দূরীভূত করতে পারবেন ।
জিজ্ঞাসা :— মহারাজ, এখন আমাদের মনে হয় রাষ্ট্রের উচিত ঐ সমস্ত বিপথগামী ও পথভ্রষ্টদের একটা জায়গায় আবদ্ধ করে রাখা এবং সমাজপতিদের উচিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জায়গায় যে সমস্ত মহৎ প্রতিষ্ঠানগুলি ছড়িয়ে আছে, তাদের অধিকারীবৃন্দ তথা আলােকপ্রাপ্ত, প্রজ্ঞাবান ও দেবর্ষিভাবযুক্ত ব্যক্তিদের অনুরােধ করে ঐ সমস্ত পথভ্রষ্টদের শুদ্ধিকরণের দায়িত্ব দেওয়া। এইভাবে এই শুদ্ধিকরণের ফলে ঐ সমস্ত বিপথগামীদের কার্যাবলী যা নাকি সামাজিক মঙ্গলের পথে বিঘ্নস্বরূপ, তা দূরীভূত হয়ে সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল ও অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করবে। আমাদের মনে হয়, এটাই সঠিক পথ ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এখন যেভাবে চলছে সে ভাবে নয়। আমাদের ধারণা কি ঠিক ?
মীমাংসা :– তােমাদের ধারণা ঠিক এবং এটাই সঠিক পথ ।
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ, এখন আমাদের সংক্ষেপে বলুন, মানবজাতি কিভাবে তাদের দুঃখ-কষ্টকে অতিক্রম করতে পারে ?
মীমাংসা :– আমার মতে সমগ্র মানবজাতি একে অপরের যা পরস্পর পরস্পরের প্রতি মন-প্রাণ ও সমস্ত শক্তি দিয়ে সাহায্য ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে আর তা দিতে হবে আত্মসুখ বাদ দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে এবং এটা করে যেতে হবে শরীর ছাড়ার আগে পর্যন্ত। … [ক্রমশঃ]
স্বামীজী তাঁর শিষ্যদের কাছে এটাও বলেছিলেন যে, তাঁর মায়ের মৃতদেহের সঙ্গে ঐ বয়সেই তাঁকে শ্মশান ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁকে দিয়ে মায়ের মুখাগ্নি বা ঐ ধরণের কাজও করানো হয়েছিল। চিতায় আগুন ধরানোর পর _তাঁর বয়স কম বলে তাঁকে চিতার আগুনের কাছে থেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু দূর থেকে ওই বালক চিতার অগ্নিশিখা লক্ষ্য রাখছিলেন এবং তিনি দেখছিলেন যে _তাঁর মায়ের সুন্দর মুখটি আগুনে পুড়ে কিভাবে ধীরে ধীরে কালো হয়ে যাচ্ছে ! এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে সেই বালক, সেখানেই অচৈতন্য হয়ে পড়েন । এরপর তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন বটে কিন্তু কিছুতেই তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছিলেন না। মায়ের মৃত্যুর পর বালক যেন একটা উদ্দেশ্যহীন জীবন যাপন করতে থাকেন __দিনের অধিকাংশ সময় তিনি ব্যাট নিয়ে বা বল নিয়ে খেলা করতেন। মায়ের মৃত্যুর কিছু দিন পর __কিশোর বয়সেই ওই বালক, বাড়ির সকলের অজ্ঞাতে চিরদিনের মত গৃহত্যাগ করেন এবং একদল ভ্রাম্যমান সন্ন্যাসীর দলে যোগ দিয়ে তাঁদের সাথে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
ভারতীয় সন্ন্যাসীরা বিভিন্নভাবে তাদের জীবন যাপন করেন । তাদের কেউ কেউ লোকালয়ের মধ্যেই কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে কুটিয়া স্থাপন করে সাধন-ভজন করেন, কেউ উত্তরভারতে হিমালয়ের কোলে অবস্থিত গঙ্গা বা যমুনার তীরে অথবা মধ্যভারতে নর্মদার তীরে অর্থাৎ কোনো নির্জন স্থানে বসবাস করে যোগোভ্যাস বা ধ্যানাভ্যাস করেন, আবার অনেক সন্ন্যাসী পরম্পরা রয়েছে যাঁরা সারা জীবন ধরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন তীর্থে তীর্থে ভ্রমণ করেই জীবনটা কাটিয়ে দেন। স্বামী বাউলানন্দজী এইরকমই একদল ভ্রাম্যমান সন্ন্যাসীর দলে পড়েছিলেন।।(ক্রমশঃ)
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ, শুদ্ধচিত্ত মহান ব্যক্তিদের পক্ষে কি বিপথগামী অপরাধীদের শুদ্ধিকরণ করে তাদের উন্নততর মানসিক উত্তরণ ঘটানো সম্ভব ? এ বিষয়ে কিন্তু আমাদের একটু সংশয় আছে ।
মীমাংসা :– দ্যাখাে, তােমাদের নিজেদের অবস্থার ওপরই কিন্তু তোমাদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। এ সমস্ত বিপথগামীদের নিশ্চয়ই শুদ্ধিকরণ ও উন্নততর মানসিক উত্তরণ ঘটানাে সম্ভব, আর যদি সম্ভব না হয় তাহলে তােমরা যেমনটি ভাবছো ও সংশয় করছে—চাইলে ঐ শুদ্ধিকরণের ব্যাপারটা ঐ সব মহান ব্যক্তিদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে ছেড়ে দাও না। অন্যথায় শুধু পথভ্রষ্ট অপরাধীরাই নয়, তাদের সংস্পর্শ ও সান্নিধ্যে এসে বহু মানুষই ঐ ধরণের অপরাধ সংঘটিত করতে থাকবে—যার ফলস্বরূপ প্রকারান্তরে সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষে অমঙ্গল হবে। সেইসঙ্গে সেইসব অপরাধী মানুষদের শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে তাদের শরীরকে হত্যা করা হবে এবং এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। এর ফলস্বরূপ তােমাদের এবং সেই সঙ্গে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে যে সততা ও পবিত্রতার সদগুণ আছে, তার বিলুপ্তি ঘটবে এবং আস্তে আস্তে সামাজিক অবক্ষয় শুরু হয়ে যাবে।
প্রকৃতপক্ষে ঐ সমস্ত পবিত্র, শুদ্ধচিত্ত ও সত্যনিষ্ঠ মহান ব্যক্তিরাই কিন্তু ঐ অশুভ প্রভাবের আগমনকে দূরে সরিয়ে দিতে সমর্থ হবে। দ্যাখাে, ঐ উদ্দেশ্য নিয়েই কিন্তু বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঐ সব মহান প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে উঠছে আর ঐ প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকারীবৃন্দ যাঁরা, তাঁদের মধ্যে শুচিতা, পবিত্রতা, সাধুতা, ঔদার্য ও দেবর্ষিভাব রয়েছে। তাঁরাই কিন্তু দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করে ঐ সমস্ত বিপথগামী তথা পথভ্রষ্টদের শুদ্ধিকরণ করে উন্নততর মানসিক রূপান্তর ঘটাতে সমর্থ । তােমাদের আরও ভাবতে হবে যে, ঐ সমস্ত আলােকপ্রাপ্ত শুদ্ধচিত্ত মহান ব্যক্তিরাই কিন্তু তােমাদের তথা সমাজকে সঠিক পথনির্দেশ দিয়ে আলোকিত করতে পারবে। তােমরা ঐ কথাটা ভাবছো না কেনো যে, যাঁরা সমাজকে সঠিক পথনির্দেশ দিয়ে সামগ্রিকভাবে সামাজিক মঙ্গল আনবেন, সেই সামাজিক মঙ্গলের পথে যে অন্তরায়গুলি আছে, তাও তাঁদেরই দূর করতে হবে ।
ঐ অন্তরায়গুলি হল এ সমস্ত অপরাধীদের জঘন্যতম কার্যাবলী । তাই প্রথমেই তাঁদের ঐ বিপথগামী অপরাধীদের শুদ্ধিকরণ করতে হবে এবং তারপরই তাঁদের পথনির্দেশেই সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল আসবে
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ, আসলে এ পর্যন্ত আমরা যে ধারণাগুলি পােষণ করে আসছি, তা-হল শুদ্ধিকরণের পথে যে অন্তরায়গুলি আছে, তা কেবল রাষ্ট্রগুলির দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে এবং এখনও তাই ভাবছি। আর এই কারণেই আমাদের মধ্যে ঐ ধরণের একটা আশংকাজনিত সংশয় ছিল এবং আছে। এটা আমাদের আস্থার ওপর অনাস্থা নয়।
মীমাংসা :— হ্যাঁ, এটা তােমাদের মনে হতে পারে, তবে এখন তােমরা সেই ধারণাকে পরিবর্তন করে নিতে পারো, কারণ কোন রাষ্ট্রের পক্ষেই সেই অন্তরায়গুলি দূর করা সম্ভব নয়–এ বিষয়টা এখন তােমাদের পরিষ্কার করে নিতে হবে। কারণ রাষ্ট্র কেবল তাদের শরীরকে স্পর্শ করতে শাস্তি দিতে পারে—ব্যক্তিসত্তা ও জীবাত্মাকে স্পর্শ বা শাস্তি দিতে পারে না। যেহেতু এই অন্তরায়গুলি কিছু সময় বিরতির পর মাঝে মাঝেই সংঘটিত হবে, সেইহেতু অন্তরায়গুলি সমাজ ও রাষ্ট্রের মঙ্গলের পক্ষে বাধাস্বরূপ হবে । আর এখন এই বিষয়টা পরিষ্কার যে, কেবলমাত্র – ঐ শুদ্ধচিত্ত, সত্যনিষ্ঠ, সর্বত্যাগী ব্যক্তিরাই সেই অন্তরায়গুলি দূর করতে সমর্থ হবেন এবং সামাজিক মঙ্গলের পথে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অন্তরায়গুলিও দূরীভূত করতে পারবেন ।
জিজ্ঞাসা :— মহারাজ, এখন আমাদের মনে হয় রাষ্ট্রের উচিত ঐ সমস্ত বিপথগামী ও পথভ্রষ্টদের একটা জায়গায় আবদ্ধ করে রাখা এবং সমাজপতিদের উচিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জায়গায় যে সমস্ত মহৎ প্রতিষ্ঠানগুলি ছড়িয়ে আছে, তাদের অধিকারীবৃন্দ তথা আলােকপ্রাপ্ত, প্রজ্ঞাবান ও দেবর্ষিভাবযুক্ত ব্যক্তিদের অনুরােধ করে ঐ সমস্ত পথভ্রষ্টদের শুদ্ধিকরণের দায়িত্ব দেওয়া। এইভাবে এই শুদ্ধিকরণের ফলে ঐ সমস্ত বিপথগামীদের কার্যাবলী যা নাকি সামাজিক মঙ্গলের পথে বিঘ্নস্বরূপ, তা দূরীভূত হয়ে সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল ও অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করবে। আমাদের মনে হয়, এটাই সঠিক পথ ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এখন যেভাবে চলছে সে ভাবে নয়। আমাদের ধারণা কি ঠিক ?
মীমাংসা :– তােমাদের ধারণা ঠিক এবং এটাই সঠিক পথ ।
জিজ্ঞাসা :– মহারাজ, এখন আমাদের সংক্ষেপে বলুন, মানবজাতি কিভাবে তাদের দুঃখ-কষ্টকে অতিক্রম করতে পারে ?
মীমাংসা :– আমার মতে সমগ্র মানবজাতি একে অপরের যা পরস্পর পরস্পরের প্রতি মন-প্রাণ ও সমস্ত শক্তি দিয়ে সাহায্য ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে আর তা দিতে হবে আত্মসুখ বাদ দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে এবং এটা করে যেতে হবে শরীর ছাড়ার আগে পর্যন্ত। … [ক্রমশঃ]
