[ আগের দিন আমরা দেখেছিলাম যে দ্বিতীয়বার এর জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্বামী বাউলানন্দজী একা একাই বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।এক গ্রামে মার্কন্ডেশ্বরের মন্দিরে অবস্থানকালে স্বামীজি পরম সাধক রামতীর্থের জীবনী সম্বলিত একখানি বই হাতে পেয়েছিলেন!]
সেই বই থেকে তিনি(বাউলানন্দজী) জানতে পারেন যে রামতীর্থজী, পাঞ্জাবের লোক ছিলেন এবং তিনি একজন সুপ্রসিদ্ধ অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর মধ্যে বৈরাগ্য উদয় হওয়ায় তিনি তাঁর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে এবং স্ত্রী-সন্তান ত্যাগ করে হিমালয়ের গভীর বনাঞ্চলে গমন করেছিলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি একটি নির্জন গুহায় কঠোর তপস্যায় রত হয়েছিলেন । তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ব্রহ্মের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করা। কঠোর তপস্যার দ্বারা তিনি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলেন এবং সর্বত্র বিরাজমান ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করলেন। তিনি এক শরীরের সঙ্গে অন্য শরীরের কোন ভেদ বা পার্থক্য দেখতে পেতেন না। কারণ তিনি আর ভিন্ন শরীর দেখতেন না_ তিনি সকলের মধ্যেই ঈশ্বরকে দেখতে পেতেন ! হিমালয়ে সাধনকালে তাঁর গুহার সন্নিকটে আরও দুটি গুহা ছিল। এদের একটিতে একটা বিরাট সাপ বাস কোরতো এবং অন্যটিতে থাকতো একটি হিংস্র সিংহ। এই ভয়ঙ্কর সর্প এবং হিংস্র সিংহের আক্রমণের ভয়ে সেই গুহা গুলির কাছে যাওয়ার কোনো সাহস পেত না। কিন্তু এই নিয়ে রামতীর্থের কোনো সমস্যা ছিল না। তার আদৌ কোন ভয় লাগত না । ‘ভয়’ তখনই আসে যখন কেউ তার শরীর এবং ‘ভয়’_ এই ব্যাপারগুলি সম্বন্ধে সচেতন থাকে। রামতীর্থ কেবলমাত্র নিজের শরীর সম্বন্ধেই নয় সর্পটিৎএবং সিংহ বা অন্যান্য যে কোনো প্রানীর শরীরের সম্বন্ধে__ আর পাঁচজনের থেকে পৃথক দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে গিয়েছিলেন! তিনি দেখতেন যে আত্মাই সমগ্র জগতে ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছেন । সেই আত্মাই সর্প এবং সিংহের আকারে বিরাজ করছেন। ফলে তিনি তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকতেন এবং তারা রামতীর্থের আয়ত্তাধীন ছিলো। এরূপ এক উন্নত অবস্থা লাভ করেছিলেন রামতীর্থ।
রামতীর্থজী গঙ্গার ধারে বসে যখন গঙ্গা অবলোকন করতেন_ সেখানে তিনি গঙ্গার প্রতিটি জলকণার মধ্যে ঈশ্বরকে দর্শন করতেন। প্রবাহিত জলরাশি স্বর্গীয় কোন শক্তি ন্যায় তার কাছে প্রতীয়মান হোতো এবং তিনি অনুভব করতেন গঙ্গা যেন তাঁকে নীরব সংকেতে তার দিকে আহ্বান করছেন। তিনি বলতেন_’তাঁর নিজের জন্য এই পার্থিব শরীরের কোন প্রয়োজন নাই, অসংখ্য শরীরের মাধ্যমে সূর্য এবং চন্দ্র রশ্মির মাধ্যমে, বাতাস এবং তার প্রবাহের মাধ্যমে__ তিনি কাজ করতে পারবেন’! চতুস্পার্শের কোন কিছুর সঙ্গে তিনি নিজের কোনো প্রভেদ দেখতে পেতেন না।
তিনি এই সব অনুভূতি ও উপলব্ধির কথা একদিন একটা কাগজে লিখলেন এবং তার ভক্তদের অবগতির জন্য সেই লেখা কুটীরে রেখে, গঙ্গায় স্নান করতে নেমে গেলেন। সেদিন রামতীর্থ আর গঙ্গা থেকে উঠলেন না_ মা গঙ্গা তাঁর বক্ষে তাঁর এই প্রিয় সন্তানকে চিরকালের মতো রেখে দিলেন।
রামতীর্থের এই জীবন কাহিনী, স্বামী বাউলানন্দকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। যে প্রবল আগ্রহ নিয়ে রামতীর্থ তপস্যা করেছিলেন, যে পরম প্রাপ্তি তিনি লাভ করেছিলেন, যে সহজ উপায়ে তিনি গঙ্গায় মিশে গেলেন ___সমস্তই স্বামীজীর মনে গভীর রেখাপাত কোরলো। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তাঁর ব্যাকুলতা এরপর থেকেই তীব্র আকার ধারণ কোরলো। তিনি এত তীব্র সাধনায় মন দিলেন যে, স্নান-আহার- নিদ্রা- কোন কিছুই আর তাকে তার সাধন-পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতো না । তিনি বহু রাত্রি বিনিদ্র যাপন করেছিলেন_ ফলে তাঁর চক্ষু লাল হয়ে গিয়েছিল! খাদ্যের অভাবে তাঁর শরীর ভেঙে গিয়েছিল! তাঁর দেহ এমন একটা বিকট আকার ধারণ করেছিল যে, তিনি যখন নদীতে স্নান করতে যেতেন তখন তাঁকে দেখে গ্রামের লোকেরা ভয়ে দরজা বন্ধ করে দিতো।
এইভাবে দিন কেটে গেল _কিন্তু তবুও তাঁর ঈপ্সিত মাতৃদর্শন হলো না।
ফলে হতাশ হয়ে স্বামীজি ওই মার্কণ্ডেশ্বর মন্দিরে প্রবেশ করে সেখানে একটি ধারালো ছুরি দেখতে পেলেন এবং ভাবলেন যে ওই ছুরি দিয়ে তিনি তাঁর এই ব্যর্থ জীবন শেষ করে দেবেন। তিনি এই কাজ করতে উদ্যতও হয়েছিলেন, কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেই সময় তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়েন । তাঁর যখন চেতনা এলো_ তখন তিনি দেখলেন যে, একজন অপরিচিত ভক্ত একটা থালায় কিছু খাবার এবং পাত্রে জল নিয়ে তাঁর সামনে বসে আছে। ঐ ছেলেটি জানালো যে, মার্কন্ডদেব স্বপ্নে তার সামনে আবির্ভূত হয়ে আদেশ করেছেন যে_ মন্দিরে অবস্থানকারী স্বামীজীর জন্য আহার্য এবং পানীয় নিয়ে যেতে। তিনি স্বামীজীকে অন্ন গ্রহণ করার জন্য প্রার্থনা জানালেন । স্বামীজি যুবকটিকে চিনতেন না পরিচয় নিয়ে জানতে পারলেন সে স্থানীয় তাঁতির ঘরের ছেলে। ছেলেটি ওই খাবার গ্রহণ করার জন্য বারবার স্বামীজীকে অনুরোধ জানাতে লাগলো।
দীর্ঘদিন সাধনের মধ্যে কাটানোয় এবং প্রচন্ড মানসিক চাপ ভোগ করার পর স্বামীজি সেই ছেলেটির কথায় অনেকদিন পর প্রথম হাসলেন। তিনি অনুভব করলেন যে, ঈশ্বরের ইচ্ছা এটাই যে তার শরীর এখনো জীবিত থাকুক এবং ঈপ্সিত ফললাভের জন্য তাঁর সংগ্রাম তিনি এখনো চালিয়ে যান!
ফলে তিনি ভক্তটির আহার্য গ্রহণ করলেন। এরপর থেকে ঐ ভক্ত ছেলেটি স্বামীজীর শারীরিক অবস্থা দেখে_ স্বামীজীর শরীরের জোর ফিরে না আসা পর্যন্ত স্বামীজীকে সেবা-শুশ্রূষা করার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছিল! স্বামী বাউলানন্দ একটু সুস্থ হওয়ার পর ওই ভক্তটিকে প্রভূত আশীর্বাদ করে সেই স্থান ত্যাগ করে আবার সামনের দিকে এগিয়ে চললেন।( ক্রমশঃ)
*MESSAGE TO HUMANITY* [2]
~ _Swami Baulananda_
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
… এইভাবে, জ্ঞানবান প্রবঞ্চকদের সংস্পর্শে অাসায় তার জ্ঞানের যথার্থ ব্যবহার দ্বারা প্রবঞ্চকদের প্রগতির লক্ষ্য সিদ্ধ হচ্ছে । ঠিক একইভাবে একই পরিস্থিতিতে প্রেমকেও কাজে লাগানো যাবে । ফলে অপকর্ম বন্ধ হবে। এই প্রচেষ্টায় প্রেমিক ভালবাসা জাগিয়ে ওদের (যাদের হৃদয়বৃত্তি কম) প্রগতির লক্ষ্য সিদ্ধ করবে।
একই পদ্ধতিতে শক্তিকেও (muscle) কাজে লাগানো যায় যদি কেউ দুষ্কর্ম বন্ধ করার ব্যাপারে অংশ গ্রহণ করে। এইভাবে যাদের শক্তি কম তাদের ভেতর শক্তি বৃদ্ধি করে তাদের প্রগতির লক্ষ্য সিদ্ধ করা যায় ।
‘জ্ঞান’ শব্দটির অর্থ হল সম্যক উপলব্ধি । এর যথাযথ ব্যবহার অর্থাৎ সকলের উন্নতির জন্য নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, বাক্য এবং কর্মকে কাজে লাগানোই হল জ্ঞানের রূপ । যারা এই জ্ঞানের ব্যবহার করছে তাদের সঙ্গে অপর সকলেরও (অর্থাৎ যাদের মধ্যে এই জ্ঞানকে কাজে লাগানো হচ্ছে) উর্ধ্বপ্রগতি হচ্ছে ৷
সাধারণত প্রত্যেক মানুষের মধ্যে প্রেম,জ্ঞান এবং শক্তি—এই তিনটির যে কোন একটির প্রাধান্য দেখা যায় । কম ক্ষেত্রেই দুটির প্রাধান্য থাকে । কোন একজনের অধিক প্রেম থাকতে পারে। প্রেমের তাড়নায় সে এর যথাযথ ব্যবহার করে । প্রাধান্যবশতঃ প্রেম কোন ভাবমূর্তি পরিগ্রহ করার জন্য নিজেকে প্রকাশ করতে প্রয়াসী হয় । অর্থাৎ প্রেমের অভাবে যে সমস্থ ঘটনা ঘটে সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অনুভূতি, ভাবনা, বাক্য এবং কর্ম দ্বারা প্রেম নিজেকে প্রকাশ করে ।
এই পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে প্রেমিক ঘটনায় সংযুক্ত ব্যক্তিদের দোষগুণ ঠিকভাবে বুঝতে পারে না। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা হয়ে অপকর্ম বন্ধ করার চেষ্টা চালাবে। প্রেমিকের এই সংগ্রামের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য থাকে যা শক্তির উপসর্গগুলিকে আকর্ষণ করে নিজের সমর্থনে আনে। ফলে সে বিপক্ষদলকে বশীভূত করে । অপরপক্ষে, যখন জ্ঞানের প্রাধান্য দেখা যায় তখন ব্যক্তি ঘটনাটিকে যথাযথ উপলব্ধি করতে পারে কিন্তু প্রেমের অভাবে তার সেই জ্ঞান লোকের মধ্যে রূপ নিতে পারে না এবং প্রকাশিত হতে পারে না।
প্রগতি কি এবং কেমন করে তা লাভ করা যায় – এই জ্ঞান ব্যতিরেকে মানুষের মধ্যে সুখী এবং নিরাপদ হওয়ার প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও মানুষ অমানবিক মনোভাব এবং আচরণ প্রাপ্ত হয়েছিল । এট। সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং কাণ্ডজ্ঞান ক্রিয়া করতে শুরু করার আগের অবস্থা । ‘অহং ভাব’, ‘প্রজনন ক্ষমতা’ এবং ‘আমোদ প্রমোদ’—এই সমস্ত চিন্তাধারার বশবর্তী হয়ে মানুষ কেবল মাত্র অমানবীয় মনোভাবাপন্ন হয় এবং আচরণও করে সেইরূপ । এই ধরনের মানুষের কেবলমাত্র নিজের সুখ এবং নিরাপত্তার জন্য অনুরাগ থাকবে। এই অনুরাগ মানবোচিত নয়। এই ধরণের অনুরাগকে বলে আসক্তি বা অসহজ প্রেম । পূর্ব জীবনে তারা যদিও মানব শরীর পেয়েছিল, তথাপি তাদের মনোভাব, আচার-আচরণ এবং স্বভাব ছিল অমানবিক। পূর্ব জীবনের প্রবণতা বর্তমান জীবনে আসে। পূর্ব জীবনের সেই সংস্কারবশে বর্তমান জীবনের এই ‘অহং’, যা কাণ্ডজ্ঞানের বিরোধিতা করে । এ হল তাদের সর্বদা সুখী এবং নিরাপদ হওয়ার প্রবণতা এবং তাদের সুখ এবং নিরাপত্তার প্রতি যে আসক্তি তারই ধারাবাহিকতা। এই আসক্তি তাদের সামনে স্বার্থকে নিয়ে এসে হাজির করায়। আর এই স্বার্থ-ই তাদের বিচার-বুদ্ধিকে দমিয়ে রাখে। আবার, হৃদয়বৃত্তি যদি জ্ঞান এবং শক্তির উপর প্রভাবশালী না হয় তাহলে কাণ্ডজ্ঞান এবং সূক্ষ্ম শক্তি বা অনুভূতির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মানুষ ‘অহং’-এর দাস হয়ে থাকে। অর্থাৎ ‘অহং’ মানুষের উপর কর্তৃত্ব করে। এর পরিণাম আরও খারাপ হয় যখন কেবলমাত্র শক্তি অপর দুটি (প্রেম এবং জ্ঞান)-র উপর প্রভুত্ব করে । প্রেমের উপর জ্ঞান বা শক্তি অথবা জ্ঞান এবং শক্তি উভয়ের প্রাধান্য বহির্জগতের প্রগতির দিকে মানবকে পরিচালিত করে। কিন্তু যখন প্রেম প্রাধান্য লাভ তখন হৃদয়বান ব্যক্তির প্রবল ইচ্ছা (হৃদয়বান ব্যক্তির শক্তি বা জ্ঞান না থাকলেও) জ্ঞানবান এবং শক্তিবান লোককে তার সংস্পর্শে নিয়ে অাসে। পরিশেষে জ্ঞানবান এবং শক্তিবান লােক প্রেমিক লোকের বশীভূত হয়। এইভাবে প্রেম____ জ্ঞান এবং শক্তির প্রভু হয় । … [ক্রমশঃ]
সেই বই থেকে তিনি(বাউলানন্দজী) জানতে পারেন যে রামতীর্থজী, পাঞ্জাবের লোক ছিলেন এবং তিনি একজন সুপ্রসিদ্ধ অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর মধ্যে বৈরাগ্য উদয় হওয়ায় তিনি তাঁর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে এবং স্ত্রী-সন্তান ত্যাগ করে হিমালয়ের গভীর বনাঞ্চলে গমন করেছিলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি একটি নির্জন গুহায় কঠোর তপস্যায় রত হয়েছিলেন । তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ব্রহ্মের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করা। কঠোর তপস্যার দ্বারা তিনি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলেন এবং সর্বত্র বিরাজমান ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করলেন। তিনি এক শরীরের সঙ্গে অন্য শরীরের কোন ভেদ বা পার্থক্য দেখতে পেতেন না। কারণ তিনি আর ভিন্ন শরীর দেখতেন না_ তিনি সকলের মধ্যেই ঈশ্বরকে দেখতে পেতেন ! হিমালয়ে সাধনকালে তাঁর গুহার সন্নিকটে আরও দুটি গুহা ছিল। এদের একটিতে একটা বিরাট সাপ বাস কোরতো এবং অন্যটিতে থাকতো একটি হিংস্র সিংহ। এই ভয়ঙ্কর সর্প এবং হিংস্র সিংহের আক্রমণের ভয়ে সেই গুহা গুলির কাছে যাওয়ার কোনো সাহস পেত না। কিন্তু এই নিয়ে রামতীর্থের কোনো সমস্যা ছিল না। তার আদৌ কোন ভয় লাগত না । ‘ভয়’ তখনই আসে যখন কেউ তার শরীর এবং ‘ভয়’_ এই ব্যাপারগুলি সম্বন্ধে সচেতন থাকে। রামতীর্থ কেবলমাত্র নিজের শরীর সম্বন্ধেই নয় সর্পটিৎএবং সিংহ বা অন্যান্য যে কোনো প্রানীর শরীরের সম্বন্ধে__ আর পাঁচজনের থেকে পৃথক দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে গিয়েছিলেন! তিনি দেখতেন যে আত্মাই সমগ্র জগতে ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছেন । সেই আত্মাই সর্প এবং সিংহের আকারে বিরাজ করছেন। ফলে তিনি তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকতেন এবং তারা রামতীর্থের আয়ত্তাধীন ছিলো। এরূপ এক উন্নত অবস্থা লাভ করেছিলেন রামতীর্থ।
রামতীর্থজী গঙ্গার ধারে বসে যখন গঙ্গা অবলোকন করতেন_ সেখানে তিনি গঙ্গার প্রতিটি জলকণার মধ্যে ঈশ্বরকে দর্শন করতেন। প্রবাহিত জলরাশি স্বর্গীয় কোন শক্তি ন্যায় তার কাছে প্রতীয়মান হোতো এবং তিনি অনুভব করতেন গঙ্গা যেন তাঁকে নীরব সংকেতে তার দিকে আহ্বান করছেন। তিনি বলতেন_’তাঁর নিজের জন্য এই পার্থিব শরীরের কোন প্রয়োজন নাই, অসংখ্য শরীরের মাধ্যমে সূর্য এবং চন্দ্র রশ্মির মাধ্যমে, বাতাস এবং তার প্রবাহের মাধ্যমে__ তিনি কাজ করতে পারবেন’! চতুস্পার্শের কোন কিছুর সঙ্গে তিনি নিজের কোনো প্রভেদ দেখতে পেতেন না।
তিনি এই সব অনুভূতি ও উপলব্ধির কথা একদিন একটা কাগজে লিখলেন এবং তার ভক্তদের অবগতির জন্য সেই লেখা কুটীরে রেখে, গঙ্গায় স্নান করতে নেমে গেলেন। সেদিন রামতীর্থ আর গঙ্গা থেকে উঠলেন না_ মা গঙ্গা তাঁর বক্ষে তাঁর এই প্রিয় সন্তানকে চিরকালের মতো রেখে দিলেন।
রামতীর্থের এই জীবন কাহিনী, স্বামী বাউলানন্দকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। যে প্রবল আগ্রহ নিয়ে রামতীর্থ তপস্যা করেছিলেন, যে পরম প্রাপ্তি তিনি লাভ করেছিলেন, যে সহজ উপায়ে তিনি গঙ্গায় মিশে গেলেন ___সমস্তই স্বামীজীর মনে গভীর রেখাপাত কোরলো। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তাঁর ব্যাকুলতা এরপর থেকেই তীব্র আকার ধারণ কোরলো। তিনি এত তীব্র সাধনায় মন দিলেন যে, স্নান-আহার- নিদ্রা- কোন কিছুই আর তাকে তার সাধন-পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতো না । তিনি বহু রাত্রি বিনিদ্র যাপন করেছিলেন_ ফলে তাঁর চক্ষু লাল হয়ে গিয়েছিল! খাদ্যের অভাবে তাঁর শরীর ভেঙে গিয়েছিল! তাঁর দেহ এমন একটা বিকট আকার ধারণ করেছিল যে, তিনি যখন নদীতে স্নান করতে যেতেন তখন তাঁকে দেখে গ্রামের লোকেরা ভয়ে দরজা বন্ধ করে দিতো।
এইভাবে দিন কেটে গেল _কিন্তু তবুও তাঁর ঈপ্সিত মাতৃদর্শন হলো না।
ফলে হতাশ হয়ে স্বামীজি ওই মার্কণ্ডেশ্বর মন্দিরে প্রবেশ করে সেখানে একটি ধারালো ছুরি দেখতে পেলেন এবং ভাবলেন যে ওই ছুরি দিয়ে তিনি তাঁর এই ব্যর্থ জীবন শেষ করে দেবেন। তিনি এই কাজ করতে উদ্যতও হয়েছিলেন, কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেই সময় তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়েন । তাঁর যখন চেতনা এলো_ তখন তিনি দেখলেন যে, একজন অপরিচিত ভক্ত একটা থালায় কিছু খাবার এবং পাত্রে জল নিয়ে তাঁর সামনে বসে আছে। ঐ ছেলেটি জানালো যে, মার্কন্ডদেব স্বপ্নে তার সামনে আবির্ভূত হয়ে আদেশ করেছেন যে_ মন্দিরে অবস্থানকারী স্বামীজীর জন্য আহার্য এবং পানীয় নিয়ে যেতে। তিনি স্বামীজীকে অন্ন গ্রহণ করার জন্য প্রার্থনা জানালেন । স্বামীজি যুবকটিকে চিনতেন না পরিচয় নিয়ে জানতে পারলেন সে স্থানীয় তাঁতির ঘরের ছেলে। ছেলেটি ওই খাবার গ্রহণ করার জন্য বারবার স্বামীজীকে অনুরোধ জানাতে লাগলো।
দীর্ঘদিন সাধনের মধ্যে কাটানোয় এবং প্রচন্ড মানসিক চাপ ভোগ করার পর স্বামীজি সেই ছেলেটির কথায় অনেকদিন পর প্রথম হাসলেন। তিনি অনুভব করলেন যে, ঈশ্বরের ইচ্ছা এটাই যে তার শরীর এখনো জীবিত থাকুক এবং ঈপ্সিত ফললাভের জন্য তাঁর সংগ্রাম তিনি এখনো চালিয়ে যান!
ফলে তিনি ভক্তটির আহার্য গ্রহণ করলেন। এরপর থেকে ঐ ভক্ত ছেলেটি স্বামীজীর শারীরিক অবস্থা দেখে_ স্বামীজীর শরীরের জোর ফিরে না আসা পর্যন্ত স্বামীজীকে সেবা-শুশ্রূষা করার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছিল! স্বামী বাউলানন্দ একটু সুস্থ হওয়ার পর ওই ভক্তটিকে প্রভূত আশীর্বাদ করে সেই স্থান ত্যাগ করে আবার সামনের দিকে এগিয়ে চললেন।( ক্রমশঃ)
*MESSAGE TO HUMANITY* [2]
~ _Swami Baulananda_
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
… এইভাবে, জ্ঞানবান প্রবঞ্চকদের সংস্পর্শে অাসায় তার জ্ঞানের যথার্থ ব্যবহার দ্বারা প্রবঞ্চকদের প্রগতির লক্ষ্য সিদ্ধ হচ্ছে । ঠিক একইভাবে একই পরিস্থিতিতে প্রেমকেও কাজে লাগানো যাবে । ফলে অপকর্ম বন্ধ হবে। এই প্রচেষ্টায় প্রেমিক ভালবাসা জাগিয়ে ওদের (যাদের হৃদয়বৃত্তি কম) প্রগতির লক্ষ্য সিদ্ধ করবে।
একই পদ্ধতিতে শক্তিকেও (muscle) কাজে লাগানো যায় যদি কেউ দুষ্কর্ম বন্ধ করার ব্যাপারে অংশ গ্রহণ করে। এইভাবে যাদের শক্তি কম তাদের ভেতর শক্তি বৃদ্ধি করে তাদের প্রগতির লক্ষ্য সিদ্ধ করা যায় ।
‘জ্ঞান’ শব্দটির অর্থ হল সম্যক উপলব্ধি । এর যথাযথ ব্যবহার অর্থাৎ সকলের উন্নতির জন্য নিজের অনুভূতি, চিন্তাধারা, বাক্য এবং কর্মকে কাজে লাগানোই হল জ্ঞানের রূপ । যারা এই জ্ঞানের ব্যবহার করছে তাদের সঙ্গে অপর সকলেরও (অর্থাৎ যাদের মধ্যে এই জ্ঞানকে কাজে লাগানো হচ্ছে) উর্ধ্বপ্রগতি হচ্ছে ৷
সাধারণত প্রত্যেক মানুষের মধ্যে প্রেম,জ্ঞান এবং শক্তি—এই তিনটির যে কোন একটির প্রাধান্য দেখা যায় । কম ক্ষেত্রেই দুটির প্রাধান্য থাকে । কোন একজনের অধিক প্রেম থাকতে পারে। প্রেমের তাড়নায় সে এর যথাযথ ব্যবহার করে । প্রাধান্যবশতঃ প্রেম কোন ভাবমূর্তি পরিগ্রহ করার জন্য নিজেকে প্রকাশ করতে প্রয়াসী হয় । অর্থাৎ প্রেমের অভাবে যে সমস্থ ঘটনা ঘটে সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অনুভূতি, ভাবনা, বাক্য এবং কর্ম দ্বারা প্রেম নিজেকে প্রকাশ করে ।
এই পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে প্রেমিক ঘটনায় সংযুক্ত ব্যক্তিদের দোষগুণ ঠিকভাবে বুঝতে পারে না। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা হয়ে অপকর্ম বন্ধ করার চেষ্টা চালাবে। প্রেমিকের এই সংগ্রামের মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য থাকে যা শক্তির উপসর্গগুলিকে আকর্ষণ করে নিজের সমর্থনে আনে। ফলে সে বিপক্ষদলকে বশীভূত করে । অপরপক্ষে, যখন জ্ঞানের প্রাধান্য দেখা যায় তখন ব্যক্তি ঘটনাটিকে যথাযথ উপলব্ধি করতে পারে কিন্তু প্রেমের অভাবে তার সেই জ্ঞান লোকের মধ্যে রূপ নিতে পারে না এবং প্রকাশিত হতে পারে না।
প্রগতি কি এবং কেমন করে তা লাভ করা যায় – এই জ্ঞান ব্যতিরেকে মানুষের মধ্যে সুখী এবং নিরাপদ হওয়ার প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও মানুষ অমানবিক মনোভাব এবং আচরণ প্রাপ্ত হয়েছিল । এট। সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং কাণ্ডজ্ঞান ক্রিয়া করতে শুরু করার আগের অবস্থা । ‘অহং ভাব’, ‘প্রজনন ক্ষমতা’ এবং ‘আমোদ প্রমোদ’—এই সমস্ত চিন্তাধারার বশবর্তী হয়ে মানুষ কেবল মাত্র অমানবীয় মনোভাবাপন্ন হয় এবং আচরণও করে সেইরূপ । এই ধরনের মানুষের কেবলমাত্র নিজের সুখ এবং নিরাপত্তার জন্য অনুরাগ থাকবে। এই অনুরাগ মানবোচিত নয়। এই ধরণের অনুরাগকে বলে আসক্তি বা অসহজ প্রেম । পূর্ব জীবনে তারা যদিও মানব শরীর পেয়েছিল, তথাপি তাদের মনোভাব, আচার-আচরণ এবং স্বভাব ছিল অমানবিক। পূর্ব জীবনের প্রবণতা বর্তমান জীবনে আসে। পূর্ব জীবনের সেই সংস্কারবশে বর্তমান জীবনের এই ‘অহং’, যা কাণ্ডজ্ঞানের বিরোধিতা করে । এ হল তাদের সর্বদা সুখী এবং নিরাপদ হওয়ার প্রবণতা এবং তাদের সুখ এবং নিরাপত্তার প্রতি যে আসক্তি তারই ধারাবাহিকতা। এই আসক্তি তাদের সামনে স্বার্থকে নিয়ে এসে হাজির করায়। আর এই স্বার্থ-ই তাদের বিচার-বুদ্ধিকে দমিয়ে রাখে। আবার, হৃদয়বৃত্তি যদি জ্ঞান এবং শক্তির উপর প্রভাবশালী না হয় তাহলে কাণ্ডজ্ঞান এবং সূক্ষ্ম শক্তি বা অনুভূতির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মানুষ ‘অহং’-এর দাস হয়ে থাকে। অর্থাৎ ‘অহং’ মানুষের উপর কর্তৃত্ব করে। এর পরিণাম আরও খারাপ হয় যখন কেবলমাত্র শক্তি অপর দুটি (প্রেম এবং জ্ঞান)-র উপর প্রভুত্ব করে । প্রেমের উপর জ্ঞান বা শক্তি অথবা জ্ঞান এবং শক্তি উভয়ের প্রাধান্য বহির্জগতের প্রগতির দিকে মানবকে পরিচালিত করে। কিন্তু যখন প্রেম প্রাধান্য লাভ তখন হৃদয়বান ব্যক্তির প্রবল ইচ্ছা (হৃদয়বান ব্যক্তির শক্তি বা জ্ঞান না থাকলেও) জ্ঞানবান এবং শক্তিবান লোককে তার সংস্পর্শে নিয়ে অাসে। পরিশেষে জ্ঞানবান এবং শক্তিবান লােক প্রেমিক লোকের বশীভূত হয়। এইভাবে প্রেম____ জ্ঞান এবং শক্তির প্রভু হয় । … [ক্রমশঃ]
