স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। রাজমন্দ্রিতে পৌঁছানোর পূর্বে স্বামীজী অন্ধ্রপ্রদেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ঘুরে বেরিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি মছলিপত্তনম্ এলাকায় সমুদ্রতীরবর্তী গ্রাম গুলিতেও গেছিলেন। ওইসব অঞ্চলে সমুদ্রের তীর বরাবর তখন কাসুরাণা বৃক্ষরাজি বিরাজ কোরতো। এই বৃক্ষরাজির লম্বা লম্বা চুলের মত শাখা পল্লবের মধ্যে দিয়ে সমুদ্রের হাওয়া যখন বয়ে চলতো_ তখন যেন মনে হতো ওংকারের তালে তালে হাওয়া বইছে। এই শব্দ স্বামীজীকে খুব আকর্ষণ করেছিল। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এ ওংকারের ছন্দ স্বামীজীর মনে পুলক সৃষ্টি করেছিল। তিনি শরীরের কথা ভুলে ওই কাসুরাণা বৃক্ষরাজির ভিতর দিয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। প্রায় এক সপ্তাহ এইভাবে ওংকার ধ্বনির মধ্যে থাকার পর তিনি একটি গ্রামে গিয়ে বিশ্রাম নিয়েছিলেন।
ওই অঞ্চলের বৃক্ষরাজির অপার্থিব শব্দ, সমুদ্রের ঢেউয়ের‌ উপর পড়া উজ্জ্বল চন্দ্রকিরণ_ স্বামীজীর মনে খুবই পুলক জাগাতো এবং বারবার তাঁকে প্রকৃতির কোলে টেনে নিয়ে যেতো। তাঁর মন প্রকৃতিতে নিমগ্ন হয়ে যেতো এবং ঐ অবস্থায় তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলতেন। ঐ সময় স্বামীজি সবসময় গভীর চিন্তামগ্ন অবস্থায় থাকতেন। নিজের সুবিধার জন্য তিনি তখন এমন একটা স্থান খুঁজতে লাগলেন_ যেখানে তিনি নিরিবিলিতে বসে ধ্যান করতে পারবেন। তখন গোদাবরীর উভয় তীরেই বেশিরভাগ অঞ্চল বনাকীর্ণ ছিল । তবে এর তীরবর্তী কিছু কিছু জায়গা তীর্থস্থান বলে বিবেচিত হোত। যেহেতু সেইসব স্থানে অতীতে বহু বড় বড় সাধক বাস করতেন _তাই স্বামীজীর সেইসব স্থান দর্শন করার ইচ্ছা হোল । এইজন্য তিনি ওখানকার একটি প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র “ভদ্রাচলম্” চলে এলেন । এই স্থান রাজমন্দ্রি হতে প্রায় 100 মাইল দূরে । নদীপথ‌ই একমাত্র রাস্তা কিছু লঞ্চ এবং নৌকা নদীতে যাতায়াত করতো। লঞ্চ যোগে পৌঁছুতে তখন তিন-চারদিন সময় লাগতো, তবে লঞ্চের ভাড়া ও ছিল অনেক বেশি। অন্য যানের মধ্যে ছিল নৌকা । পাল এর সাহায্যে নৌকা চলতো। যখন হাওয়া অনুকূলে থাকতো তখনই একমাত্র নৌকা চলতো। নৌকা যোগে ভদ্রাচলম্ পৌঁছুতে 10 দিন সময় লাগতো। স্বামীজি সাধারণত হেঁটে হেঁটে নদীর ধার ধরে ওই পথে যাচ্ছিলেন। যেখানে বন জঙ্গলের জন্য হাঁটা পথে যাওয়া যেতোনা _ সেখানে তিনি কোনো নৌকায় উঠে পড়তেন। পথে কোনো গ্রামে মন্দির থাকলে সেখানে রাতের মতো বিশ্রাম নিয়ে আবার চলা শুরু করতেন।
একবার স্বামীজি নৌকায় করে “পোচাভরম্”-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন! তখন ছিল গ্রীষ্মকালীন পূর্ণিমা রাত্রি! সমগ্র নদীতটে বালির চড়ায় সেই জোছনা পড়েছে! মনে হচ্ছিল_চন্দ্রের উজ্জ্বল জোছনায় সমগ্র বালুচর যেন রূপোর আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে দিয়েছে! দূরে সবুজ বৃক্ষে ঢাকা পাহাড়, রজতাচ্ছাদিত বালুকারাশি, প্রবহমান জলের কুলুধ্বনি এবং পিছনে সবুজ পাহাড়__ এমন অপার্থিব সুন্দর দৃশ্য দেখে স্বামীজীর মন ভরে উঠলো! স্বামীজি এই স্থানে নেমে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলেন ! তিনি মাঝিকে থামতে বললেন কিন্তু মাঝি তাঁর কথা শুনলো না। নৌকা পাল তুলে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে এবং সময় হঠাৎ করে একদল শৃগাল বালির চড়ার উপর দিয়ে দৌড়ে নদীতে জল পান করতে এলো। উজ্জ্বল বালুচরের উপর সেই ধাবমান পশুগুলির সারি রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির উপর যেন আরো সৌন্দর্য সৃষ্টি করলো। পিপাসা নিবারণের পর শৃগালের দল চিৎকার করে, মারামারি করে_ খেলা করতে লাগলো এবং তারা এই ভাবেই আনন্দ করতে লাগলো! স্বামীজী জিদ ধরলেন যে, তাঁকে সেখানেই নামিয়ে দেওয়া হোক্ ! অশেষ পীড়াপীড়িতে মাঝি রাজি হোল_ স্বামীজি তাঁর ভ্রমণের একমাত্র সঙ্গী নোট বই এবং পেন্সিল নিয়ে সেই স্থানে নেমে পড়লেন। রুপোর মতো উজ্জ্বল বালুচরের উপর দিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন। চড়ার মাঝখানে গিয়ে তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলেন। তিনি দেখলেন শৃগালের দল তাঁকে দেখে ভয় পেলোনা, তারা আরও কিছুক্ষণ খেলা করার পর ধীরে ধীরে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। স্বামীজি সেই জ্যোৎস্নালোকিত নদীর চড়ায় একাকী বসে বসে মহাবিশ্বপ্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলেন !(ক্রমশঃ)
========================
*MESSAGE TO HUMANITY*
~ _Swami Baulananda_
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
সত্তার চিন্তা-ভাবনা ও কার্যের মাধ্যমে মনে যে চাপ পড়ে তার সমষ্টিকে সত্তার ‘অহং’ বলে । সত্তার এই অহং-কে এই পাঠে ‘ব্যক্তি অহং’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে । যে পদ্ধতিতে বিশ্ব সত্তা সমস্ত পর্যায়ের ব্যক্তিসত্তায় পরিণত হয় সেই পদ্ধতিতে বিশ্ব সত্তার দ্বারা স্বতন্ত্রীকরনের ফলে সতর্কতার এই অহং তার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য না হারিয়ে ‘ব্যক্তিবিশ্ব-অহং’_এর সাথে এক হয়ে যায়। সত্তা বলতে মন এবং অহং এর সংযোগকে বোঝায়। বিশ্ব অহং-এর গঠন(যে পদ্ধতিতে সর্বেসর্বা বিশ্বমন রূপে প্রকাশিত হন)এবং মন ও ওই অহং-এর সংযোগকে বিশ্বসত্তা বলে। ‘ব্যক্তিবিশ্ব-অহং’-এর গঠন (যে পদ্ধতিতে বিশ্বমন ব্যক্তিমন রূপে প্রকাশিত হন) এবং ঐ মন ও অহং-এর সংযোগে ব্যক্তিসত্তার সৃষ্টি হয় । ব্যক্তিসত্তার ততক্ষণই অস্তিত্ব থাকে_ যতক্ষণ এই সংযোগের অস্তিত্ব থাকে । যতক্ষণ এই সংযোগ বর্তমান থাকে ততক্ষণ বিশ্বসত্তাও বর্তমান থাকে। অমানবীয় সত্তার অহং-এর মধ্যে যে সম্মিলিত সংস্কার থাকে, সেই সংস্কারের মধ্যে অমানবীয় সত্তার প্রবৃত্তি বিদ্যমান থাকে।ব্যক্তি অহং(যা নিজ নিজ স্বত্বায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য না হারিয়ে বিশ্ব অহং-এর সাথে একীভূত হয়)_এর মধ্যে অমানবীয় সত্তার প্রবৃত্তি বিদ্যমান থাকে, যদিও তা সাধারণ শক্তি এবং কান্ডজ্ঞান মানুষের পর্যায়ে আসে।
মানবীয় সত্তা রূপে কাজ করবার জন্য এখানেই মানব জীবনে কাণ্ডজ্ঞানের প্রয়োজন এসে পড়ে। কান্ডজ্ঞান আদর্শ মানের মানবীয় সচেতনতার মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকে। সেজন্য কান্ডজ্ঞান ইঙ্গিত সূচক বা সংকেত পূর্ণ। এটি সত্তাকে ‘মানবসত্তা রূপে কি করতে হবে’ বা ‘কি করতে হবে না’_ তার ইঙ্গিত দেয় । নিজ নিজ সত্তার সঙ্গে একীভূত হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তি অহং নিজ নিজ সত্তায় পুরোপুরি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য রাখে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সত্তা কান্ডজ্ঞান সম্পর্কে সতর্ক হয়, এটি ব্যক্তির শরীরে সৃজনাত্মক ও প্রজননাত্মক চেতনাকে পরিচালিত করে। কান্ডজ্ঞান সম্বন্ধে ব্যক্তি সতর্ক হতে চাইলেও তার আচার-আচরণ এবং স্বভাব তার মধ্যে রয়ে যায়।
যথাযথ কার্যকরী সূক্ষ্ম চেতনা যুক্ত হয়ে মানব তার কান্ডজ্ঞান সম্বন্ধে সতর্ক হয়। এই সূক্ষ্ম চেতনাই ব্যক্তি অহং-কে ব্যক্তির বশীভূত করার জন্য উন্মুখ হয়। এই কাজে সক্ষম‌ও হয়। ব্যক্তি অহং ব্যক্তির বশীভূত হওয়ার ফলে ব্যক্তি অহং-এর অমানবীয় প্রবৃত্তি মানবীয় প্রবৃত্তিতে রূপান্তরিত হয়। মানবীয় প্রবৃত্তি পেয়ে ব্যক্তি অহং ঊর্ধ্বমুখী হয়। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃত্তি নিয়ে ব্যক্তি অহং মানবের মতো কাজ করে । অহং-এর এই বশবর্তীতা মানবকে আদর্শ মানের মানবীয় সচেতনতা অনুযায়ী কাজ করতে সমর্থ করে তোলে । কান্ডজ্ঞানের দ্বারা যে বিষয়,বস্তু উপলব্ধ হয়না সুক্ষ্ণ চেতনা তা জানে এবং উপলব্ধি করে । এই মানবীয় সত্তা ঊর্ধ্বমুখী হয় । তাদের অহং ঊর্ধ্বমুখী হয়। তারা কাণ্ডজ্ঞানের সঙ্গে সুসমঞ্জস হয়।
মানব কান্ডজ্ঞান এর সঙ্গে সুসমঞ্জস হয়ে, সুক্ষ্ণ চেতনার সাহায্য নিয়ে তাদের অহংকে পরিচালিত করে এবং অহং সৃজনাত্মক এবং প্রজননাত্মক চেতনাকে ঊর্ধ্বপ্রগতির দিকে পরিচালিত করে। অমানবীয় প্রবৃত্তিযুক্ত ব্যক্তি অহং এতক্ষণ পর্যন্ত উর্দ্ধগতির বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল । এখন হতে মানব প্রবৃত্তিযুক্ত সত্তার কর্তা হয়ে দাঁড়ায়। ঊর্ধ্ব প্রগতির জন্য তাদের সংস্কার গত প্রবণতা এবং প্রচেষ্টা পূরণে সুসমঞ্জস সৃজনাত্মক এবং প্রজননাত্মক চেতনাকে পরিচালিত করে ।
এইভাবে চিন্তা ভাবনা এবং কার্যের দ্বারা সৃষ্ট মনের যে ছাপ তা কোনো এক স্থানে এসে একের পর এক বিনষ্ট হয় এবং অহং তার ব্যক্তি স্বত্তা হারিয়ে ফেলে।
উদাহরণস্বরূপ পাত্রে জল আছে বললে পাত্রের অস্তিত্ব পূর্ব হতেই বর্তমান থাকতে হয়। মৃত্তিকা দিয়ে পাত্র তৈরি করতে হলে জলের অস্তিত্ব পূর্ব হতেই বর্তমান থাকতে হবে। জল এবং মৃত্তিকার সংযোগে পাত্রটি অস্তিত্ব লাভ করে। মৃত্তিকা পাত্রে পরিণত হতে হলে জলকে মৃত্তিকার সঙ্গে সংযুক্ত হতে হচ্ছে । মৃত্তিকার সঙ্গে জল যুক্ত না হলে পাত্র অস্তিত্ব লাভ করতে পারছে না । সুতরাং পাত্রকে তার বৈশিষ্ট্য রাখতে গেলে তার সঙ্গে জল দরকার।
ঠিক এইরকম ব্যক্তিসত্তা রূপে বিশ্ব সত্তার প্রকাশ হয় । এইভাবে বিশ্ব সত্তার দ্বারা বিশ্ব সত্তা তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য পায়। এইরূপে বিশ্ব মন এবং বিশ্ব অহং-এর সংযোগ হয় এবং ব্যক্তিসত্তার উদ্ভব হয়। যে রূপ বিশ্বসত্তা ব্যক্তিসত্তায় রূপান্তরিত হয় ঠিক সেইরূপ ব্যক্তিমনে বিশ্ব-অহং-এর উপস্থিতি ঘটে । ব্যক্তি মনে বিশ্ব অহং-এর অনুপস্থিতিতে (অর্থাৎ তাদের সংযোগের অভাবে) ব্যক্তিসত্তার অস্তিত্ব লোপ পায়। এই হোল পাত্রের সঙ্গে জলের সম্বন্ধ । … [ক্রমশঃ]