গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের সাথে পরম গুরুদেব স্বামী বাউলানন্দজীর সাক্ষাৎ-এর কথা হচ্ছিল। সেদিন স্বামী বাউলানন্দজী গুরুজীকে আকাশমার্গ অবলম্বন করে_ উড়িয়ে রায়নার শ্মশান থেকে একেবারে দক্ষিণ ভারতের গোদাবরীর তীরে পেরেন্টাপল্লীতে নিয়ে এসেছিলেন।
গুরু মহারাজ বলেছিলেন_”সেই অদ্ভুত মানুষটি আমাকে একটা ঝরনার ধারে অনেকগুলি গাছের নিচে নামিয়ে দিয়ে _নিজে তরতর করে উপরের দিকে উঠে গেলেন! আমি ঐস্থানেই চুপটি করে অনেকক্ষন অপেক্ষা করলাম_কিন্তু সেই বৃদ্ধ ব্যক্তিটি বা অন্য কেউ আমাকে ডাকতে এলো না! আমি একটু বিরক্ত হোয়েই ওনার ওঠার পথ অনুসরণ করে উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম।
অনেকটা ওঠার পর আমি দেখলাম_ সেখানে একটি মন্দির এবং ছোট ছোট দু একটি ঘর রয়েছে । একটি ঘরের দাওয়ায় তিনজন বয়স্কা মহিলা একটা বন্ধ ঘরের দিকে মুখ করে বসে ছিলেন। আমি গিয়ে ওনাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম_”এইমাত্র যে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী এখানে উঠে এলেন তিনি কই?”
আমার কথা শুনে ওনারা পিছন ফিরে চেয়ে আমাকে ভালো করে চেয়ে দেখলেন। তারপর ওনাদের একজন আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন_”আরে প্রহ্লাদ যে! এস_এস! গুরুদেব ঘরের ভিতরে আছেন_যাও, ভিতরে যাও!”(ক্রমশঃ)
________________০_______________
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা–মানবজাতির দুঃখ ও অতৃপ্তির কারণ কি ?
উত্তর–কারণ মানুষের পাশবিক আচরণ ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতার প্রবৃত্তি।
জিজ্ঞাসা—অনেকে এই পশুবৃত্তি ত্যাগ করতে চেয়েও, পারেন না। এর কারণ কি ?
উত্তর—তারা দৈহিক শক্তি এবং বৌদ্ধিক উৎকর্ষতায় উন্নত হয়েছেন কিন্তু প্রেমের পথে অগ্রসর হতে পারেননি। এদের সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গুলি ক্রিয়াশীল কিন্তু সূক্ষ্ম শক্তি সম্বন্ধে সচেতনতা নেই। বুদ্ধি এবং শারীরিক সক্ষমতার নেতিবাচক দিকটা তারা ধারণা করতে পারেন এবং এর করুণ পরিণতি অনুমান করতে পারেন অথচ এগুলাে অতিক্রম করতে পারেন না। কারণ তাদের হৃদয়ে নিঃস্বার্থ প্রেমের বিকাশ নেই, আছে স্বার্থকেন্দ্রিক প্রেম । তাই স্বার্থ ত্যাগ করার ক্ষমতা এরা অর্জন করেননি। তাই নিজেদের সংকট সম্বন্ধে ধারণা থাকলেও সেটাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা এদের নেই।
জিজ্ঞাসা–এর জন্য কে দায়ী?
উত্তর—এই সমস্যার তিনটে দিক রয়েছে।
জিজ্ঞাসা–সেগুলো কি ?
উত্তর–(এক) সংকটের মূল, (দুই) সংকটের বিস্তার এবং (তিন) তার পরিণতিস্বরূপ ধারণালব্ধ মানুষের বর্তমান অবস্থা।
জিজ্ঞাসা–সংকটের মূলে কে ?
উত্তর–সমাজের কিছু মুষ্ঠিমেয় স্বার্থপর মানুষ।
জিজ্ঞাসা–কি ভাবে ?
উত্তর–সমাজের একশ্রেণীর মানুষ প্রয়ােজনের চেয়ে অতিরিক্ত অধিগ্রহণের প্রচেষ্টা করে যান এবং ফলস্বরূপ অপর শ্রেণী জীবনের মৌলিক সংস্থান থেকে বঞ্চিত থাকেন। এইভাবেই সমাজে অমানবিকতার বীজ অঙ্কুরিত হয় । এটাই সংকটের মূল।
জিজ্ঞাসা—এই সংকটের বিস্তারের মূলে কি ?
উত্তর—রাজনীতি।
জিজ্ঞাসা—কিভাবে ?
উত্তর—আধ্যাত্মিক মনীষীদের নির্দেশে এবং সহযােগিতায় সমাজে রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল সামঞ্জস্য স্থাপন করা। অর্থাৎ এক সামাজিক মানবতার আদর্শ তৈরী করা_ যাতে সমস্ত মানুষ সমান সুখ-সুবিধা ভােগ করতে পারে, বৈষম্য না থাকে। কিন্তু রাজনীতি এ উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি। রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু হবার পূর্বেই এই বৈষম্য ছিল, কিন্তু রাজনীতি এই বৈষম্যকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
জিজ্ঞাসা—যে সমস্ত মানুষ ইচ্ছা থাকলেও ইন্দ্রিয় চেতনার উর্ধ্বে উঠতে পারেন না এবং যারা উন্নত হবার কোন তাগিদই অনুভব করেন না, এদের এই অবস্থার জন্য কে দায়ী?
উত্তর–প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম।
জিজ্ঞাসা- আরও বিশদভাবে জানতে চাই।
উত্তর–প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উদ্দেশ্য এবং দায়িত্ব ছিল সমাজকে নীতিশিক্ষা ও মূল্যবােধে উদ্বুদ্ধ করা এবং রাজনৈতিক আদর্শের পিছনে আচার্যের ভূমিকা পালন করা_ যাতে বৈষম্য ও বিভেদ দূর করা যায় । প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মআন্দোলন সে কাজে ব্যর্থ হয়েছে এবং আজ অধিকাংশ মানুষের বিভ্রান্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জিজ্ঞাসা–এই মত সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারছি না ৷ অতীত ও বর্তমানের সমস্ত সাধু ও আচার্যদের মতে ধর্মই মানবতা তথা মানবসমাজের প্রাণস্বরূপ। ধর্ম ছাড়া মানবজাতি বিনষ্ট হবে। সেহেতু সমস্ত মানুষকেই ধার্মিক হতে হবে ৷ তাহলে কি অর্থে বলা যায় যে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম উদ্দেশ্যবিরােধী হয়ে উঠছে ?
উত্তর–বিষয়টি যথেষ্ট গূঢ় ৷ অনেক সাধু বা আচার্য পৃথিবীতে ছিলেন বা আছেন যাঁরা যথার্থ অধিকারী । কিন্তু এমন অনেক সাধু বা আচার্য ছিলেন অথবা আছেন যাঁরা নিজেরাই নিজেদেরকে উক্ত ভূমিকায় নিয়ােগ করেছেন।
যাঁরা যথার্থ সাধু বা আচার্য তাঁরা চিরকালই সমাজে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছেন এবং প্রতিকারের অপরিহার্য প্রয়ােজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই মানুষের অতিরিক্ত অধিগ্রহণের কু-স্বভাব থেকে মুক্ত হবার জন্য আবেদন করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই মানবজাতির শান্তি ও একতার স্বপক্ষে বলেছেন এবং অনৈক্য ও অশান্তির বিরুদ্ধাচারণ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই মানবজাতির মানবিক উত্তরণের প্রতি জোর দিয়েছেন এবং অমানবিক সভ্যতার বিরােধিতা করেছেন। এটা আধ্যাত্মিকতা, প্রথাগত ধর্ম-অনুসরণ নয় কারণ এই সমস্ত আচার্যেরা আধ্যাত্মিক ভাবাপন্ন, ধর্মীয় নীতিবাদী নন।
যারা তথাকথিত আচার্য সেজে থাকেন_ তারা বলেন যে, কিছু মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অন্যের চেয়ে চিরকালই বেশি থাকবে, এটা অপরিহার্য এবং সমাজকে শৃঙ্খলিত রাখার এটাই একমাত্র উপায়। এখানে সামাজিক অগ্রসরতার চেয়ে সামাজিক গঠনের উপরেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত সঞ্চয় এবং সংখ্যালঘুর অতিরিক্ত সুযােগ-সুবিধা ঐ সমস্ত সঞ্চয় ও সুযােগ-সুবিধার নিরাপত্তার জন্য প্রয়ােজন, যা একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল এবং ধর্মের মূল ভিত্তি। তদুপরি এই বিশিষ্ট ভাগ্যবান শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে একতা থাকা উচিত এবং বঞ্চিত শ্রেণীর মধ্যে অনৈক্য অপর শ্রেণীর এই ঐক্যকে পুষ্ট করে, সুতরাং এই ব্যবস্থাকে উৎসাহিত এবং পরিপােষণ করা উচিত। তাদের মতে একমাত্র এই কাঠামােতেই উচ্চ শ্রেণীর মানুষ তাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করতে পারবে, অর্থাৎ অবহেলিত শ্রেণীর জন্য দয়া, দাক্ষিণ্য, দান ইত্যাদি ধার্মিক কর্ম হিসেবে বিবেচিত। এইজন্য সমাজের অধিকাংশ মানুষকেই অপরের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে থাকতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের এই দুর্দশার প্রতি কোন সহানুভূতি এক্ষেত্রে কাজ করে না। এরা প্রতিবাদ করলে সমাজপতিরা মন্তব্য করেন যে, এই সমস্ত একতার দাবী প্রতিষ্ঠিত সমাজ-গঠনের পরিপন্থী। তাই বর্তমান সংকটের কারণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম। কারণ এই সমস্ত ধর্মপতিরা পদাধিকারী, অধিকারী নন।
জিজ্ঞাসা—যাঁরা অবহেলিত তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং যারা শােষক, তারা সংখ্যালঘু–এমন ধর্মের সমর্থক কারা?
উত্তর–শাসক শ্রেণী, অর্থাৎ রাজনীতিবিদরা ( যারা রাজা এবং যারা রাজা সৃষ্টি করেন) এবং ধর্মপতিরা ; প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে সমর্থন করছেন।
জিজ্ঞাসা–কেন তারা সমর্থন করছেন ?
উত্তর–কারণ তাদের স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে।
জিজ্ঞাসা–অধিকাংশ মানুষই কি এটা সমর্থন করছেন না ?
উত্তর–সমর্থন করছেন না, বাধ্য হয়ে মেনে নিচ্ছেন।
জিজ্ঞাসা—মেনে নেবার কারণ কি বিনম্র শ্রদ্ধা নয় ?
উত্তর–না। মেনে নেবার কারণ ভীতি।
_____________০__________________
জিজ্ঞাসা–ধর্মভীরুতাকেই আমরা শ্রদ্ধা বলে ভেবে নিই কারণ মানুষ ঈশ্বরকে ভয় পায়। তাই নয় কি ?
উত্তর—না, এ ধারণা সঠিক নয়। একে ঈশ্বরের প্রতি ভীতি বলে না। সাধারণ মানুষ সমাজে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের ভয় পায়, যাদের পিছনে প্রশাসক ও রাজনীতিবিদদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন আছে ।
জিজ্ঞাসা—প্রকৃত আচার্য এবং পােষাকী আচার্যের মধ্যে যে পার্থক্য, সে সম্বন্ধে আমরা জানতে আগ্রহী।
উত্তর–প্রকৃত আচার্যরা আধ্যাত্মিক এবং পােষাকী আচার্যরা ধর্মীয় অনুশাসন সম্বন্ধে অভিভাবকের ভূমিকা গ্রহণ করেন। সাধু এবং ঋষিদের মধ্যে যে সাধুত্ব ও ঋষিত্ব, তার বৈশিষ্ট গুনগত তাঁরা সমস্ত পরিবেশ এবং পরিস্থিতিতেই আত্মস্থ, তাঁদের মধ্যে প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তির পূর্ণ বিকাশ। তাঁরা স্থিতপ্রজ্ঞ, অর্থাৎ আত্মবােধে প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা কোন কিছুই অধিকার করেন না এবং কোন কিছুর দ্বারাই অধিকৃত বা বশীভূত হন না ।
এই গুণগত বৈশিষ্ট্য পােষাকী আচার্যদের মধ্যে দেখা যায় না। এদের প্রেম, জ্ঞান ও শক্তি স্বার্থ ও সংখ্যা দ্বারা সীমিত। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এদের আচরণের পরিবর্তন এবং ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায়। এদের মধ্যে অধিকার করার প্রবণতা দেখা যায় এবং ফলস্বরূপ অন্যের দ্বারা বশীভূত হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল থাকে ।
লক্ষ্য করে দেখবে যে, এরা প্রচুর পার্থিব সম্পদের ওপর গা ভাসিয়ে বসে থাকেন এবং সারা বিশ্বের প্রশাসক, রাজনীতিবিদ ও আমলাদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ ও বিষয়-আশয় আদায় করেন। এরা বাস করেন.বিশাল প্রাসাদে, সর্বদা সেবকদের দ্বারা পরিবেষ্ঠিত হয়ে। অহংকারী রাজা-মহারাজের মতো এদের আচরণ এবং ভাবভঙ্গী। সপ্তাহে দু-বার বা একবার এরা প্রাসাদের বারান্দায় দাড়িয়ে ‘দর্শন’ দেন এবং প্রবচন করেন। সাধারণতঃ এরা করুণা, প্রেম, বিনম্রতা ইত্যাদি বিষয়ে উপদেশ দেন। উচ্চ মঞ্চ থেকে এরা ক্লিষ্ট জনগণের দুর্দশা ও যন্ত্রণা দেখেন। এরা নিজেদের ভগবৎ-কৃপার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। উচ্চ শ্রেণীর মানুষ এদের আধিপত্য স্বীকার করেন এবং বাকীরা মেনে নিতে বাধ্য হন। এরা ঈশ্বরের সার্বজনীন অস্তিত্বের মহিমা প্রচার করেন কিন্তু নিজেরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনেক দূরত্ব রেখে চলেন ৷ মানুষের দারিদ্র্য ও দূর্দশা দেখে এরা নিজেরা ভোগ-বিলাস স্পৃহা থেকে বিরত হন না। এরা নিজেদের গােষ্ঠীস্বার্থের বাইরে আর কিছু বিচার করেন না।
জিজ্ঞাসা–সাধারণতঃ বলা হয় যে, ঈশ্বরের কোন নাম-রূপ নেই কারণ নাম ও রূপ পরিবর্তনশীল। অর্থাৎ ঈশ্বর নিত্য তাই নাম-রূপের অতীত। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না ঈশ্বর কিভাবে নাম-রূপে অবতীর্ণ হন। আমরা এ ব্যাপারে বিশদভাবে জানতে আগ্রহী।
উত্তর–’ঈশ্বর’ শব্দটিই একটি নাম, যা পরিপূর্ণ প্রেম, জ্ঞান, শক্তি এবং সেগুলি সম্বন্ধে সচেতনতা । আর এই সচেতনতার যে নিত্য সাক্ষী, তার নির্দেশক। যেহেতু প্রতিটি নামেই রূপ আছে, সেহেতু পূর্ণ বিকাশেরও একটা রূপ আছে। ‘ঈশ্বর’ নামের প্রকৃতি ও আকার নির্ভর করে সাধারণ মানুষের ঈশ্বর সম্বন্ধে ধারণার ওপর । উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি, ‘ইনি হলেন একটি মানুষ’, অথবা, ‘ইনি হলেন এক পাগল মানুষ’, অথবা, ‘এটি একটি মৃত মানুষের শরীর’, অথবা ‘এটি একটি মানুষের মৃতদেহ’–এই বাক্যগুলি ভাষায় প্রচলিত। লক্ষ্যণীয়, প্রথম দুটি বাক্যে মানুষকে শরীরের সাথে একাত্ম করা হচ্ছে। তৃতীয় বাক্যটিতে মানুষকে শরীর এবং মৃত্যুর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। চতুর্থ বাক্যটিতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, মানুষ শরীর থেকে আলাদা এবং জীবিত, কিন্তু তার শরীরটি মৃত। হয়ত এগুলি বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছে, কিন্তু এর পিছনে বিজ্ঞানমনস্কতা আছে। ‘মানুষ’ শব্দটি এক্ষেত্রে এই বিজ্ঞানমনস্কতার সারবস্তু। শব্দটি একটি নাম যা শরীর থেকে আলাদা কোন অস্তিত্বকে বােঝায়। অথচ এই নামের একটি রূপ আছে। মানুষের শরীরটিই তার রূপ।
তাহলে ‘মানুষ’ শব্দটি ব্যবহারের সময় বুঝতে হবে যে, শরীর মানুষের প্রতিচ্ছবি, অথচ শরীরটা কিন্তু মানুষ নয়। সুতরাং ‘মানুষ’ শব্দটি শরীরাতীত কোন অস্তিত্বের নির্ণয়ক এবং শরীরটা সেই অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি বলে ‘মানুষ’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও ‘মানুষ’ শব্দটি রূপক নয়, কিন্তু শব্দটির একটি রূপ আছে—মানবশরীর। সমস্ত প্রাণীর ক্ষেত্রেই এই সত্য প্রযােজ্য।
প্রেম, জ্ঞান, শক্তির পূর্ণতা এবং সেগুলি সম্বন্ধে সচেতনতা, আত্মসচেতনতা এবং অসীমতা–এর একটা নাম আছে। নামটি ‘ঈশ্বর’। নামের সাথে অবিচ্ছিন্ন যে গুণগত বিকাশ, তাই ঈশ্বরের রূপ। সুতরাং যারা বলেন যে ঈশ্বরের রূপ নেই, তারা বলতে বাধ্য হবেন যে মানুষেরও কোন রূপ নেই। কিন্তু যে কথা তারা বলেন না, তাই পক্ষান্তরে তারা মেনেই নেন যে ঈশ্বরের রূপ আছে। এই বিভ্রান্তিকে অতিক্রম করার জন্যই বলা হয়ে থাকে যে ঈশ্বর সর্বভূতে বিরাজমান। … [ক্রমশঃ]
গুরু মহারাজ বলেছিলেন_”সেই অদ্ভুত মানুষটি আমাকে একটা ঝরনার ধারে অনেকগুলি গাছের নিচে নামিয়ে দিয়ে _নিজে তরতর করে উপরের দিকে উঠে গেলেন! আমি ঐস্থানেই চুপটি করে অনেকক্ষন অপেক্ষা করলাম_কিন্তু সেই বৃদ্ধ ব্যক্তিটি বা অন্য কেউ আমাকে ডাকতে এলো না! আমি একটু বিরক্ত হোয়েই ওনার ওঠার পথ অনুসরণ করে উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম।
অনেকটা ওঠার পর আমি দেখলাম_ সেখানে একটি মন্দির এবং ছোট ছোট দু একটি ঘর রয়েছে । একটি ঘরের দাওয়ায় তিনজন বয়স্কা মহিলা একটা বন্ধ ঘরের দিকে মুখ করে বসে ছিলেন। আমি গিয়ে ওনাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম_”এইমাত্র যে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী এখানে উঠে এলেন তিনি কই?”
আমার কথা শুনে ওনারা পিছন ফিরে চেয়ে আমাকে ভালো করে চেয়ে দেখলেন। তারপর ওনাদের একজন আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন_”আরে প্রহ্লাদ যে! এস_এস! গুরুদেব ঘরের ভিতরে আছেন_যাও, ভিতরে যাও!”(ক্রমশঃ)
________________০_______________
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা–মানবজাতির দুঃখ ও অতৃপ্তির কারণ কি ?
উত্তর–কারণ মানুষের পাশবিক আচরণ ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতার প্রবৃত্তি।
জিজ্ঞাসা—অনেকে এই পশুবৃত্তি ত্যাগ করতে চেয়েও, পারেন না। এর কারণ কি ?
উত্তর—তারা দৈহিক শক্তি এবং বৌদ্ধিক উৎকর্ষতায় উন্নত হয়েছেন কিন্তু প্রেমের পথে অগ্রসর হতে পারেননি। এদের সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গুলি ক্রিয়াশীল কিন্তু সূক্ষ্ম শক্তি সম্বন্ধে সচেতনতা নেই। বুদ্ধি এবং শারীরিক সক্ষমতার নেতিবাচক দিকটা তারা ধারণা করতে পারেন এবং এর করুণ পরিণতি অনুমান করতে পারেন অথচ এগুলাে অতিক্রম করতে পারেন না। কারণ তাদের হৃদয়ে নিঃস্বার্থ প্রেমের বিকাশ নেই, আছে স্বার্থকেন্দ্রিক প্রেম । তাই স্বার্থ ত্যাগ করার ক্ষমতা এরা অর্জন করেননি। তাই নিজেদের সংকট সম্বন্ধে ধারণা থাকলেও সেটাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা এদের নেই।
জিজ্ঞাসা–এর জন্য কে দায়ী?
উত্তর—এই সমস্যার তিনটে দিক রয়েছে।
জিজ্ঞাসা–সেগুলো কি ?
উত্তর–(এক) সংকটের মূল, (দুই) সংকটের বিস্তার এবং (তিন) তার পরিণতিস্বরূপ ধারণালব্ধ মানুষের বর্তমান অবস্থা।
জিজ্ঞাসা–সংকটের মূলে কে ?
উত্তর–সমাজের কিছু মুষ্ঠিমেয় স্বার্থপর মানুষ।
জিজ্ঞাসা–কি ভাবে ?
উত্তর–সমাজের একশ্রেণীর মানুষ প্রয়ােজনের চেয়ে অতিরিক্ত অধিগ্রহণের প্রচেষ্টা করে যান এবং ফলস্বরূপ অপর শ্রেণী জীবনের মৌলিক সংস্থান থেকে বঞ্চিত থাকেন। এইভাবেই সমাজে অমানবিকতার বীজ অঙ্কুরিত হয় । এটাই সংকটের মূল।
জিজ্ঞাসা—এই সংকটের বিস্তারের মূলে কি ?
উত্তর—রাজনীতি।
জিজ্ঞাসা—কিভাবে ?
উত্তর—আধ্যাত্মিক মনীষীদের নির্দেশে এবং সহযােগিতায় সমাজে রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল সামঞ্জস্য স্থাপন করা। অর্থাৎ এক সামাজিক মানবতার আদর্শ তৈরী করা_ যাতে সমস্ত মানুষ সমান সুখ-সুবিধা ভােগ করতে পারে, বৈষম্য না থাকে। কিন্তু রাজনীতি এ উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি। রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু হবার পূর্বেই এই বৈষম্য ছিল, কিন্তু রাজনীতি এই বৈষম্যকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
জিজ্ঞাসা—যে সমস্ত মানুষ ইচ্ছা থাকলেও ইন্দ্রিয় চেতনার উর্ধ্বে উঠতে পারেন না এবং যারা উন্নত হবার কোন তাগিদই অনুভব করেন না, এদের এই অবস্থার জন্য কে দায়ী?
উত্তর–প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম।
জিজ্ঞাসা- আরও বিশদভাবে জানতে চাই।
উত্তর–প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উদ্দেশ্য এবং দায়িত্ব ছিল সমাজকে নীতিশিক্ষা ও মূল্যবােধে উদ্বুদ্ধ করা এবং রাজনৈতিক আদর্শের পিছনে আচার্যের ভূমিকা পালন করা_ যাতে বৈষম্য ও বিভেদ দূর করা যায় । প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মআন্দোলন সে কাজে ব্যর্থ হয়েছে এবং আজ অধিকাংশ মানুষের বিভ্রান্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জিজ্ঞাসা–এই মত সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারছি না ৷ অতীত ও বর্তমানের সমস্ত সাধু ও আচার্যদের মতে ধর্মই মানবতা তথা মানবসমাজের প্রাণস্বরূপ। ধর্ম ছাড়া মানবজাতি বিনষ্ট হবে। সেহেতু সমস্ত মানুষকেই ধার্মিক হতে হবে ৷ তাহলে কি অর্থে বলা যায় যে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম উদ্দেশ্যবিরােধী হয়ে উঠছে ?
উত্তর–বিষয়টি যথেষ্ট গূঢ় ৷ অনেক সাধু বা আচার্য পৃথিবীতে ছিলেন বা আছেন যাঁরা যথার্থ অধিকারী । কিন্তু এমন অনেক সাধু বা আচার্য ছিলেন অথবা আছেন যাঁরা নিজেরাই নিজেদেরকে উক্ত ভূমিকায় নিয়ােগ করেছেন।
যাঁরা যথার্থ সাধু বা আচার্য তাঁরা চিরকালই সমাজে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছেন এবং প্রতিকারের অপরিহার্য প্রয়ােজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই মানুষের অতিরিক্ত অধিগ্রহণের কু-স্বভাব থেকে মুক্ত হবার জন্য আবেদন করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই মানবজাতির শান্তি ও একতার স্বপক্ষে বলেছেন এবং অনৈক্য ও অশান্তির বিরুদ্ধাচারণ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই মানবজাতির মানবিক উত্তরণের প্রতি জোর দিয়েছেন এবং অমানবিক সভ্যতার বিরােধিতা করেছেন। এটা আধ্যাত্মিকতা, প্রথাগত ধর্ম-অনুসরণ নয় কারণ এই সমস্ত আচার্যেরা আধ্যাত্মিক ভাবাপন্ন, ধর্মীয় নীতিবাদী নন।
যারা তথাকথিত আচার্য সেজে থাকেন_ তারা বলেন যে, কিছু মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অন্যের চেয়ে চিরকালই বেশি থাকবে, এটা অপরিহার্য এবং সমাজকে শৃঙ্খলিত রাখার এটাই একমাত্র উপায়। এখানে সামাজিক অগ্রসরতার চেয়ে সামাজিক গঠনের উপরেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত সঞ্চয় এবং সংখ্যালঘুর অতিরিক্ত সুযােগ-সুবিধা ঐ সমস্ত সঞ্চয় ও সুযােগ-সুবিধার নিরাপত্তার জন্য প্রয়ােজন, যা একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল এবং ধর্মের মূল ভিত্তি। তদুপরি এই বিশিষ্ট ভাগ্যবান শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে একতা থাকা উচিত এবং বঞ্চিত শ্রেণীর মধ্যে অনৈক্য অপর শ্রেণীর এই ঐক্যকে পুষ্ট করে, সুতরাং এই ব্যবস্থাকে উৎসাহিত এবং পরিপােষণ করা উচিত। তাদের মতে একমাত্র এই কাঠামােতেই উচ্চ শ্রেণীর মানুষ তাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করতে পারবে, অর্থাৎ অবহেলিত শ্রেণীর জন্য দয়া, দাক্ষিণ্য, দান ইত্যাদি ধার্মিক কর্ম হিসেবে বিবেচিত। এইজন্য সমাজের অধিকাংশ মানুষকেই অপরের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে থাকতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের এই দুর্দশার প্রতি কোন সহানুভূতি এক্ষেত্রে কাজ করে না। এরা প্রতিবাদ করলে সমাজপতিরা মন্তব্য করেন যে, এই সমস্ত একতার দাবী প্রতিষ্ঠিত সমাজ-গঠনের পরিপন্থী। তাই বর্তমান সংকটের কারণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম। কারণ এই সমস্ত ধর্মপতিরা পদাধিকারী, অধিকারী নন।
জিজ্ঞাসা—যাঁরা অবহেলিত তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং যারা শােষক, তারা সংখ্যালঘু–এমন ধর্মের সমর্থক কারা?
উত্তর–শাসক শ্রেণী, অর্থাৎ রাজনীতিবিদরা ( যারা রাজা এবং যারা রাজা সৃষ্টি করেন) এবং ধর্মপতিরা ; প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে সমর্থন করছেন।
জিজ্ঞাসা–কেন তারা সমর্থন করছেন ?
উত্তর–কারণ তাদের স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে।
জিজ্ঞাসা–অধিকাংশ মানুষই কি এটা সমর্থন করছেন না ?
উত্তর–সমর্থন করছেন না, বাধ্য হয়ে মেনে নিচ্ছেন।
জিজ্ঞাসা—মেনে নেবার কারণ কি বিনম্র শ্রদ্ধা নয় ?
উত্তর–না। মেনে নেবার কারণ ভীতি।
_____________০__________________
জিজ্ঞাসা–ধর্মভীরুতাকেই আমরা শ্রদ্ধা বলে ভেবে নিই কারণ মানুষ ঈশ্বরকে ভয় পায়। তাই নয় কি ?
উত্তর—না, এ ধারণা সঠিক নয়। একে ঈশ্বরের প্রতি ভীতি বলে না। সাধারণ মানুষ সমাজে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের ভয় পায়, যাদের পিছনে প্রশাসক ও রাজনীতিবিদদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন আছে ।
জিজ্ঞাসা—প্রকৃত আচার্য এবং পােষাকী আচার্যের মধ্যে যে পার্থক্য, সে সম্বন্ধে আমরা জানতে আগ্রহী।
উত্তর–প্রকৃত আচার্যরা আধ্যাত্মিক এবং পােষাকী আচার্যরা ধর্মীয় অনুশাসন সম্বন্ধে অভিভাবকের ভূমিকা গ্রহণ করেন। সাধু এবং ঋষিদের মধ্যে যে সাধুত্ব ও ঋষিত্ব, তার বৈশিষ্ট গুনগত তাঁরা সমস্ত পরিবেশ এবং পরিস্থিতিতেই আত্মস্থ, তাঁদের মধ্যে প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তির পূর্ণ বিকাশ। তাঁরা স্থিতপ্রজ্ঞ, অর্থাৎ আত্মবােধে প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা কোন কিছুই অধিকার করেন না এবং কোন কিছুর দ্বারাই অধিকৃত বা বশীভূত হন না ।
এই গুণগত বৈশিষ্ট্য পােষাকী আচার্যদের মধ্যে দেখা যায় না। এদের প্রেম, জ্ঞান ও শক্তি স্বার্থ ও সংখ্যা দ্বারা সীমিত। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এদের আচরণের পরিবর্তন এবং ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায়। এদের মধ্যে অধিকার করার প্রবণতা দেখা যায় এবং ফলস্বরূপ অন্যের দ্বারা বশীভূত হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল থাকে ।
লক্ষ্য করে দেখবে যে, এরা প্রচুর পার্থিব সম্পদের ওপর গা ভাসিয়ে বসে থাকেন এবং সারা বিশ্বের প্রশাসক, রাজনীতিবিদ ও আমলাদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ ও বিষয়-আশয় আদায় করেন। এরা বাস করেন.বিশাল প্রাসাদে, সর্বদা সেবকদের দ্বারা পরিবেষ্ঠিত হয়ে। অহংকারী রাজা-মহারাজের মতো এদের আচরণ এবং ভাবভঙ্গী। সপ্তাহে দু-বার বা একবার এরা প্রাসাদের বারান্দায় দাড়িয়ে ‘দর্শন’ দেন এবং প্রবচন করেন। সাধারণতঃ এরা করুণা, প্রেম, বিনম্রতা ইত্যাদি বিষয়ে উপদেশ দেন। উচ্চ মঞ্চ থেকে এরা ক্লিষ্ট জনগণের দুর্দশা ও যন্ত্রণা দেখেন। এরা নিজেদের ভগবৎ-কৃপার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। উচ্চ শ্রেণীর মানুষ এদের আধিপত্য স্বীকার করেন এবং বাকীরা মেনে নিতে বাধ্য হন। এরা ঈশ্বরের সার্বজনীন অস্তিত্বের মহিমা প্রচার করেন কিন্তু নিজেরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনেক দূরত্ব রেখে চলেন ৷ মানুষের দারিদ্র্য ও দূর্দশা দেখে এরা নিজেরা ভোগ-বিলাস স্পৃহা থেকে বিরত হন না। এরা নিজেদের গােষ্ঠীস্বার্থের বাইরে আর কিছু বিচার করেন না।
জিজ্ঞাসা–সাধারণতঃ বলা হয় যে, ঈশ্বরের কোন নাম-রূপ নেই কারণ নাম ও রূপ পরিবর্তনশীল। অর্থাৎ ঈশ্বর নিত্য তাই নাম-রূপের অতীত। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না ঈশ্বর কিভাবে নাম-রূপে অবতীর্ণ হন। আমরা এ ব্যাপারে বিশদভাবে জানতে আগ্রহী।
উত্তর–’ঈশ্বর’ শব্দটিই একটি নাম, যা পরিপূর্ণ প্রেম, জ্ঞান, শক্তি এবং সেগুলি সম্বন্ধে সচেতনতা । আর এই সচেতনতার যে নিত্য সাক্ষী, তার নির্দেশক। যেহেতু প্রতিটি নামেই রূপ আছে, সেহেতু পূর্ণ বিকাশেরও একটা রূপ আছে। ‘ঈশ্বর’ নামের প্রকৃতি ও আকার নির্ভর করে সাধারণ মানুষের ঈশ্বর সম্বন্ধে ধারণার ওপর । উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি, ‘ইনি হলেন একটি মানুষ’, অথবা, ‘ইনি হলেন এক পাগল মানুষ’, অথবা, ‘এটি একটি মৃত মানুষের শরীর’, অথবা ‘এটি একটি মানুষের মৃতদেহ’–এই বাক্যগুলি ভাষায় প্রচলিত। লক্ষ্যণীয়, প্রথম দুটি বাক্যে মানুষকে শরীরের সাথে একাত্ম করা হচ্ছে। তৃতীয় বাক্যটিতে মানুষকে শরীর এবং মৃত্যুর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। চতুর্থ বাক্যটিতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, মানুষ শরীর থেকে আলাদা এবং জীবিত, কিন্তু তার শরীরটি মৃত। হয়ত এগুলি বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছে, কিন্তু এর পিছনে বিজ্ঞানমনস্কতা আছে। ‘মানুষ’ শব্দটি এক্ষেত্রে এই বিজ্ঞানমনস্কতার সারবস্তু। শব্দটি একটি নাম যা শরীর থেকে আলাদা কোন অস্তিত্বকে বােঝায়। অথচ এই নামের একটি রূপ আছে। মানুষের শরীরটিই তার রূপ।
তাহলে ‘মানুষ’ শব্দটি ব্যবহারের সময় বুঝতে হবে যে, শরীর মানুষের প্রতিচ্ছবি, অথচ শরীরটা কিন্তু মানুষ নয়। সুতরাং ‘মানুষ’ শব্দটি শরীরাতীত কোন অস্তিত্বের নির্ণয়ক এবং শরীরটা সেই অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি বলে ‘মানুষ’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও ‘মানুষ’ শব্দটি রূপক নয়, কিন্তু শব্দটির একটি রূপ আছে—মানবশরীর। সমস্ত প্রাণীর ক্ষেত্রেই এই সত্য প্রযােজ্য।
প্রেম, জ্ঞান, শক্তির পূর্ণতা এবং সেগুলি সম্বন্ধে সচেতনতা, আত্মসচেতনতা এবং অসীমতা–এর একটা নাম আছে। নামটি ‘ঈশ্বর’। নামের সাথে অবিচ্ছিন্ন যে গুণগত বিকাশ, তাই ঈশ্বরের রূপ। সুতরাং যারা বলেন যে ঈশ্বরের রূপ নেই, তারা বলতে বাধ্য হবেন যে মানুষেরও কোন রূপ নেই। কিন্তু যে কথা তারা বলেন না, তাই পক্ষান্তরে তারা মেনেই নেন যে ঈশ্বরের রূপ আছে। এই বিভ্রান্তিকে অতিক্রম করার জন্যই বলা হয়ে থাকে যে ঈশ্বর সর্বভূতে বিরাজমান। … [ক্রমশঃ]
