গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ যখন পেরেন্টাপল্লী আশ্রমে গিয়ে পৌঁছেছিলেন_তখন ওখানে একটা ঘরের সামনের দাওয়ায় বসে ছিলেন তিনজন বয়স্কা মা(মহিলা)! ওনাদের মধ্যে একজন, যাঁর নাম ছিল অন্নপূর্ণাম্মা_তিনিই গুরু মহারাজকে “প্রহ্লাদ”_নামে সম্বোধন করেছিলেন এবং ওনাকে ঘরের মধ্যে যাবার অনুমতি দিয়েছিলেন। ঐ মায়েরা গুরু মহারাজকে বলেছিলেন_ওনাদের গুরুদেব (স্বামী বাউলানন্দজী) সন্ধ্যার সময় ঘরে ঢোকার আগে ওনাদের কে বলে দিয়েছিলেন_উনি না ডাকা পর্যন্ত কেউ যেন ওনাকে বিরক্ত না করে,_ এই বলে উনি দরজা ভেজিয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং গুরু মহারাজ তখন ওনাদের কে_ স্বামীজী স্বয়ং ওনাকে ডেকে এনেছেন এবং নিচে দাঁড় করিয়ে রেখে উপরে উঠে এসেছেন_এই কথা বলছিলেন, তখন ঐ মহিলারা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন_কারণ তাঁরা ভালোভাবেই জানতেন যে, তাঁদের গুরুদেব সন্ধ্যা থেকে কোথাও যান নি,ঘরেই বিশ্রামরত ছিলেন।
যাই হোক,যে কোন ভাবেই হোক না কেন_গুরুমহারাজ ঐ বন্ধঘরের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেছিলেন। ভিতরে গিয়ে তো উনি অবাক!! আরে এতো সেই সাধুবাবাটাই_যিনি গুরু মহারাজকে আকাশমার্গ অবলম্বন করে এতোদূর নিয়ে এসেছিলেন! গুরু মহারাজ ওনাকে এইভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে থাকতে _একটু বিরক্তিমিশ্রিত বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন!(ক্রমশঃ)
______________০_________________
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :–আপনার মতে ব্যক্তিতে কেন্দ্রীভূত বিশ্বমন, বিশ্ব-অহং, ব্যক্তি-অহং, পঞ্চ-ইন্দ্রিয়, সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর এবং আধ্যাত্মিক শক্তি মিলিত হয় একটি অস্তিত্বে, তারই সংজ্ঞা, মনুষ্য। এই একই ভাবে ঈশ্বরের কি কোন সংজ্ঞা হতে পারে ?
উত্তর :—নৈর্ব্যক্তিক বিশ্বমন এবং নৈর্ব্যক্তিক বিশ্ব-অহং এর মিলিত তত্ত্বকে এক নিত্য, অসীম, অধ্যাত্ম অস্তিত্বরূপে চিন্তা করা যায়—তাই ঈশ্বর। অতএব ঈশ্বর হলেন জগতের সম্মিলিত প্রেম, জ্ঞান, শক্তি, সচেতনতা, আত্ম-সচেতনতা’র ঘনীভূত তত্ত্ব এবং নিত্যতা। মনুষ্য’র মধ্যে এই নিত্যতা নেই, আছে স্থায়ীত্ব। মনুষ্যচেতনায় যখন নিত্যতার বােধ এসে যায় তখন তার ভিতর ঈশ্বরবােধের প্রকাশ ঘটে।
জিজ্ঞাসা :—যারা মনুষ্য নয়, তাদের ক্ষেত্রে তাহলে কী বলা যায় ?
উত্তর :—এক অর্থে তারাও মানুষ। কিন্তু তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম চেতনার অভাব।
জিজ্ঞাসা :–বনস্পতির ক্ষেত্রেও কী একথা সত্য ?
উত্তর :–হ্যাঁ, প্রায়।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ, এই সমস্ত শব্দগুলি, যথা ঈশ্বর, বিশ্ব-অস্তিত্ব, মনুষ্য, প্রাণী, ইত্যাদি—শুধুই বিভিন্ন রূপের নাম। যেমন বিশ্ব অস্তিত্ব একটি রূপের নাম। যে রূপটি হােল জগৎ। কিন্তু ‘বিশ্ব-অস্তিত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করতে গেলে অন্য কিছু বােঝায়, অর্থাৎ ঈশ্বর। এবং এই ‘ঈশ্বর’ নামটিরও রূপ আছে। রূপ বলতে এই জগৎ, অস্তিত্ব এবং আমরা যা কিছু দেখছি সমস্ত কিছু। এক অর্থে নামাঙ্কিত সমস্ত রূপ, নাম-রূপ-অতীত তত্ত্বরই পরিচয়। এই অবােধ্য নাম-রূপ-অতীত তত্ত্বই ঈশ্বর। আমাদের ধারণা কি সঠিক ?
উত্তর :—সঠিক, কিন্তু আরও আছে।
জিজ্ঞাসা :—সেটা কী ?
উত্তর :—শুধু নাম-রূপধারী ব্যক্তি এবং ব্যক্তি-শরীরগুলিই যে ঈশ্বর তত্ত্বের প্রতিনিধি, তাই নয়— জগতের সমস্ত বস্তু, বালির প্রতিটা কণা, পাথর, জলের প্রতিটি ফোঁটা, মৃত বৃক্ষ, মৃতদেহ, অগ্নি, অগ্নিশিখা, মেঘ, অর্থাৎ যা কিছু দৃশ্যমান এবং অনুভূতিসাপেক্ষ তাই ঈশ্বরের প্রকাশ।
জিজ্ঞাসা :—বস্তুর আয়তন ও চরিত্র অনুযায়ী কি প্রকাশের তারতম্য ঘটে ?
উত্তর :–না, একেবারেই না। প্রতিটি বস্তুই ঈশ্বরের সম্পূর্ণ প্রকাশ।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ এই বিভিন্ন নাম-রূপধারী বস্তুতে ঈশ্বরীয় প্রকাশে কোন তারতম্য বা পার্থক্য নেই ?
উত্তর :–না, প্রকাশে কোন তারতম্য নেই, আছে বিকাশে।
জিজ্ঞাসা :—আমরা বুঝতে পারছি না। যদি আর একটু বিস্তৃতভাবে বুঝিয়ে দেন, ভাল হয়।
উত্তর :—এই জগৎ এবং তার সমস্ত বস্তু, মহাশূন্যে অবস্থিত। এই অবস্থিতি নির্ভর করে বস্তুর আয়তন এবং চরিত্র অনুযায়ী। প্রতিটি বস্তুর মধ্যেই মহাশূন্য অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে এবং মহাশূন্যে আছে প্রেম, জ্ঞান, শক্তি, সচেতনতা ও আত্মসচেতন। তার আধার, অর্থাৎ ঈশ্বরত্ব। সুতরাং প্রতিটি বস্তুতেই ঈশ্বর এবং ঈশ্বরত্বের প্রকাশ বিদ্যমান। অতএব, জলের ফোঁটা, বালুকণা, পাথর, অগ্নি, অগ্নিশিখা, মেঘ, মৃত বৃক্ষ, মৃতদেহ, প্রাণী-শরীর, মনুষ্য-শরীর –মহাশূন্যে অবস্থিত এবং তাদের মধ্যে মহাশূন্যের অবস্থান। তাই তাদের মধ্যে নিত্য-শাশ্বত তত্ত্বের সমপ্রকাশ–কোন ভেদ নেই। কিন্তু বস্তুর গুণ, মান, গঠন বিশেষে বিকাশের তারতম্য বিদ্যমান ।
মানুষ ব্যতীত অন্য প্রাণীর মধ্যে ঈশ্বর প্রকাশের বােধ নির্ভর করে মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ওপর। মানুষের মধ্যে ঈশ্বর প্রকাশের বােধও মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সাপেক্ষ। সমস্ত বস্তুতে ঈশ্বরতত্ত্বের বােধ নির্ভর করে ঈশ্বরের প্রতি ব্যক্তির ভালবাসা এবং বিশ্বাসের ওপর। এই বিশ্বাস ও ভালবাসার ভিত্তি হােল সর্বভূতে ঈশ্বর-অস্তিত্বের অভিজ্ঞতার ওপর আর এই অভিজ্ঞতার ভিত্তি হল ঈশ্বর, ব্ৰহ্মাণ্ড, বিশ্ব, মানুষ, এদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও নির্ভরতা, অস্তিত্বের উদ্দেশ্য এবং এই উদ্দেশ্যসাধনের উপায় সম্বন্ধে সঠিক ধারণা। সুতরাং, সমস্ত বস্তুতে প্রকাশ সম্পূর্ণ, বিকাশে ভিন্ন এবং মনুষ্য শরীরে প্রকাশ এবং বিকাশ দুয়েরই পূর্ণতার সম্ভাবনা বিদ্যমান।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ, এই আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি স্থাপন করা হয়েছে। কথাটা কি ঠিক ?
উত্তর :– হ্যাঁ।
জিজ্ঞাসা :–মন্দির, মসজিদ বা গির্জাকে মাধ্যম করে কি ভগবৎ কৃপা লাভ করা সম্ভব, বা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি হওয়া সম্ভব ?
উত্তর :– হ্যাঁ, সম্ভব ।
জিজ্ঞাসা :– কীভাবে সম্ভব ?
উত্তর :—প্রতিটি মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদিতে একটি করে নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। যে স্থানে মাটির, কিংবা কাঠের, অথবা পাথরের বা ধাতুর মূর্তি রয়েছে– যেগুলাে হয় প্রতীক, বা মূর্তি, বা বেদী, যা’ই বলাে। নাম যা’ই হােক, এগুলাে কিছু স্থান অধিকার করে আছে এবং এই স্থান যেহেতু মহাশূন্যেরই অংশ, সেহেতু তার মধ্যে ঈশ্বরের সম্পূর্ণ প্রকাশ বিদ্যমান, তাই এক অর্থে এই প্রতীকগুলি ঈশ্বরেরই প্রকাশ । অতএব ভগবৎ-কৃপা এই সমস্ত বস্তুর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়।
পৃথিবীর যে সব স্থানে আজ মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি দেখা যায়, এককালে সে সব স্থানে কিছুই ছিল না। মানুষই সেগুলাে প্রতিষ্ঠা করে নিজ স্বভাব ও ধারণা অনুযায়ী প্রার্থনা, উপাসনা, পূজা ইত্যাদি শুরু করেছে। যে শূণ্য স্থান আজ মূর্তি বা প্রতীক দ্বারা অধিকৃত, সে স্থানে ঈশ্বরের অবস্থান আছে । যে মানুষ প্রার্থনারত, সেই শরীরেও ঈশ্বরের অবস্থান এবং উপাস্য ও উপাসকের মধ্যবর্তী স্থানেও ঈশ্বর বিদ্যমান। যেহেতু সর্বভূতে ঈশ্বরের তাত্ত্বিক অস্তিত্ব স্বীকার্য, সেহেতু উপাস্য ও প্রতীক এক অর্থে ঈশ্বরেরই রূপ। একইভাবে উপাসক মনুষ্য শরীরও তার রূপ এবং দুই-এর মধ্যবর্তী স্থানেও ঈশ্বরত্ব বিদ্যমান। মানুষ তার ভাব অনুযায়ী যত আন্তরিকতা ও গভীরতায় ঈশ্বরচিন্তা করতে পারবে তত সে ঈশ্বরের সাথে একাত্মতা অনুভব করবে এবং সাথে সাথে তত চিন্ময় হয়ে উঠবে তার প্রতীক, সে নিজে এবং জগতের সমস্ত বস্তু। তীব্রতা আরও ঘনীভূত হলে সে ঈশ্বরপ্রেমের পূর্ণ স্বাদ নিজের মধ্যে আস্বাদন করতে সক্ষম হবে।
জিজ্ঞাসা :—ধারণাটা এখন কিছুটা স্পষ্ট হল। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অনেকেই, যাঁদের ঈশ্বর সম্বন্ধে সঠিক ধারণা নেই, তারা বলেন, “অমুক মন্দিরে বা মসজিদে গিয়ে অমুক-প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা করে আমরা শীঘ্র ফল পেয়েছি।” এও কি সম্ভব ?
উত্তর :–হ্যাঁ, সম্ভব।
জিজ্ঞাসা :—কীভাবে সম্ভব ?
উত্তর :—সমস্ত মূর্তি, প্রতীক, উপাসনা-বেদী যেহেতু ঈশ্বরের রূপ, সেহেতু ভগবৎ-কৃপা প্রবাহের মাধ্যম। এই প্রবাহ নির্ভর করে মানুষের প্রকৃতি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতার ওপর। সুতরাং মানুষ যখন ঈশ্বরের কাছে কিছু প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা করে এবং যদি সেই প্রার্থনায় আন্তরিকতা থাকে তবে ভগবৎ কৃপা সেই প্রাপ্তির রূপ পরিগ্রহ করে মানুষকে সন্তুষ্ট করে।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ, ধারণা পাকা না হলেও ভগবৎকৃপা লাভ করা যায় ?
উত্তর :—হ্যাঁ যায় ।
জিজ্ঞাসা :—কীভাবে?
উত্তর :—বস্তু সংগ্রহ করার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, এক ধরনের দ্রব্য আছে, যা সব সময়ে সব স্থানে প্রাপ্য। সেই দ্রব্যের যােগান সদা প্রাপ্তব্য। তুমি মূল্য দিলেই একটি যােগাড় করতে পারাে। জিনিষটি তােমার পক্ষে ভালও হতে পারে, মন্দও হতে পারে। অনুকূল হতে পারে, প্রতিকূল হতে পারে। তুমি সেটা জানতেও পারাে, নাও জানতে পারাে। জিনিষটির উৎপত্তি কোথায় এবং কে সেটিকে সর্বস্থানে সর্ব অবস্থায় প্রাপ্তিযােগ্য করেছেন সে সম্বন্ধে তােমার সম্যক ধারণা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। তবু তুমি সেটি পেয়েছ কারণ তুমি তার মূল্য দিয়েছ। তােমার পাওয়া বা না পাওয়া তােমার জানা বা না জানার ওপর নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে মূল্য প্রদান বলতে তােমার আন্তরিক প্রার্থনা, সশ্রদ্ধ পূজা এবং কাম্য বস্তু অর্জনের ব্যাকুলতা ইত্যাদি, যার ফলস্বরূপ ভগবৎ-কৃপা ঐ বস্তু প্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে তােমার দিকে প্রবাহিত হয়েছে ।.সাধারণতঃ বলা হয়ে থাকে যে স্থান-মাহাত্ম্য-র জন্য কিংবা অতীতে ঐ স্থানে কোন ব্যক্তির সাধন-মাহাত্ম্য’র জন্য এ-সমস্ত ঘটনা ঘটে।
জিজ্ঞাসা :–কোন প্রতীক, মূর্তি বা উপাসনাস্থল.ছাড়াও কি পূজা, প্রার্থনা, ধ্যান-জপ দ্বারা ভগবৎ-কৃপা অথবা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি লাভ করা সম্ভব ?
উত্তর :— হ্যাঁ, নিশ্চয়ই সম্ভব।
জিজ্ঞাসা :—কীভাবে ?
উত্তর :—যে মুহূর্তে মানুষ ঈশ্বরচিন্তা করতে শুরু করে, সেই মুহূর্তে সে তার স্বভাব, ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী এক লক্ষ্যবস্তু নির্ণয় করতে সক্ষম হয়—যা হয়ত মন্দির, মসজিদ বা গীর্জার তথাকথিত প্রতীক হতে ভিন্ন। এই সৃষ্ট লক্ষ্যবস্তুর প্রতি মনােনিবেশ যত গভীর হবে তত ভগবৎ-কৃপা অনুভব করা যাবে । তােমার কল্পনার দ্বারা যে সৃষ্ট বস্তু, তাই তােমার কাছে ঈশ্বর, যা তােমার প্রার্থনাস্থানের পরিবেশ অথবা প্রতীকের দ্বারা প্রভাবিত নয়। তােমার একাত্মতা, শ্রদ্ধা ও ব্যাকুলতার যে সুপ্ত শক্তি তাই ঈশ্বরের করুণা রূপে তােমাকে সিক্ত করবে, তােমার স্থান-কাল-পাত্র যাই হােক না কেন।
জিজ্ঞাসা :—কিন্তু এ সবই তো মূর্তি পূজার পর্যায়ে পড়ে। অনেকেই দাবী করেন যে মূর্তিপূজা অপ্রয়ােজনীয়, প্রগতির প্রতিবন্ধক, অযৌক্তিক এবং বর্জনীয়। এ সম্বন্ধে আমাদের কিরকম দৃষ্টিভঙ্গী রাখা উচিত ?
উত্তর :–সমস্ত মূর্তি কল্পনাপ্রসূত ! যা নেই তাই সৃষ্টি করা হল কল্পনা। কিন্তু যা বাস্তবে আছে, তাকে নিজ ভাব-অনুযায়ী রূপ দেওয়া কল্পনা নয়, বরং সাধনার অনুকুল পন্থা। মনে রাখতে হবে যে কল্পনার উপাসনাই একদিন মানুষকে প্রকৃত কল্পনার পারে নিয়ে যেতে সাহায্য করে যদি লক্ষ্য সম্বন্ধে সচেতনতা থাকে। সেই অর্থে মূর্তি-পূজা প্রগতিবিরােধী বা অপ্রয়ােজনীয় নয়, বরং সুবিধাজনক ও অনুকূল পন্থা।
তাছাড়া, মানুষ বলতে আমরা জানি এক ব্যক্তি, অর্থাৎ তিনি যা, এবং তার শরীর যা, তার একটি প্রতীক মাত্র। পৃথিবীতে মানুষ এবং তার শরীর–দুই একসাথে বিবেচিত হয় ; অর্থাৎ তত্ত্ব এবং তত্ত্বের প্রতীক। সুতরাং প্রতীক পূজা বা মূর্তি পূজার মধ্যে দোষের কিছু নেই। তবে দেহাতীত যে অস্তিত্ব অর্থাৎ সূক্ষ্ম জগতে প্রতীকের প্রয়ােজন হয় না, যেহেতু সে অবস্থায় শরীর নেই।
জিজ্ঞাসা :—তাহলে মূর্তিপূজাকে কি সাধনপথের অপরিহার্য অঙ্গ বলা উচিত?
উত্তর :—না কখনই নয়। তবে নিঃসন্দেহে তাকে সাধনপথের উপযােগী ও অনুকূল বলা যায়। সমস্যাটা প্রতীক নিয়ে নয়—সমস্যাটা মন্দির, মসজিদ বা গীর্জা সংক্রান্ত আমাদের গোঁড়ামীকে নিয়ে । … [ক্রমশঃ]
যাই হোক,যে কোন ভাবেই হোক না কেন_গুরুমহারাজ ঐ বন্ধঘরের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেছিলেন। ভিতরে গিয়ে তো উনি অবাক!! আরে এতো সেই সাধুবাবাটাই_যিনি গুরু মহারাজকে আকাশমার্গ অবলম্বন করে এতোদূর নিয়ে এসেছিলেন! গুরু মহারাজ ওনাকে এইভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে থাকতে _একটু বিরক্তিমিশ্রিত বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন!(ক্রমশঃ)
______________০_________________
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :–আপনার মতে ব্যক্তিতে কেন্দ্রীভূত বিশ্বমন, বিশ্ব-অহং, ব্যক্তি-অহং, পঞ্চ-ইন্দ্রিয়, সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর এবং আধ্যাত্মিক শক্তি মিলিত হয় একটি অস্তিত্বে, তারই সংজ্ঞা, মনুষ্য। এই একই ভাবে ঈশ্বরের কি কোন সংজ্ঞা হতে পারে ?
উত্তর :—নৈর্ব্যক্তিক বিশ্বমন এবং নৈর্ব্যক্তিক বিশ্ব-অহং এর মিলিত তত্ত্বকে এক নিত্য, অসীম, অধ্যাত্ম অস্তিত্বরূপে চিন্তা করা যায়—তাই ঈশ্বর। অতএব ঈশ্বর হলেন জগতের সম্মিলিত প্রেম, জ্ঞান, শক্তি, সচেতনতা, আত্ম-সচেতনতা’র ঘনীভূত তত্ত্ব এবং নিত্যতা। মনুষ্য’র মধ্যে এই নিত্যতা নেই, আছে স্থায়ীত্ব। মনুষ্যচেতনায় যখন নিত্যতার বােধ এসে যায় তখন তার ভিতর ঈশ্বরবােধের প্রকাশ ঘটে।
জিজ্ঞাসা :—যারা মনুষ্য নয়, তাদের ক্ষেত্রে তাহলে কী বলা যায় ?
উত্তর :—এক অর্থে তারাও মানুষ। কিন্তু তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম চেতনার অভাব।
জিজ্ঞাসা :–বনস্পতির ক্ষেত্রেও কী একথা সত্য ?
উত্তর :–হ্যাঁ, প্রায়।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ, এই সমস্ত শব্দগুলি, যথা ঈশ্বর, বিশ্ব-অস্তিত্ব, মনুষ্য, প্রাণী, ইত্যাদি—শুধুই বিভিন্ন রূপের নাম। যেমন বিশ্ব অস্তিত্ব একটি রূপের নাম। যে রূপটি হােল জগৎ। কিন্তু ‘বিশ্ব-অস্তিত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করতে গেলে অন্য কিছু বােঝায়, অর্থাৎ ঈশ্বর। এবং এই ‘ঈশ্বর’ নামটিরও রূপ আছে। রূপ বলতে এই জগৎ, অস্তিত্ব এবং আমরা যা কিছু দেখছি সমস্ত কিছু। এক অর্থে নামাঙ্কিত সমস্ত রূপ, নাম-রূপ-অতীত তত্ত্বরই পরিচয়। এই অবােধ্য নাম-রূপ-অতীত তত্ত্বই ঈশ্বর। আমাদের ধারণা কি সঠিক ?
উত্তর :—সঠিক, কিন্তু আরও আছে।
জিজ্ঞাসা :—সেটা কী ?
উত্তর :—শুধু নাম-রূপধারী ব্যক্তি এবং ব্যক্তি-শরীরগুলিই যে ঈশ্বর তত্ত্বের প্রতিনিধি, তাই নয়— জগতের সমস্ত বস্তু, বালির প্রতিটা কণা, পাথর, জলের প্রতিটি ফোঁটা, মৃত বৃক্ষ, মৃতদেহ, অগ্নি, অগ্নিশিখা, মেঘ, অর্থাৎ যা কিছু দৃশ্যমান এবং অনুভূতিসাপেক্ষ তাই ঈশ্বরের প্রকাশ।
জিজ্ঞাসা :—বস্তুর আয়তন ও চরিত্র অনুযায়ী কি প্রকাশের তারতম্য ঘটে ?
উত্তর :–না, একেবারেই না। প্রতিটি বস্তুই ঈশ্বরের সম্পূর্ণ প্রকাশ।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ এই বিভিন্ন নাম-রূপধারী বস্তুতে ঈশ্বরীয় প্রকাশে কোন তারতম্য বা পার্থক্য নেই ?
উত্তর :–না, প্রকাশে কোন তারতম্য নেই, আছে বিকাশে।
জিজ্ঞাসা :—আমরা বুঝতে পারছি না। যদি আর একটু বিস্তৃতভাবে বুঝিয়ে দেন, ভাল হয়।
উত্তর :—এই জগৎ এবং তার সমস্ত বস্তু, মহাশূন্যে অবস্থিত। এই অবস্থিতি নির্ভর করে বস্তুর আয়তন এবং চরিত্র অনুযায়ী। প্রতিটি বস্তুর মধ্যেই মহাশূন্য অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে এবং মহাশূন্যে আছে প্রেম, জ্ঞান, শক্তি, সচেতনতা ও আত্মসচেতন। তার আধার, অর্থাৎ ঈশ্বরত্ব। সুতরাং প্রতিটি বস্তুতেই ঈশ্বর এবং ঈশ্বরত্বের প্রকাশ বিদ্যমান। অতএব, জলের ফোঁটা, বালুকণা, পাথর, অগ্নি, অগ্নিশিখা, মেঘ, মৃত বৃক্ষ, মৃতদেহ, প্রাণী-শরীর, মনুষ্য-শরীর –মহাশূন্যে অবস্থিত এবং তাদের মধ্যে মহাশূন্যের অবস্থান। তাই তাদের মধ্যে নিত্য-শাশ্বত তত্ত্বের সমপ্রকাশ–কোন ভেদ নেই। কিন্তু বস্তুর গুণ, মান, গঠন বিশেষে বিকাশের তারতম্য বিদ্যমান ।
মানুষ ব্যতীত অন্য প্রাণীর মধ্যে ঈশ্বর প্রকাশের বােধ নির্ভর করে মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ওপর। মানুষের মধ্যে ঈশ্বর প্রকাশের বােধও মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সাপেক্ষ। সমস্ত বস্তুতে ঈশ্বরতত্ত্বের বােধ নির্ভর করে ঈশ্বরের প্রতি ব্যক্তির ভালবাসা এবং বিশ্বাসের ওপর। এই বিশ্বাস ও ভালবাসার ভিত্তি হােল সর্বভূতে ঈশ্বর-অস্তিত্বের অভিজ্ঞতার ওপর আর এই অভিজ্ঞতার ভিত্তি হল ঈশ্বর, ব্ৰহ্মাণ্ড, বিশ্ব, মানুষ, এদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও নির্ভরতা, অস্তিত্বের উদ্দেশ্য এবং এই উদ্দেশ্যসাধনের উপায় সম্বন্ধে সঠিক ধারণা। সুতরাং, সমস্ত বস্তুতে প্রকাশ সম্পূর্ণ, বিকাশে ভিন্ন এবং মনুষ্য শরীরে প্রকাশ এবং বিকাশ দুয়েরই পূর্ণতার সম্ভাবনা বিদ্যমান।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ, এই আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি স্থাপন করা হয়েছে। কথাটা কি ঠিক ?
উত্তর :– হ্যাঁ।
জিজ্ঞাসা :–মন্দির, মসজিদ বা গির্জাকে মাধ্যম করে কি ভগবৎ কৃপা লাভ করা সম্ভব, বা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি হওয়া সম্ভব ?
উত্তর :– হ্যাঁ, সম্ভব ।
জিজ্ঞাসা :– কীভাবে সম্ভব ?
উত্তর :—প্রতিটি মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদিতে একটি করে নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। যে স্থানে মাটির, কিংবা কাঠের, অথবা পাথরের বা ধাতুর মূর্তি রয়েছে– যেগুলাে হয় প্রতীক, বা মূর্তি, বা বেদী, যা’ই বলাে। নাম যা’ই হােক, এগুলাে কিছু স্থান অধিকার করে আছে এবং এই স্থান যেহেতু মহাশূন্যেরই অংশ, সেহেতু তার মধ্যে ঈশ্বরের সম্পূর্ণ প্রকাশ বিদ্যমান, তাই এক অর্থে এই প্রতীকগুলি ঈশ্বরেরই প্রকাশ । অতএব ভগবৎ-কৃপা এই সমস্ত বস্তুর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়।
পৃথিবীর যে সব স্থানে আজ মন্দির, মসজিদ, গির্জা ইত্যাদি দেখা যায়, এককালে সে সব স্থানে কিছুই ছিল না। মানুষই সেগুলাে প্রতিষ্ঠা করে নিজ স্বভাব ও ধারণা অনুযায়ী প্রার্থনা, উপাসনা, পূজা ইত্যাদি শুরু করেছে। যে শূণ্য স্থান আজ মূর্তি বা প্রতীক দ্বারা অধিকৃত, সে স্থানে ঈশ্বরের অবস্থান আছে । যে মানুষ প্রার্থনারত, সেই শরীরেও ঈশ্বরের অবস্থান এবং উপাস্য ও উপাসকের মধ্যবর্তী স্থানেও ঈশ্বর বিদ্যমান। যেহেতু সর্বভূতে ঈশ্বরের তাত্ত্বিক অস্তিত্ব স্বীকার্য, সেহেতু উপাস্য ও প্রতীক এক অর্থে ঈশ্বরেরই রূপ। একইভাবে উপাসক মনুষ্য শরীরও তার রূপ এবং দুই-এর মধ্যবর্তী স্থানেও ঈশ্বরত্ব বিদ্যমান। মানুষ তার ভাব অনুযায়ী যত আন্তরিকতা ও গভীরতায় ঈশ্বরচিন্তা করতে পারবে তত সে ঈশ্বরের সাথে একাত্মতা অনুভব করবে এবং সাথে সাথে তত চিন্ময় হয়ে উঠবে তার প্রতীক, সে নিজে এবং জগতের সমস্ত বস্তু। তীব্রতা আরও ঘনীভূত হলে সে ঈশ্বরপ্রেমের পূর্ণ স্বাদ নিজের মধ্যে আস্বাদন করতে সক্ষম হবে।
জিজ্ঞাসা :—ধারণাটা এখন কিছুটা স্পষ্ট হল। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অনেকেই, যাঁদের ঈশ্বর সম্বন্ধে সঠিক ধারণা নেই, তারা বলেন, “অমুক মন্দিরে বা মসজিদে গিয়ে অমুক-প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা করে আমরা শীঘ্র ফল পেয়েছি।” এও কি সম্ভব ?
উত্তর :–হ্যাঁ, সম্ভব।
জিজ্ঞাসা :—কীভাবে সম্ভব ?
উত্তর :—সমস্ত মূর্তি, প্রতীক, উপাসনা-বেদী যেহেতু ঈশ্বরের রূপ, সেহেতু ভগবৎ-কৃপা প্রবাহের মাধ্যম। এই প্রবাহ নির্ভর করে মানুষের প্রকৃতি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতার ওপর। সুতরাং মানুষ যখন ঈশ্বরের কাছে কিছু প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা করে এবং যদি সেই প্রার্থনায় আন্তরিকতা থাকে তবে ভগবৎ কৃপা সেই প্রাপ্তির রূপ পরিগ্রহ করে মানুষকে সন্তুষ্ট করে।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ, ধারণা পাকা না হলেও ভগবৎকৃপা লাভ করা যায় ?
উত্তর :—হ্যাঁ যায় ।
জিজ্ঞাসা :—কীভাবে?
উত্তর :—বস্তু সংগ্রহ করার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, এক ধরনের দ্রব্য আছে, যা সব সময়ে সব স্থানে প্রাপ্য। সেই দ্রব্যের যােগান সদা প্রাপ্তব্য। তুমি মূল্য দিলেই একটি যােগাড় করতে পারাে। জিনিষটি তােমার পক্ষে ভালও হতে পারে, মন্দও হতে পারে। অনুকূল হতে পারে, প্রতিকূল হতে পারে। তুমি সেটা জানতেও পারাে, নাও জানতে পারাে। জিনিষটির উৎপত্তি কোথায় এবং কে সেটিকে সর্বস্থানে সর্ব অবস্থায় প্রাপ্তিযােগ্য করেছেন সে সম্বন্ধে তােমার সম্যক ধারণা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। তবু তুমি সেটি পেয়েছ কারণ তুমি তার মূল্য দিয়েছ। তােমার পাওয়া বা না পাওয়া তােমার জানা বা না জানার ওপর নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে মূল্য প্রদান বলতে তােমার আন্তরিক প্রার্থনা, সশ্রদ্ধ পূজা এবং কাম্য বস্তু অর্জনের ব্যাকুলতা ইত্যাদি, যার ফলস্বরূপ ভগবৎ-কৃপা ঐ বস্তু প্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে তােমার দিকে প্রবাহিত হয়েছে ।.সাধারণতঃ বলা হয়ে থাকে যে স্থান-মাহাত্ম্য-র জন্য কিংবা অতীতে ঐ স্থানে কোন ব্যক্তির সাধন-মাহাত্ম্য’র জন্য এ-সমস্ত ঘটনা ঘটে।
জিজ্ঞাসা :–কোন প্রতীক, মূর্তি বা উপাসনাস্থল.ছাড়াও কি পূজা, প্রার্থনা, ধ্যান-জপ দ্বারা ভগবৎ-কৃপা অথবা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি লাভ করা সম্ভব ?
উত্তর :— হ্যাঁ, নিশ্চয়ই সম্ভব।
জিজ্ঞাসা :—কীভাবে ?
উত্তর :—যে মুহূর্তে মানুষ ঈশ্বরচিন্তা করতে শুরু করে, সেই মুহূর্তে সে তার স্বভাব, ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী এক লক্ষ্যবস্তু নির্ণয় করতে সক্ষম হয়—যা হয়ত মন্দির, মসজিদ বা গীর্জার তথাকথিত প্রতীক হতে ভিন্ন। এই সৃষ্ট লক্ষ্যবস্তুর প্রতি মনােনিবেশ যত গভীর হবে তত ভগবৎ-কৃপা অনুভব করা যাবে । তােমার কল্পনার দ্বারা যে সৃষ্ট বস্তু, তাই তােমার কাছে ঈশ্বর, যা তােমার প্রার্থনাস্থানের পরিবেশ অথবা প্রতীকের দ্বারা প্রভাবিত নয়। তােমার একাত্মতা, শ্রদ্ধা ও ব্যাকুলতার যে সুপ্ত শক্তি তাই ঈশ্বরের করুণা রূপে তােমাকে সিক্ত করবে, তােমার স্থান-কাল-পাত্র যাই হােক না কেন।
জিজ্ঞাসা :—কিন্তু এ সবই তো মূর্তি পূজার পর্যায়ে পড়ে। অনেকেই দাবী করেন যে মূর্তিপূজা অপ্রয়ােজনীয়, প্রগতির প্রতিবন্ধক, অযৌক্তিক এবং বর্জনীয়। এ সম্বন্ধে আমাদের কিরকম দৃষ্টিভঙ্গী রাখা উচিত ?
উত্তর :–সমস্ত মূর্তি কল্পনাপ্রসূত ! যা নেই তাই সৃষ্টি করা হল কল্পনা। কিন্তু যা বাস্তবে আছে, তাকে নিজ ভাব-অনুযায়ী রূপ দেওয়া কল্পনা নয়, বরং সাধনার অনুকুল পন্থা। মনে রাখতে হবে যে কল্পনার উপাসনাই একদিন মানুষকে প্রকৃত কল্পনার পারে নিয়ে যেতে সাহায্য করে যদি লক্ষ্য সম্বন্ধে সচেতনতা থাকে। সেই অর্থে মূর্তি-পূজা প্রগতিবিরােধী বা অপ্রয়ােজনীয় নয়, বরং সুবিধাজনক ও অনুকূল পন্থা।
তাছাড়া, মানুষ বলতে আমরা জানি এক ব্যক্তি, অর্থাৎ তিনি যা, এবং তার শরীর যা, তার একটি প্রতীক মাত্র। পৃথিবীতে মানুষ এবং তার শরীর–দুই একসাথে বিবেচিত হয় ; অর্থাৎ তত্ত্ব এবং তত্ত্বের প্রতীক। সুতরাং প্রতীক পূজা বা মূর্তি পূজার মধ্যে দোষের কিছু নেই। তবে দেহাতীত যে অস্তিত্ব অর্থাৎ সূক্ষ্ম জগতে প্রতীকের প্রয়ােজন হয় না, যেহেতু সে অবস্থায় শরীর নেই।
জিজ্ঞাসা :—তাহলে মূর্তিপূজাকে কি সাধনপথের অপরিহার্য অঙ্গ বলা উচিত?
উত্তর :—না কখনই নয়। তবে নিঃসন্দেহে তাকে সাধনপথের উপযােগী ও অনুকূল বলা যায়। সমস্যাটা প্রতীক নিয়ে নয়—সমস্যাটা মন্দির, মসজিদ বা গীর্জা সংক্রান্ত আমাদের গোঁড়ামীকে নিয়ে । … [ক্রমশঃ]
