আমরা আগের দিন আলোচনা করছিলাম_গুরু মহারাজের সঙ্গে স্বামী বাউলানন্দজীর প্রথম সাক্ষাৎকারের কথা! বাউলানন্দজীর ঘরে ঢুকে ঐ বৃদ্ধের দৃঢ় কন্ঠস্বর এবং প্রত্যয়ী নির্দেশ পেয়ে উনি ইচ্ছা করেই এড়িয়ে যাবার জন্যই বলেছিলেন_”আমি জল খাবো”! বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর ইঙ্গিতে উনি ঘরের কোনায় রাখা কুঁজো থেকে একটা পাত্রে জল গেলে খেতে যাবেন_এমন সময় গুরু মহারাজের মনে হয়েছিল ঐ গুরুস্থানীয় সন্ন্যাসীর অনুমতি নিয়ে _প্রসাদ করে ঐ জল পান করা উচিৎ! তাই তিনি জলপূর্ণ পাত্রটি নিয়ে স্বামী বাউলানন্দজীর দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলেন। কিন্তু এখানেই ঘটে গেল একটা miracle! যত‌ই উনি স্বামীজীর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন তত‌ই যেন ওনার নিজস্বতা হারিয়ে যেতে লাগলো_উনি জলপূর্ণ পাত্রটি নিয়ে স্বামী বাউলানন্দজীর পায়ে ঠেকিয়ে তারপর পান করতে গেলেন! হটাৎ ওনার অন্তঃকরণে এক অপার্থিব ভক্তিভাব জাগ্রত হোল_ আপনা-আপনিই ওনার মুখ থেকে তিনবার উচ্চারিত হোল _”গুরু পাদোদকং”_”গুরু পাদোদকং”_”গুরু পাদোদকং”! তারপর উনি সেই জল সবটাই এক ঢোকে চোঁ-চোঁ করে পান করলেন। সেই জল যত‍ই গুরু মহারাজের শরীরের মধ্যে প্রবেশ করতে থাকলো_তত‍ই ওনার শরীরে একপ্রকার অপার্থিব আনন্দে ভরে যেতে লাগলো!!(ক্রমশঃ)
________________০_______________
*** *আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা* ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< _স্বামী বাউলানন্দ_ >>
জিজ্ঞাসা :—যা বুঝছি তাতে মনে হচ্ছে যে ধর্মীয় সংস্কারের সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রতিটি ব্যর্থতাই সমস্যাগুলােকে আরও জটিল ও গভীর করে তুলেছে। এমতাবস্থায় আরও প্রচেষ্টার কি কোন সম্ভাবনা আছে এখন বা ভবিষ্যতে ?
উত্তর :—না, বহুদিন আগেই সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেছে।
জিজ্ঞাসা :—কি ভাবে ?
উত্তর :—অতীতের সমস্ত সংস্কার প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য ছিল যে শ্রেণীর হাতে অধিক ক্ষমতা, তাদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া। রাজনৈতিক নেতারা এবং তাদের ঘনিষ্ঠরা এই শ্রেণীর অন্তর্গত এবং তাই পরবর্তীকালে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হােল। সুতরাং এরা একজোট হয়ে নিজেদের ক্ষমতা, অধিকার ও কর্তৃত্বকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। ধর্মকে রক্ষা করার নামে তারা তখন সংগ্রাম শুরু করল। সুতরাং ধর্মের নামে দু’ধরনের আন্দোলন গড়ে উঠেছে সবসময়—এক, সংস্কারের আন্দোলন, এবং দুই, ধর্ম রক্ষার আন্দোলন।
যাঁরা সংস্কারের হােতা, তারা সাধারণ মানুষ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ৯৫ শতাংশ)। তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন মহাজনেরা। যারা ধর্মরক্ষার আন্দোলনের হােতা, তারা মুষ্টিমেয় (প্রায় পাঁচ শতাংশ) এবং তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানিক ধর্মীয় গুরুরা।
এই দুই আন্দোলনের দ্বন্দ্বে শেষপর্যন্ত আবার নতুন কোন ধর্ম সৃষ্টি হয়েছে জগতে।
জিজ্ঞাসা :—সমাজে ৯৫ শতাংশ মানুষ আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব পাওয়া সত্ত্বেও কেন এই সংস্কার-প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে ?
উত্তর :—যতদিন পর্যন্ত এই মহাপুরুষেরা শরীরে অবস্থান করেছেন ততদিন সংস্কার-আন্দোলন সঠিক পথেই চলেছে। কিন্তু তাঁরা শরীর ছাড়ার পর যখন অন্যরা দায়িত্ব নিয়েছে তখন তাদের মধ্যে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার লােভ ও উচ্চাশা প্রবেশ করেছে। এইভাবে প্রতিটি সংস্কার-প্রচেষ্টা শেষপর্যন্ত স্বার্থরক্ষার আন্দোলনে পর্যবসিত হয়ে নতুন কোন ধর্মীয় অনুশাসনে রূপ নিয়েছে।
জিজ্ঞাসা :—সারা পৃথিবীতে এরকম হয়েছে, না কি কোন বিশেষ স্থানে ?
উত্তর :—সারা পৃথিবীতেই এরকম হয়েছে।
জিজ্ঞাসা :–এর জন্য কী বা কে দায়ী ?
উত্তর :—এর জন্য দায়ী স্বার্থপরতা, শ্রেণীস্বার্থ ও রাজনীতি।
জিজ্ঞাসা :—এতদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে যা হয়েছে সে সম্বন্ধে এক স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেল। কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীর রাজনৈতিক চিত্রটা অনেক পাল্টে গেছে। সংস্কার আন্দোলনের জন্য ক্ষেত্র কি আগের থেকে অনেক প্রস্তুত নয় ? নতুন কোন প্রচেষ্টার সাফল্য সম্বন্ধে আমরা কি আশাবাদী হতে পারি না? সার্থক সংস্কার আন্দোলন কি এখন প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেনি ?
উত্তর :–পৃথিবীর রাজনীতিতে উল্লেখযােগ্য কোন পরিবর্তন হয়নি। রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য আগে যা ছিল এখনও তাই আছে, পাল্টেছে শুধু প্রশাসনিক আঙ্গিক। এবং এই পরিবর্তন কোনভাবেই সুস্থ ও আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ সেগুলি কখনও ঐ ধর্ম সংস্কারের অনুকূল নয়। সুতরাং নতুন কোন প্রচেষ্টার ক্ষেত্র প্রস্তুত নয় এবং অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতেও সে সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।.অতএব নতুন কোন প্রচেষ্টার সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রশ্নটাই এক্ষেত্রে অবান্তর ।
জিজ্ঞাসা :—এই কথাটা আমরা মেনে নিতে পারছি না। কারণ আগেকার সেই রাজ-রাজড়ার যুগ আর নেই, প্রশাসনিক নীতি-নিয়ম অনেক পাল্টে গেছে, ধর্ম আরও উদার হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাই আমাদের মনে হয় বর্তমান পরিস্থিতি নতুন সংস্কারের উর্বরক্ষেত্র। আমাদের এই ধারণা কি সঠিক নয় ?
উত্তর :—না, একেবারেই নয়।
জিজ্ঞাসা :– আমাদের ভুলটা কোথায় হচ্ছে একটু বুঝতে চাই।
উত্তর :—তুমি বলতে চাইছে যে, রাজাদের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে পৃথিবীতে। বর্তমান অবস্থার বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। পূর্ণ রাজাদের সংখ্যা কমে আংশিক রাজাদের সংখ্যা বেড়েছে। এই সংখ্যা যােগ করলে দেখা যাবে যে, রাজন্য অধিকার, শাসন ও কর্তৃত্বের ক্ষমতা একবিন্দুও কমেনি। রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে এখনও ধর্মীয়-রাজনৈতিক ক্ষমতাই বােঝায়। সাধারণ মানুষের অবস্থারও কোন পরিবর্তন হয়নি। পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলে পরিবর্তন হচ্ছে যেগুলাে সুস্থতার লক্ষণ, কিন্তু সেগুলির স্থিতি নড়বড়ে যেহেতু অন্যান্য স্থানে সেই পরিবর্তনের কোন প্রভাব পড়েনি।
তুমি বলছাে যে ধর্ম আগের থেকে অনেক উদার হয়েছে, বিচার করা যাক। কোন এক ধর্মীয় মতাবলম্বী মানুষ অপর কোন সম্প্রদায়ের অনুগামীদের সংখ্যা কমাতে চায়। প্রত্যেকেই চায়। তার নিজের দল ভারী করতে। প্রত্যেকে চায় অধিক ক্ষমতা। প্রত্যেকে চায় যে তার ধর্ম রাষ্ট্রধর্ম হােক্। পৃথিবীর সমস্ত ধর্ম-আন্দোলনের এই চেহারা এখন। রাজনীতি ও ধর্মের এই অবস্থার কী পরিণতি তা বুঝিয়ে বলার আবশ্যক নেই। যেহেতু তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছাে তােমার চারপাশে কী ঘটেছে।
এইটা একটা দিক। এবার অন্য দিকটা দেখা যাক্। ধরে নেওয়া যাক্, কোন একটি ধর্ম-আন্দোলনের ক্ষেত্রে সংস্কার করা সম্ভব হয়েছে। সেই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যারা সমাজের মাথা অর্থাৎ বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী তাঁরা স্বেচ্ছায় নিজেদের অতিরিক্ত অধিকার ও ক্ষমতা ত্যাগ করেছেন। সেই ধর্মের প্রতিটি মানুষ একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে, ঐক্যবদ্ধভাবে, একে অপরকে সহযােগিতাপূর্বক মনুষ্যত্ব জাগরণের প্রচেষ্টায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন—এ সবই ঠিক আছে। কিন্তু অন্যান্য ধর্মগােষ্ঠীর এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গী, অভ্যাস ও আচরণের প্রসার হতে দেবে না।
অন্যান্য ধর্মগােষ্ঠীদের বিরােধিতা প্রতিহত করার জন্য সংস্কারকদের তৎপর হতে হবে। কিন্তু প্রতিহত করার জন্য যে ধরনের কৌশল, আচরণ ও নীতির প্রয়ােজন তা সংস্কারের আদর্শের পরিপন্থী। সংস্কার আন্দোলনের কর্ণধাররা যদি প্রতিষ্ঠিত ধর্মগোষ্ঠীগুলির সম্মিলিত আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানাের সিদ্ধান্ত নেন তবে ভবিষ্যতে নিজেদের অগ্রগতির সম্ভাবনাকে মূল্য হিসাবে ধার্য করতে হবে। সেই ঝুঁকি স্বীকার করে নিলেও রাজনীতির সহায়তা ছাড়া সাফল্যের কোন সম্ভাবনা নেই। সুতরাং সংস্কার প্রচেষ্টা এবং তার অনুগামীরা সংস্কারের পূর্বে যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থাতেই প্রত্যাবর্তন করেন। পৃথিবীর বুকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম-আন্দোলনের ইতিহাসে এই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে বার বার। বর্তমানেও এই একই অবস্থা চলছে। এ এক ভয়ানক বৃত্ত, যার কোন সুরাহা নেই।
সুতরাং, একই সাথে পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের সংস্কার প্রয়ােজন। তবেই সম্ভব হবে সমস্ত মানুষের পক্ষে এই নতুন সংস্কারকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করা এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের আচরণে, ব্যবহারে, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা। কিন্তু ধর্মীয় আদর্শের মাধ্যমে এই সার্বিক সংস্কার আনা সম্ভব নয় ।
জিজ্ঞাসা :—অর্থাৎ, সংস্কার সম্ভব, কিন্তু ধর্মীয় আদর্শের মাধ্যমে সার্বিক সংস্কার সম্ভব নয়। সুতরাং প্রশ্নটা হচ্ছে উপায় নিয়ে, সংস্কারের সম্ভাবনা নিয়ে নয়। তাই তাে ?
উত্তর :– হ্যাঁ, ঠিক তাই।
জিজ্ঞাসা :—ধর্মীয় আদর্শ বলতে কী বলতে চাইছেন (যার দ্বারা সার্বিক সংস্কার সম্ভব নয় ) ?
উত্তর :—যে সমস্ত নীতি-নিয়ম সমাজের অধিকাংশ মানুষের প্রগতি ও মুক্তি সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণার সমর্থক, কোন এক বিশেষ গােষ্ঠীর ক্ষেত্রে তাকেই ধর্মীয় আদর্শ বলা যায়। সংস্কার করতে গিয়ে প্রত্যেক ধর্মগােষ্ঠীরই চেষ্টা হবে নিজেদের রীতি-নীতির পরিবর্তন এনেও অপরের সাথে নিজেদের স্বাতন্ত্র রক্ষা করে চলার। বলাবাহুল্য, এতে বর্তমান পরিবেশ ও পরিস্থিতি আরও কলুষিত হতে পারে। সুতরাং সমস্ত পৃথিবীতে একসাথে সব ধর্মের সংস্কার ধর্মীয় আদর্শের দ্বারা সম্ভব নয়।
জিজ্ঞাসা :—সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, পৃথিবীতে কয়েকটা প্রধান ধর্ম আছে, বাকীগুলি ছােটখাটো কিছু বিশেষ স্থান এবং গােষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমরা এই আলােচনায় শুধু কি প্রধান ধর্ম-আন্দোলনগুলিকে বিচার করছি, নাকি সমস্ত ধর্মের কথা বলছি ?
উত্তর :–আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশ্নটা খুব মজার, যদিও গুরুত্ব সহকারে বিচার করার প্রয়ােজন আছে। কোন ধর্মটা প্রধান এবং কোনটা তুচ্ছ, বিচার করতে গেলে সমস্ত ধর্ম-আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হবে। অনেক তথাকথিত ছোটখাটো ধর্ম-আন্দোলন, বয়সের নিরিখে বহু তথাকথিত প্রধান ধর্ম-আন্দোলনের চেয়ে প্রাচীন। সুতরাং ‘প্রধান’ বা ‘অপ্রধান’ বিচারের মাপকাঠি এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই বয়স বা আয়ু নয়।
এই বিচারের আর একটা সম্ভাব্য পদ্ধতি আধ্যাত্মিকতা। অর্থাৎ কোন্ ধর্ম-দর্শনে আধ্যাত্মিক গভীরতা সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত— সেই দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে খুব একটা উল্লেখযােগ্য পার্থক্য চোখে পড়বে না। অথচ আলােচনা প্রসঙ্গে বারবার এই ‘প্রধান’ বা ‘অপ্রধান’ ধর্ম-আন্দোলনের বিচার চলে আসে। কী ভিত্তিতে ?
এক-একটি ধর্মগােষ্ঠীর মধ্যে কতজন মহাপুরুষ এসেছেন, সেটা একটা বিচারের মাপকাঠি হতে পারে। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, সংখ্যার বিচারে তেমন কোন পার্থক্য নেই।
একটিই বিকল্প অবশিষ্ট থাকে যে, এক-একটি ধর্ম-আন্দোলন কতটা সার্থক হয়েছে জগতের সামাজিক ইতিহাসে। খুব স্থূলভাবে এই বিচারের উপায় একটাই–কতজন মানুষ এক-একটা ধর্মগােষ্ঠীর অনুগামী। সংখ্যানির্ণয় করলে দেখা যাবে যে, কিছু ধর্মের পিছনে জনসমর্থন বিপুল এবং তুলনায় অন্যগুলি সংখ্যালঘু। সুতরাং শুধুমাত্র সংখ্যাতত্ত্বের নিরিখেই ধর্ম-আন্দোলনের প্রাধান্য বিচার করা হয় ।
এবার আরও গভীরভাবে এই যুক্তির বিশ্লেষণ প্রয়ােজন। কী পদ্ধতিতে এই তথাকথিত ধর্ম-আন্দোলনগুলি নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে ? জন-সমর্থন আদায়ের পিছনে তাদের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল ?
প্রধান ধর্ম-আন্দোলনগুলির যারা নেতা, তারা প্রথমে তাদের পূর্বসূরী কোন মহাপুরুষের আদর্শ গ্রহণ করে’ ঈশ্বরের নামে মানুষের মধ্যে প্রেম ও জ্ঞানের বাণী প্রচার করেছিল, কিন্তু তারা নিজেরা কোন আদর্শ হয়ে উঠতে পারেনি—এটা সমস্ত ধর্ম-আন্দোলনের ক্ষেত্রে সত্য।
তাই পরবর্তীকালে এরা নিজেদের গােষ্ঠীকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে প্রয়ােজনে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করতেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি। এইসমস্ত নিষ্ঠুর অত্যাচার সংঘটিত হয়েছিল কোন মহাপুরুষের নামে বা ঈশ্বরের নামে। এই অমানুষিক আচরণ সমস্ত ধর্মের এবং পৃথিবীর সমস্ত মহাপুরুষদের কলঙ্ক। এই প্রচেষ্টা ও নৃশংস পদ্ধতি আজও চলছে সমস্ত ধর্মগােষ্ঠীর মধ্যে। একটি মাত্র ব্যতিক্রম আছে, যারা কোনদিন কখনই জোরপূর্বক ধর্মান্তরণ করার চেষ্টা করেনি।
এখন দেখতে হবে যে এইভাবে গােষ্ঠীকে শক্তিশালী করার পিছনে মূল উদ্দেশ্য কি ছিল ? নিজেদের জন্য কিছু বাড়তি সুবিধা ও সুযােগ আদায় করাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এবং আছে। কোন বিশেষ অঞ্চলের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেওয়াই মূল লক্ষ্য।
সুতরাং ধর্মগােষ্ঠীর কদর নির্ভর করছে, কতজন অনুগামী–তার ওপরে। মানুষের সংখ্যা তখনই বেশি হয় যখন অপর ধর্মের তুলনায় সুযােগ-সুবিধা, অধিকার বা ক্ষমতা অধিক হয়। এবং এই সমস্ত ক্ষমতা অর্জনের মূলে কাজ করছে রাজনৈতিক প্রভাব। অর্থাৎ কোন এক গােষ্ঠীর শক্তি—মূলতঃ রাজনৈতিক শক্তি । সুতরাং, যাদের ‘প্রধান’ বলা হচ্ছে, তারা প্রত্যেকেই (একটি ছাড়া) রাজনীতি এবং অত্যাচারের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এদের উত্থান আদর্শগত কারণে নয় যদিও এরা মহাপুরুষদের ও শাস্ত্রের উন্নত চিন্তাধারার পিছনে আশ্রয় নিয়ে একদিন প্রচারের কাজে ব্রতী হয়েছিল। মূলে তো কোন দ্বন্দ্ব নেই—সবাই ঘােষণা করে, ঈশ্বরই সত্য, তার মহিমাই সর্বত্র বিরাজমান। যে কারণে এবং যে পদ্ধতিতে এই সমস্ত আন্দোলন প্রধান ধর্মের শিরােপা পেয়েছে তা কোনওভাবেই শাস্ত্র-সমর্থিত নয়। তৎসত্ত্বেও এই সমস্ত পদ্ধতি প্রয়ােগ করা হয়েছে এবং হচ্ছে এবং তার জন্য তাদের আমরা মহিমান্বিত করি। এই রক্তাক্ত আন্দোলনগুলিকে ‘প্রধান’ ধর্ম বললে, ধর্ম, ঈশ্বর এবং প্রকৃত মহাপুরুষদের অমর্যাদা করা হয়। এগুলােকে বলা উচিত ‘রাজনৈতিক ধর্ম-আন্দোলন’। … [ক্রমশঃ]