স্থান ~ পরমানন্দ মিশন ৷ সময় ~ ১৯৯০-৯১ খ্রিস্টাব্দ । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ গঙ্গাবাবু, পঙ্কজবাবু, স্বরূপানন্দ মহারাজ ও অন্যান্য ভক্তবৃন্দ ।

জিজ্ঞাসু :— তাহলে মহারাজ! সাধারণ মানুষ মহাপুরুষকে চিনতে পারে না ঠিকই কিন্তু জ্যোতিষবিদ্যায় পারদর্শী ব্যক্তি তো আপনাকে চিনতে পারলো?

গুরুমহারাজ :— হ্যাঁ, তা যে কোন ব্যাপারেই “পারদর্শী” হওয়াটাও তো সাধনাসাপেক্ষ ব্যাপার ! ফলে, সে তো আর So called সাধারণ থাকছে না! যে কোন বিদ্যা অর্জন করে তাতে সিদ্ধ হতে গেলে গুরুর কাছে শিক্ষা-গ্রহণ করে একনিষ্ঠভাবে সাধন-ভজন করতে হয়__ তবে তো হয়। আর ঠিক ঠিক জ্ঞান হয়ে গেলে সে মহাপুরুষকে ধরে ফেলবে বই কি? ছাই মাখা হলেই বা কি — সোনা তো সোনাই থাকে! পাঞ্চভৌতিক শরীর ধারণ করতে হয়েছে — এছাড়াও অনেক কিছু সাধারণ মানুষের মত করতে হচ্ছে — কিন্তু আসল “মাল”-টিকে সে লুকাবে কোথায়? যার চোখ হয়েছে — শক্তিলাভ হয়েছে — সে ঠিকই ধরে ফেলবে। তবে ধরা বা না ধরায় কিই বা আসে যায়। মহাপুরুষরা, অবতার পুরুষ নির্দিষ্ট কাজ করতে আসেন — সে কাজ তারা করেই যাবেন, আর কাজ শেষ হলে সমস্ত আকর্ষণ ছিন্ন করে শরীর ছেড়ে দেবেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন “গাইগরুর শরীরের যে কোন অংশে হাত দিলেই গরুকে ছোঁয়া হলো কিন্তু বাঁট দিয়ে দুধ বেরোয় — অন্যান্য অঙ্গ দিয়ে তা বেরোয় না। তেমনি জীবজগতের সবই ব্রহ্মের প্রকাশ — মহাপুরুষরাও তাই, যেন গাইগরুর “বাঁট”। এঁরা জগতকে অধ্যাত্ম শিক্ষা দেন, জগতকল্যাণে দুগ্ধধারার মতো করুণাধারা প্রবাহিত হয় এঁদের মধ্যে দিয়ে — তাই ব্রহ্ম এখানে অধিক প্রকাশমান। সূর্য সর্বত্র আলো দেয় সর্বত্রই প্রকাশিত কিন্তু স্বচ্ছ জলে এর প্রতিফলন অন্যান্য বস্তু অপেক্ষা বেশি — হীরায় আরও বেশি।”

মহাপুরুষগণের জীবনই হয় শাস্ত্রের বাণী বা শিক্ষা। স্বামী বিবেকানন্দের জীবনই হচ্ছে গীতার জ্বলন্ত নিদর্শন। এইরূপ যে কোন মহাপুরুষ মানব-শরীর ধারণ করে, মানুষের বেশে, মানুষের কাছে আসেন — মানুষের নানাবিধ কল্যাণ করার জন্য। এবার তুমি যা বলছিলে — যে সাধারণ মানুষ এঁদের ঠিক ঠিক চিনতে পারে না — দ্যাখো তা পারবেই বা কি করে! যার সঙ্গে তোমার কোন পরিচিতি নেই — ধারণা নেই — তাকে — সেইরূপ কোন ব্যক্তিকে বা কোন বস্তুকে তুমি কি চিনতে পারবে — না তার মূল্যায়ন করতে পারবে? পারবেই না তো। কিন্তু দ্যাখো — ভারতবর্ষ এমনই পূণ্যভূমি এখানকার সাধারণ বা অতি সাধারণ ব্যক্তিও কিন্তু সাধু-সন্ত-মহাত্মাদের ভক্তি করে — ভালোবাসে। তাছাড়া ফুল ফুটলে যেমন তার সৌরভ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে — তেমনি কোন মহাপুরুষ কোথাও শরীর গ্রহণ করলে বা কোথাও কার্য শুরু করলে অগণিত ভক্তবৃন্দ সেখানে হাজির হয় এবং তাদেরকে নিয়েই ওই মহাপুরুষ তার নির্দিষ্ট কাজ শুরু করে দেন।

সূর্য যেমন নিজের আলোয় নিজেই উদ্ভাসিত বা প্রতিভাসিত হন — তেমনি মহাপুরুষগণও নিজের ঐশ্বর্যে (ষড়ৈশ্বর্য — শ্রী, বল, যশ, জ্ঞান ইত্যাদি) নিজেই প্রতিভাসিত হন, বা নিজেই নিজেকে প্রতিভাসিত করেন। সূর্যকে যেমন টর্চ জ্বেলে বা হ্যারিকেন জ্বেলে দেখতে হয় না, কারণ সূর্য স্বয়ং প্রকাশ, তার আলোতেই সবকিছু প্রকাশিত — তেমনি কোন মহাপুরুষ অন্য কারও দ্বারা প্রকাশিত হন না — তিনিও স্বয়ং প্রকাশ। তিনিই তাঁর পরিজনদের মধ্যে কাউকে কাউকে শক্তি প্রদান করে কিছু কিছু কাজ করিয়ে নেন। তাদের মধ্যে অহংকার এসে গেলে — আবার তিনি তার শক্তি হরণও করে নেন, আবার হয়তো অন্য কারুকে দিয়ে কাজটি করান। এইভাবেই মহাপুরুষগণ তাঁর আরব্ধ কাজ ঠিকই সম্পন্ন করেন। ভগবানের কাজ ভাগ্যবানে করে। ভগবানের কাজ যে যেভাবে করতে পারে — সেই ব্যক্তির ততটুকুই লাভ, পরকালের কড়ি ততটুকুই জোগাড়।

তবে যা বলছিলাম। মহাপুরুষ বা পরমহংসগণের জীবনকলা (জীবনযাত্রা), তাঁদের আচার-আচরণ, সবকিছুই নির্দেশ করে দেয় যে, তিনি অসাধারণ! যে কোন মহাপুরুষের বাল্যকাল থেকে অন্তিমকাল পর্যন্ত ঘটনাসমূহকে একটু শ্রদ্ধাপূর্বক বা বিবেক সহকারে নিরীক্ষণ করলেই বা শুদ্ধবুদ্ধি দিয়ে বিচার করলেই টেরও পাওয়া যায়। দু’জন সাধুর গল্প বলছি শোন — এদের একজন ছিলেন সাধারণ সাধু — আর একজন পরমহংস। একটা ছোট্ট ঘটনায় এদের উভয়ের স্বরূপ কিভাবে উন্মোচিত হলো তাই বলছি শোন।

ওই সাধু দু’জন একদিন বনের পথ ধরে — তাদের কোন এক গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিল। তাদের পিছন পিছন আসছিল এক সুন্দরী যুবতী নারী। পথ চলতে চলতে হঠাৎ একটা পাহাড়ি ছোট নদী তাদের সামনে পড়ল। ওই নদীতে জল বেশি ছিল না হয়তো কোমর পর্যন্ত কিন্তু প্রচণ্ড খরস্রোত। সাধু দু’জন দিব্যি পার হয়ে গেল — কিন্তু ওই যুবতীটি ভয় পাচ্ছিল বলে পার হতে পারল না। সাধুরা ওপারে গিয়ে গা-মোছামুছি করে ভিজে বস্ত্র ছেড়ে শুকনো বস্ত্র পরার উদ্যোগ নিয়েছে এমন সময় এপার থেকে ওই নারী চিৎকার করে সাহায্যের জন্য আবেদন জানাল। একজন সাধু ওই রমণীর ভয়ার্ত আবেদন শুনেও না শোনার ভান করে গন্তব্যের দিকে হাঁটা লাগাল। কিন্তু পরমহংসজী ঘটনার প্রয়োজনীয়তা বিচার করে (অর্থাৎ একে নির্জন বনপথ অন্যদিকে সন্ধ্যা আগত প্রায়) তৎক্ষণাৎ জলে নেমে পড়ে ওপারে পেরিয়ে গেলেন এবং ওই নারীকে অবলীলাক্রমে কোলে নিয়ে এপারে নামিয়ে দিলেন। তারপর উনি ওই সাধুকে follow করে তার সঙ্গ ধরলেন আর মহিলাটি তার গন্তব্যস্থলের দিকে চলে গেল। পূর্বের সাধুটি ঘটনাটি সবই দেখলো আর একজন সন্ন্যাসী হওয়া সত্ত্বেও একটি যুবতী নারীকে কোলে করে নদী পার করার দৃশ্য দেখে খুবই দুঃখিত হল। সারাদিন হেঁটে সন্ধ্যার সময় সাধু দু’জন একটি সাধুদের বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা দেখে — সেখানে রাত্রি কাটানোর মনস্থ করল। অন্যান্য সাধুরাও সেখানে ধুনি জ্বালিয়ে বসেছিল, এরাও কাঠ জোগাড় করে ধুনি জ্বালাল — এরপর সন্ধ্যাকৃত্য করার জন্য দু’জনে ধুনির দুধারে বসল — কিন্তু পূর্বের সাধুটির মুখ ভার। সকালের সেই ঘটনার পর থেকে একটা কথাও বলেনি। এই প্রথম হঠাৎ করে রাগত স্বরে বলে ফেলল “এটা আপনি কি করলেন?” পরমহংস বললেন “কোনটা?” প্রথম সাধু বলল — “ওই যে আপনি ওই যুবতীটিকে কোলে নিলেন? একজন সন্নাসীর পক্ষে এটি কি গর্হিত কাজ নয়?” পরমহংস সকালের সেই ঘটনাটি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন — কারণ তাঁর মনে তো ঘটনাটি কোন রেখাপাতই করেনি। তিনি স্মিত হেসে উত্তর দিলেন — “ও আচ্ছা — সেই সকালের নদী পার করার কথা বলছেন! কিন্তু তাকে তো আমি নদী পার হবার পরই কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছিলাম আর আপনি তো দেখছি তাকে এখনও মনে মনে বয়ে বেড়াচ্ছেন! এইজন্যই আপনি দুঃখ পাচ্ছেন, অশান্তি ভোগ করছেন — নামিয়ে ফেলুন না — তাহলেই তো ল্যাটা চুকে যায়।”

সাধু-সন্ন্যাসী মহলে গল্পটা খুবই প্রচলিত — কারণ গল্পটির মধ্যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এই ঘটনাটি ঘটেছিল বলেই উপস্থিত সাধুরা পরমহংসকে সেদিন চিনতে পেরেছিল এবং মুখে মুখে ঘটনাটি সাধুসমাজে ছড়িয়ে পড়েছিল। একজন মহাপুরুষ বা পরমহংসের সঙ্গে_একজন সাধারণ মানুষের (অথবা কোন ব্যক্তি যে সাধু-সন্তের বেশ ধারণ করেছে কিন্তু চেতনায় উন্নত হতে পারেনি )এখানেই তফাৎ !

ঘটমান এবং অতীতের ঘটনাসমূহকে বয়ে বয়ে নিয়ে চলে মানুষ। এই সব ভার-বোঝায় ভারাক্রান্ত মানুষ, সমস্যাজর্জরিত মানুষ অহরহ ক্লিষ্ট হচ্ছে তবুও আসক্তি-বশত আবার ঘটনা ঘটাচ্ছে, আবার বোঝা বাড়াচ্ছে। এবার কথা হচ্ছে যিনি পরমহংস, তিনি চেতনায় এতটাই উন্নত যে, তাঁর মন কিছুতেই আসক্ত হয় না ফলে কোনরূপ ভার-বোঝাও তাঁকে বয়ে বেড়াতে হয় না। যাঁরা নিত্যমুক্ত — সে তো সদাই নিত্যানন্দে মশগুল! জাগতিক সুখ বা দুঃখের কোন অনুভূতি এঁদের থাকে না কিন্তু যদি এঁরা সমাজে কাজ করতে নেমে আসেন তখন এঁদের সবকিছু প্রদর্শন করতে হয়। সাধারণ মানুষের মতোই, আচরণ করতে হয়। নাহলে সাধারণ মানুষ তাঁর কাছে আসবে না — তাঁর যে মানবকল্যাণব্রত সেটি সিদ্ধ হবে না। তাই তাঁর কাছে যতক্ষণ কোন দুঃখী মানুষ তার দুঃখের কাঁদুনি গাইবে ততক্ষণ তিনি দুঃখী। আবার যখন কোন সুখী মানুষ তার সুখের — তার গৌরবের কাহিনী তাঁকে শোনাবে ততক্ষণ তিনি সুখী। কিন্তু যখন কেউ নেই যখন তিনি একা — তখন শুধুই আনন্দ আর আনন্দ! তখন তিনি শুধু পরমানন্দে সমাহিত হয়ে থাকেন!

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ৷৷