ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।
বিভিন্ন বৈষ্ণব শাস্ত্রের বা গ্রন্থে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথের মন্দিরের উল্লেখ রয়েছে । কবি বিজয়রাম লিখেছেন_” চা-পান করিয়া তাহা চলিল ত্বরিত। অগ্রদ্বীপে আসি নৌকা হইল উপস্থিত । / সেই স্থানে গোপীনাথ ঠাকুরের ঘর । অপূর্ব নির্মাণ বাটি দেখিতে সুন্দর ।।/” ____মহাপ্রভু স্বয়ং গোপীনাথ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, গোবিন্দের তৈরি করা মাটির গৃহে।পাকাপোক্ত মন্দির তৈরি হয়েছিল আরও অনেক পরে । কথিত আছে গোপীনাথের প্রথম দেখার মত বড় মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় । কিন্তু কথায় আছে, ‘গঙ্গাতীরে বাস _ভাবনা বারো মাস’! এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কতবার নতুন নতুন মন্দির তৈরি হয়েছে, আর তা গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে _তার ইয়ত্তা নাই । কিন্তু রয়ে গেছেন গোপীনাথ, গোবিন্দ ঘোষের গোপীনাথ, স্বয়ং মহাপ্রভুর প্রতিষ্ঠিত গোপীনাথ !
গোপীনাথ প্রতিষ্ঠার পর মহাপ্রভু গোবিন্দকে সস্নেহে বললেন_” গোবিন্দ ! তুমি সংসারে থাকো, বিয়ে-থা করে সংসারী হও, আর গোপীনাথের সেবা করো। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে জোড়হাতে চুপ করে সব কথা শুনে গোবিন্দ বললেন _”তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক প্রভু! তোমার ইচ্ছার বাইরে জগত-সংসারে কবে কি হয়েছে ? তাই এবারও তোমার ইচ্ছার অন্যথা হবেনা!” মহাপ্রভু সন্তুষ্টচিত্তে বিদায় নিলেন। মহাপ্রভুর সাথে সাথে বিদায় নিলেন ভক্ত।তকুল। শূন্য আশ্রমে থেকে গেলেন গোবিন্দ ও গোপীনাথ । মহাপ্রভুর আদেশের কথা লোকমুখে প্রচার হোতে বেশি সময় লাগল না, গোবিন্দের ভক্তমন্ডলীই তার বিবাহের পাত্রী যোগাড় করে ফেললো। মহাসমারোহে বিবাহও হয়ে গেল গোবিন্দের ! বৎসরকালের মধ্যে একটি ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দেবার অব্যবহিত পরেই গোবিন্দের তরুণী ভার্যা দেহত্যাগ করে অমৃতলোকে গমন করলো। এ কি প্রভুর নিষ্ঠুর লীলা ! গোবিন্দের দিনের বেশিরভাগ সময় গোপীনাথের সেবায়, ভক্ত-বৈষ্ণব সেবায় কেটে যায়। তার স্ত্রী যতদিন ছিলেন ততদিন তার কাজের একটু সুবিধা হয়েছিল, কারণ সে গোবিন্দকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতো। সেই সাহায্যের হাতটি তো গেলোই, আবার ভার পরলো একটি নবজাতকের সেবা শুশ্রূষার!
গোপীনাথ সেবা, আবার এই শিশুর সেবা_ দুজনকে সমানভাবে সেবা করতে গোবিন্দের খুবই অসুবিধা হতে লাগলো । এই দ্বিবিধ সেবার ফলে কখনো কখনো গোপীনাথের সেবার ত্রুটি হতে লাগলো। আবার সেইটা পূরণ করতে গিয়ে শিশুটির অযত্ন হয় । উভয়ের সেবায় গোবিন্দ মুহ্যমান হয়ে পড়ে । তার সময় সময় খেয়াল থাকেনা _কে ছেলে, আর কে গোপীনাথ ! ধীরে ধীরে পুত্র যত বড় হোতে লাগলো, গোবিন্দের পুত্রের প্রতি মোহ বাড়তে থাকলো । পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গোপীনাথ বিস্মরণ হয়ে যায়! আহা! জগতে অপত্যস্নেহ অপেক্ষা বড় আর কি আছে ! শিশুটির যখন পাঁচ বছর বয়স_ তখন সেই শিশুটি মারা গেলো! শোকে-দুঃখে পাগলপারা হয়ে গেলো গোবিন্দ ! বুক চাপড়ে হাহাকার করে কেঁদে উঠলো সে _তার যত রাগ গিয়ে পড়লো শ্রীকৃষ্ণের জীবন্ত বিগ্রহ গোপীনাথের উপর ! ‘দিবানিশি তোমার পূজা-অর্চনা সেবা নিয়ে থাকি__ আর তার এই প্রতিফল ? এ জীবন আর রাখবো না!’__ গোপীনাথ বিগ্রহের কাছে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকলো! ঠাকুরের সেবা নাই, নিজের স্নানাহার নাই_ সব বন্ধ ! থাক ঠাকুর উপবাস করে ! দেখি ওকে কে খেতে দেয় ?
“গোবিন্দ বাবা! তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেল যে! একফোঁটা জল দেবে না ?__বিগ্রহ কথা কয়ে উঠলো করুণ স্বরে । অনড় হয়ে পড়ে রইলো গোবিন্দ, শুনেও না শোনার ভান করে চুপ করে পড়ে রইলো। “তোমার কি দয়ামায়া নাই ! একটা নিরীহ ছেলেকে তুমি না খাইয়ে রাখবে?”_ বিগ্রহ আবার কথা বলে উঠলো।
“ছেলে ? আমার ছেলে কোথায় ? দাও আমার ছেলে ফিরিয়ে দাও !”__গোবিন্দ কেঁদে উঠলো আর ঝেড়েমেরে উঠে দুই হাত বাড়িয়ে দিলো চিন্ময় বিগ্রহের দিকে ! ভালো করে চেয়ে দেখলো গোবিন্দ _সেই চিন্ময় বিগ্রহের চোখেও জল ! যেন ক্ষুধাকাতরই শুধু নয়, গোবিন্দের পুত্রশোকের ব্যাথাতে সেও যেন ব্যথিত, চোখেমুখে যেন সেই অভিব্যক্তি স্পষ্ট । “একটা ছেলে মারা গিয়েছে বলে_ আর একটা ছেলেকেও তুমি না খাইয়ে মেরে ফেলবে ? তুমি কেমন পিতা?”__ এবার যেন বিগ্রহের কন্ঠে অনুযোগের সুর! “তুমি আমার ছেলে ? তুমি যদি আমার ছেলেই হও, যদি তুমি আমাকে পিতৃবৎ মনে করে থাকো_তাহলে কেন আমাকে পুত্রশোক দিলে ? কেন আমার বুক খালি করে দিয়ে আমার পুত্রকে ছিনিয়ে নিলে?_ কাতরে উঠলো গোবিন্দ, “বলো_ উত্তর দাও !”
এবারে বিগ্রহের কণ্ঠস্বর যেন কঠিন দৃপ্ত। এবার আর অনুযোগ নয়, এবার নির্দেশ __”গোবিন্দ তোমাকে অতি গোপন কথা বলছি ! যে বাপের আমাকে নিয়ে দুই ছেলে সেখানে আমি দ্বিতীয় পুত্র হয়ে থাকতে পারিনা ! দীর্ঘদিন তোমার কাছে একছেলে হয়ে ছিলাম _সেটা অন্য রকম ছিল, ভালোই ছিলাম । তারপর তোমার যখন পুত্রসন্তান হোলো, তার প্রতি তোমার মোহ পড়ে গেল। তখন তুমি আমার সেবার নানান ত্রুটি ঘটাতে শুরু করলে। একবার ভাবলাম তোমাকে ছেড়ে চলে যাই!” “না_ না ! যেওনা_ তুমি চলে যেওনা প্রভু!”__ গোবিন্দের আর্তস্বর । “যাইনি তো ! যখন দেখলাম তোমার এই সন্তানের আয়ু বেশি নয় অর্থাৎ সে-ও বেশিদিন বেঁচে থাকবে না, আর আমিও যদি চলে যাই__ তাহলে তোমার একুল-ওকুল দু’কুলই যাবে। আমাকেও হারাবে, আবার তোমার ছেলেটা তো মারা যাবেই! এখন তোমার সেই ছেলে মারা গেছে__ কিন্তু আমিতো আছি ! আর আমি আছি মানে তোমার সেই ছেলেও রয়েছে আমার মধ্যে ! তুমি এখন থেকে আমার মধ্যে দুই ছেলে রয়েছে __ভেবে আরও মনোযোগ দিয়ে আমার সেবা যত্ন করো__ এতেই তোমার মঙ্গল হবে !”__ গোপীনাথ বিগ্রহ সিদ্ধান্ত দিলো। কিন্তু মানুষের পাটোয়ারী বুদ্ধি যায়না__ গোবিন্দ আবার বললো__ ” আমার ছেলে তোমার মধ্যে রয়েছে ? কিন্তু সে বেঁচে থাকলে আমার কত কাজে লাগতো_ আমার কত কাজ করে দিতে পারতো__ তুমি কী সে সব করবে ?
“নিশ্চয়ই করবো। বলো, আমাকে কি কাজ করতে হবে?”_ বিগ্রহের এবার বাৎসল্য ভাব, তাই সেই সুরে কথা বললো!
“পুত্রের যা কর্তব্য ! আমার দেহান্তে পিতৃশ্রাদ্ধ। সে তো সন্তানেরই অধিকার ! আমার ছেলে বেঁচে থাকলে সে আমার শ্রাদ্ধাদি কর্ম করতো_ তুমি করবে আমার শ্রাদ্ধ ?”__ গোবিন্দ বিনীত কন্ঠে বললো।
” তুমি যখন বলছো, তখন নিশ্চয়ই করবো! তুমি আমার পিতা, তোমার আদেশ আমি অমান্য করি কি করে?”__ গোপীনাথ বিগ্রহের আশ্বাসবাক্য !
শ্রীবিগ্রহের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে খুবই খুশি হোল গোবিন্দ ! তাড়াতাড়ি উঠে ঠাকুরের সেবাভোগের বন্দোবস্ত শুরু করে দিলো। এই ঘটনার পর বেশ কয়েক বছর বেঁচে ছিল সে__ ধীরে ধীরে আশ্রমের ভক্তসংখ্যা বাড়তে শুরু করলো । গোবিন্দ গোপীনাথের সম্পর্ক নিয়ে জনশ্রুতিও তৈরি হয়ে গেলো। বৃদ্ধ গোবিন্দ সকলকে বলতো যে, গোপীনাথ কথা দিয়েছে_’সে তার শ্রাদ্ধ করবে’!
সেকথা কেউ বিশ্বাস করতো_ কেউ করতো না! অনেকে ভাবতো পরপর স্ত্রীবিয়োগ ও পুত্রবিয়োগের ফলে লোকটার একটু মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে ! অবশেষে এলো সেই দিন! সকালে উঠে শিষ্য-ভক্তরা দেখলো _গোবিন্দ ঠাকুরের দেহ নিষ্প্রাণ হয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে পড়ে রয়েছে! চারিদিকে খবর হয়ে গেলো__ ভক্তরা কাঁদতে কাঁদতে মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করলো। সেই রাত্রেই গোপীনাথের নবনিযুক্ত পূজারী স্বপ্নে দর্শন করলো __ দেখলো তার আরাধ্য গোপীনাথ মুর্তি থেকে প্রকট হয়েছে! মূর্তির পদ্মচক্ষুতে টলটলে জল ঝরে ঝরে পড়ছে ! পিতার মৃত্যুতে শোকার্ত হবেনা _তার চোখ দিয়ে জল পরবেনা! গোপীনাথ তো শুধু পাষাণ মূর্তি নয়, চিন্ময় বিগ্রহ ! এরপর প্রকটিত মূর্তি কথা বললো_”শোন_ গোবিন্দ আমার পিতা, আমি একমাস অশৌচ পালন করবো,হবিষ্যান্ন খাবো ! আজ সকালেই আমাকে স্নান করিয়ে ‘কাচা’_ পরিয়ে দাও, আমি আমার পিতার কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আছি যে, আমি তার শ্রাদ্ধ করবো, পিন্ড দেবো_ নিজের হাতে! তুমি সকলকে ডেকে সব বন্দোবস্ত করো!”
__ ঘুম ভেঙে গেলো সেবাইতের। সকালেই ইষ্টদর্শন ! হেঁকে-ডেকে সকলকে বললো দর্শনের কথা ! ভক্তদের মধ্যে তুমুল কোলাহল পড়ে গেলো __অনেকেই ভাবতে লাগলো বৃদ্ধ এসব কথা বলতো বটে__ কিন্তু তারা বিশ্বাস করতো না ! একমাস পরে গোবিন্দের শ্রাদ্ধ-বার্তা রটে গেলো গ্রামে গ্রামে ! শ্রাদ্ধবাসরে সে কি ভিড় ! ‘কাচা কাপড়’_ পরিহিত গোপীনাথকে মন্দির থেকে নিয়ে আসা হোলো বাইরে শ্রাদ্ধবাসরে। ঠাকুর বেরিয়ে আসতেই সে কি কোলাহল, আর সে কি জয়ধ্বনি ! আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে গেলো! সকলের সামনে গোপীনাথ নিজ হাতে পিন্ডদান করলেন । ভগবানের বাৎসল্য রসের পরাকাষ্ঠা দেখল উপস্থিত জনগণ__ জানলো জগতবাসী! নিজের ছেলে বেঁচে থাকলে পিতার মৃত্যুর পর সে আর কত বৎসর শ্রাদ্ধকর্ম করতে পারে ? হয়তো তার জীবদ্দশাকালীন কয়েক বৎসর__ তার বেশি তো নয় ! কিন্তু গোপীনাথ স্বয়ং যার পুত্র, সে আবহমানকাল ধরে রাখে তার প্রতিশ্রুতি ! আজও প্রতি বৎসর চৈত্র মাসের কৃষ্ণ একাদশী তিথিতে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ মহাভাগ্যবান পিতা গোবিন্দের শ্রাদ্ধ ও পিন্ডদান করে আসছে।
