মহাপ্রভু চলেছেন বৃন্দাবনের পথে ! কোনো কোনো পদকর্তা বলেছেন, _রামকেলি যাওয়ার পথে নবদ্বীপ থেকে সোজা গৌড়বঙ্গের ভিতর দিয়ে দ্বারবঙ্গ (বর্তমান দ্বারভাঙ্গা) হয়ে পশ্চিমাভিমুখে ছিল তৎকালীন যাত্রাপথ। যাইহোক, নবদ্বীপ থেকে প্রথমে শান্তিপুর, মহাপ্রভু যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই লোকজনের ভিড়, মহোৎসব! সেদিন মধ্যাহ্নের আহারের পর প্রভু গোবিন্দকে বললেন_” গোবিন্দ ! মুখশুদ্ধি আছে?” গোবিন্দ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো _”এই আনছি প্রভু !” বলেই গোবিন্দ জনে জনে প্রভুর জন্য প্রয়োজনীয় মুখশুদ্ধি, কারো কাছে রয়েছে কিনা _জিজ্ঞাসা করতে লাগলো। মহাপ্রভুকে দেওয়া যায় এমন যত্ন করে রাখা মুখশুদ্ধি আর কার কাছে আছে! বাধ্য হয়ে একটু দূরের কোনো হরিতকী গাছ থেকে পাওয়া গোটা হরিতকী কোন গৃহস্থবাড়িতে পাওয়া গেল, সেখান থেকে এক টুকরো কেটে গোবিন্দ _প্রভুকে দিল। দেরির কারণ জানতে চাওয়ায় গোবিন্দ লজ্জিতভাবে আনুপুর্বিক ঘটনা প্রভুর কাছে বর্ণনা করলো ।
বিশ্রামান্তে আবার যাত্রা ! গঙ্গার তীর ধরে কাটোয়ার পথে, তারপর অজয়ের তীর ধরে ঝাড়িখণ্ডের পথ, আর রামকেলির পথ সোজা গঙ্গার তীর বরাবর! পরদিন প্রভু পৌঁছেছেন গঙ্গার তীরবর্তী জনপদ অগ্রদ্বীপে। সেখানেই মধ্যাহ্ন-ভোজনের ব্যবস্থা ও সাময়িক বিশ্রাম । সেদিনও আহারান্তে মুখশুদ্ধির জন্য মহাপ্রভু গোবিন্দর দিকে হাত বাড়ালেন । গতদিনের অবশিষ্ট হরিতকী গোবিন্দ সযত্নে বেঁধে রেখেছিল বস্ত্রাঞ্চলে, ভেবেছিল পরদিন যদি প্রভু চান__ তাহলে দেওয়া যাবে। আর তাই হোল, মহাপ্রভু চাইলেন মুখশুদ্ধি আর গোবিন্দ তাড়াতাড়ি আঁচল খুলে দিয়েও দিলো, গতদিনের রক্ষিত হরীতকীর খন্ড মহাপ্রভুর হাতে!
এতোদূর পর্যন্ত ঘটনা ঘটে যাওয়া দেখে আপনারা সবাই ভাববেন সবকিছু তো ঠিকঠাকই আছে, অসুবিধা তো কোথাও কিছু হয় নাই! কিন্তু এই একটি ছোট্ট ঘটনা যে কত ঘটনার জন্ম দিতে পারে, কত হিসাব__ বেহিসাব করে দিতে পারে, ভগবানের নরলীলা এই ক্ষুদ্র ঘটনায় কতটা প্রকট হোতে পারে__ তা ঘটনাটা ঘটা পর্যন্ত কারো জানা ছিল না ! সেদিন গোবিন্দ, মহাপ্রভু মুখশুদ্ধি চাইবামাত্র তার আঁচলের প্রান্তখুলে হরিতকী খন্ড যেই না মহাপ্রভুর হাতে দিয়েছে_ অমনি প্রভু বললেন_ “কি হলো গোবিন্দ ! কাল মুখশুদ্ধি দিতে কতো দেরি হোল, আর আজ যে তাড়াতাড়ি দিয়ে দিলে ! গোবিন্দ কাঁচুমাচু করে উত্তর দিলো_” প্রভু এটা কালকেরটাই! তারই অবশিষ্ট অংশ এটা ! যদি আপনি আজকেও মুখশুদ্ধি চান, তাই সঞ্চয় করে রেখেছিলাম!” একথা শুনে হুংকার দিয়ে উঠলেন মহাপ্রভু ! “কি তুমি কালকের হরিতকী আঁচলে সঞ্চয় করে রেখেছিলে ? এখনো তোমার সঞ্চয়প্রবৃত্তি যায়নি ? এখনো আসেনি তোমার ঈশ্বরে সম্পূর্ণ নির্ভরতা?_ প্রভু কঠোর হলেন অথবা ধরলেন ছদ্ম-গাম্ভীর্য! পুনরায় বললেন _”আমার সঙ্গ এবার তোমায় ত্যাগ করতে হবে _গোবিন্দ! তোমার মধ্যে সঞ্চয় প্রবৃত্তি রয়েছে যা গৃহস্থী- সংসারীর সংস্কার, সন্ন্যাসীর নয়! আমি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, জুটলে খাই না জুটলে উপবাসী থাকি! সঞ্চয়, সন্ন্যাসীর ধর্ম নয়,সংসারীর ধর্ম! এবার থেকে তুমি সংসারী হও! এই অগ্রদ্বীপেই কুটির বানিয়ে কৃষ্ণভজন করো । আমার সঙ্গে তুমি আর অগ্রসর হয়ো না !”
মহাপ্রভুর এই কঠোর কঠিন বাক্য শুনে গোবিন্দর মাথায় বজ্রাঘাত হোল। মহাপ্রভুর পা-দুটো ধরে হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগলো গোবিন্দ ! বললো_” হে প্রভু ! তুমি করুণাময় ! করুণা করো! চরণছাড়া করো না, সঙ্গছাড়া করলে এ প্রাণ যে আর থাকবেনা প্রভু! চোখের জলে মহাপ্রভুর চরণ ধুয়ে দিতে লাগলো গোবিন্দ ! মহাপ্রভু আর কি করেন _উঠে দাঁড়িয়ে গোবিন্দকে তুললেন, তারপর স্নেহপূর্ণ অথচ গম্ভীর কণ্ঠে গোবিন্দকে বলতে শুরু করলেন_ “তুমি কেঁদোনা গোবিন্দ ! পরমেশ্বরের লীলা বোঝার সাধ্য কার আছে বলো! তোমাকে দিয়ে তিনি অন্য লীলা করাবেন, অসাধ্য সাধন ঘটাবেন, এবার জগৎ দেখবে ভগবানের ভক্ত বাৎসল্যের পরাকাষ্ঠা! উপযুক্ত পাত্র ছাড়া ঈশ্বরের লীলা পোষ্টাই হয় না __তুমি দীর্ঘদিন আমার সঙ্গে থেকে আমার সেবা করে সেই উপযুক্ততা অর্জন করেছো। তাই তোমার মাধ্যমে ঈশ্বরের এক নতুন ও বিচিত্র লীলা সংঘটিত হবে । সুতরাং তুমি এই অগ্রদ্বীপেই থাকো, এখানেই গঙ্গার তীরে কুটির বানিয়ে সাধন-ভজন করতে শুরু করো_ তারপর পরবর্তী নির্দেশ যেমন যেমন আমি তোমাকে পাঠাবো, তুমি তেমন তেমন কাজ করবে । তোমাকে কেন্দ্র করে এই স্থানে ঈশ্বরের বাৎসল্য-লীলার প্রকাশ ঘটবে।”
মহাপ্রভু চলে গেলেন, সঙ্গে চলে গেল ভক্তের দল ! অগ্রদ্বীপের গঙ্গাতীরে জনশূন্যস্থানে একা পড়ে রইল ভক্তপ্রবর গোবিন্দ ঘোষ । কেঁদে কেঁদে চোখের জল শুকিয়ে গেল গোবিন্দের _কিন্তু মহাপ্রভু আর ফিরে এলেন না ! তবে কিছুদিন পর থেকেই গোবিন্দের অন্তর্জগৎ থেকে প্রেরণা আসতে লাগলো_” গোবিন্দ ওঠো, ঈশ্বরের লীলার যোগ্য হয়ে ওঠো! মহাপ্রভুর আদেশ অমান্য করো না । ওনার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করো। ভগবানের প্রীতি উৎপাদনই তো মানবজীবনের উদ্দেশ্য। তাহলে বৃথা কালক্ষেপণ করে কি লাভ ! ওঠো, কাজে লেগে যাও!”
ঝেড়েমেড়ে উঠে বসল গোবিন্দ ! কুটির বানাতে হবে, সেখানে হবে ঈশ্বরের সেবা। অগ্রদ্বীপের গঙ্গার তীরবর্তী স্থানটি বেশিরভাগ গোপালক ঘোষেদের বসতি। তারা রোজ গরু চরাতে আসে আর দেখে এক সাধু গঙ্গার তীরে কুটির বানাতে ব্যস্ত । একে একে ওদের অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়ায়। ভজনকুটির সহ ওনার থাকার ঘর ও রান্নাঘর তৈরি হয়ে গেল । স্থানীয় ব্যক্তিরা অনেকেই গোবিন্দের সাধু ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে ওর কাজের সহযোগী হয়ে গেল। তারাই ওনার আহার্য যোগায় সুতরাং অন্ন-বস্ত্রের অভাব রইল না। এবার প্রয়োজন ঠাকুরঘরে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার! কিন্তু কোথায় পাবে বিগ্রহ । মহাপ্রভু কি নির্দেশ দেন তার অপেক্ষায় গঙ্গার তীরে প্রভু গুনগানে দিন কাটায় গোবিন্দ ! প্রভু বলেছেন _’যথাসময়ে বিগ্রহ স্থাপন হবে’, এই বিশ্বাস!
একদিন গঙ্গায় স্নান করছে গোবিন্দ__ গায়ে ঠেকলো কালো মতন কি একটা বস্তু! গোবিন্দ ভাবলো_ শ্মশানের মরাপোড়া কাঠ হবে বোধহয়, ঠেলে দেয় স্রোতে_ কিন্তু সেটি উজান স্রোতে ভেসে এসে আবার ঠেকলো গোবিন্দর গায়ে! গোবিন্দের অন্তশ্চেতনায় মহাপ্রভুর নির্দেশ এলো_”গোবিন্দ ওটা পোড়াকাঠ নয়, ওটা সেই নির্দিষ্ট পাথর, ওই পাথরেই বিগ্রহ মূর্তি বানাও এবং তার সেবা করো !”
চেতনা ফিরে পেতেই গোবিন্দ পাথরটা ধরে ফেললো_ প্রভুর আদেশ! সেই মুহূর্তে তার মনেও হলো না যে, পাথর কি জলে ভাসে ? “এ কেমন লীলা, যেখানে জলে ভাসে শিলা!” পাথর পাওয়া গেল, এবার বিগ্রহ বানাতে চাই ভাস্কর _ কিন্তু চিন্তা কি ? মহাপ্রভুর ইচ্ছায় জুটে গেল উপযুক্ত ভাস্কর ! সেই নির্দিষ্ট পাথর কেটে কেটে ধীরে ধীরে অপরূপ রূপ ফুটিয়ে তুললো ভাস্কর! এবার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার পালা ! মহাপ্রভু কথা দিয়েছিলেন _বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার দিন তিনি স্বয়ং উপস্থিত থাকবেন। বার্তা পাঠালো গোবিন্দ, মহাপ্রভু দিন নির্দিষ্ট করলেন এবং ভক্তের বাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য সদলবলে এসে হাজির হোলেন ভক্তপ্রবর গোবিন্দের কুটিরে। মহাপ্রভুর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে অগ্রদ্বীপ হয়ে উঠল বৃন্দাবন ! ওই অঞ্চলের আবালবৃদ্ধবনিতা এসে হাজির হোলো গঙ্গাতীরে। মহাপ্রভু নিজের হাতে শ্রীবিগ্রহ স্থাপন করলেন গোবিন্দের ভজন কুটিরে। বিগ্রহের নাম দিলেন গোপীনাথ ! অপূর্ব ভাস্কর্য _বংশীবাদন রত শ্রীকৃষ্ণমূর্তি, পাশে শ্রীরাধিকা পরে স্থাপন করা হয়েছিল । “বৈষ্ণবাচার দর্পণে”_ রয়েছে,_” গোবিন্দ ঘোষ ঠাকুর বন্দো সাবধানে ।/ যার নাম সার্থক প্রভু করিলাম আপনে। / গৌরাঙ্গের শাখা অগ্রদ্বীপেতে নিবাস,/ শ্রীগোপীনাথ ঠাকুর যাঁহার প্রকাশ।”/ __এইভাবে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল । এরপর সেই গোপীনাথকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরের তথা মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ঠাকুরের আরো কি কি লীলা প্রকটিত হয়েছিল তা পরবর্তী সংখ্যায়।