চৈতন্য চরিতামৃতকার কৃষ্ণদাস কবিরাজ উদ্ধারণ দত্ত সম্বন্ধে লিখেছেন __”মহাভাগবতশ্রেষ্ঠ দত্ত উদ্ধারণ / সর্বভাবে সেবে নিত্যানন্দের চরণ /”! গদাধর দাস তাঁর “জগন্নাথ মন্ডল” গ্রন্থে লিখেছেন __”ভক্ত উদ্ধারণ দত্ত পরম শাস্ত্রতে জ্ঞাত,/ সদা গোবিন্দের গুনগান।।/ আকর গ্রন্থ চৈতন্যভাগবতে বৃন্দাবন দাস লিখেছেন __” উদ্ধারণ দত্ত মহাবৈষ্ণব উদার,/ নিত্যানন্দের সেবায় যাহার অধিকার ।/ কতদিন থাকি নিত্যানন্দ খড়দহে,/ সপ্তগ্রাম আইলেন সর্বজন কহে।/ উদ্ধারণ দত্ত ভাগ্যবন্তের মন্দিরে,/ রহিলেন প্রভুবর ত্রিবেনীর তীরে!” কায়মনোবাক্যে নিত্যানন্দের চরণ / ভিলেন অকৈতবে ভক্ত উদ্ধারণ ।/ “পদসমুদ্র গ্রন্থে”_ তাঁর বংশ পরিচয় রয়েছে__ শ্রীকর নন্দন, ভক্ত উদ্ধারণ _ভদ্রাবতী গর্ভজাত / ত্রিবেণীতে বাস, নিতাইয়ের দাস_ শ্রী গৌরাঙ্গ পদাশ্রিত।/ বিষয়-বাণিজ্য, সাংসারিক কার্য মলপ্রায় ত্যজ্য করি, পুত্র শ্রীনিবাসে, রাখিলা আবাসে_ হইলা বিবেকাচারী।/ নীলাচলপুরে প্রভু মিলিবারে সদা ইতি উতি চায়, আশাঝুলি রয়ে ভিখারী হইয়ে প্রসাদ মাগিয়া খায় ।”/ বিভিন্ন প্রাচীন বৈষ্ণব শাস্ত্রে উদ্ধারণ দত্তের উল্লেখ রয়েছে । সেই সকল গ্রন্থ থেকেই তাঁর বর্তমান জীবনীর অবতারণা ! আমরা পূর্ববর্তী সংখ্যায় উদ্ধারণ দত্তের সাথে নিত্যানন্দের সপ্তগ্রাম লীলার কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা পেয়েছি ! এবার নিত্যানন্দের বিদায়ের পালা। বিদায়ের আগে নিত্যানন্দ উদ্ধারণের মাথায় হাত রেখে তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন __”তুমি তো জানো, আমি শ্রীচৈতন্যের কিঙ্কর ! তাঁর আজ্ঞায়_ তাঁর কাজ আমাকে সমাধা করতে হয়! আমি একজায়গায় আবদ্ধ হয়ে থাকি কি করে? দেশে দেশে ঘুরে আমাকে যে নামপ্রচার করতে হবে! তবে এটা জেনে রাখবে_ যতদূরেই আমি থাকিনা কেনো, আমার প্রাণ তোমার কাছেই বাঁধা থাকবে !” _এই বলে নিত্যানন্দ সপ্তগ্রাম ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু কোনো কোনো লীলাকার বলেছেন_ নিত্যানন্দের সাথে উদ্ধারণ দত্ত বঙ্গদেশের সমগ্র তীর্থ পরিভ্রমণ করেছিলেন। “ভক্তিরত্নাকর” গ্রন্থে রয়েছে _”গৌড়ভূমে মত তীর্থ কে করে গমন,প্রভু সঙ্গে সর্বতীর্থ ভ্রমে উদ্ধারণ!”/ নিত্যানন্দ প্রভুর সাথে ভ্রমণকালে মাঝে মাঝে নিত্যানন্দের জন্য রান্নাও করতেন_উদ্ধারণ! “চৈতন্য দীপিকা”_ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে _”প্রভু কহে কখনো বা আমি পাক করি,/ না পারিলে উদ্ধারণ রাখয়ে উতারি।।/ বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের দ্বাদশ সখার নাম ছিল __শ্রীদাম, সুদাম, সুবল, মহাবল, সুবাহু, ভদ্রসেন, স্তোককৃষ্ণ, পুরাম, লবঙ্গ, মহাবাহু, গন্ধর্ব ও বীরবাহু । বৈষ্ণব কবি লোচনদাস এদের মধ্যে আটজন এর পূর্ব নাম ও অধুনা নামের সাদৃশ্য নির্ণয় করে গেছেন__ “রামদাস, গৌরীদাস, ঠাকুর সুন্দর /কৃষ্ণদাস, পুরুষোত্তম ও কমলাকর।/ কালাকৃষ্ণদাস আর উদ্ধারণ দত্ত,/ দ্বাদশ গোপাল ব্রজে ইহার মহত্ব।।” উদ্ধারণ দত্ত দ্বাদশ গোপালের অন্যতম সুবাহু গোপালের অবতার রূপে চিহ্নিত ছিলেন । মাত্র 48 বছর বয়সে ভক্ত উদ্ধারণ, পুত্র শ্রীনিবাসের উপর বিষয়কর্মের ভার দিয়ে সম্পূর্ণরূপে বৈরাগ্য অবলম্বন করেন, অর্থাৎ গৃহত্যাগ করে বৈরাগীর জীবন-যাপন করতে থাকেন । প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়__ তিনি এরপর ছয় বৎসর নীলাচলে এবং বাকি ছয় বৎসর বৃন্দাবনে সাধন করেছিলেন । তারপর 60 বছর বয়সে অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে তিনি নশ্বরদেহ বিসর্জন দিয়েছিলেন। এখানে কিন্তু বৈষ্ণব পদকর্তাগণ বা ঐতিহাসিকগণ __কাটোয়ার কাছে উদ্ধারণপুরের উদ্ধারণ দত্তের সমাধি রয়েছে, তার সাথে সরাসরি উদ্ধারণ দত্তের নাম কিভাবে যুক্ত হলো_ তার বিস্তারিত ইতিহাস কেউ দিয়ে যাননি। কেউ কেউ বলেন যৌবন বয়সে কর্মপোলক্ষে কিছুদিন উদ্ধারণ (বা দিবাকর) দত্ত উদ্ধানপুরে (উদ্ধারণপুরে)-র নিকটস্থ নৈহাটির জমিদারের দেওয়ান ছিলেন । ওই সময় হয়তো তিনি উদ্ধানপুরে (উদ্ধারণপুরে) সাধন-ভজন করে থাকতে পারেন। কেউ কেউ মনে করেন নিত্যানন্দ প্রভুর সাথে গৌড়বঙ্গ ভ্রমণকালীন তাঁরই নির্দেশে বা আদেশে তিনি গঙ্গার পশ্চিম তীরে ওধনপুর, উদ্ধানপুর বা উদ্ধারণপুরে কিছুকাল সাধন-ভজন, নাম প্রচার ইত্যাদি করেছিলেন । যা-ই হোক বা রে ভাবেই হোক, তাঁর পুণ্যস্মৃতি স্মরণ করেই পরবর্তীকালে স্থানটির নাম হয় উদ্ধারনপুর। উদ্ধারণপুরে আজও তাঁর সাধনক্ষেত্র আছে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত গঙ্গার ঘাট রয়েছে_ যা “উদ্ধারণপুরের ঘাট” নামে পরিচিত । আছে তার সমাধিক্ষেত্র ! তাঁর প্রতিষ্ঠিত নিতাই-গৌরের বিগ্রহ রয়েছে, যার আজো নিত্য সেবা-পূজা হয়ে চলেছে । ওদিকে তাঁর জন্মস্থান সপ্তগ্রামেও উদ্ধারণের পাঠ রয়েছে, সেখানেও সমাধি আছে, মূর্তিও আছে ! উদ্ধারণপুরের ঘাটে বর্তমানে উদ্ধারণ দত্তের একটি আবক্ষ মূর্তি তৈরি হয়েছে । সপ্তগ্রামেও উদ্ধারণ প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহ রয়েছে __”দক্ষিনে নিত্যানন্দ–বামে গদাধর, মধ্যে ষড়ভুজ শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর।/ এছাড়া তিনি বিষ্ণু ও রাধাবল্লভ মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিভিন্ন মহাজনের মত অনুযায়ী, উদ্ধারণের তিরোভাব তিথি মোটামুটি একই হোলেও_ তিরোধানের মাস সম্বন্ধে ভিন্ন মত রয়েছে । এই জন্যেই হয়তো সপ্তগ্রামে যে মাসে উদ্ধারণের তিরোধান দিবস পালিত হয়, উদ্ধারণপুরে হয় তার এক মাস আগে অথবা পরে! উদ্ধারণ দত্ত শরীর ত্যাগ করেছিলেন বৃন্দাবনে ! ফলে সেখানেই তাঁর প্রকৃত সমাধি রয়েছে_ বংশীবটের সন্নিকটে ! হয়তো সেখান থেকেই তার অস্থিভস্ম নিয়ে এসে পরবর্তীকালে সপ্তগ্রাম এবং উদ্ধারণপুরের সমাধি তৈরি করা হয়েছিল। কাটোয়ায় “সখীর আখড়া”-তেও উদ্ধারণের ‘ফুল সমাধি’ রয়েছে । উদ্ধারণপুরে উদ্ধারণ দত্তের মে পাঠ-বাড়ি রয়েছে, সেখানে চারিদিকে প্রাচীর ঘেরা উদ্ধারণ দত্তের সমাধি আছে, টিনের চালাঘরে নিতাই-গৌর মন্দির আছে, দুটি নিম গাছ আছে _যেগুলি সম্বন্ধে কথিত আছে যে, নিত্যানন্দ প্রভু নিজের দাঁত মেজে তা পুঁতে ছিলেন! ওখানে আর আছে শিবমন্দিরে শ্বেতপাথরের রত্নেশ্বর শিবলিঙ্গ! খুব সম্ভবত পনেরশো একচল্লিশ খ্রীস্টাব্দে অপ্রকট হ’ন । কিন্তু তখনও নিত্যানন্দ পত্নী জাহ্নবীদেবী শরীরে বিরাজমান ছিলেন। “ভক্তিরত্নাকর”_ গ্রন্থে রয়েছে__” উদ্ধারণ দত্তের চরিত্র সোঙরিয়া/ শ্রীজাহ্নবা ঈশ্বরী ধরিতে নারে হিয়া।/ নিত্যানন্দ-প্রিয় উদ্ধারণের কথায় / যৈছে প্রভুগণ চেষ্টা কহনে না যায় ।/ জাহ্নবী দেবী ও বৃন্দাবনে ছিলেন, ওখান থেকে খড়দহে ফেরার পথে সপ্তগ্রামে উনি উদ্ধারণ দত্তের তিরোধানের সংবাদ পেয়েছিলেন ও শোক প্রকাশ করেছিলেন। শ্রীপাট সপ্তগ্রামে ষড়ভূজ মহাপ্রভুর প্রধান বিগ্রহ। ত্রেতার রামের দুই হাত,দ্বাপরে কৃষ্ণের দুই হাত, আর কলিতে গৌরাঙ্গ নিত্যানন্দ গৌরাঙ্গের দূই হাত_এই মোট ছয় হাত। নিত্যানন্দ গৌরাঙ্গের যুগলবিগ্রহ-ও অধিষ্ঠিত আছে,আর আছে মাধবীমন্ডপ ও নূপুর পুকুর_ উদ্ধারণ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত। এগুলি এখনও ভক্তদের প্রাণে ভক্তির জোয়ার এনে দেয় । ভক্তেরা সেখানে গেলে মনের শান্তি ও প্রাণের আরাম লাভ করে।