২০১৭/১
।।ভাগবত-কথা।।
নবদ্বীপ লীলায় নিত্যানন্দ প্রভুর অবস্থা বর্ণনায় মহাজন লিখেছিলেন_” অক্রোধ পরমানন্দ নিত্যানন্দ রায় / অভিমানশুন্য নিতাই নগরে বেড়ায় । যে না লয়, তারে বলে দন্তে তৃণ ধরি/ আমারে কিনিয়া লহ ভজ গৌরহরি।।”
আমরা গত সংখ্যায় নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপাধন্য উদ্ধারণ দত্তের কিছু কথা-কাহিনীর আলোচনা শুরু করেছিলাম –এবার তার পরবর্তী অংশ । সপ্তগ্রামের দিবাকর দত্ত নিত্যানন্দের কৃপায় উদ্ধারণ দত্ত নামে পরিচিত হলেন ভক্ত সমাজে। বণিকশ্রেষ্ঠ দিবাকর এখন ভক্তশ্রেষ্ঠ উদ্ধারণ ! দলে দলে ভক্তকুল হাজির হতে লাগলো উদ্ধারণের বাড়িতে __যেখানে নিত্যানন্দ মহাপ্রভুও তখন বিরাজ করছিলেন। প্রভু অকাতরে তাদেরকে গৌরহরির নাম ও প্রেম বিলি করছেন । শুরু হোলো বণিককুলের কৃষ্ণভজন । সাধারণ মানুষ বণিকদের এই পরিবর্তন দেখে হতবাক! সমস্ত বণিকসমাজ কৃষ্ণভক্ত হয়ে গেল,_” সপ্তগ্রাম হইল যেন নব বৃন্দাবন!”
একদিন উদ্ধারণ দত্তের বাড়িতে একজন ব্রাহ্মণ এলো। তার উদ্দেশ্য ছিল নিত্যানন্দের সঙ্গে তর্ক করা ! বিষয় কি__ না, ভক্তি শ্রেষ্ঠ অথবা জ্ঞান শ্রেষ্ঠ ? নিত্যানন্দ প্রভু সানন্দে সেই পন্ডিত ব্রাহ্মণকে সমাদর করে বসালেন । আলোচনা চলতে থাকলো__ মীমাংসা আর হয় না ! বেলা বাড়তে থাকলো, নিত্যানন্দ প্রভু ইঙ্গিতে উদ্ধারণকে বললেন _ব্রাহ্মণ যেন অভুক্ত হয়ে ফিরে না যায়, তার জন্য যেন আহার্যের ব্যবস্থা করা হয়! ব্রাহ্মণ স্নানাহ্নিক সারতে সরস্বতী নদীতে গেল। ত্রিবেণীর এক বেণী সরস্বতী ! উদ্ধারণ নিত্যানন্দ প্রভুকে জিজ্ঞাসা করলো_” আজ কি রাঁধবো,ব্রাহ্মণকেই বা কি খেতে দেবো?” নিত্যানন্দ বললেন_” আজ চালে-ডালে খিচুড়ি রান্না করো, তাই দিয়ে ভগবানের আর ভক্তদের সেবা হবে!” তাই রান্না হোল । রান্নার পর অঙ্গনে আসন, জল ও পাতা দেওয়া হোল । নিত্যানন্দ প্রভু ভক্তদের নিয়ে বসলেন _পঙক্তি ভোজনে ব্রাহ্মনের জন্য আসন আলাদা করে দেওয়া হলো। প্রভু ব্রাহ্মণকে আহ্বান করলেন বসার জন্য ! ব্রাহ্মণ পূর্বেই জিজ্ঞাসা করলো_” আমার জন্য আহার্য কে প্রস্তুত করেছে?” প্রভু বললেন _”কেন উদ্ধারণ!” ক্রোধে রক্তচক্ষু করলো ব্রাহ্মণ, বলল_”কি !আমি বেনের হাতে রান্না খাবো?__ ” বেনিয়ার পাচিত অন্ন কেমতে খাইবো/ দিয়ে ছিয়ে এমতে কি জাতি খন্ডাইব !” নিত্যানন্দ প্রভু ব্রাহ্মণকে শান্ত করলেন। বললেন,_ “সন্ন্যাসীর বা ভক্তের হাতের রান্নায় কখনো অন্নদোষ হয় না, কারণ সে তো ভগবানকে অন্ন নিবেদন করে প্রসাদ গ্রহণ করে ! উদ্ধারণ গোবিন্দের ভোগ রান্না করেছে __তারি প্রসাদ এই কিশোরন্ন বা খিচুড়ি! তাই এই অন্নগ্রহণে কোন দোষ হয় না! এতে উদ্ধারণের কোনো অপরাধ হয়নি ! আর আপনার গোবিন্দের প্রসাদে অরুচিই বা হবে কেনো ?”
“গুনকর্মে হইল ইহ জাতির উৎপত্তি,/ লিখাজোখা ভাগবতে ভগবানের উক্তি। / পরম ভক্ত এই উচ্চজাতি পাই,/ তার গৃহে তার অন্ন মুই কিন্তু খাই।”
শান্ত হয়ে ব্রাহ্মণ নিত্যানন্দের পাশের আসনে বসলো। কিন্তু একি ! সকলকে পরিবেশন করে উদ্ধারণ মে ব্রাহ্মণকেও অন্ন দিতে আসছে !একি ঘোর অনাচার ! ব্রাহ্মণ ক্ষিপ্ত হয়ে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন! নিত্যানন্দ প্রভুর কোনো সান্ত্বনা, কোনো যুক্তিই সে মানতে রাজি নয়, শুনতে রাজি নয় ! উচ্চৈঃস্বরে উদ্ধারণকে উদ্দেশ্য করে সেই ব্রাহ্মণ বললো_” তোমার এতো অহংকার! আমায় পরিবেশনের স্পর্ধা করো?”
গোলমাল চরম পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে দেখে_ এবার আসন ছেড়ে উঠলেন নিত্যানন্দ প্রভু! ভক্তের লাজরক্ষাকারী প্রভু শ্রীভগবান গৌরহরিকে স্মরণ করে দীপ্ত কণ্ঠে উদ্ধারণকে লক্ষ্য করে বললেন__ “উদ্ধারণ! তোমার পরিবেশনের ওই কাঠের হাতাটি আমার হাতে দাও তো!” উদ্ধারণ গুরুর আদেশে কাঠের হাতাটি নিত্যানন্দকে দিলেন। নিত্যানন্দ সেই শুকনো কাঠের হাতাটি সকলের সামনে অঙ্গনে পুঁতে দিলেন, আর চক্ষুমুদে একমনে গৌরহরিকে ডাকতে লাগলেন! এ কি আশ্চর্য ! ধীরে ধীরে সেই কাষ্ঠখন্ড এক মাধবী তরুতে পরিণত হলো, তাতে ফুল ফুটল, মৌমাছিরাও ধেয়ে এলো ফুলের অপূর্ব সৌরভে!
“মুহুর্তের মধ্যে হোল বৃক্ষের উন্নতি / পুস্পিত হইল মধু পিয়ে অলি মতি।” সেই মাধবীতরু বিস্তারিত হয়ে উদ্ধারণ সহ সকলকে অঙ্গনে ছাতার ন্যায় এমনভাবে সুশীতল ছায়া দান করতে লাগলো_ যেন বৈষ্ণবসেবা ভক্তসেবায় কোন ত্রুটি না ঘটে! ভাবস্থ নিত্যানন্দ ব্রাহ্মণকে উদ্দেশ্য করে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগলেন _”দেখেছো উদ্ধারণের ভক্তির কতো শক্তি! তার স্পর্শের কতটা পবিত্রতা!
ব্রাহ্মণ বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে রইলো! পরে আচ্ছন্নভাব কেটে যেতেই গাছের কাছে মাথা নত করে প্রণাম করলো, গড়াগড়ি দিয়ে উঠোনের মাটি সর্বাঙ্গে মাখতে লাগলো। উদ্ধারণকে বললো_” উদ্ধারণ ! দাও_ দাও, তোমার হাতের অন্ন দাও আজ শুধু উদরের ক্ষুধাই নয়, জীবনের ক্ষুধাও মেটাই।” ধন্য উদ্ধারণ ! ধন্য ব্রাহ্মণ আর উপস্থিত সকল ভক্তগন ! মহাপ্রভুর অভিন্ন সত্তা নিত্যানন্দ প্রভুর সপ্তগ্রাম-লীলা চাক্ষুষ করল যারা__তারাও কি কম গো! সেই মাধবীলতামন্ডপ এখনো শীতল ছায়া দিয়ে ত্রিতাপ জর্জরিত জীবনের ব্যথা হরণ করছে ! আজও যে কোনো মানুষ গিয়ে সেই মন্ডপ দেখে আসতে পারে । এই অলৌকিক লীলাবিকাশের কতদিন পরে ওই মাধবী-মন্ডপে গৌরহরি স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছিলেন ! উদ্ধারণকে দর্শন দিয়ে বলেছিলেন __” তুমি নিত্যানন্দের কৃপায় শান্তিলাভ করেছো। যারা পরবর্তীকালে এসে এই লতামন্ডপে আশ্রয় নেবে, তারাও শান্তিলাভ করবে, নিতাইচাঁদের কৃপা পাবে!” গৌরবন্দনা করে আজকের আলোচনা শেষ করছি _বাকি আলোচনা আগামী সংখ্যায়!
