(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ বলেছেন_” মন্ত্রগুরু আর যত শিক্ষাগুরুগণ, তা সবার চরণ আগে করিয়ে বন্দন । শ্রীরূপ, সনাতন, ভট্র রঘুনাথ, শ্রীজীব, গোপাল ভট্র, দাস রঘুনাথ । এই ছয় গুরু, শিক্ষাগুরু যে আমার _ইহা সবার পাদপদ্মে কোটি নমস্কার।”__ছয় গোঁসাইকে ছয় গুরু বলে বর্ণনা করেছেন চৈতন্যচরিতামৃতকার। আর ছত্রে-ছত্রে এঁদের প্রতি অন্তরের শ্রদ্ধা ভক্তি নিবেদন করেছেন। বৈষ্ণবের মে দীনতা, নম্রতা, নত হওয়ার যে ভাব __তা পরিপূর্ণভাবে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজের রচনায় দেখতে পাওয়া যায়। এই মহাজন অন্যত্র বলেছেন _”শ্রী গৌরাঙ্গের দুটি পদ, যার ধন-সম্পদ, সে জানে ভকতি রস সার।
শ্রী গৌরাঙ্গের মধুর লীলা, তার করতে প্রবেশিলা হৃদয় নির্মল ভেল তার।।”__
এখানে নির্মল হৃদয়ের এক পরম বৈষ্ণব হলেন গোপাল ভট্র। গোপাল ভট্রের পরিচয় একটু নেওয়া যাক ! দক্ষিণ ভারতের শ্রীরঙ্গমের ছেলে এই গোপাল ভট্ট । ছোটবেলা থেকেই গোপালের মধ্যে ভক্তিমার্গের ভাব লক্ষিত হোত । দেব-দ্বিজে ভক্তি ছিল _যেন তাঁর জন্মগত! বাড়িতে অতিথি এলে তার সেবার ভার গোপাল নিজেই নিজের ওপর নিয়ে নিতেন। আর অতিথি যদি ভক্তিমূলক হোত, তাহলে তো কথাই নেই ! তার সঙ্গে হরিকথায় ছেলের আর নাওয়া-খাওয়া, পড়াশোনার কথা খেয়াল থাকতো না ! প্রেমের ঠাকুর শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু যখন দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করছিলেন, তখন তিনি একবার বেঙ্কটের ঘরে এসেছিলেন । প্রভুকে ঘরে আনতে পেরে বেঙ্কট ও তাঁর পরিবারের সকলের সে কি আনন্দ! প্রভুকে পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে বসিয়ে সকলে সেই পাদোদক পান করলেন। এগারো বছরের বালক গোপাল সেই পাদোদক পান করেই প্রেমাপ্লুত হয়ে গেলেন ! সেই প্রকাশ তথা প্রেমের বহিঃপ্রকাশে বালক আনন্দে নৃত্য করতে লাগলেন । যথার্থই গৌর-প্রেমিক ভক্তপ্রবর নরোত্তম দাস লিখেছেন, “যে গৌরাঙ্গের নাম লয়_ তার হয় প্রেমোদয়, তারে মুই যাই বলিহারি। গৃহে বা অরণ্যে থাকে, হা গৌরাঙ্গ বলে ডাকে_নরোত্তম সঙ্গ মাগে তারি।।”
চাতুর্মাস্য করার জন্য সেবার মহাপ্রভু বেঙ্কট এর ঘরে থেকে গেলেন। পিতা বেঙ্কট আদরের পুত্র এবং গুণবান ভক্তিপরায়ন এই পুত্রকে প্রভুর সেবায় সমর্পণ করে দিলেন । গোপালের প্রতি পুত্রবুদ্ধি না করে,ভেবে নিলেন _গোপাল যেন “গৌরধন”, “গৌরের সম্পদ”!
বেঙ্কটের আরো দুটি ভাই ছিল প্রবোধানন্দ আর ত্রিমল্ল ! প্রবোধানন্দ ছিলেন তৎকালীন যুগে খুবই পণ্ডিত ব্যক্তি, তিনি পান্ডিত্যের জন্য “সরস্বতী” উপাধি লাভ করেছিলেন। ছোট বয়স থেকে গোপাল_ প্রবোধানন্দের কাছে পাঠ নিতে শুরু করেন এবং অল্পকাল মধ্যে সর্ব শাস্ত্রে বিচক্ষণ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এগুলি পরের কথা __আগের কথায় আসা যাক ! চাতুর্মাস্য সম্পন্ন হোলে মহাপ্রভু যখন শ্রীরঙ্গম ত্যাগ করার উদ্যোগ নিতে শুরু করলেন ততদিনে প্রভূসঙ্গে আর সেবায় গোপাল অন্যরকম অর্থাৎ একজন ভাবাবিষ্ট সাধকে পরিণত হয়ে গেছে। প্রভূর এত কৃপা গোপালের উপর যে__ প্রভু যেন গোপালের জন্যই শ্রীরঙ্গমে বেঙ্কটের বাড়িতে চাতুর্মাস্য উদযাপন করলেন। যাত্রার প্রারম্ভে বেঙ্কটকে ডেকে প্রভু বললেন, “তোমার পুত্র পরম বৈষ্ণব! চার মাস ধরে এ আমার নিষ্ঠাভরে সেবা করেছে, ওর প্রতি আমি বিশেষ প্রসন্ন! ওকে বিদ্যাশিক্ষা দাও, সুপণ্ডিত করো, আর যেন ওর বিবাহ দিও না।” আর প্রবোধানন্দকে গোপালের বিদ্যাশিক্ষার ভার নিতে প্রভুই আদেশ দিলেন। তিনি এও বললেন যে, শিক্ষান্তে যেন গোপালকে বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিদায় বেলায় বেঙ্কটরা তিন ভাই প্রভুর পা ধরে কাঁদতে লাগলেন, বিলাপ করতে করতে বলতে লাগলেন_ “প্রভু! তুমি চলে গেলে আমরা কি করে থাকবো! কার সঙ্গে কাবেরী নদীতে স্নান করতে যাবো! কেই বা আমাদের সাথে পরম আত্মীয়ের ন্যায় রঙ্গরসিকতা করবে! রঙ্গনাথের মন্দিরে প্রেমাবেশে কীর্তন-ই বা কে করবে! কার দর্শন আকাঙ্ক্ষায় শতশত ভক্তকূল সেখানে সমবেত হবে, আর সুলভে ভক্তিফল কুড়িয়ে নেবে ! আমাদের এই ভবন ছিল মন্দির _এই ভবন আজ থেকে বিগ্রহশূন্য হয়ে গেলো! এই বেদনা আমরা সইবো কেমন করে!”
প্রভু সকলকে সান্ত্বনা দিয়ে শান্ত করলেন । সকলকে একে একে প্রেমালিঙ্গন দিয়ে বিদায় নিলেন। কিন্তু গোপাল নিরস্ত হবার ছেলে নয়__ সে প্রভুর পায়ে পায়ে চলতে লাগলো । মুখে একটাই কথা _”আমি তোমার সঙ্গী হবো, তুমি যেখানে যাবে_ আমি সেখানেই যাবো।” মহাপ্রভু গোপালের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগলেন_” যাও তুমি গৃহে ফিরে যাও, সেখানে গিয়ে থাকো! বাবা-মায়ের সেবা করো, যতদিন তাঁরা বেঁচে থাকবেন ততদিন যেন সেবার কোনোরূপ ত্রুটি না হয় ! আর তারপরে আমি তোমাকে বৃন্দাবনে নিয়ে যাবো।”
মহাপ্রভু তখন নীলাচলে __গদাধর, হরিদাস আদি ভক্তবৃন্দেরা ভগবানের সঙ্গসূধায় মত্ত। এদিকে তখন গোপালের পিতা-মাতার বিয়োগ হয়েছে, পাঠান্তে গোপাল মহাপ্রভুর আদেশমতো পৌঁছে গেলেন বৃন্দাবনে । নীলাচলে মহাপ্রভু ভগবৎ প্রসঙ্গ করতে করতে হঠাৎ গদাধরকে জিজ্ঞাসা করলেন _”বহুদিন ব্রজধাম শ্রীবৃন্দাবনের কোনো খবর পাইনি, সেখানকার সংবাদের জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে!” সেই দিনই পত্র পৌঁছালো পুরীধামে, রূপ-সনাতন পত্র পাঠিয়েছেন মহাপ্রভুকে ! সমস্ত কুশল সংবাদ জানানোর পর লিখেছেন_ “গোপাল ভট্রের এসে পৌঁছেছেন বৃন্দাবনে!”
“পৌঁছে গেছে!”__ প্রভুর মন আনন্দে ভরে গেলো! কথা রেখেছে গোপাল, প্রভু জানেন _এঁরাই ভবিষ্যতের বৈষ্ণবনিধি, বৈষ্ণব সমাজের অগ্র-পথিক! এঁদের দ্বারা তাঁর আরব্ধ কর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত হবে! তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে পত্রের উত্তর পাঠালেন । লিখলেন,_ “প্রিয় রূপ সনাতন! গোপাল তোমাদের কাছে গিয়েছে শুনে খুশি হলাম । ওকে ভাতৃপ্রতিম ভাববে, আর ওর যত্ন নেবে। মাঝে মাঝে তোমাদের সকলের কুশল সংবাদ দেবে । এই পত্রের সঙ্গেই গোপালের জন্য ডোর-কৌপিন, বহির্বাস ও আসন পাঠালাম।”
ধন্য ভাগ্য গোপাল ভট্রের! মহাপ্রভু বাল্যকাল থেকে যাঁকে নির্বাচিত করে রেখেছেন _পরবর্তীকালে কাজের জন্য ! তাইতো এঁরা সহচর! যুগে যুগে লীলা পার্ষদ! মহাপ্রভুর পত্র বৃন্দাবনে আসার পর সেখানে মহা উৎসব লেগে গেলো! মহা ধুমধাম সহকারে, নানান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গোপালের অঙ্গে তুলে দেওয়া হল প্রভুর পাঠানো ডোর-কৌপিন! বৃন্দাবনের সমগ্র বৈষ্ণব সমাজ হরিনাম সংকীর্তনে মাতিয়ে তুলল ব্রজধামের আকাশ বাতাস! বৃন্দাবনবাসী বরণ করে নিলো এই নবীন সন্ন্যাসীকে, গ্রহণ করে নিল ভাবীকালের আচার্যকে ! গোপাল মহাপ্রভুর পাঠানো সবকিছু ব্যবহার করলেও, আসনটি ব্যবহার করতে দ্বিধা করছিলেন। আসনটি কোনো বস্ত্রনির্মিত ছিল না __এটি ছিল কাষ্ঠাসন, কাঠের তৈরি কালো রঙের আসন ! গোপালের ইতস্তত ভাব দেখে, অগ্রাহ্য প্রতীম রূপ-সনাতন এগিয়ে এলেন, ওকে বোঝালেন যে, ‘কেন সে ভাবছে যে ওই আসনে বসার অধিকার তার নাই ! প্রভু যখন গোপালের নাম করে আসন পাঠিয়েছেন _তখন ওই আসনে কেবলমাত্র গোপালেরই অধিকার _আর কারো নয়!’ সুতরাং আসন স্বীকার তাকে করতেই হবে! রাজি হোলেন গোপাল, কিন্তু মন সায় দেয়না ! গভীর চিন্তা-মগ্ন অবস্থাতে রাত্রে শয়ন করলেন তিনি! নিশাকালে সবাই যখন নিদ্রামগ্ন__তখন আলোয় উদ্ভাসিত হোলো গোপালের কুঠিয়া! সেখানে প্রকট হলেন মহাপ্রভু! তারপর তিনি বললেন_ “এতেই তোমার সিদ্ধি ঘটবে, আর এতেই আপাতত তোমার শরীর-মন শীতল হবে- শান্ত হবে !” আবেশ কাটাতেই গোপাল দেখলেন মহাপ্রভু ঘরে নেই, কিন্তু ঘর যেন ভগবানের শরীরের সৌরভে আমোদিত! তাঁর সারা শরীরে স্বেদ, অশ্রু, পুলকাদির লক্ষণ ফুটে উঠলো! আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলো গোপাল! প্রভু এসেছিলেন স্বয়ং তাঁর দুয়ারে_ তার মনের শান্তির নিমিত্ত !!এই ভাবনা যতোই মনে আসে, ততোই চোখের জল বাধা মানেনা ! প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কাটিয়ে তখনই তিনি সেই আসনে উপবিষ্ট হয়ে মহামন্ত্র জপ করতে লাগলেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীর মন শান্ত হতে হতে তিনি সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন বৈষ্ণব শিরোমনি গোপাল ভট্র ! সারারাত কখন কেটে গেছে ভোরের কাকলিতে ঘোর কাটলো গোপালের ! সেই থেকে গোপাল বুঝতে পারলেন প্রভুর প্রেরিত এই আসন_ সিদ্ধাসন! তিনি সমগ্র জীবনে আর কখনো ভুল করেননি ! আজীবন এই আসনে বসেই তিনি তাঁর সাধনা করতেন! এই আসনে বসে জীবনে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা, বিচিত্র দর্শনের উপলব্ধি যে তাঁর হয়েছিল _তার কতটুকুই বা প্রকাশিত হয়েছে ! এটা সাধকের নিজস্ব সাধনালব্ধ তত্ত্ব _এ বলার নয় ! যার জীবনে হয়, সেই কেবল বুঝতে পারে! সেই জানে__ আর একজন জানেন, যিনি সমস্ত ঘটনার সাক্ষী, ঘটন-অঘটনের দ্রষ্টা__ পরমেশ্বর !! ইষ্টরূপে_ কেউ তাঁকে বলে কালী, কেউ বলে কৃষ্ণ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা অন্য অন্য নামে তার ভজনা করে! সবার ভজন মন্ত্র হয়তো আলাদা, পূজার আচার হয়তো ভিন্ন, দেশ-কাল-পাত্রের ভিন্নতায় সবকিছুই ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় কিন্তু চিরন্তন হলো ভক্ত ভগবানের সম্পর্ক ! এটি দেশ-কাল-পাত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে সকল স্থানেই একরকম । তাই বলা হয় লীলা চিরন্তন! ভক্তের সঙ্গে ভগবানের যে সম্পর্ক যে ভাবের আদান-প্রদান, ঘটনার ঘনঘটা__ এগুলিই ভগবৎলীলা !
বৈষ্ণবসমাজে, বিশেষত গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর আগমনের পর গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে__ যে ভক্তি রসের প্লাবন এসেছিল এবং কত ভারতের ভক্তিতে, ভগবান যে কতশত লীলা করে গেছেন __তা বর্ণনা করা যায় না ! বহু বৈষ্ণবশাস্ত্রে বহু লীলাকাহিনী বর্ণিত হয়েছে, আবার কত যে হয়নি _তার খোঁজ কে রাখবে! তাই মহাজনগণ বলেছেন_ প্রভূর লীলার অন্ত নাই, কে এর অন্ত করবে!
” অনন্ত অনন্ত ভাবের অন্ত কে করে, প্রধান গ্রন্থ বেদ-বেদান্ত গেল চুপ মেরে। পুরাণেরা দিশেহারা _সার কৈল নাম শেষকালে।”
নাম জপ করতে করতেই সিদ্ধ হয়েছিলেন গোপাল ভট্র! এই মহান চরিত্রের পরবর্তী সাধন জীবনী আলোচনা পরের সংখ্যায় হবে । এখন আসুন _সবাই মিলে গৌর-গোবিন্দের চরণে শত শত প্রণাম জানিয়ে, তাঁর কৃপা প্রার্থনা করি!
শ্রীচৈতন্যপ্রভুং বন্দে,বালোহপি যদনুগ্রহাৎ।
তরেন্নানামতগ্রাহব্যাপ্তং সিদ্ধান্তসাগরম্।।(আদিলীলা,২-য় পরিচ্ছেদ)
__ যাঁর কৃপায় নানা মত রূপ সন্তু সিদ্ধান্ত সমূহ থাকেন সেই চৈতন্য প্রভু কে বন্দনা করি ওম শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।
শ্রীমদ্ভাগবতে রয়েছে_”সাধবো হৃদয়ং মহ্যং/ সাধুনাং হৃদয়ন্ত্বহম্।
মদন্যত্তে না জানন্তি/ নাহং তেভ্য মনাগপি।”(৯/৪/৬০)___দুর্বাসা ঋষিকে ভগবান বলেছিলেন যে, “সাধুগণ আমার হৃদয় এবং আমিও সাধকদের হৃদয়স্বরূপ । আমাকে ভিন্ন তাঁহারা অপর কাহাকেও পরিজ্ঞাত নয়, আমিও সেই সমস্ত সাধু ভিন্ন কাহাকেও জানিনা।”
কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখলেন__ “ঈশ্বরস্বরূপ ভক্ত তাঁর অধিষ্ঠান/ ভক্তের হৃদয়ে কৃষ্ণের সতত বিশ্রাম।।…….
….. সেই ভক্তগণ হয় দ্বিবিধ প্রকার/ পারিষদগণ আর সাধকগণ আর ।।”
আমরা এখানে ভগবানের পরিষদদের কথাই আলোচনা করছি। যাঁদের কথা শোনাটাই মহা ভাগ্যের, যাঁদের জীবন ত্যাগ, তিতিক্ষা ও তপস্যামন্ডিত, লোকহিতার্থে যাঁদের শরীর ধারণ__ সেই মহান মানুষদের জীবন বা জীবনী আলোচনা করা খুবই দুঃসাধ্য ও দুরহ । তবুও নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের জীবন ও জীবনীর প্রতি আলোকপাতের চেষ্টা করা হচ্ছে এইমাত্র ! ষড়গোঁসাই-এর আলোচনা প্রসঙ্গে এখন আমাদের আলোচ্য গোপাল ভট্ট । পূর্ব সংখ্যায় ওনার প্রাথমিক পরিচয় দেওয়া হয়েছে, এবার তাঁর সাধন জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। চৈতন্য চরিতামৃতকার কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোপাল ভট্রকেও তাঁর একজন শিক্ষাগুরু হিসাবে বর্ণনা করেছেন _” শ্রীরূপ, সনাতন, ভট্ট রঘুনাথ/ শ্রীজীব, গোপাল ভট্র, দাস রঘুনাথ/ এই ছয়গুরু, শিক্ষাগুরু যে আমার/ ইঁহা সবার পাদপদ্মে কোটি নমস্কার।।”____মহাপ্রভুর প্রেরিত আসনে বসে কৃষ্ণসেবা, মহাপ্রভুর সেবার সাথে একটি শালগ্রাম শিলার সেবা-পূজাও করতেন গোপাল ভট্ট ! পরম নিষ্ঠা ও সেবায় তুষ্ট হয়ে একদিন সেই শিলা থেকেই রাধারমন বিগ্রহ প্রকট হলেন! সেই থেকে সবসময় ভাবাবেশে থাকেন গোপাল ভট্ট ! সেই বিগ্রহের সেবা করেন, পূজা করেন_ তাঁর সাথেই কথা বলেন, মনের নানা ভাব প্রকাশ করেন তাঁর সঙ্গে! গোপালের সেই রাধারমন বিগ্রহ যেন সর্বক্ষণের সঙ্গী! কিন্তু সাধকের জীবন তো আর একভাবে যায় না _একদিন পথে বেরিয়ে পড়লেন গোপাল! লক্ষ্য হরিদ্দার, হৃষীকেশ, দেবতাত্মা হিমালয় ! পথে দেববন্দা নামে একটি গ্রামে পৌঁছাতেই শুরু হোল বৃষ্টি । কোথায় পাবেন আশ্রয়? ঈশ্বর ভারতের আবার চিন্তা কি? এক ব্রাহ্মন এই সাধকের ভক্তিপ্রদীপ্ত রূপ দেখে তাঁকে আপন আলয়ে নিয়ে গেল । রাত্রে নানান আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে গেল ব্রাহ্মণ, প্রতিশ্রুতি দিল যে _তার প্রথম সন্তানকে সে সাধুর হাতে তুলে দেবে।
হরিদ্বার আদি তীর্থদর্শনের সময় গণ্ডকী নদীর দুর্গম অঞ্চল থেকে বারোটি শালগ্রাম শিলা সংগ্রহ করেছিলেন গোপাল, মহা আনন্দে সেগুলিকে নিয়ে সেবা-পূজার অভিপ্রায়ে তিনি ফিরে এলেন বৃন্দাবনে। এখন নিত্যপুজা যেমন চলে তেমনি চলছে, একদিন যমুনায় স্নান করে ভজনকুটিরে ঢোকার মুখে দেখেন একটি বালক বসে আছে ।
_কে রে ?
_আমি গোপীনাথ ।
_কার ছেলে?
_ দেববন্দা গ্রামে । যার বাড়িতে আতিথ্য নিয়েছিলে, আমি তার ছেলে। বাবা আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
এ খবর দাবানলের মত বৃন্দাবনের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়ল। দলে দলে ভক্তরা এই বালককে দেখতে আসলো । তাদের কারো হাতে বালকের জন্য বস্ত্র, কারো হাতে অলংকার ! বালকের সেসবের প্রয়োজন নাই, কিন্তু সেই থেকে ওই বালক গোপীনাথজীর আশ্রমেই পাকাপাকিভাবে থেকে গেল ।
নতুন বস্ত্র ও অলংকার দেখে গোপালের খুব স্বাদ হলো তার শালগ্রাম শিলাদের তা পড়ায়! কিন্তু আবরণ বা আভরণ কিছুই তো শালগ্রাম শিলার প্রয়োজন নাই । ভক্তের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণকারী ভগবানের লীলার অন্ত নাই! রাত্রি প্রভাত হলে দেখা গেল _দ্বাদশ শিলার মধ্যে একটি শিলা নয়নমনোহর দ্বিভুজ মুরলীধর ত্রিভঙ্গ বঙ্কিম ব্রজকিশোর মূর্তিতে দণ্ডায়মান । আনন্দে অভিভূত হয়ে গোপাল ছুটলেন রূপ-সনাতনের কাছে । গোস্বামীদ্বয় বললেন, “এ আর বিচিত্র কি ! ভক্তের ইচ্ছা হয়েছে ভগবানকে সাজাবে _তাই সেই ভক্ত-ইচ্ছা পূরণের জন্য ঈশ্বর বিগ্রহায়িত হয়েছেন । বৈশাখী পূর্ণিমায় হোলো বিগ্রহের অভিষেক, নাম হলো রাধারমণ।”
তবে ভক্ত মুখে মুখে রাধারমন বিগ্রহ হবার অন্য একটি কাহিনীও বর্ণিত রয়েছে । ভক্তপ্রবর বল্লভ ভট্র নীলাচলে মহাপ্রভুর শ্রীমুখ থেকে গোপাল ভট্রের নানা কথা শুনেছিলেন । তাঁর ইচ্ছা হোলো একবার বৃন্দাবনে গিয়ে গোপালের সাথে সাক্ষাত করার । তখনকার বৃন্দাবন জঙ্গলাকীর্ণ_ বনে বনে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে, শেষে যমুনার তীরে এর সাক্ষাৎ হোলো। গোপালের দিব্যকান্তিময় মনোহর মূর্তি, সর্বাঙ্গে ভগবদ্ভক্তির দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে যেন ! বল্লভ সেই মুর্তিকে প্রণাম করে দাঁড়াতেই তাঁর হৃদয়ে আনন্দ উথালপাথাল করতে লাগলো । কিছু একটা দেওয়ার জন্য তার প্রাণ আনচান করতে লাগলো! কি দেন_ কি দেন ! মনে পড়লো তাঁর গলায় ঝোলানো শালগ্রাম শিলার কথা! যিনি তাঁর আরাধ্য, তাঁর ইষ্ট। সেই প্রাণধনকেই সমর্পণ করে দিলো গোপাল ভট্রের হাতে । গোপাল সেই শিলামূর্তিকে মস্তকে ও হৃদয়ে স্পর্শ করে রেখে দিলেন যথাস্থানে । অনেকের মতে এই শালগ্রাম শিলাই রূপ নিয়েছিল রাধারমন বিগ্রহরূপে ! বল্লভ একটি বটুকাতে রেখে সর্বক্ষণ গলায় ঝুলিয়ে রাখতেন এই শালগ্রাম শিলা। তাই এই ঠাকুরের আরেকটি নাম ছিল _”বটুকের ঠাকুর।”
যাই হোক, বিগ্রহ পেয়ে গোপালের আনন্দ আর ধরে না ! মনের আনন্দে বিগ্রহের সেবা-পূজায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিলেন । বল্লভ দিনরাত ভাবাবেশে থাকেন আর প্রভূর গুনকীর্তন করেন । সদাসর্বদা মুখে_নন্দের নন্দন, শিখীপুচ্ছধারী, প্রাণগোবিন্দ, বিপদতারণ, মধুসূদনের স্তুতি_ আর নিরন্তর প্রার্থনা_ “প্রভু ! আমাকে আনন্দরসে পূর্ণ করো আনন্দময়!” তাঁর এই সময়ের মূর্তির বর্ণনা দিয়ে মহাজনগণ লিখেছেন __”শ্রী গোপাল ভট্ট বসি আছয়ে নির্জনে / সমর্পিয়া নেত্র-মন শ্রীরাধারমনে।/ ক্ষণে নিজকৃত পদ্য পড়য়ে সুস্বরে/ শুনিতে সে নামাবলী _কেবা ধৈর্য ধরে।”
অর্থাৎ সেই অবস্থায় গোপাল নানান ভগবৎস্তুতিও রচনা করতেন। সনাতন গোস্বামীর নির্দেশে তিনি বৈষ্ণব আচার, মুদ্রা ও নিয়মবিধি রচনা করেন। তিনি সমস্ত পুরানবাক্য উদ্ধার কল্পে_ “হরিভক্তিবিলাস”_ গ্রন্থ লেখেন । গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের এটি একটি করচা বা কারিকা গ্রন্থও রচনা করেন তিনি। রূপ-সনাতনের মুখে শ্রীচৈতন্যের মুখনিঃসৃত যেসব সিদ্ধান্তের কথা তিনি শুনেছিলেন__ তারই সংকলন এই “কারিকা গ্রন্থ”! কথিত আছে এই গ্রন্থের উপর ভিত্তি করেই শ্রীজীব গোস্বামীর ‘ষট্ সন্দর্ভ’ বা ‘ভগবৎ সন্দর্ভ’_ গ্রন্থ রচিত হয়েছিল।
তখন গোপাল ভট্রের নাম বৈষ্ণব সমাজে সমাদৃত। শ্রীনিবাস বৃন্দাবনে গিয়ে গোপাল ভট্রের কাছে দীক্ষা নিলেন। শ্রীনিবাস হোসেন শ্রীনিবাস আচার্য! গোপাল ভট্র তাঁকে গৌড়দেশে চৈতন্য প্রচারিত ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করতে আদেশ দিলেন। গুরুর আদেশে গৌড়বঙ্গে ফিরে এলেন শ্রীনিবাস, সঙ্গে আনলেন অনেক ভক্তি বিষয়ক গ্রন্থ _যার মধ্যে একটি ছিল কৃষ্ণদাস কবিরাজ বিরচিত চৈতন্যচরিতামৃতের পুঁথি! হয়তো বাংলাদেশে এটিই ছিল প্রথম চরিতামৃতের copy ! গোপাল ভট্র কৃষ্ণদাস কবিরাজের গুরুস্থানীয় ছিলেন কিন্তু অত বড় গ্রন্থে গোপাল ভট্র সম্বন্ধে কৃষ্ণদাস উদাসীন ছিলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে__ ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’_ রচনার আগে কৃষ্ণদাস বৃন্দাবনের সমস্ত পূজ্যপাদের আদেশ ও অনুমতি নিয়ে লেখা শুরু করেছিলেন । গোপাল ভট্ট অনুমতি প্রদানকালে বলে দিয়েছিলেন এই গ্রন্থে যেন তাঁর নিজের অর্থাৎ গোপালের সম্বন্ধে কিছু লেখা না হয় । কৃষ্ণদাস সেই আজ্ঞা পালন করেছিলেন__ শুধুমাত্র স্থানে স্থানে তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন, গোপাল ভট্রের সাধন জীবনের কোন কথা উল্লেখ করেননি।
নাম-যশের কাঙাল প্রকৃত বৈষ্ণব কোনো দিনই নয়, ফলে গোপালও এর ব্যতিক্রমী ছিলেন না। ভগবান গৌরহরির যশোগাথা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক__ দীন ভক্তের এই ছিল ঐকান্তিক ইচ্ছা!
কৃষ্ণদাস কবিরাজ “চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে গোপালের কথা না লিখলেও _”স্তবপঞ্চক” গ্রন্থে লিখেছেন _গোপালের মহিমা! তাঁর লেখায় পাওয়া যায়_ “নিরন্তর হরিভক্তি কথনে যাঁর শক্তি, যাঁর সর্বদাই সৎ-অনুভব, নশ্বর বিষয়ে যিনি বিরক্ত, মহাপ্রভুর আগমনে যাঁর পাঠ বিখ্যাত, তিনি আমার হৃদয়ে সতত স্ফূরিত হোন।”
দেববন্দা গ্রামের সেই ব্রাহ্মনপুত্র গোপীনাথের উপর রাধারমন সহ অন্যান্য শালিগ্রাম ও দেব-দেবীর সেবা-পূজার ভার অর্পণ করে ইষ্টগতপ্রাণ গোপাল ভট্ট বৃদ্ধ বয়সে, সহস্র ভক্ত-অনুরাগীদের কাঁদিয়ে_ শ্রাবণী শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে, শ্রীধাম বৃন্দাবনে ব্রহ্মলীন হয়েছিলেন। সমগ্র বৈষ্ণব সমাজ চিরতরে হারিয়েছিল হারিয়ে ফেলেছিল ষড়গোঁসাই-এর অন্যতম এক গোঁসাই কে!!
“শ্রী গৌরাঙ্গের মধুর লীলা যার কর্ণে প্রবেশিলা হৃদয় নির্মল ভেল তার।/ গৃহে বা অরণ্যে থাকে, হা গৌরাঙ্গ বলে ডাকে_ নরোত্তম মাগে সঙ্গ তার।”__ শ্রীমন্মহাপ্রভুর পরবর্তী সময়ের এক মহাজন মহাপ্রভুর কীর্তন করার সময় এসব কথা বলেছিলেন _যা গৌরভক্তবৃন্দের কাছে আজো পরম সম্পদ । আর এক পার্ষদ, পদকর্তা বাসুঘোষ লিখেছিলেন,_ “গৌর না হ’ত, কেমনে হইত, কেমনে ধরিতাম দে’ (দে= দেহ )/ রাধার মহিমা, প্রেম-রস সীমা, জগতে জানাতো কে!………….. গাও গাও পুনঃ, গৌরাঙ্গের গুণ, সরল করিয়া মন/ এ ভবসাগরে এমন দেয়াল না দেখি একজন ।। / গৌরাঙ্গ বলিয়া, না গেল গলিয়া _কেমনে সেধেছে সিধি/ বাসুদেব হিয়া , পাষাণে মিশিয়া, গড়েছে কোন বা বিধি।।”
শ্রীগৌরাঙ্গের অন্যতম আর এক পার্ষদ রঘুনাথদাস গোস্বামী । ষড়গোঁসাই-এর অন্যতম একজন বৈষ্ণবকুল শিরোমণি_ বৃন্দাবনের রত্নবিশেষ রঘুনাথ দাস।
সপ্ত গ্রামের জমিদার ছিলেন তখন হিরণ্য দাস তার ভ্রাতা গোবর্ধন দাস। ধনের অভাব ছিল না জমিদারবাড়িতে কিন্তু দুঃখ ছিল হিরন্য দাসের মনে, কারণ সন্তান নেই। কিন্তু গোবর্ধন দাসের একটি সন্তান ছিল এবং তারই নাম রঘুনাথ দাস । একে নিয়েই আমাদের এখনকার আলোচনা । ধনী জমিদারের আদরের দুলাল হলে কি হয়_ ছোটবেলা থেকেই রঘুনাথ হরিভক্তিপরায়ণ। যেখানেই হরিগুনগান, হরিকীর্তন হয় সেখান থেকে রঘুনাথ আর ফিরতে চায় না, বাড়ির লোককে ধরে বেঁধে নিয়ে আসতে হয়। একবার পরম ভক্ত হরিদাস ঠাকুর এসেছেন সপ্তগ্রাম নিকটস্থ চাঁদপুরে, উঠেছেন বলরাম আচার্যের গৃহে। বলরাম আচার্য আবার হিরণ্য-গোবর্ধনের বাড়ির পুরোহিত। অতবড় বৈষ্ণবসাধককে দর্শনের জন্য অনেকেই বলরামের বাড়ি যাচ্ছিল_ বালক রঘুনাথও গেল। মহাসাধকের কাছে বসে, সেই ছোট বয়সের পাঠশালার বালক রঘুনাথ হরিকথা-গৌরকথা শুনতে শুনতে কেমন যেন হয়ে গেল । হরিদাসের নজর পড়লো ছেলেটির দিকে ! ছেলেটি তো বেশ! সেই শুরু !পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে গিয়ে হরিদাস ঠাকুরের সংগ করা! এতেই লাভ হল ভক্ত হরিদাসের কৃপা! এই কৃপাই বুঝি রঘনাথকে পৌঁছে দিয়েছিল চৈতন্য চরণে !
যতই বড় হতে লাগলো রঘুনাথ, পিতা ও পিতৃব্য চাইলো ছেলে বিষয়মুখী হোক, সংসারী হোক। কিন্তু রঘুনাথ বিষয়ের ব্যাপারে বড়ই উদাসীন! পিতা-পিতৃব্য ভাবলো_ছেলে যদি বিষয়বিমুখী হয় তাহলে জমিদারির কি হবে ? বিষয়সমূহের কি হবে ? পাঁচজনে পরামর্শ দিল __ছেলের বিয়ে দিলেই ছেলে সংসারী হবে। জমিদার পুত্রের পাত্রি জুটতে বেশি সময় লাগলো না । অপ্সরার ন্যায় পরমাসুন্দরী এক কিশোরীর সাথে বিয়ে হোল রঘুনাথের! কিন্তু তাতেও ঘরে মন বসে না তার _মন শুধুই ঈশ্বরমুখী ! রঘুনাথ, ভক্ত হরিদাসের মুখে গৌরহরির কথা শুনেছিল, শুনেছিল তার ভালোবাসার কথা! আরও শুনেছিল যে, সেই ভালোবাসা অকৈতব, প্রত্যাশাবিহীন ! সে আর শুনেছিল গৌরাঙ্গের অপরূপ রূপের কথা! যে রূপে নয়ন দিলে আর নয়ন ফেরানো যায় না ! মনে তার একটাই বাসনা_ কবে গৌররূপ নয়নে হেরবে, কবে গৌরচরণে শরণ নিয়ে জনম সার্থক করবে ।
একদিন রঘুনাথ খবর পেল গৌরহরি সন্ন্যাস নিয়ে শান্তিপুরে রয়েছেন অদ্বৈত আচার্যের গৃহে । পাগলের মত ছুটলো সে শান্তিপুরের উদ্দেশ্যে । মনে একটাই সংকল্প_প্রভূর মতো স্ত্রী পরিত্যাগ করে সেও সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হবে! প্রভুর সাথে দেখা হোতেই চরণদুটো বক্ষে জড়িয়ে ধরে রঘুনাথ ব্যক্ত করল মনের কথা !
প্রভু বললেন_ “ঘরে বসে ভগবৎ-ভজনা করো, সময় হলে সমস্ত হয়ে যাবে!” চোখের জলে বুক ভাসাতে ভাসাতে ঘরে ফিরে এলো রঘুনাথ। কিন্তু প্রভুর আদেশ শিরোধার্য করে, ঘরে বসেই সাধন-ভজনে আত্ম নিবেদন করল গভীরভাবে। মনে বাসনা কতদিনে আবার প্রভুর দর্শন হবে! মাঝেমধ্যে রঘুনাথ এখানে-ওখানে পালিয়ে যায়, কিন্তু জমিদারের লোকেরা তাকে ঠিক ফিরিয়ে নিয়ে আসে। জমিদার বংশের একমাত্র কুলপ্রদীপ_ তাকে এভাবে গৃহত্যাগ করতে দিতে চান না বাবা-জ্যাঠারা! কড়া-পাহারার মধ্যে রাখা হোল রঘুনাথকে । কিন্তু যার মন ছুটেছে ভগবানের দিকে_ তুচ্ছ বিষয়-বাসনা বা ভোগাদি কামনা তাকে কি করে ঘরে আটকে রাখতে পারবে ? আবার পলালো রঘুনাথ কিন্তু এবারেও ধরা পড়ে গেল। আর শাসন শিথিল করতে রাজি হলো না পিতা গোবর্ধন। ঘরে বন্দি করে সারাদিন পাহারার ব্যবস্থা করলো। দিনে-রাতে মোট এগারোজন পাহারাদার নিয়োগ করা হোলো_ যাতে আর পালাতে না পারে ! সেই সময় খবর এলো মহাপ্রভু রামকেলি হয়ে শান্তিপুরে পৌঁছেছেন। বাবার হাতে-পায়ে ধরে কাতরভাবে মিনতি করতে লাগলো রঘুনাথ _”একবার মহাপ্রভুর সাথে দেখা করার আর চরণ স্পর্শ করার অনুমতি দাও _নাহলে গৌরাঙ্গ বিরহে প্রাণ আর দেহে থাকবে না! যদি আমি প্রাণেই মারা যাই_ তাহলে কাকে নিয়ে তোমাদের আশা মিটবে?” প্রভূর কৃপায় অনুমতি মিললো তবে সঙ্গে চলল অনেক লোক এবং থাকলো পাহারার ব্যবস্থা, তাছাড়াও গেল দ্রব্যসম্ভার, পূজার উপকরণ! প্রভুর সেবায় নিজেকে নিবেদন করতে পেরে খুব খুশি হলো সে! কিন্তু সর্বক্ষণ একটাই চিন্তা _রক্ষীদের নজর এড়িয়ে কেমন করে পালানো যায় নীলাচলে! কারণ প্রভু এখান থেকে চলে যাবেন সেখানে অর্থাৎ নীলাচলে । অন্তর্যামী প্রভু বুঝলেন রঘুনাথের মনের কথা! আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন _”তোমার সংসার বিরাগ দেখে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি, কিন্তু এভাবে সংসার ত্যাগ করাটা হবে মর্কট বৈরাগ্য । তুমি অনাসক্ত হয়ে বিষয়াদি ভোগ করো । গোপনে গোবিন্দ ভজনা করো। লোকে যেন তোমার অন্তরে প্রবাহিত কৃষ্ণপ্রেম বুঝতে না পারে । সময় হলেই আমি তোমাকে ডেকে নেবো।” __”আপনি আমাকে ডেকে নেবেন?”_ রঘুনাথ উৎফুল্ল হয়ে উঠলো প্রভু বললেন_” আমি যখন উত্তর-পশ্চিমের তীর্থদর্শন সাঙ্গ কোরে নীলাচলে ফিরবো_ তখন তুমি চলে এসো আমার কাছে! তখন আসার উপায় স্বয়ং গোবিন্দই কোরে দেবেন!” __”সে সময় কখন হবে প্রভু!”_ রঘুনাথ অতিকষ্টে বললো। প্রভু বললেন _”ব্যস্ত হয়ো না, অস্থির হয়ো না। ধৈর্য ধরো, এই ভবসিন্ধু পার হবার জন্য নির্দিষ্ট ‘সময়ে’র প্রয়োজন হয়! কাল প্রসন্ন না হলে কোন কিছুই হওয়া সম্ভব হয় না! সহসা বা হঠাৎ করে কখনো কিছু লাভ করা যায় না ! অধ্যাত্মপথে ধীরে ধীরে নিষ্ঠা সহকারে অগ্রসর হতে হয় । বিষয়ে মোহগ্রস্ত না হয়ে, ভোগে আসক্ত না হয়ে _বিষয়ভোগ করাটাও কঠিন সাধনা!”
রঘুনাথ শান্ত হোল __ঘরেও ফিরে গেল। মহাপ্রভুর কাছে_ ‘সংসারে অনাসক্ত হয়ে থাকার’ মন্ত্র শিখে নিয়ে পিতার জমিদারির কাজে-কর্মে মন দিলো। তার পরিবর্তন দেখে পিতা-মাতা সহ বাকিরা সবাই অবাক হোয়ে গেলো__ হল কি রঘুনাথের? কিন্তু এই ঘটনায় মনে মনে অভিভাবকেরা খুব খুশি হোলো । ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে প্রহরার শাসনও শিথিল হোল । যে ছেলের অস্থিরতা দূর হয়েছে, যে ছেলে কর্তব্যকর্মে মন দিয়েছে_ তার আবার প্রহরার প্রয়োজন কি!
এদিকে ঘটলো অন্য অঘটন। বিষয় মানেই বিষ! ধনী লোকের শত্রুর অভাব নাই। হিরণ্য-গোবর্ধনের জমিদারির আয় ছিল 20 লাখ টাকার মতো, আর নবাব কে রাজস্ব দিতে হতো 8_লাখ টাকা।ফলে তাদের ঐশ্বর্য দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল! এতেই পাশের এক মুসলমান জমিদারের গাত্রদাহ শুরু হয়ে গেলো। সে নবাবকে নালিশ করলো_ “হুজুর ! হিরণ্য-গোবর্ধনের জমিদারির আয় 20 লাখ, আর রাজস্ব দিচ্ছে 12 লাখ! মুলুক থেকে ওদের আয় বেড়েছে _ওদের রাজস্ব বাড়িয়ে দিন!” নবাবের চাই টাকা। তাই অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই ফরমান পাঠালো হিরণ্য-গোবর্ধনের কাছে ! নবাবকে ঠকিয়ে খাওয়া!! রাজস্ব দ্বিগুণ করতে হবে !
দ্বিগুণ রাজস্ব মানে তো 24 লাখ! আদায় তো মাত্র 20 লাখ_ কি করে দেবে? এ ফরমান তো মানা সম্ভব হবে না জমিদারের! কিন্তু জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করা কি সম্ভব! হিরণ্য-গোবর্ধনের জমিদারি নবাব বাজেয়াপ্ত করলো_ আর ওদের দুজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে বন্দী করে রাখার আদেশ দিলো!
নবাবের সৈন্য এসে বাড়ি ঘিরে ফেললো! আগে থেকে খবর পেয়ে দুই ভাই সরে পড়েছিল। নবাবের সৈন্যরা ছেলেটাকেই অর্থাৎ রঘুনাথকে বেঁধে নিয়ে নবাবের কাছে হাজির করলো। নবাবের উজির বিচার সভায় রঘুনাথকে জিজ্ঞাসা করলো_” তোর বাপ-জ্যাঠা কোথায়? কোথায় গেলে তাদের খোঁজ পাওয়া যাবে ? রঘুনাথ বিনীত কণ্ঠে জবাব দিলো যে, সে এ ব্যাপারে কিছুই জানেনা! উজির যতই জেরা করে__ রঘুনাথ শান্ত, নিরুদ্ধেগ কন্ঠে একই উত্তর দেয় । উজির ভাবলেন ছেলেটিকে উত্তম-মধ্যম প্রহার দিলেই সব কথা বের হয়ে যাবে! কিন্তু ছেলেটির কি মায়া জড়ানো মুখ! প্রহার করতে হাত ওঠেনা কেন? এদিকে রঘুনাথ যখন শুনলো তাকে প্রহার করা হবে _তখন সে একমনে একধ্যানে চৈতন্যের চরণ স্মরণ করতে লাগলো । শ্রীচৈতন্যই ভবসাগরের কান্ডারী । তাঁর স্মরণে এবং শরণে সর্বভয়, সর্ববিপদ নাশ হয়! সুতরাং সেই শ্রীচরণে ভরসা রাখাই শ্রেয়।
এদিকে উজির ছেলেটির মুখের দিকে চেয়ে মারতেও পারছে না, আবার নবাবের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করতেও পারছে না! সেই বা কি করে এখন ! ছেলেটির বিনম্রতা, মধুর বচন, শ্রদ্ধা_ উজিরকে দুর্বল করে তুললো। উজির নিজে বিচারের ভাবনা নিয়ে নবাবের কাছে পাঠিয়ে দিলেন বন্দীকে! এবার নবাব ও রঘুনাথ মুখোমুখি হোলো । কি হোল সেই সাক্ষাতের ফলাফল_ তা আগামী সংখ্যায় বর্ণিত হবে ।গৌর চরণে সভক্তি প্রণিপাত জানিয়ে এই সংখ্যার লেখার এখানেই ইতি টানছি।।
“জয় জয় শ্রীচৈতন্য জয় নিত্যানন্দ/ জয়াদ্বৈতচন্দ্র জয় গৌর ভক্তবৃন্দ।।”__চৈতন্যচরিতামৃতকার কৃষ্ণদাস কবিরাজ এইভাবে ভগবান এবং তাঁর পার্ষদগণ ও ভক্তবৃন্দকে বারবার বন্দনা করেছেন, স্মরণ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন_” শ্রীচৈতন্যপ্রভুং বন্দে যৎপদাশ্রয়বীর্যতঃ। সংগৃহ্ণাত্যাকরব্রাতাদজ্ঞঃ সিদ্ধান্ত-সম্মণীন্।।”__’ শ্রী চৈতন্য প্রভুকে বন্দনা করি । তাঁর চরণ আশ্রয় করলে অজ্ঞানও শাশ্ত্র থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে_ খনি থেকে মনি চয়নের মতো।”
__ শ্রীমন্মহাপ্রভুর মহিমা প্রকাশের নিমিত্ত মহাজন কৃত যেসব আকর-গ্রন্থসমূহ রয়েছে, সেখানে প্রভুর মহিমা প্রচারের সাথে সাথে সকল গৌরভক্তবৃন্দের মহিমাও বর্ণিত হয়েছে। আমরা সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করেই গৌর পরিজনের জীবনালেখ্য বর্ণনায় প্রবৃত্ত হয়েছি । আমাদের বর্তমান আলোচনা চলছিল ছয়-গোঁসাইয়ের অন্যতম রঘুনাথ দাস গোস্বামীকে নিয়ে। পিতৃসত্য পালনের নিমিত্ত রঘুনাথ শ্রীরামচন্দ্র 14 বছর বনবাসের শাস্তি মাথা পেতে নিয়েছিলেন আর চৈতন্যপার্ষদ রঘুনাথ দাস, পিতা পিতৃব্যের হয়ে সপ্তগ্রাম মুলুকের মুসলমান শাসকের ঘরে বন্দিদশা প্রাপ্ত হয়েছিল। হুজুর বাহাদুর এই কিশোরকে শাস্তি দিয়েও দিতে পারছিল না _কারণ কিশোরের মুখের মধ্যে এমন এক দিব্যভাব বিরাজিত ছিল যে, সেই দিকে চাইলেই নিষ্ঠুর ব্যক্তিও যেন কোমল স্বভাব হয়ে যায় ! তাছাড়া সে যেন কিছু বলতে চায়_ কি বলবে এই কিশোর বালক! হুজুর শুনবে ওর কথা। উজিরের অনুমতি পেয়ে রঘুনাথ বলতে লাগলো _”আমার বাবা জ্যাঠার ব্যাপারে আপনারা কেন এত উত্তেজিত হচ্ছেন? এতো অতি সামান্য ব্যাপার! হুজুর বাহাদুর! দেখুন, আমার বাবা-জ্যাঠার সাথে আপনাদের কতদিনের সম্পর্ক ! ওরাতো আপনার ভাইয়ের মতো! ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া আর কোথায় না হয় ! ঝগড়া হয়_ আবার আলোচনার মাধ্যমে সহজেই তা মিটেও যায় । তাছাড়া আমার বাবা যদি আপনার ভাই-ই হয়, তাহলে আমিও তো আপনার সন্তান! সন্তানের একটা আর্জি_ আপনি পিতা হয়ে রাখবেন না? আপনি আমার জ্যাঠাকে ডেকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে নিন! আপনি মহাজ্ঞানী, সকলে আপনাকে বলে জিন্দাপীর __আপনি নিশ্চয়ই সুষ্ঠু মীমাংসা করবেন!”
রঘুনাথের মধুর ও বিনয়পূর্ণ কথায় গলে গেল শাসক বাহাদুর! তার চোখ অশ্রুসিক্ত, এতোটুকু কিশোরের এতো আত্মবিশ্বাস, বিনয়,শ্রদ্ধা! বললেন, “যাও তুমি মুক্ত ! তোমার জ্যাঠাকে কিছু রাজস্ব বেশি দিয়ে দরবারে আসতে বলো। আর আজ থেকে তুমিও আমার আর এক সন্তান_ তোমার অধিকার থাকলো, আমার ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার ।”
কিছু রাজস্ব বেশি দিয়ে পুনরায় জমিদারি ফেরত পেলো হিরণ্য-গোবর্ধন! পুত্রের মান বেড়ে গেল বাড়িতে! এত সহজে এই বালক পুত্রের মাধ্যমে নবাবের সঙ্গে মীমাংসা হয়ে যাবে _তা ধারণাও করতে পারেননি জমিদারবাবুরা! ছেলের জন্যই ফিরে পাওয়া গেল তালুক-মুলুক! ছেলে কিন্তু পালাতে ছাড়লো না _ঠিক চুপিসারে কেটে পড়লো একদিন। পিতা লোক পাঠিয়ে আবার ধরে আনলো ছেলেকে! মা আকুল হয়ে বললো_ “ছেলে আমার গৌরপ্রাপ্তির জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে_ ওকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখো!” বিষন্ন হোলো গোবর্ধন _দড়ি দিয়ে কি ওকে বেঁধে রাখা যাবে? অপ্সরার মতো স্ত্রী, ইন্দ্রের ঐশ্বর্য, এসবও ওকে বশ মানাতে পারলো না _আর সামান্য দড়ির বাঁধন? গোবর্ধন ভক্তলোক, সে স্ত্রীকে বোঝালো যে, প্রারব্ধ কর্মহেতু মানুষের বর্তমান কর্মের গতি নির্ধারিত হয়, তাই তা খন্ডাতে সে অসমর্থ ! পূর্বজন্মের সুকৃতি যদি থেকে থাকে, তাহলেই কোনো মানুষের সংসারে বৈরাগ্য আসে ! আর সে ফল কেউ খন্ডন করতে পারে না । এ কথা শুনে মা ও অঝোরে কাঁদতে লাগলো_ “বাবা হয়ে তুমি পুত্রকে ঘরে ধরে-বেঁধে রাখতে পারবেনা ?” গোবর্ধন বললো_” চৈতন্যের জন্য যে পাগল, তাকে বাঁধা যায় না তাকে বাধার কুদুরী পাওয়া যায়না, তাকে বাঁধার কোনো দড়ি পাওয়া যায় না।”
এদিকে রঘুনাথের অন্য ভাবনা __’যতবার পালাই, ততোবারই ঘরে ফিরিয়ে আনে! এর একটা বিহিত করতে হবে।’ মনে হোল গৌরচন্দ্রের কৃপা পেতে হোলে নিত্যানন্দের কৃপা আগে প্রয়োজন ! কারণ সংসার-সমুদ্র পার করে চৈতন্য-বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার ভেলা বা নৌকা যে নিত্যানন্দ ! চৈতন্য মন্দিরে পৌঁছানোর সেতু যে নিত্যানন্দ! রাধারানীর কৃপা না হোলে যেমন কৃষ্ণ সাক্ষাৎকার হয় না, তেমনি দয়াল নিতাই কৃপা করে দ্বার না খুললে চৈতন্যদর্শন হয় না! তাই বাবার অনুমতি নিয়ে রঘুনাথ চলল নিতাই সাক্ষাতে! নিত্যানন্দ তখন অবস্থান করছিলেন পানিহাটিতে_সেখানে নিত্য উৎসব! বাবা গোবর্ধন অনুমতি দিলেন কিন্তু সত্বর বাড়ি ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিও করিয়ে নিলেন । পানিহাটির গঙ্গাতীরে বৃক্ষমূলের গোঁড়া বাঁধানো উচ্চভূমিতে দিব্যদেহী জ্যোতির্ময়রূপে চারিদিকে ভক্তবৃন্দ পরিবৃত হয়ে উপবিষ্ট নিত্যানন্দ! নিত্যানন্দ-কন্ঠে হরিকথামৃত পান করছেন সকলে, এমন সময়ে রঘুনাথ উপস্থিত হয়ে দণ্ডবৎ প্রণাম জানালেন। নিতাই যেন হঠাৎ করে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। বললেন_ “এতদিনে ধরা দিলে চোর!”
_ চোর কোথায়?
_”চোর নয় তো কি? নিতাইয়ের সারা জীবনের সঞ্চিত সম্পত্তি যে গৌরচরণ, তা যদি কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে নিতে চায়_ তাহলে সে চোর নয় তো কি? যার সম্পত্তি _তাকে না জানিয়ে জিনিস নিলে চুরি করা হয় না কি ? যে এটা করে সে একশো বার চোর! চুরির চেষ্টা করে যে _সেও চোর! তবে দেখো _দেখো, এই চোর যেন কত প্রিয়_ সুজন ! কত নয়ন মনোহর!”
উপস্থিত ভক্তবৃন্দ মহাজন বাক্য এবং তাঁর আচরণ কিছুই বুঝতে পারছিল না _শুধু উভয়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রস-মাধূর্য্য উপভোগ করছিল। নিতাই রঘুনাথকে হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিয়ে একেবারে নিজের পায়ে স্থাপন করলেন! বললেন_ “ধরা যখন পড়েছো, শাস্তি পেতেই হবে!” সকলে ব্যাকুল হয়ে পড়লো! এমন সুন্দর ছেলেকে দেবে শাশ্তি? রঘুনাথ জোড়হাতে বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল। নিত্যানন্দ হাসিমুখে বললেন, “আমাদের সকলকে দই-চিঁড়া খাওয়াও! এটাই তোমার জন্য শাস্তি!” আনন্দে অধীর হয়ে বাড়িতে খবর পাঠালো রঘুনাথ! প্রচুর খাদ্যসম্ভার, অর্থ ও লোকজন আনালো বাড়ি থেকে। দিকে দিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল পানিহাটিতে চিঁড়া-মহোৎসবের মেলা বসবে। মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের খবর দেওয়া হোলো__ যে যা পারো চিঁড়া, দই, কলা, সন্দেশ, চিনি, ক্ষীর নিয়ে এসো__ যথাযথ মূল্য কিনে নেওয়া হবে। যেখানে যত ভক্ত আছে সকলকে খবর দেওয়া হোলো, নিমন্ত্রণ করা হোলো_ যে আসবে সেই প্রসাদ পাবে । পরিপূর্ণ প্রসাদ, অভেদ প্রসাদ __কোথাও কোনো কুন্ঠা নাই! শুধু চলে এসো ,এসে উপস্থিত হও_ চিঁড়া-মহোৎসব রঙ্গ দেখে যাও । ধীরে ধীরে ভক্তজন জমায়েত হোতে থাকলো । চৈতন্য পার্ষদরাও অনেকে হাজির হোলেন_ রামদাস, সুন্দরানন্দ, গঙ্গাধর, মুরারী, কমলাকর, সদাশিব কবিরাজ, পুরন্দর পন্ডিত, ধনঞ্জয়, জগদীশ, পরমেশ্বর দাস প্রমুখেরা । এঁরা সকলেই শ্রীচৈতন্যের নাম-প্রেম প্রচারের সঙ্গী! আরো হাজির হোলেন গৌরদাস কীর্তনীয়া, কৃষ্ণদাস, মহেশ, উদ্ধারণ দত্ত _এছাড়াও আরো যে কত শত ভক্তবৃন্দ জমা হলেন_কে তার খবর রাখে !
রাঘবের বাড়িতে নিত্যানন্দের অবস্থান । ভাবস্থ অবস্থায় প্রভূ রাঘবকে বললেন _”আমি গোপদের নিয়ে পুলিন-ভোজন শুরুছি _তুমিও বসে যাও!” এ বুঝি নিত্যানন্দের বললাম ভাব!! সেই যে দ্বাপরে রাখাল সখাদের নিয়ে কৃষ্ণ-বলরাম যমুনাপুলিনে ভোজন করেছিলেন__এ বুঝি সেই পূর্বের স্মৃতি! তাই যদি হয় তাহলে কৃষ্ণ কোথায়? এই কথা নিত্যনন্দের মনে হোতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সামনে মহাপ্রভু আবির্ভূত হোলেন । সব ভক্তেরা ভোজনে বসেছে__নিতাইসব মন্ডলে মন্ডলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সঙ্গে মহাপ্রভু ! সকলে নিতাইকে দেখছে কিন্তু মহাপ্রভুকে নিতাই ছাড়া অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না! ভোজনের পূর্বে যখন বৈষ্ণবরা মালশা ভোগ প্রভুকে মনে মনে নিবেদন করছেন __সেই মুহুর্তেই গৌর নিতাইকে, আবার নিতাই গৌরকে এক মুঠো করে চিঁড়ে নিয়ে __পরস্পরকে খাইয়ে দিচ্ছেন! এ দৃশ্য নিতাই ছাড়া আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না !! সবাই আসন গ্রহণ করলে পাশাপাশি দুটো আসন পাতলেন নিতাই । একটি নিজের অপরটি গৌরের ! পাশাপাশি বসে মালশা ভোগ খেতে লাগলেন দুজনে__ এমন ভাগ্যবান কজন আছে যে, এই দৃশ্য দেখে নয়ন সার্থক করে! “হরি-হরি ধ্বনি তোল”_ আদেশ করলেন নিত্যানন্দ! সমবেত বৈষ্ণবের হরিধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে গেল। এই ভাবেই নিতাই কৃপা করলেন রঘুনাথকে! শুধু তার সামগ্রিই_ অঙ্গীকার করলেন না, মহাপ্রভুকে টেনে আনলেন উৎসবে! এই ভাবেই নিতাইয়ের কৃপায় রঘুনাথের চৈতন্য চরণ লাভ হোল । কিন্তু উৎসবে সহস্র লোক খেলেও রঘুনাথ কেন খেতে বসেনি ? নিতাই নিষেধ করেছিলেন _তিনি তাকে গৌরের ভুক্তাবশেষ প্রসাদ খাওয়াবেন। রঘুনাথ জানলো এটা নিত্যানন্দের প্রসাদ, নিত্যানন্দের এই প্রসাদই ছিল গৌরাঙ্গের করুনার আস্বাদে ভরা! রাঘব নিয়ে এলো প্রসাদ __দু’ভাই-এর ভুক্তাবশেষ রঘুনাথকে দিল, বলল_”তুমি চৈতন্য গোঁসাই-এর প্রসাদ পেলে, তোমার সর্ববন্ধন ছিন্ন হোলো । রাঘবের কথা শুনে রঘুনাথ আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাচতে লাগলো। কিন্তু কোথায় চৈতন্য গোঁসাই?
ব্যাকুল হোল রঘুনাথ ! তিনিই নীলাচলে, তিনিই আবার ভক্ত হৃদয়ে, তিনিই আবার ভক্ত গৃহে। তিনি কখনো ব্যক্ত, কখনো সুপ্ত। কখনো মানুষের মতো হাঁটেন-চলেন, কথা বলেন, আবার কখনো আবির্ভূত হ’ন _ভক্তের কাতর প্রার্থনায়! তিনি সর্বব্যাপী, গতি-স্থিতি তাঁরই ইচ্ছায় সংঘটিত হয়। সংশয় করতে যেয়ো না __’সংশয়াত্মা বিনশ্যতি’_সংশয়কারীরা বিনাশপ্রাপ্ত হয়__নিত্যানন্দ উপদেশ করতে লাগলেন ।
রঘুনাথ নিতাইয়ের পা আঁকড়ে ধরলো_ বললো ” সংশয় করিনা কিন্তু তিনি যদি নাই আসতে পারেন আমি কেন তার কাছে যেতে পারি না ? চাঁদ কখনও নিচে নামেনা জানি _____কিন্তু ন’দের চাঁদের কৃপা না হোলে_ বামন হয়ে কি করে তাকে স্পর্শ করি ! আমার গৃহ ভালো লাগেনা যতবার গৃহ ছাড়তে চাই, ততবার বাবা লোক পাঠিয়ে ধরে আনে! ঘরের বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়। এই বন্ধন থেকে মুক্তি পেতেই চাই__ ‘চৈতন্য চরণ’।! আমি শুনেছি নিত্যানন্দের কৃপা হোলে তবেই চৈতন্যচরণ লাভ হয়। তাই হে প্রভু! তুমি আমাকে কৃপা করো, আমি কিছুই জানিনা, কোন ক্রিয়া করিনা ! কিন্তু হে প্রভু ! শুনেছি অকৃতিরাই তো তোমার কৃপালাভের অগ্রগন্য অধিকার ! রঘুনাথের আকুলতায় নিত্যানন্দ অন্য ভক্তদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমরা সবাই দেখো __চৈতন্যকৃপায় ইন্দ্রিয়সুখ,বিষয়সুখ এসবের কোন রুচি নেই ছেলেটির । দেখো একবার কৃষ্ণপাদপদ্মের গন্ধ পায়, সে ব্রহ্মলোকের সুখও অগ্রাহ্য করে !” তিনি রঘুনাথকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন,_ “বাবা তোমার ইষ্ট শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য চিঁড়া-মহোৎসবে পুলিন ভবনে এসেছিলেন । খেয়ে গেলেন তোমার দই-চিঁড়া, ফলমুলাদী মিষ্টান্ন ! আবার রাত্রে রাধারানীর সেবাও দেখে গেলেন । তখনও আবার প্রসাদ করে দিলেন। তাই দুবার তার সাক্ষাৎ প্রসাদ লাভ করেছো তুমি!! এমন আয়োজন তারই নির্দেশে __তোমাকে উদ্ধার করতেই হবে! তাই এই সব কর্মকান্ড ! তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ফিরে যাও, ঠিকই তিনি তোমাকে তার অন্তরঙ্গ সেবক করে নেবেন!
তবে আর কথা কি !এবার ঘরে ফেরার পালা! বিদায়ের পূর্বে সকল ভক্তকে ভক্তিপূর্ণ প্রণাম কোরে সকলকে দক্ষিণা দিলো রঘুনাথ । সকলের আশীর্বাদ প্রার্থনা করলো ! রাঘব মন্দিরে নিত্যানন্দ ছিলেন, তাই তাঁকে আলাদা করে অর্থ প্রণামী হিসাবে দিলো । এবার প্রভু নিত্যানন্দের সেবার জন্য ভান্ডারীর হাতে গোপনে কিছু অর্থাদি দিলো___ বলে দিল যেন প্রভু জানতে না পারেন! সকল ভক্তের আশীর্বাদ ও ভালোবাসা মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরে এলো রঘুনাথ।।
