।। ভাগবত-কথা।।২০১৪/১
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
“অগত্যেকগতিং নত্বা হীনার্থাধিকসাধকম্। শ্রীচৈতন্যং লিখাম্যস্য মাধুর্য্যৈশ্বর্যশীকরম্।।”__”গতিহীন ব্যক্তিগণের একমাত্র গতি, নিঃসম্বলগণের উপায় স্বরূপ চৈতন্যদেবকে নমস্কার করিয়া তদীয় মাধুর্যময় ঐশ্বর্যকণা লেখা হইতেছে।”__চৈতন্যচরিতামৃত মধ্যলীলা একবিংশ পরিচ্ছেদে কৃষ্ণদাস কবিরাজ একথা উল্লেখ করেছেন। “অগতির গতি”_ স্বয়ং ভগবান ছাড়া আর কেই বা হোতে পারে! তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা সহচর জীব গোস্বামীর জীবনালেখ্য আলোচনাকালে আমরাও সেই “অগতির গতি”- কে স্মরণ করেই আলোচনা শুরু করতে চলেছি!
রাধা দামোদর বিগ্রহ লাভ করলেন শ্রীজীব গোস্বামী। পরম-সুন্দর এই বিগ্রহ স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন সনাতন গোস্বামীকে। বিগ্রহের রূপের ছটায় সনাতনের হৃদয়-মন উদ্বেলিত হয়ে ওঠে ! স্বপ্নদর্শনান্তে পরদিনই তিনি শিল্পী ডেকে পাঠিয়ে তৈরি করান স্বপ্নে দেখা মুর্তি ! তারপর নিজের ভজনকুটিরে এই বিগ্রহ স্থাপন করে কিছুদিন সেবা পূজা করেছিলেন। এখন থেকে এই বিগ্রহের সেবার ভার পড়লো শ্রীজীবের উপর। গুরু পূজিত এই বিগ্রহের সেবার ভার পেয়ে শ্রীজীবের আনন্দের আর সীমা নাই ! বৃন্দাবনে শৃঙ্গারবটের কাছে রাধা দামোদর মন্দির স্থাপিত হোলো (পরবর্তীকালে ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকাল বৃন্দাবনে বৈষ্ণব সমাজের উপর যে অত্যাচার হয়, সেই সময় এই মন্দিরের মূল বিগ্রহ জয়পুরে সরানো হয় এবং সেই স্থানে প্রতিভূ বিগ্রহ স্থাপন করা হয় । বর্তমানে সেই বিগ্রহের ই-সেবা পূজা চলে)।।
ইতিমধ্যে বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সমাজে নেমে এলো ঘোর মর্মান্তিক দুর্বিপাক ! সকলকে দুখঃসাগরে নিমজ্জিত করে সনাতন গোস্বামী দেহ রক্ষা করে চৈতন্য লোকে গমন করলেন। যে ‘চরণ পাহাড়ী শিলা’ ছিল সনাতনের বৃদ্ধবয়সের সবচাইতে প্রিয় বস্তু_শ্রীজীব গোস্বামী সেই শিলা শিরে ধারণ করে নিয়ে এসে পুনরায় এটি স্থাপন করলেন নিজের নবনির্মিত মন্দিরে। “চরণ পাহাড়ি”-র মাহাত্ম্যের কথা পাঠকবর্গের নিশ্চয়ই মনে আছে! বৃদ্ধবয়সে সনাতন ‘গিরি গোবর্ধন’- পরিক্রমা করতে পারতেন না, তাই কৃপা করে গোবিন্দজী তার কাছে আবির্ভূত হন এবং এক শিলাখণ্ডের উপর তাঁর শ্রীপদের ছাপ প্রদান করেন_ যা বৃন্দাবনে “চরণ পাহাড়ি”_নামে খ্যাত। শ্রীজীবের রাধা দামোদর মন্দির এই ‘গোবর্ধন প্রতীক’ আজও বিরাজিত, যা বৈষ্ণব ভক্তদের কাছে এক পরম শ্রদ্ধার বস্তু ও বৃন্দাবনের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ!
শ্রীজীব যে নতুন মন্দির করলেন তারই এক পাশে গড়ে তুললেন একটি গ্রন্থশালা । সর্বকালীন বৈষ্ণব সাহিত্যের অমূল্য গ্রন্থ রাজি এখানে সযত্নে সংগ্রহ করা হতে লাগলো। ফলে অচিরেই এটি একটি বৃহৎ আকার ধারণ করলো। এইভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে শ্রীজীব গোস্বামী বৈষ্ণব সমাজের মানুষের মনোজগতের খাদ্যের একটি বিরাট স্থান পূর্ণ করেছিলেন। রূপ-সনাতন আদি বৈষ্ণব মহাজনের কৃপায় অচিরেই শ্রীজীবের প্রেমভক্তি সাধনা সার্থক হয়ে উঠলো এবং কিছুকালের মধ্যেই অর্থাৎ রূপ-সনাতনের অন্তর্ধানের পর, তিনিই হয়ে উঠলেন ব্রজমণ্ডলের অধিকর্তা !
রূপ-সনাতনের প্রেমভক্তি সাধনা ও তীব্র বৈরাগ্যের প্রভাবে বৃন্দাবন তখন হয়ে উঠেছিল মহা তীর্থক্ষেত্র ! দলে দলে বৈষ্ণবেরা তখন বৃন্দাবনে উপস্থিত হোতেন । এদের কেউ বা আসতেন মহাজনদের নিকট বৈষ্ণব ধর্ম তথা ভক্তি ধর্মে দীক্ষা নিতে, কেউ করতে চাইতেন বৈষ্ণব শাস্ত্রের পঠন-পাঠন, প্রকৃত শিক্ষায় আগ্রহীদের সকলকেই আসতে হোতো শ্রীজীব গোস্বামীর কাছে । আর এই মহান ধর্মনেতা মুমুক্ষু মানুষদের দুবাহু প্রসারিত করে আশ্রয় দিতে থাকেন। এভাবেই শ্রীজীবের প্রেমপ্রবাহে বৃন্দাবন হয়ে উঠেছিল প্রেম-ভক্তি-রস সাধনার আশ্রয়স্থল!
কিন্তু সে সময় বিভিন্ন দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতদের ছিল বৃন্দাবনে আনাগোনা। তারা তাদের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ছড়াবার জন্য এবং তর্কে অবতীর্ণ হওয়ার জন্যই আসতো! কিন্তু শ্রীজীবের সান্নিধ্যে এসে_ তাদের সে সাধ চিরতরে শেষ হয়ে যেতো। সেই সময় বৈষ্ণব সমাজের স্বীকৃতি ছাড়া কোন গ্রন্থ বা তত্ত্বই প্রামাণ্য বলে গৃহীত হোতো না । তাই তরুণ প্রতিভাবান শিক্ষাবিদরাও আসতেন শ্রীজীবের কাছে ।
সেটা ছিল মুঘল রাজদরবারে সম্রাট আকবরের আমল ! বৃন্দাবনের খ্যাতি বিশেষত শ্রীজীবের খ্যাতি সম্রাটের কানে পৌঁছাতে দেরি হলো না । আনুমানিক 15 73 খ্রিস্টাব্দে তিনি একবার পারিষদ সমেত এসেছিলেন বৃন্দাবনে । বৈষ্ণব সমাজের মুখপাত্র হিসেবে শ্রীজীব সাক্ষাত করেছিলেন সম্রাটের সঙ্গে। নয়ন মনোহর ঐ মহা-বৈষ্ণবের দিব্য শ্রীমন্ডিত মূর্তি আর করুণাসুন্দর দৈন্যময় বেশ সম্রাটকে খুবই আকর্ষণ করেছিল। কথার অবতারণায় তাঁর লোকোত্তর প্রতিভা, বাগ্মিতা ও তেজস্বীতা দেখে আকবর মুগ্ধ হয়েছিলেন । সম্রাট আকবর এই বৈষ্ণব শিরোমনির কাছে রাধাগোবিন্দের লীলাভূমি নিধুবন দর্শন করতে চেয়েছিলেন । গোস্বামীদের সম্মতি নিয়ে বাদশাহের চোখে কাপড় বেঁধে লীলাস্থলের এক পাশে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই ভূমিতে দণ্ডায়মান হওয়ামাত্র আকবর শাহ অনুভব করেছিলেন এক বিস্ময়কর অলৌকিক অভিজ্ঞতা!
মুসলমান সম্রাটদের অনুমতি ছাড়া তখন কোথাও কোনো হিন্দু মন্দির নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না । এই অলৌকিক অভিজ্ঞতা লাভের পর সম্রাট বৃন্দাবনের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিলেন । আজ্ঞা হল তখন থেকে বৃন্দাবনে বৈষ্ণবরা তাদের ইচ্ছামতো দেব-দেউল তৈরি করতে পারবে । সম্রাট আকবর বৈষ্ণবদের দেখে খুবই প্রীত হয়েছিলেন, তিনি তাদেরকে তাঁর কাছ থেকে কিছু চেয়ে নেবার জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন । কিন্তু বৈষ্ণব শিরোমণি শ্রীজীব গলবস্ত্রে বলেছিলেন, “সম্রাট! আমরা দীন, কাঙ্গাল বৈষ্ণব, ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের অবলম্বন, সর্বস্ব ত্যাগ করে প্রভুর শরণাগত হয়ে এখানে পড়ে রয়েছি ! আমাদের সম্রাটের কাছে কিছুই চাইবার নাই।” আকবর বাদশাও সহজে ছাড়ার পাত্র নয় _জিদ করলেন, কিছু চাইতেই হবে । বৈষ্ণবগণ তখন সকলে পরামর্শ করে বললেন, “হে সম্রাট ! প্রাচীনকালে রাজারাই নিষ্ঠার সঙ্গে তপোবন রক্ষা করতেন, আমরা আপনার কাছে এটাই চাই যে, আপনিও বৃন্দাবনের তপস্বীগণকে সমস্ত বিঘ্ন থেকে রক্ষা করবেন । তাছাড়া বৃন্দাবনের অরণ্যে বিভিন্ন প্রাণীরা হিংসা ভুলে স্বাধীনভাবে বিচরণ করে । কিন্তু কখনো কখনো রাজন্যবর্গ মৃগয়ার নিমিত্ত এখানে এসে হিংসার বীজ বপন করে, তাদেরকে হত্যা করে। যদি আপনি এই ব্যাপার থেকে তাদের নিরস্ত হওয়ার হুকুম দেন_ তাহলে আমরা বড়ই বাধিত হই।”
সম্রাট বাদশা খুব খুশি হয়ে বৈষ্ণবগণের সমস্ত আর্জি মেনে নিলেন। ব্রজমন্ডল রক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা করলেন, প্রাণীহত্যা আইন করে বন্ধ করলেন, এমনকি ব্রজধামের গাছপালা কাটাও নিষিদ্ধ হোল। বৃন্দাবনের রজ-লাভের আশায়, আর ওই ভূমিতে স্থান পাবার আশায়_ কত মহাত্মা বৃক্ষশরীরে অবস্থান করেন এবং তাঁরা ঐ পবিত্র ভূমিতে ধ্যানস্থ থেকে সাধন-ভজন করেন__ তাঁদেরকে রক্ষা করাই ছিল ওই আবেদনের উদ্দেশ্য। আবেদন গ্রাহ্য হতেই বৈষ্ণবকুলে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল!
সম্রাট আকবর রাজধানীতে ফিরে গেলেও তাঁর মন কিন্তু বৈষ্ণবকুল অনেকটাই জয় করে নিয়েছিল। কারণ রাজধানীতে ফিরে গিয়েই তিনি গুণী চিত্রকরদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বৃন্দাবনে শ্রীজীব গোস্বামী আদি মহাত্মাদের চিত্র অঙ্কন করে নিয়ে আসার জন্য । তখনকার দিনে ফটোগ্রাফির কোন ব্যবস্থা ছিল না, তাই চিত্রকর দ্বারা চিত্র অংকনই একমাত্র ব্যবস্থা ছিল। শ্রীজীব গোস্বামী কিন্তু এতে রাজি হননি _তিনি চিত্রকরদের ফেরত পাঠালেন, আর সম্রাট যাতে রুষ্ট না হয় সেজন্য সম্রাট কে একটা চিঠি লিখে জানালেন যে, ‘ত্যাগ, বৈরাগ্য, দৈনতা _বৈষ্ণবদের সাধনার প্রধান অঙ্গ, ভোগ বিলাসিতা নয় _আত্মপ্রচারও নয় ! চিত্রকরদের ফেরানোয় সম্রাট যেন কিছু না মনে করেন!’ সম্রাট এতে রুষ্ট না হয়ে বরং খুশিই হয়েছিলেন। বৈষ্ণব সাধকদের সাধনজীবন দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের জীবনেও তার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন । সম্রাটের কাছে শ্রীজীব গোস্বামী আর একটা উপকার নিয়েছিলেন_ তখনকার দিনে গ্রন্থ যা লেখা হোতো তা পুঁথি আকারে _হয় তালপত্রে না হয় ভূর্জপত্রে! ফলে গ্রন্থের অনুলিখন বা গ্রন্থের প্রচার ব্যাপারটা খুবই কষ্টসাধ্য ছিল । শ্রীজীব গোস্বামী সম্রাটের সহায়তায় রাজধানী থেকে কাগজ আনতেন এবং এর ফলে তৎকালীন বৃন্দাবনে শাস্ত্রগ্রন্থের প্রচার অনেক ত্বরান্বিত হয়েছিল।
সনাতন ও রূপের গ্রন্থাদি রচনাকালে জীব গোস্বামী তাঁদেরকে সহায়তা করতেন । সনাতনের পান্ডিত্য এবং রূপের কবিত্ব, এই দুই ‘ভাবে’-র ই বিস্ময়করভাবে সমাহার হয়েছিল জীব গোস্বামীর জীবনের মধ্যে । আর এই প্রতিভাধর মহাত্মার ছিল ঐকান্তিক নিষ্ঠা। শ্রীজীব প্রায় 60 বৎসর কাল শাশ্ত্রচর্চায় অতিবাহিত করেন । 25 টিরও বেশি শাস্ত্রগ্রন্থ রচনা করেছিলেন তিনি। ‘ভাগবতসন্দর্ভ’ এই মহামনীষীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তাঁর রচিত এই গ্রন্থ চিরকালের বিদ্বৎ-সমাজের কাছে এক অসামান্য মর্যাদার আসন করে নিয়েছে। সনাতন নেই, রূপ বৃদ্ধ হয়েছেন, দেহ আর কর্মক্ষম নয় _তাছাড়া সবসময়ই সাধন-ভজনে রত থাকেন । সেজন্য দার্শনিক তত্ত্ব বিচারের ও গ্রন্থ রচনার সমস্ত দায়-দায়িত্ব পড়েছিল শ্রীজীবের উপর । যদিও সুপণ্ডিত গোপাল ভট্র কিছুদিন এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন কিন্তু কার্য সম্পন্ন করেন শ্রীজীব গোস্বামী ।
বৃন্দাবনের প্রেমভক্তির মাহাত্ম্য সেই সময় দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সাধন শক্তি, মনীষা ও কর্মশক্তিবলে শ্রীজীব প্রায় এককভাবে আপন হাতে ধারণ করেছিলেন বৈষ্ণব সমাজ পরিচালনার রশি! এরপরই ঐশীকর্মের সহায়ক রূপে বৃন্দাবনের রঙ্গমঞ্চে তিন মহাবৈষ্ণবের আবির্ভাব ঘটেছিল _ যাঁদের নাম ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে । তাঁরা হলেন শ্রীনিবাস, নরোত্তম ও শ্যামানন্দ । যাঁদের কথা পরের সংখ্যায় শ্রীজীব গোস্বামীর অন্তঃলীলার সাথে আলোচিত হবে।।