শ্রী্শ্রী চৈতন্যচরিতামৃতকার শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর অমূল্য গ্রন্থের মধ্যলীলায় সনাতনপৃরভূর রোগমুক্তির ঘটনা নিয়ে লিখেছেন__
” প্রভু স্পর্শে প্রেমাবিষ্ট হইল সনাতন/ মোরে না ছুঁইহ কহে গদগদ বচন।। দুইজনে গলাগলি রোদন অপার / দেখি চন্দ্রশেখরের হইল চমৎকার ।। তবে প্রভু তাঁর হাতে ধরি লইয়া গেলা/ পিন্ডার উপর আপন পাশে বসাইলা।। শ্রীহস্তে করেন তার অঙ্গ সমার্জন / তেঁহো কহে মোরে প্রভু না করো স্পর্শন ।। প্রভু কহে তোমা স্পর্শি আত্মপবিত্রিতে/ ভক্তিবলে পারো তুমি ব্রহ্মাণ্ড শোধিতে।।”
__এহেন সনাতনের ভক্তি কথা লিখন তাঁর কৃপাভিন্ন এবং সর্বোপরি তাঁর আরাধ্য করুনাবতার শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা ভিন্ন সম্ভব হয় না। তাই তাঁদের সকলের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেই_ লেখার এই প্রয়াস! পূর্ব সংখ্যায় আমরা শ্রীধাম বৃন্দাবনে সনাতন গোস্বামীর মদনগোপাল বিগ্রহ লাভের কথা জেনেছিলাম । এই বিগ্রহের আরেকটি চমৎকার কাহিনী প্রচলিত রয়েছে _সেটা বলা যাক। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রপৌত্র বজ্রবাহু একসময় সমগ্র ব্রজধামে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রাচীন আটটি বিগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন_ মদন গোপাল শ্রীমুর্তি তাদের মধ্যে অন্যতম ।
শ্রীবিগ্রহ লাভ করার পরেই যে সনাতনের সকল ভাবনার অন্ত হোলো _তা কিন্তু নয় ! কারণ কোথায় শ্রীবিগ্রহকে স্থাপন করা হবে বা বিগ্রহের সেবা কিভাবে হবে_ তারও ব্যবস্থা করতে হোল তাঁকেই। সনাতনের ভজন কুটিরের আর একপাশে ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করে ঠাকুরের থাকার ব্যবস্থা করা হোলো, আর হোলো ভোগের ব্যবস্থা । ভিক্ষায় তা আটা পাওয়া যায় তা পিন্ডাকৃতি করে আগুনে পুড়িয়ে নিয়ে চোখের জলে পরম প্রেমভক্তি সহায়ে ভোগ নিবেদন করা হোতো । এই দগ্ধপিন্ডই প্রধান ভোগ, আর এতে প্রেমভক্তি মিশ্রিত হয়ে সে এক অপূর্ব স্বাদ-গন্ধ পরিপূর্ণ মহাভোগে রূপান্তরিত হোতো। অর্থাৎ এই ভোগে পরম প্রীত হোতেন মদনগোপাল! বৈষ্ণব ভক্তসমাজে এই কথা রাষ্ট্র হোতে সময় লাগলো না । পরবর্তীকালে এই দগ্ধপিন্ড ভোগ_ বৈষ্ণব সমাজে ” আঙ্গাকড়ি ভোগ” নামে বিশেষ স্থান গ্রহণ করলো। আঙ্গাকড়ি ছাড়াও সনাতন নানা ধরনের শাক সিদ্ধ করে গোপালকে নিবেদন করতেন। এই সব সিদ্ধ আর দগ্ধ ভোগ নিবেদন চলতে থাকলো দিনের পর দিন। একদিন সনাতনের স্বপ্নদর্শন হলো শ্রীবিগ্রহ থেকে বেরিয়ে এসে মদনগোপাল যেন তাঁকে বলছেন _”এই দগ্ধ আর সিদ্ধ ভোগ নিবেদন কতদিন চলবে ?” স্বপ্নভঙ্গের পর সনাতন উঠে বসে কাঁদতে লাগলেন _”প্রভু! তুমিতো অন্তর্যামী, তুমি সবই জানো_ আমি তোমার সেবার অযোগ্য! আমি অধম সেবক! তুমি তো জগৎপতি, নিখিলনাথ, রাজাধিরাজ ! তোমার উপযুক্ত রাজভোগ আমি কোথায় পাবো ঠাকুর ! যদি আমার এই স্বল্প উপাচারে তোমার রুচি না হয় _তাহলে তুমি নিজেই তোমার ভোগের ব্যবস্থা করে নাও প্রভু!”
জগতে সবচেয়ে বিচিত্র এই ঈশ্বরের লীলা! ধনী গৃহিণী চৌবেজীর বহুভোগ ছেড়ে কাঙ্গাল ভক্তের মামুলি অন্নভোগে রুচি হওয়া ও এখন আবার ভালো রুচিকর আহার্য যাচঞা করা__ এগুলি লীলা ছাড়া আর কি ! মদনগোপালের দিকে তাকাতে কষ্ট হয় সনাতনের! প্রভুর ইচ্ছা পূরণে তিনি অক্ষম, এত অধম, এত দীন! নয়নজলে বক্ষ ভেসে যায় তাঁর! নিরন্তর আকূতি আর প্রার্থনায় প্রভুর অন্তর স্পর্শ না করে কি আর পারে ? ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় তার অন্তরের আকুতিতে আর অশ্রুর অর্ঘে!
রামদাস কাপুর নামে এক ধনী ব্যবসায়ী নৌকাযোগে বৃন্দাবনের পাশ দিয়ে যমুনার ধারা ধরে চলেছেন দূর দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে । তার সঙ্গে রয়েছে লোকজন, বহুমূল্য পণ্যসামগ্রী ইত্যাদি । আদিত্যটিলার নিকটে এসে নৌকাটি হঠাৎ আটকে গেল । মাঝি-মাল্লারা এবং নৌকার লোকজন ঠেলাঠেলি করেও সেই নৌকাকে এক চুলও সরাতে পারলোনা । কৃষ্ণপক্ষের গভীর জমাট অন্ধকার রাত্রি, কাছে জনবসতির চিহ্নমাত্র নেই। তৎকালীন যুগে সাধারণ ডাকাতরা ছাড়াও স্বয়ং জমিদাররাও স্থানে স্থানে ডাকাতি করে বেড়াতো। মহা সমস্যায় পড়ে রামদাস অগতির গতি বিপদভঞ্জন মধুসূদনকে স্মরণ করতে লাগলেন। ভালো করে লক্ষ্য করে রামদাস দেখলেন গভীর জঙ্গলের বৃক্ষরাজির ফাঁকে যেন এক চিলতে আলোর রশ্মি বেরিয়ে আসছে । পরম আশায় আশায় বুক বেঁধে রামদাস ধীরপদে সেই আলো লক্ষ্য করে এগিয়ে চলতে লাগলেন। আলোর অভিমুখে এগিয়ে চলাই তো প্রকৃত অভিসার ! আলোকে সামনে রেখে এগিয়ে চলে যারা, তাদেরকেই তো শাস্ত্র বলেছেন আর্য ! উপনিষদের চিরন্তন প্রার্থনা _”তমসো মা জ্যোতির্গময়!” রামদাস সেই সনাতন ভারতবর্ষেরই শাশ্বত পথিক, তার যাত্রা ছিল আলোর দিকে । নিকটে পৌঁছে রামদাস দেখলেন একটি ছোট্ট কুটির, সেখানে প্রদীপের আলো মিটমিট করে জ্বলছে। সেখানে একজন সাধু বৈষ্ণব স্থির ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে রয়েছেন। যাঁর দুনয়ন বেয়ে নেমে আসছে অবিরল অশ্রুধারা ! মাঝেমধ্যে দেহটি ভক্তি প্রকম্পিত হয়ে উঠছে, আর ভক্ত প্রবরটির সামনে স্থাপিত রয়েছে নয়নাভিরাম কৃষ্ণ বিগ্রহ!
দেবপ্রতিম এই বৈষ্ণব সাধককে দেখামাত্র কি জানি কেনো রামদাসের মনে হোলো_ ইনিই তার সকল সমস্যার সমাধান, সমস্ত বিপদের ত্রাতা ! এর উপরেই সম্পূর্ণ ভরসা করা যায় । রামদাস উচ্চকণ্ঠে প্রণাম মন্ত্র উচ্চারণ করে শ্রীবিগ্রহ কে প্রণাম জানাতেই সনাতনের ভাবাবস্থা কেটে গেল । তিনি চেয়ে দেখলেন আগন্তুককে। রামদাস করজোড়ে তার বিপদের কাহিনী নিবেদন করলেন সনাতনের কাছে । একান্ত অনুনয় করে এই প্রার্থনা করলেন_” প্রভু আপনাকে দেখে আমার অন্তর জগতে এমন এক ভাব জাগ্রত হয়েছে, যাতে আমি বেশ বুঝতে পারছি যে _আপনার আশীর্বাদে আমার বিপদ নিশ্চয়ই কেটে যাবে। আপনিই আমার ত্রাতা, আমার পথ প্রদর্শক! এই বিপদে সঠিক মার্গদর্শন করিয়ে আমাকে বিপদমুক্ত করুন প্রভূ!”_ এই বলে রামদাস সনাতনের পদতলে সশব্দে পতিত হোলেন।
আর্তের কাতর আহবানে বিগলিত হোল সনাতনের অন্তর । তিনি বললেন _”বাবা এত কাতর হয়োনা । মদনগোপালের আশ্রয়ে যখন এসে পড়েছো, তখন তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে কৃপা করবেন। যাও বাবা, নিশ্চিন্তে তোমার নৌকায় ফিরে গিয়ে রাত্রি অবসানের অপেক্ষা করো। প্রভাতে কিছু একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হবে ।” সাধু বাবার আশীর্বাদ ও অভয় লাভের পর রামদাস সংকল্প করলেন যে, ‘এই নয়নমনোহর দেববিগ্রহের কৃপায় যদি তার বিপদ উদ্ধার হয়, তাহলে সে বারের বাণিজ্যের সমস্ত মুনাফা তিনি বিগ্রহের সেবায় উৎসর্গ করবেন!’ কথিত আছে_ মদনগোপালের কৃপায় এবং সনাতনের আশীর্বাদে রামদাস অলৌকিকভাবে বিপদ মুক্ত হয়েছিলেন । তবে রামদাস তাঁর সংকল্পের কথা ভোলেননি __বাণিজ্যে মুনাফা করে, ফিরেই তিনি বৃন্দাবনে সনাতন গোস্বামীর পদপ্রান্তে এসে পৌঁছান এবং বাণিজ্যের লভ্যাংশ শ্রীবিগ্রহ মদনগোপালের মন্দির, জগমোহন ও নাট্যশালা নির্মাণ ছাড়াও বেশকিছু ভূসম্পত্তি ক্রয় করে ঠাকুরের সেবা ও ভোগাদির স্থায়ী ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ।
‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধৌ’ গ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে_”সদ্ধর্ম্মস্যাববোধায়/ যেষাং নির্ব্বন্ধিনী মতিঃ। অচিরাদেব সর্ব্বার্থঃ/ সিদ্ধত্যেষামভীপ্সিতঃ।।”__ভাগবত ধর্ম জানার জন্য যাদের স্থির নিষ্ঠা, তাদের আকাঙ্খার সবকিছুই শীঘ্র লাভ হয়ে থাকে ।
ধনীর ঘর থেকে কাঙ্গালের কুটিরে এসেও শ্রীবিগ্রহ নিজেই তার নিজের ভোগের ব্যবস্থা করে নিলেন। সনাতন বিগ্রহ-সেবার ভার আর নিজের ওপর রাখলেন না । মদনগোপালের কাছে প্রার্থনা করলেন ছুটি মঞ্জুর করার ! কারণ মহাপ্রভু তাকে যে কাজের ভার দিয়েছিলেন _তা তিনি কখনো বিস্মৃত হননি ! তাই ব্রজমন্ডলের যখন যেখানে তিনি থাকতেন, সেখানই তিনি চারিপাশের ভূমি পর্যবেক্ষণ ও প্রদক্ষিণ করতেন_ কোনো না কোনো লুপ্ততীর্থ যদি কোথাও থেকে থাকে, তার অন্বেষণ চালিয়ে যেতেন! কারণ সেটিই ছিল তার সাধনার অন্যতম অঙ্গ ! ব্যবসায়ী রামদাস কাপুরের নির্মাণ করে দেওয়া মন্দিরে সনাতন কোনোদিন বাস করেননি _ তিনি যেমন পর্ণকুটিরে থাকতেন তেমনিই রয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে তিনি মদনগোপাল মন্দির নির্মাণ ছাড়াও নন্দগ্রামে নন্দ-যশোদা, বলরাম ও কৃষ্ণবিগ্রহ স্থাপন করে_ বৈষ্ণব ভক্তসমাজে বিশেষ শ্রদ্ধাস্পদ হয়ে উঠেছিলেন । বৃন্দাবনের আসর আরো জমে উঠলো, যখন মহাপ্রভুর নির্দেশে একে একে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন রূপ গোস্বামী, গোপাল ভট্র, রঘুনাথ দাস প্রমুখেরা । এঁদের ভক্তি-সাধনা,ত্যাগ বৈরাগ্যময় জীবন ও শাস্ত্রজ্ঞানের প্রভা শুধু বৃন্দাবন কেনো_ সমগ্র উত্তর ভারতের অধ্যাত্মজগতেও আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। সকলে যেন তাঁদের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিলেন! আর এঁদের সকলের মধ্যমণি হয়ে বিরাজ করতে লাগলেন আপ্তকাম, সংসারের ভোগসুখে বীতস্পৃহ, সন্ন্যাসীশ্রেষ্ঠ, ভক্তশ্রেষ্ঠ_ সনাতন গোস্বামী।।
২০১২/২
