শ্রবণং কীৰ্ত্তনং বিষ্ণোস্মরণং পাদসেবন।
অৰ্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যমাত্মনিবেদন।
ইতি পুংসার্পিতা বিষ্ণৗে ভক্তিশ্চেন্নবলক্ষণ।৷ (শ্রীমদ্ভাগবত ৭৫।১৮)
–বিষ্ণুর নাম শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, পাদসেবা, অর্চনা, বন্দনা, দাস্য, সখ্য ও আত্মনিবেদন–ভগবান বিষ্ণু-ভক্তের তাে এই নবলক্ষণী ভক্তি দরকার। প্রভু শােনাচ্ছেন সনাতনকে এইসব তত্ত্ব কথা। ভাগবত অমৃতকথা উৎসারিত হচ্ছে ভগবানের শ্রীমুখ থেকে। তুষারধবল পর্বতনিঃসৃত ঝরনার ধারা যেমন স্বতঃই ঝর ঝর করে উৎসারিত হয়, তেমনি গৌরহরির শ্রীকণ্ঠ থেকে কৃষ্ণকথা, কৃষ্ণ গুণগান, কৃষ্ণতত্ত্ব, ভক্তিতত্ত্ব, ভক্তলক্ষণ আরও কত কি স্বতঃই উচ্চারিত হয়ে চলেছে। “আশ্চর্যোবক্তা কুশলােহস্য লন্ধা।”
তত্ত্ব কথা শেষ করে প্রভু সনাতনকে আরও বলতে লাগলেন– “সনাতন ! এরপর থেকে কন্থাকরঙ্গধারী ( কৃষ্ণপ্রেমে ) কাঙাল বৈষ্ণবেরা দলে দলে গিয়ে ব্রজমণ্ডলে আশ্রয় নেবে। তুমি তাঁদের উপর দৃষ্টি রেখাে, রক্ষণাবেক্ষণ করাে।” পরবর্তীকালের ইতিহাস সাক্ষী সনাতন মহাপ্রভুর এই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সনাতন মহাপ্রভুকে করজোড়ে নিবেদন করেছিলেন, “হে গৌরহরি—তুমি জ্ঞানভাণ্ডাররূপ অমৃতসিন্ধু থেকে যে বারি সিঞ্চন করলে তাঁর একবিন্দুও ধারণ করার সাধ্য আমার নেই। তবে তুমি যদি এই পঙ্গুকে চলচ্ছক্তি দিতে চাও তাহলে আমার মাথায় তােমার শ্রীচরণযুগল রাখাে।” প্রভু সনাতনের মাথায় শ্রীকরকমল স্পর্শ করে আশীর্বাদের মুদ্রায় বললেন -“তােমাকে যা শেখালাম, তােমাতে তা স্ফুরিত হােক।” .
পরে বৈষ্ণবস্মৃতি সংকলনের সূত্র ধরিয়ে দিলেন, বললেন–“তােমাকে কিছুই চিন্তা করতে হবে না, জ্ঞান, বুদ্ধি, ভাব সমস্ত কৃষ্ণই তােমাকে জুগিয়ে দেবেন। লিখতে শুরু করলেই দেখবে কৃষ্ণ তােমার চিত্তে সমস্ত কিছু উজ্জ্বল করে তুলবেন।”
সনাতন বৃন্দাবনের পথে যাত্রা শুরু করল। চৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটকে (৯।১০।৫) রয়েছে– “কালেন বৃন্দাবনকেলিবাৰ্ত্তা, / লুপ্তেতি তাং খ্যাপয়িতং বিশিষ্য। / কৃপামৃতেনাভিষিষে চ দেবস্তত্রৈব রূপঞ্চ সনাতনঞ্চ।৷” –কালক্রমে বৃন্দাবনের লীলারসের কথা লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই উহা পুনঃপ্রচারের জন্য শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু শ্রীরূপ ও শ্রীসনাতন গােস্বামীকে করুণামৃত দ্বারা অভিষিক্ত করলেন।
বৃন্দাবনের বনে বনে সনাতন কৃষ্ণকৃপান্বেষণে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এক এক দিন, এক এক বৃক্ষতলে এবং রাত্রে অন্য স্থানে যাপন করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে ‘মথুরামাহাত্ম্য’ গ্রন্থ সংগ্রহ করে মথুরাখণ্ডের লুপ্ততীর্থসমূহ এক এক করে উদ্ধার করে তিনি বৈষ্ণবদের সেই স্থানগুলি চিহ্নিত করার নির্দেশ দিলেন। ব্রজমণ্ডলের বনে বনে ঘুরে বেড়ান সনাতন, আর কোন কোন স্থানে পা দিতেই পুলক, কম্পনাদি অষ্টসাত্ত্বিক ভাবসমূহের লক্ষণ ফুটে ওঠে তাঁর শরীরে। কোন কোন স্থানে দিব্যদৃষ্টিও লাভ হয়। তিনি না তাকিয়েই দেখতে পান তাঁর ইষ্টের বিভিন্ন লীলাখেলা। রাখালবালকগণের সাথে বাঁশিচূড়াধারী রাখালরাজের অপুর্ব কিশাের দেহসৌষ্ঠব। আর সখিগণের মাঝে রূপলাবণ্যে আলাে-করা রাইকিশােরী, শুধু তাই নয় তাঁদের খেলা, তাঁদের লীলা, তাঁদের জলকেলি–সব মানসদৃষ্টিতে দেখতে পেতেন সনাতন। কৃপাময়ের কি অলৌকিক কৃপা ! আনন্দাশ্রু দু’চোখ ভরে, গণ্ড বেয়ে টপ্ টপ্ করে পড়ত বস্ত্রাঞ্চলে—বস্ত্র ভিজে যেতাে। এইভাবে কোনটি নিধুবন, কোনটি কুঞ্জবন, কোনটি ভাণ্ডীর বন, কোনটি শ্যামকুণ্ড আর কোনটি রাধাকুণ্ড সবই আবিষ্কার হতে লাগল। মহাপ্রভু স্বয়ং সেইসকল স্থান আগেই নির্দিষ্ট করেছিলেন, সনাতন সেগুলিকে নিশ্চয় করলেন। কিন্তু যাঁর জন্য এই নিশ্চয়তা তাঁর কথা মনে পড়লে যে প্রাণ-মন আকুল হয়ে ওঠে আর বৃন্দাবনলীলাও ভালাে লাগে না। নদীয়া-বিহারীর জন্য ব্যাকুল হিয়া, তাই বৃন্দাবনে আর মন টিকল না, সনাতন ছুটে চললেন যমুনাপুলিন ছেড়ে দিগন্তবিস্তারী নীলাচলের উদ্দেশে। এবার ঝারিখণ্ড হয়ে যাত্রা, অর্ধাশনে, অনশনে কখনাে শুধু জল পান করে প্রিয়মিলনের আশায় ছুটে চলা ! ঝারিখণ্ডের জল-দোষে গায়ে চুলকানি দেখা দিল—সে বিশ্রী চুলকানি। গােটা গায়ে দাগড়া দাগড়া কুষ্ঠসদৃশ ঘা। ভক্তপ্রবর মনে মনে ভাবলেন, “এই অশুচি শরীর নিয়ে কি করে প্রভুর কাছে মুখ দেখাবাে ? আমি হয়তাে কৃষ্ণভজনের অযােগ্য, তাই আমার সারাশরীরে এই কুৎসিত ব্যাধি দেখা দিয়েছে। প্রভুর সামনে এমনকি কোন দেব-মন্দিরে প্রবেশ করার অধিকারও আমার নাই।” তাহলে উপায়? হ্যাঁ, উপায় আছে—পুরীধামে গিয়ে পূণ্য রথযাত্রার দিন প্রভুর দিকে চাইতে চাইতে রথচক্রে পিষ্ট হয়ে এই নশ্বরদেহ পরিত্যাগ করতে হবে। এই ভাবনায় ভাবিত হয়ে পথ চলতে লাগলেন সনাতন।
নীলাচলে পৌঁছে ভক্তপ্রবর যবন হরিদাসের কুটিরে উঠলেন সনাতন। কিন্তু প্রভুর নাগাল এড়িয়ে যাবার সাধ্য কি ভক্তের, করুণাময় ভগবান গৌরসুন্দর ঠিক পৌঁছে গেছেন হরিদাসের কুটিরে। সবার প্রণাম শেষে অপরাধীর ন্যায় পাশ থেকে একবার প্রভুর পাদস্পর্শ করেই পাশে সরে যাচ্ছিলেন সনাতন। প্রভু দু’বাহু বাড়িয়ে সনাতনকে আলিঙ্গন করার জন্য ব্যাকুল হলেন। সনাতন ত্রস্তপদে পিছু হটলেন—“না-না, আমাকে ছুঁয়াে না ! আমি হীন, অস্পৃশ্য, আমার সারা গায়ে দারুণ ব্যাধি।” প্রভু নিষেধ শুনলেন না। জোর করে সনাতনকে আলিঙ্গন করলেন। সনাতনের কণ্ডুক্লেদ তাঁর গায়ে লাগল। মরমে মরে গেলেন সনাতন—নিতান্ত অপরাধীর ন্যায় মুখমণ্ডল ম্লান করে চুপ করে একপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। প্রভুর মুখে স্মিত উজ্জ্বল হাসি, প্রভু বললেন, “ভক্তের বাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য এই আলিঙ্গন আর সনাতনকে স্পর্শ করে আমি আজ পবিত্র হলাম।”
হরিদাসের কুটিয়ায় রয়ে গেলেন সনাতন। প্রভু বললেন, “তাহলে আর কথা কি ! দুই ভক্ত মিলে একসাথে থাকো, আর কৃষ্ণনামরূপ অমৃতসমুদ্রে সদাসর্বদা অবগাহনপূর্বক স্নান কর।” সনাতন সবই করেন কিন্তু মনঃকষ্ট যায় না কারণ তার দেহ এখনাে ব্যাধিমুক্ত হয়নি। তাই জগন্নাথস্বামীর মন্দিরে না গিয়ে তিনি দূর থেকে চূড়ার চক্র দেখে প্রণাম সারেন, ভক্ত গােবিন্দ প্রসাদ নিয়ে আসে, সেই প্রসাদ চোখের জলে গ্রহণ করেন। প্রভু নীলাচলে আর ভক্তপ্রবর সনাতনও নীলাচলে— কত নিকটে প্রভু, তাও সন্দর্শনে যাওয়া হয় না। গায়ের ব্যাধি তাঁকে মনে মনে নিদারুণ অস্পৃশ্য করে তুলেছে, দুয়ারে দাঁড়িয়ে দূরের পানে চেয়ে চেয়ে দিন কেটে যায়–আবার কবে হরিদাসের কুটিরে প্রভুর সহসা আগমন ঘটবে, গৌরহরিকে দেখে নয়ন সার্থক হবে ! আবার ভয় হয় প্রভু যদি তাঁকে পুনরায় আলিঙ্গন করে বসেন, শরীরের কণ্ডুক্লেদ যদি আবার সেই ভাগবতী তনুতে লেগে যায়—শিহরে ওঠেন সনাতন। চোখ বন্ধ করে আকুল হয়ে প্রার্থনা করেন—“চাইনা প্রভু–চাইনা তোমার কষ্ট। আমার যত কষ্টই হােক, এই বেশ আছি।” আবার মনে কখনাে দেহত্যাগের বাসনাও উঁকি মারে। রথচক্রে পিষ্ট হলেই তাে শরীরের সদগতি–তাহলে আর ভাবনা কি ! কিন্তু ভাবনার ভগবান গৌরহরি আবার হঠাৎই এলেন হরিদাসের কুটিয়ায়। সরাসরি প্রশ্ন—সনাতনকে, “অকালে দেহত্যাগ করলে কি কৃষ্ণলাভ হবে ? কৃষ্ণলাভ হয় সাধনে আর ভজনে। দেহত্যাগ করলে যদি কৃষ্ণ পাওয়া যেতাে তাহলে মানুষের আর কি চিন্তা থাকতাে, কোটি কোটি মানুষ আত্মহত্যা করতাে আর মুক্তিলাভ করতাে। তাই বলছি—শােন সনাতন ! কৃষ্ণপ্রাপ্তিই মনুষ্যজীবনের চরম পুরুষার্থ। আর কৃষ্ণপ্রাপ্তির একমাত্র উপায় ভক্তিলাভ।” সনাতন অবাক হয়ে প্রভুর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, অন্তর্যামী প্রভু মনের গূঢ় বাসনাটি পর্যন্ত জেনে ফেলেছেন! কি লজ্জা! লজ্জায় দু’হাতে মুখ ঢাকলেন সনাতন। প্রভু বলে চলেছেন, “নিজেকে নীচ, অস্পৃশ্য ভাবছ, কে বললে তুমি নীচ-অস্পৃশ্য ? যবনের সাথে দীর্ঘদিন সংস্রবে ছিলে বলেই কি নিজেকে ঐসব ভাবছ ? কিন্তু জেনাে ভক্তের কোন জাত নেই। যেজন কৃষ্ণভজনা করে সেই উচ্চ, সেই বৃহৎ, সেই মহৎ। ‘চণ্ডালােহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠ হরিভক্তিপরায়ণাঃ।’ ভক্তিতে সবাই সমজাতি, আর যদি সত্যি দৈন্যতা আশ্রয় করতে চাও তাহলে অভিমানশূন্য হও। অভিমানহীন দৈন্যতাই কৃষ্ণকে কাছে নিয়ে আসবে। দীনতার অভিমানও অভিমান, এটিও ত্যাগ করতে হবে, নির্বাসনা হতে হবে—তাহলেই দেখবে কৃষ্ণ কত দয়াময়, কত করুণাময়।”
কথা বলতে বলতে মহাপ্রভু ভাবস্থ হয়ে গেলেন, ভাবের ঘােরে অস্ফুটস্বরে বলে চলেছেন— ” সনাতন ; তুমি তাে নিজেকে আমাতে আত্মসমর্পণ করেছ, তখন আর ঐ দেহ তাে তােমার অধিকারে নেই, যা পরের দ্রব্য তা নষ্ট করার কি আধিকার তােমার আছে ? এই শরীরকে এখনাে আমার অনেক প্রয়ােজন–ওটাকে যত্ন করাে, ওটাকে রক্ষা করাে।” মহাপ্রভুর ভাবগম্ভীর প্রত্যাদেশ শুনতে শুনতে মহাপ্রভুর চরণ ধরে সনাতন মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে গেলেন। জ্ঞান ফিরলে তাঁর সব মনে পড়ে গেল——শরীর ত্যাগের সঙ্কল্প মাথা থেকে তো গেলই—শরীরকে যত্ন করতে লাগলেন সনাতন! হরিদাসের সঙ্গেই থাকতে লাগলেন তিনি হরিদাস-কুটিরে সিদ্ধবকুলের নীচে। সিদ্ধবকুল থেকে প্রভু যেখানে থাকেন সেখানে যাবার দুটো রাস্তা। একটা মন্দিরের সিংহদ্বারের পাশ দিয়ে শহরের রাজপথ হয়ে, আর অন্যটা সমুদ্রতীর ধরে। প্রথম পথটি সহজগম্য —দ্বিতীয় পথটি কষ্টসাধ্য। দ্বিতীয় পথটি বালুকাপূর্ণ, ছায়াহীন কিন্তু নির্জন, ওপথে মাছ-ধরা মেছুয়ারা ভিন্ন শহরবাসী খুব একটা যাতায়াত করে না। জ্যৈষ্ঠের মধ্যাহ্ন—তপ্ত বালুকাবেলা, তবু দ্বিতীয় পথকেই নির্বাচন করলেন সনাতন। উত্তপ্ত বালুতে পা পুড়ে যাচ্ছে— তাতে সনাতনের কোন খেয়াল নেই। ফোস্কা পড়ছে। —তা পড়ুক ! তাতে কিছুই এসে যায় না—প্রাণে যে আনন্দের হিল্লোল চলছে, তাঁর কাছে এসব তুচ্ছ ! শুধু তুচ্ছই নয়—তুচ্ছাতিতুচ্ছ ! কিসের এই আনন্দের জোয়ার ! প্রভু ডেকেছেন তাকে ! গােবিন্দ এসে বলে গেছে—“প্রভু ডেকেছেন !” প্রভু ডেকেছেন— এই আনন্দে বিভাের সনাতনের কাছে তপ্ত বালুকা যেন সুশীতল মৃত্তিকা। ভগবৎ প্রীতিই তাঁর কাছে সুখস্পর্শ।