“ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্।” –(চৈঃ চরিঃ)
–সচ্চিদানন্দ শ্রীকৃষ্ণই পরমেশ্বর। তিনি সকলের আদি ; কিন্তু তাঁর আদি কেউ নেই, তিনি গােবিন্দ এবং সর্ব কারণের কারণ।
এ হেন কৃষ্ণ-গুণগান বা হরি-গুণগান করা জীবের সাধ্য নয়। আর ভগবান নিজেই বলেছেন, ‘‘ভক্ত, ভাগবত আর ভগবান এক।” তাই ভক্ত গুনগানও সেই ভগবানেরই মহিমা কীর্তন। তাই ভগবানের ভক্তশ্রেষ্ঠ এই রূপ-সনাতন-শ্রীজীব আদি ছয় গোঁসাই-এর মহিমা কীর্তনের প্রয়াস। সনাতনের কাশীযাত্রা এবং মহাপ্রভুর সাথে সাক্ষাতের কথা আমরা আগে আলোচনা করেছি। কাশীর গঙ্গাতীরে দশাশ্বমেধ ঘাটে সনাতনকে দু’মাস ধরে বিভিন্ন বিষয়ে মহাপ্রভু উপদেশ করলেন। ঘুরে-ফিরে আলােচনার বিষয়বস্তু সেই একটাই—কি করে কৃষ্ণপ্রেমধন লাভ করা যায়।
আহা, সে কি মনােরম দৃশ্য ! স্বয়ং ভগবান গৌরহরি নিজমুখে নিজকথা (কৃষ্ণকথা) বলে চলেছেন। আর পদপ্রান্তে বসে কৃতাঞ্জলিপুটে সনাতন সেই অমৃতকথা শুনছেন, আর হাপুসনয়নে কাঁদছেন। তাঁর নয়নবারি কাশীর দশাশ্বমেধঘাটের গঙ্গাবারিতে মিশে তাঁকে যেন আরও পূতঃসলিলা করছে। প্রভু বােঝাচ্ছেন সাধন বিধি পাঁচটি–সাধুসঙ্গ, নামকীর্তন, ভাগবত-শ্রবণ, মথুরাবাস আর বিগ্ৰহসেবা। কৃষ্ণপ্রাপ্তির উপায় বােঝাতে প্রভু বললেন—পরীক্ষিৎ কৃষ্ণলাভ করেছিলেন শ্রবণে, শুকদেব কীর্তনে, প্রহ্লাদ স্মরণে, লক্ষ্মী পদসেবনে, পৃথু পূজনে, অক্রূর বচনে, হনুমান দাস্যে, অর্জুন সখ্যে, আর বলি আত্মনিবেদনে।
গৌরহরির মুখনিঃসৃত অমৃতনিঝরিণী ঝরতে থাকল ঝরঝর করে—আনন্দে আপ্লুত শ্রোতা সনাতন। ভগবান বােঝালেন—কৃষ্ণতত্ত্ব–অবতারতত্ত্ব। কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান, “কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং”। এক কৃষ্ণ থেকে অসংখ্য অবতারের প্রকাশ। এই সংখ্যা গুণে শেষ করা যায় না। পল্লবিত শাখার মধ্য দিয়ে দেখা টুকরাে টুকরাে অসংখ্য চাঁদের মতাে। সনাতন প্রভুকে জিজ্ঞাসা করেন—প্রভু! এটা কলিযুগ। এই কলির অবতার কে, আর কি করেই বা তাঁকে বুঝব ?
প্রভু সহাস্যবদনে উত্তর দিলেন—যিনি অবতার তিনি কি আর নিজ-মুখে নিজের অবতারতত্ত্বের কথা ঘােষণা করবেন! লক্ষণ দেখে অবতারকে চিনতে হয়, ‘ইনিই অবতার কিনা’ সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসতে হয়। যিনি স্বরূপে অবতীর্ণ আর প্রকটে কীর্তন-প্রবর্তক ও প্রেমদাতা, তিনিই কলির অবতার।
সনাতন গঙ্গাতীরে সেই দিনই যা বুঝেছিলেন, কৃষ্ণদাস কবিরাজ পরবর্তীকালে তাই লিখেছিলেন।
স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণ, কৃষ্ণ পরতত্ত্ব
পূর্ণজ্ঞান পূৰ্ণানন্দ পরম মহত্ত্ব।
নন্দসূত বলি যাঁরে ভাগবতে গাই
সেই কৃষ্ণ অবতীর্ণ চৈতন্য গোঁসাই।৷
সনাতন প্রায় ধরে ফেলেছেন। বলছেন — ‘প্রভু নিশ্চয় করে বলুন, তিনি কোনজন, তিনি কি কাছেই রয়েছেন, অতি কাছে ?’ প্রভু বলছেন–চাতুরালি ভক্তকে মানায় না সনাতন, সত্যিই ভগবান অতি কাছেই থাকেন। অতিরও অতিকাছে—হৃদয়ে। জানাে না ভক্তহৃদয়ে ভগবানের বাস। তাই ওসব কথা ছেড়ে কৃষ্ণকথা শােনাে। কৃষ্ণ কিশোর, চিরকিশাের। কৈশােরেই কৃষ্ণের নিয়তস্থিতি। তাঁর ঐশ্বর্যের অমৃতসিন্ধুর এক বিন্দুও মন ও বাক্যের গােচর নয়। কৃষ্ণের সমান আর কেউ নেই, ফলে তাঁর থেকে উচ্চতর হওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। অনন্ত ঐশ্বর্যময় শ্রীভগবানের অনন্ত লীলা। তবে তাঁর সমস্ত লীলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ নরলীলা। এই লীলায় নিজের রূপে নিজেই বিভাের থাকেন তিনি, নিজেকে দেখে নিজেই বিস্মিত হন। নিজেকে আস্বাদ করার জন্য নিজেই ইচ্ছুক হন, উৎসুক হন। তাহলে তাঁর এই ভূবনমােহিনীরূপে জগৎ মুগ্ধ হবে না কেন ! পতিব্রতা রমণীরাও তাঁর রূপে মজে জাত-কুল হারাতে কসুর করেন না। বৈকুণ্ঠের লক্ষ্মীও কৃষ্ণের রূপে মুগ্ধ, তাতে আসক্ত। আর কৃষ্ণ আকৃষ্ট, গােপীদের কামগন্ধহীন নির্মল প্রেমে। আর এই কামবর্জিতা প্রেমিকা গােপিনীদের সঙ্গেই হয় কৃষ্ণের রাসলীলা। এখানে পুরুষ-প্রবেশ নিষেধ। এই লীলায় কন্দর্পের মনও মথিত। যে সকলের মােহ উৎপাদন করে এখানে সেও মােহিত। তাই রাসলীলায় কৃষ্ণ মদনমােহন।
প্রভু সনাতনকে বললেন–তোমার প্রতি প্রভুর অশেষ কৃপা। আমাকে মাধ্যম করে, আমাকে যন্ত্র করে প্রভু আমার মুখ দিয়ে তাঁর ঐশ্বর্য-মাধুরী তােমাকে শােনালেন। কৃষ্ণকথা বলতে শুরু করলে আমার বাহ্যিক হুঁশজ্ঞান থাকে না, সময়ের বােধ থাকে না, তখন কি বলতে কি বলি আমার মনেও থাকে না। শুধু কৃষ্ণমাধুরীর স্রোতে ভেসে যেতে ভালো লাগে, তাই ভেসে যাই। আবার যখন সম্বিৎ ফেরে তখন বাহ্যজগতে ফিরে আসি।
সনাতন কাঁদতে লাগলেন, মহাপ্রভুর চরণদুটি বক্ষে ধরে আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন-তোমার এত কৃপা ঠাকুর–তােমার এত কৃপা ! আমি অযোগ্য জেনেও তুমি আমাকে তােমার শ্রীমুখে ভগবৎ শােনার যােগ্য করে গড়ে নিলে –এতেই তো প্রমাণ হ’ল তুমি করুণাময়, কৃপাময়, দয়াময়। প্রভু বললেন–ওঠো সনাতন ! যা কিছু হয় ভগবৎ ইচ্ছাতেই হয়। তােমার অনেক কাজ রয়েছে —তাই তােমার অনেক কিছু জানা দরকার, আর তাই এই ব্যবস্থা। নিজেকে মারতে হলে ক্ষুদ্র অস্ত্র হলেই হয় কিন্তু যুদ্ধ করতে হলে, বহুলােক মারতে ঢাল-তরােয়াল আদি অস্ত্রের প্রয়ােজন হয়। এবার আবার ভগবৎ কথা শোন – ভক্তি অর্থে ভজনা করা, এক অর্থে সেবা। ভগবৎ-ভজনাই সেবা। এ সেবা নিজের সুখের জন্য নয়, কৃষ্ণের সুখের জন্য। একমাত্র কৃষ্ণ প্রীত হলেই জগৎ প্রীত হয়, ‘তস্মিন্ তুষ্টে জগৎ তুষ্ট’। এখানে একটি কথা রয়েছে—সাধারণ মানব কৃষ্ণকে অন্তর্জগতে খুঁজে পায় না, কারণ সাধনার জোর নেই, বাইরে কোথায় তাও জানে না ; তাহলে তাদের কৃষ্ণসেবা কি করে হবে ? তাদের জন্য বিধান সাধুসেবা বা ভক্তসেবার মাধ্যমে কৃষ্ণসেবা করতে হয়। প্রকৃত ভক্ত, প্রকৃত সাধুজন কৃষ্ণের প্রিয়, ভগবানের প্রিয়। তাই কোন গৃহে নবজাতক শিশু যেমন সবার প্রিয়, আর সেই শিশুকে আদর যত্ন করলে, ভালােবাসলে যেমন গৃহস্থ প্রীত হন, তেমনি ভগবানের ভক্তগণ– যাঁরা তাঁর খুবই প্রিয়, তাঁদের সেবায় ভগবান প্রীত হ’ন। এখানে আবার জিজ্ঞাসা রয়ে যায় প্রকৃত ভক্ত, প্রকৃত সাধু কিভাবে চিনবে ? যাঁর সান্নিধ্যে এলে ঈশ্বরীয় ভাবের উদ্দীপন হয়, দানব ভাব, পাশব ভাবের অবসান ঘটে—তিনিই সাধুজন, তিনিই মহাজন। ওস্তাদ গুণীনের মন্ত্রশক্তিতে বা গাছ-গাছড়া ওধুষের শক্তিতে উন্মত্ত ফণা বিষধর সর্প যেমন নতশির, নম্রশির হয়ে থাকে, তেমনি প্রকৃত সাধু-বৈষ্ণব-ভক্তের নিকটে কাম-ক্রোধাদি রিপুগণ নত এমনকি প্রণত হয়ে থাকে। এইরূপ সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের সেবাও ভগবৎসেবা বলেই গণ্য হয়। কথাতেই আছে–“মহতের কৃপা হলেই ভগবৎ কৃপা হয়”, “সাধুর চরণধূলি, ভক্ত পদরজ না পেলে কৃষ্ণচরণে মতি হয় না” – এইসব কথাগুলি মহাজন বাক্য—এগুলি মিথ্যা নয়।
মানুষ শরীরধারণ করলেই জীব প্রকৃত মানব হয়ে ওঠে না। মানবের মধ্যেই ইতরমানব, দেবমানব আবার দানব রয়েছে। মানুষের মধ্যে সদগুণ যেমন— শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালােবাসা, ভক্তি ইত্যাদি, তেমনি বদগুণ হিংসা, স্বার্থপরতা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, লােভ, মদগর্বিতা ইত্যাদি। সদগুণসম্পন্ন মানুষ ধীরে ধীরে সাধারণ মানব থেকে দেবমানবে রূপান্তরিত হয়, আর বদগুণসম্পন্ন মানুষ ধীরে ধীরে দানবে রূপান্তরিত হয়। তাই মানুষের প্রকৃতপক্ষে মানব হয়ে ওঠার প্রাথমিক শর্ত শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস। কোন মানুষের যদি সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের প্রতি সর্বোপরি ভগবান কৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মে এবং শাস্ত্রবাক্যে বিশ্বাস জন্মে, তাহলেই তাঁর উন্নতি শুরু হয়। তখন দ্রুত তাঁর অপগুণ বা বদগুণ অপসৃত হয়, তার কুসঙ্গ, কুবাক্য ইত্যাদি ভালাে লাগে না। তার তখন সৎ-গ্রন্থ ও সৎসঙ্গ বা সাধুসঙ্গে মতি জন্মায়। সাধুসঙ্গ থেকে কেউ কেউ শ্রবণ-কীর্তনাদির অনুষ্ঠান করতে চায় আবার কেউ কেউ অন্তর্জগতে লীন হতে শুরু করে। এইভাবে ভক্তির প্রাবল্যে বা সাধনশক্তির দ্বারা জীবের অনর্থ বা অনিষ্ট দূর হতে থাকে। আর যত অনিষ্ট দূর হবে—ততই ইষ্টলাভ ত্বরান্বিত হতে থাকে। কারণ অনর্থ দূর হলেই নিষ্ঠা আসে, নিষ্ঠা থেকে আসে নামে এবং কৃষ্ণপদে রুচি, রুচি থেকে আসে কৃষ্ণপদ লাভের আসক্তি, আসক্তি থেকে আসে কৃষ্ণপ্রীতি, আর এই প্রীতি বা রতি ঘনীভূত হলেই ভক্ত-হৃদয়ে প্রেমের উদ্ভব হয়। –এতদূর কথা বলতে বলতে পরম প্রেমাবেশে গৌরহরি সনাতনকে স্পর্শ করে তাঁর মধ্যে শক্তি সঞ্চারিত করতে লাগলেন, কৃত-কৃতার্থ, আপ্লুত ভক্তপ্রবর সনাতনের দেহ বেতসপত্রের ন্যায় থরথর করে কাঁপতে থাকল—দু’চোখে গড়াতে লাগল প্রেম। সনাতন পরিণত হলেন মানব থেকে দেবমানবে, যে দেবমানবকে আমরা এবার দেখব বৃন্দাবনে–সিংহের মত বীরবিক্রমে এ অরণ্য থেকে অন্য অরণ্যে লুপ্ততীর্থ উদ্ধার করে বেড়াচ্ছেন, আর তাঁর কণ্ঠে সদা-সর্বদা হরিগুণকীর্তনের সুরে শুধু মানুষ কেন, বনের পশু-পাখীরাও হিংসা ভুলে, ভয় ভুলে তাঁর চতুর্দিকে নৃত্য করছে। গৌরহরি সনাতনকে নির্দেশ দিলেন–
“তুমি করিহ ভক্তিরসের প্রচার,
মথুরায় লুপ্ততীর্থের করিহ উদ্ধার।
বৃন্দাবনে কৃষ্ণসেবা বৈষ্ণব আচার,
ভক্তিস্মৃতি শাস্ত্র করি করহ প্রচার।৷”
