গুরু মহারাজের সাথে দেখা করার জন্য সূক্ষ্ম শরীরে বা কারণ শরীরে যে সব মহাপুরুষ অাসতেন – তাদের সবার সাথেই ন’কাকারও যোগাযোগ হোত । গুরু মহারাজ সিটিং-এ পুরোনো কথা (আশ্রমের প্রথম দিকের কথা) অনেক সময় আলোচনা করতেন । একদিন বলছিলেন তিনজন উন্নত যোগী আলোকময় (জ্যোতিঃশরীর) শরীর নিয়ে ওনার কুটিয়ায় (সর্বপ্রথম কুঠিয়া) প্রকট হয়েছিলেন । তারপর ওনার সাথে কিছু কথাবার্ত্তা বলে তাঁরা চলেও যান ৷ পৃথিবীগ্রহের ভালোমন্দ নিয়ে এক আলোচনা সভায় ওনারা যোগ দিতে গিয়েছিলেন (হিমালয়ের কোন অঞ্চলে), যেখানে পৃথিবীগ্রহ ছাড়াও অন্যান্য গ্রহের মহাত্মারাও উপস্থিত ছিলেন ৷ তখন আশ্রমের ব্রহ্মচারী ছেলেরা অর্থাৎ তৃষাণদা সহ সবাই তখন গুরু মহারাজের কুঠিয়ার পাশেই একটা চালাঘরে মিলেমিশে একসাথে থাকতো ! গুরু মহারাজ ওদেরকে ডাকার কথা বললে – ওই মহাত্মারা রাজী হন নি ! ওরা চলে যাবার পর গুরু মহারাজ যখন ছেলেদের ডাকেন – তখন তৃষাণ মহারাজরা দেখেন যে তিনটে ছোট ছোট আলোকবিন্দু যেন আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে !
এই ঘটনাটা আমি ন’কাকাকে জিজ্ঞাসা করায় উনি বলেছিলেন – ” বহু পূর্ব হতেই বনগ্রামের উপর দিয়ে বিভিন্ন মহাত্মারা যাতায়াত করত – আমি প্রায়ই সন্ধ্যার দিকে এবং ভোরের দিকে ‘সোঁ’ ‘সোঁ’ করে ঝড়ের মতো একটা আওয়াজ পেতাম এবং জানতাম বিভিন্ন মহাপুরুষগণ আকাশমার্গ অবলম্বন করে এই পথে যাতায়াত করে ৷ সেইদিন ওই মহাত্মারা গুরু মহারাজকে ওদের সম্মেলনের Report দিয়ে গেলেন ৷” ন’কাকা এই কথাগুলি এমনভাবে বললেন – যাতে করে আমি ভালোভাবে বুঝতে পারলাম যে ন’কাকাও গুরু মহারাজের সাথেই এইসব মহাত্মার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন ।
গুরু মহারাজের কাছে শুনেছিলাম বাবাজী মহারাজের কথা , যিনি যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের গুরু এবং যিনি প্রায় ৫০০০ বছর বা তারও অধিক সময় ধরে শরীর রক্ষা করে যোগী – মুনি – ঋষিদের রক্ষা করে চলেছেন এবং যোগ-পরম্পরাকে রক্ষা করে চলেছেন ৷ হিমালয় পরিভ্রমন কালে ওনার সাথে গুরুমহারাজের এক গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখা হয়েছিল _পরে communication – ও হয়েছিল ।
আমি একদিন ন’কাকাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম বাবাজী মহারাজের কথা – “আচ্ছা, ন’কাকা ! গুরু মহারাজের কাছে শুনেছি , বিভিন্ন পুস্তকেও লেখা আছে যে, বাবাজী মহারাজ এখনও শরীরে রয়েছেন – তাঁর সাথে গুরু মহারাজের দেখা হয়েছে ৷ তাহলে আপনার সাথেও কি দেখা হয়েছে ?” ন’কাকার Instantaneous উত্তর – ” হ্যাঁ বাবা ! ওই রাত্রি ২টো ২-৩০টার মধ্যে একটু মনঃসংযোগ করলেই বাবাজী মহারাজের সাথে যোগাযোগ করা যায় !” এই উত্তর শুনে সেদিন আমার মনে হয়েছিল ন’কাকার সাথে বাবাজী মহারাজের বারেবারেই দেখা হয় – যোগাযোগও হয় ! পরে অবশ্য এই কথার উত্তরও পেয়েছিলাম ! উনি নিজেই একদিন বললেন – ” গভীর রাতে একবার মন্দিরের কাছে এসেছি, দেখলাম আশ্রম যাবার পথে যে অশ্বত্থ গাছটা রয়েছে (সম্ভবত এখন যেটা গ্রামের ছেলেদের খেলার মাঠ – তার উল্টোদিকের অশ্বত্থ গাছটা, আবার শোনার ভুলে আশ্রমের বটগাছও হোতে পারে।)– ওটা আলোয় ঝকঝক করছে । একটু আগিয়ে গিয়ে দেখলাম কয়েকজন মহাপুরুষ ওখানে নেমেছেন –ওঁরা বাবাঠাকুরের(গুরুমহারাজ) সাথে দেখা করতে গেলেন । ওদের মধ্যে বাবাজী মহারাজকেও দেখলাম ।”
বনগ্রাম আশ্রমে ২৫শে ডিসেম্বরের অনুষ্ঠান যে ঘটনার জন্য বন্ধ হয়ে গেল – সেই তুমুল ঝড়-বৃষ্টির উল্লেখ আগে আগে করা হয়েছে ! তারপর ভক্তদের চরম কষ্টভোগে কাতর আশ্রমের মহারাজরা গুরু মহারাজকে নানা Angle থেকে Complain করায় গুরুজী মনে মনে একটু কষ্ট পেয়েছিলেন ৷ এরফলে সেই রাত্রেই ৫ জন মহাপুরুষ গুরু মহারাজের ঘরে এসে অনেকক্ষণ ছিলেন এবং গুরু মহারাজকে নানারকম কথা তাঁরা বলেছিলেন ! তার মধ্যে একটা কথা ওনারা গুরু মহারাজকে বলেছিলেন – ” পরমানন্দ ! তুমি মনে কোন ক্ষোভ বা বিক্ষোভ রেখো না ! কারণ, তোমার মনে যদি সামান্যতম ক্ষোভ জন্মে তাহলে তারফলে পৃথিবীগ্রহের মারাত্মক ক্ষতিসাধন হতে পারে ৷” এইসব নানাভাবের কথা ওনারা গুরু মহারাজের সাথে আলোচনা করেছিলেন ৷৷ গুরু মহারাজ এনাদের সবার নাম বলেন নি – শুধু বলেছিলেন , ” এনারা সবাই ছিলেন আমার গুরুস্থানীয়।”
গুরুমহারাজের কাছে কথাগুলো শোনার পর আমি ন’কাকাকে এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলাম _” আচ্ছা ন’ কাকা! গত ২৫-ডিসেম্বরের রাতে গুরুমহারাজের ঘরে যে পাঁচজন মহাত্মা এসেছিলেন ওনারা কারা? আর ওনাদের সাথে আপনারও যোগাযোগ হয়েছিল তো?”উনি শিশুর মতো হেসে সহজভাবে আমাকে বলেছিলেন _” তা আবার হবে না! আমাকে এড়িয়ে যেতে পারে!”
আমি বললাম _” ন’কাকা! তাহলে ঐ পাঁচজন কে কে ছিলেন?”উনি পরপর নামগুলি বলে দিলেন_” রামানন্দ অবধূত, স্বামী বাউলানন্দ, সিড়ডি সাইবাবা, হরিহরানন্দ গিরি এবং বাবাজী মহারাজ।” সেদিনও আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম যে হরি – হর অভেদ তত্ত্ব! গুরুমহারাজ হরির অবতার _তাই তাঁর মধ্যে ষড়ৈশ্বর্যের(শ্রী, যশ, বল, ঐশ্বর্য, মাধূর্য ইত্যাদি ) পরিপূর্ণ প্রকাশ ছিল। আর শ্মশানচারী হরে-র সিদ্ধি, ঐশ্বর্য সবই আছে _কিন্তু প্রকাশ নাই। ন’কাকার বাড়িতে ন’কাকীমার সাথে ওনার কথোপকথনের সময় অনেকবার বলতে শুনেছি _”আমার তো শিবের সংসার! প্রাচূর্য নাই_কিন্ত কোন কিছুর অভাবও নাই।”
গুরুমহারাজ যেমন বলেছিলেন _” ন’কাকা বনগাঁয়ের (বনগ্রামের) বুড়োশিব”— আমার দূর্ভাগ্য যে তেমন করে হয়তো ওনাকে ভক্তি করতে পারিনি! তবে উনি পুত্রবৎ স্নেহ করতেন _এটাই এ জীবনের পরম প্রাপ্তি! আবার মাঝে মাঝে বন্ধুর মতো হাল্কা কথাবার্তাও হোত! ঐ সব আলোচনার সময় এতো হাসাহাসি করতেন, এতো মজা করতেন_যে আমার এক এক সময় খুব অবাক লাগতো, আনন্দও লাগতো।
গুরুমহারাজের জন্য, ন’কাকার জন্য _আমরা কি ই বা করতে পারি!! ওনারাই তো যা করার তা করেন। আমাদের কৃপা বা করুনা করার জন্যই তো ওনাদের শরীর ধারণ!
আমরা শুধু স্মরণ-মনন করতে পারি_তাঁদের জন্য চোখের জল ফেলতে পারি! ন’কাকা প্রায়ই বলতেন _”সখী! সে হরি কেমন বল্
নাম শুনে যার এত প্রেম জাগে
চোখে আসে এতো জল।”
[জয় গূরূজী! জয় ন’কাকা!] (ক্রমশঃ)