গুরু মহারাজ (স্বামী পরমানন্দ)-এর সিটিং-এর কথা বলা হচ্ছিল । প্রসঙ্গ ‘সাপ’ – কিন্তু একথা বলতে বলতেই অন্য কথায় চলে যাওয়া হচ্ছে । আসলে ওনার কথা বলতে শুরু করলে – এত কথা মনে এসে ভিড় করে, কলমের ডগায় এসে হাজির হয় যে – কি লিখতে কি লিখি – নিজেই বুঝে উঠতে পারি না ! “কত কথা পুষ্পপ্রায় – বিকশি উঠিতে চায়”- ! পাঠকরা নিশ্চই এই অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি মার্জনা করবেন ।
গুরুমহারাজের ছোটবেলায় ঐ সঙ্গীর (বন্ধুর) মৃত্যুতে ব্যথিত বালক রবীনের কাছে সর্পের দেবী (মনসা) প্রকট হয়েছিলেন ৷ উনি বালক রবীনের কাছে সেইসময় সর্প জগতের বিডিন্ন রহস্য উদ্-ঘাটন করে দেন ! তাছাড়া উনি রবীনকে আরও বলেন, — যে ছেলেটির সর্পাঘাতে মৃত্যু হয়েছিল , তার মৃত্যু অবধারিতই ছিল ! যে কোন প্রকারে সেটি সংঘটিত হোতই ! আর এ ক্ষেত্রে ঐ ছেলেটি (বালক রবীনের বন্ধু)-র ই দোষ ছিল । ও অহেতুক সাপটিকে কষ্ট দিচ্ছিল – তাই আত্মরক্ষার জন্য সাপটি Reaction করেছিল ।
গুরু মহারাজ উল্লেখ করেছিলেন – ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা ! বালক শ্রীকৃষ্ণ গোচারণে গিয়ে যখন দেখল কালীয় হ্রদে ‘কালীয় নাগ’ নামের এক ভয়ঙ্কর বিষধর সাপ তাঁর বন্ধুদের আর বেশ কিছু গরুকে বিষক্রিয়ায় জর্জরিত করে ফেলেছে – তখন উনি নিজের মধ্যে ভগবৎসত্ত্বার প্রকাশ ঘটিয়ে ঐ ভয়ঙ্কর সাপকে বশীভূত করলেন । তারপর ভগবান কালীয়কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – ” তুমি কালীয় হ্রদের জলে এত বিষ ঢেলেছ যে এর জলে বিষক্রিয়া হয়ে গেছে – আর এই জল পান করে আমার বন্ধুরা এবং গাভীগণ মৃতপ্রায় ! তুমি এ কাজ কেন করলে ?” তখন কালীয় নাগ উত্তর দিয়েছিল – “প্রভু ! তুমি তো আমাকে ঢালার জন্য সুধা দাওনি – আমাকে তো তুমি বিষ-ই দিয়েছ – তাই আমি তাই ঢেলেছি ! তুমি যদি আমাকে বিষের বদলে সুধা বা অন্য কিছু দিতে – তাহলে আমিও সকলকে তা দিতে পারতাম !”
এগুলি ভক্তিজগতের কথা! গুরু মহারাজ বলেছিলেন “জ্ঞানী না হলে ‘ভক্ত’ হওয়া যায় না ! যার জ্ঞান হয়েছে, যে এই জগৎসংসারের সবকিছুই তিনিময় _ সব কিছুই তাঁর (ঈশ্বরের)_এই জ্ঞান করেন, তিনিই জ্ঞানী । এই ভাব না এলে ‘শরণাগতি’ আসে না — তাই জ্ঞানীরাই ভক্ত হতে পারে৷” বাকী যাদের কথায় কথায় চোখে জল আসে , ভাবে গদগদ হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে , নেচে-কুঁদে আকুল হয় – এগুলোকে গুরু মহারাজ বলেছিলেন ‘বিকার’! কামবিকার, ভাববিকার ইত্যাদি নানা ‘বিকার’ এগুলি ! ঠিক ঠিক ‘ভাব’-এ মানুষ কখনও হুঁশ বা চৈতন্য হারায় না, শরীর স্থির হয়ে যায় ! আর “ভাবে নৃত্য”(যেটা মহাপ্রভুর হোত, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর মধ্যেও এর প্রকাশ ঘটেছিল) যদি হয় – তাহলে তার প্রভাবে সেখানে উপস্থিত সকলেরই কুণ্ডলীনি শক্তির ক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে এবং দেখা যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানকার সকলেই নাচতে শুরু করেছে ! ভাবের ঘোর কাটলে তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে যে তারা কেউ নিজের ইচ্ছায় নাচে নি ! তাদের অন্তর্জগত থেকে এমন প্রেরণা এসেছে যে কখন তারা নিজের অজ্ঞাতেই নাচতে শুরু করেছে ! এটাই “ভাবে নাচা” – আর বাকীদের তো ‘নেচে নেচে ভাব আনা’-র চেষ্টা !
আবার অন্য প্রসঙ্গে চলে যাওয়া হচ্ছে – গুরু মহারাজ বলছিলেন ‘সাপেদের কথা’ ! সেদিন নানা কথা বলতে বলতে আলোচনা করছিলেন সাপেদের প্রকৃতি সম্বন্ধে ! যা বললেন তার সারমর্ম যা বুঝেছিলাম তা বলছি — সাপেরা খুবই শান্ত, নিরীহ, সুন্দর স্বভাবের প্রাণী ৷ ওরা সাধারণত অকারণে কখনই কামড়ায় না ৷ অনেক সময় খাবারকে (ব্যাঙ, ইঁদুর ইত্যাদি) তাড়া করে তাকে ধরতে গিয়ে হয়তো কখনও দৈবাৎ কোন মানুষের গায়ে তার ‘ছোবল’ পড়েছে – অন্যথায় তাকে আঘাত না করলে কখনই সাপ Reaction করে না ৷ কোন শিশুকে সাপে কামড়েছে – এমন ঘটনা নাই বললেই হয় ৷ কারণ ওরা বুঝতে পারে যে শিশুটির দ্বারা তার কোন বিপদের আশঙ্কা নাই । যে কোন পশু বা পাখীই এটা বোঝে ! সাধারণত কোন পশু বা পাখী মানুষের কাছাকাছি হলে – ওরা তার চোখের দিকে তাকায় ! চোখের দিকে দেখে- সে বুঝতে পারে ‘ব্যক্তিটি কেমন! তারপর সে ঐ ব্যক্তির সঙ্গে কেমন আচরণ করবে -তা নির্ধারণ করে নেয় ।তাছাড়া পশুপাখীরা মানুষের গায়ের গন্ধ-তেও প্রভাবিত হয়। শিশুর গা(শরীর )-থেকে নির্গত ফেরোমেন বা গন্ধ শুঁকেই তারা বুঝতে পারে যে -এ ক্ষতিকর নয় । তাই দেখবে -এমন অনেক record রয়েছে -যেখানে পশুপাখীরা হিংস্রতা ভূলে কোন শিশুকে রক্ষা করেছে ।
যাই হোক, সেদিন সিটিং এ উনি সাপে কামড়ানোর ব্যাপারগুলি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। উনি বলেছিলেন -বিষধর সাপ দুধরনেরই হতে পারে -ফনাধর এবং ফনাহীন।সাধারণত বিষধর সাপেদের চোয়ালের দুপাশে দুটো বিষদাঁত থাকে -যেগুলি ইন্জেকশনের ছুঁচের মতো তীক্ষ্ণ ও ফুটোবিশিষ্ঠ এবং যেগুলি বিষথলির সাথে যুক্ত থাকে ।এর ফলে কোন বিষধর সাপ যখনই কাউকে ছুবলে দেয় তখন ঐ দুটি বিষদাঁত শরীরের গভীরে ঢুকে যায় এবং সেখানে রক্তের সাথে মিশে বিক্রিয়া করতে করতে ছুটে চলে হৃৎপিণ্ডের দিকে ।এইভাবেই শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়াশীলতা হারিয়ে প্রানীটি মারা যায় ।
ফনাধর এবং ফনাহীন সাপেদের বিষের প্রকৃতিও আলাদা -তাই শরীরে (বিশেষত মানবশরীরে) এদের কার্যকারীতাও পৃথক পৃথক হয় ।
ফনাধর সাপেদের বিষ, রক্তের কনিকা গুলিকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে,ফলে সময়মতো চিকিৎসা না হলে victim-এর হার্টফেল হয়। অপরপক্ষে চন্দ্রবোড়া জাতীয় ফনাহীন সাপেদের বিষে মানবশরীরের রক্তকনিকা ভেঙে dilute হয়ে যায়।এরফলে kidney ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শরীরের যে কোন অঙ্গ দিয়ে bleeding হতে শুরু করে এবং মারা যায়।
Victim – এর শরীরে ক্ষতস্থান দেখে, কোন সাপে কামড়েছে তা বোঝা যায়। যদি পরপর দুটো পরিস্কার পাশাপাশি ফুটো দেখা যায় –তাহলে সেটি অবশ্যই ফনাযুক্ত বিষধর সাপের কামড়! অনেকগুলো দাগ থাকলে তা সাধারণত বিষহীন সাপের কামড়,তবে বোড়াসাপের(চন্দ্রবোড়া)কামড়েও শরীরে একাধিক দাগ হতে পারে।(ক্রমশঃ )