বিষণ্ণ ব্রাহ্মণ আরও এগিয়ে চলল বনপথ ধরে ৷ অনেকক্ষণ চলার পর দেখল যে একজন কাদায় পড়ে আটকে যাওয়া গাড়ীর চাকা তোলার চেষ্টা করছে – কিন্তু তুলতে পারছে না ৷ বিপন্ন ব্রাহ্মণ তাকেও সমস্ত ঘটনা বলে, জিজ্ঞাসা করল — তার অন্যায় কি ছিল ? ক্লান্তির ঘাম মুছে লোকটি বলল – “বাবা, আমি কর্ণ ! লোকে আমাকে ‘দাতাকর্ণ’ নামে ডাকত । জন্ম থেকে বিধাতা আমার উপর বিরূপ ছিল ৷ কিন্তু নিজ পৌরুষবলে আমি সমাজের উচ্চ অবস্থানে আমার স্থান করে নিয়েছিলাম ৷ সারা জীবন দান-ধ্যান – দেবসেবা – অতিথিসেবা করেছি, শস্ত্রবিদ্যায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেও রথচক্র মেদিনী গ্রাস করায় নিরস্ত্র অবস্থায় আমাকে পরাজিত ও নিহত হতে হয়েছিল । সেই দ্বাপর যুগ থেকে আজও আমি ভেবে চলেছি কি ছিল আমার অন্যায় ? তাছাড়া আর একটা জিনিসও আমি ভেবে আসছি __ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং আমার বিপরীতে থেকে তিনিও কি আমার প্রতি ন্যায় করেছিলেন ? কিন্তু আজ পর্যন্ত সে সব কথার কোন মীমাংসা হ’ল না — তাই তোমাকে আর কি বলব বাবা ?”
ব্রাহ্মণ আবার এগিয়ে যেতে লাগল । কিছুদূর গিয়ে এক খেঁকশিয়ালের সাথে তার দেখা হোল। শিয়ালটি একটা উঁচু ঢিপির উপর উঠে বেশ দীপ্ত ভঙ্গিমায় বসে ছিল ৷ ব্রাহ্মণ তাকে দেখে মনে একটু সাহস পেল – ভাবল শেয়াল তো খুবই চালাক হয়, এ নিশ্চয়ই তার কোন উপকার করতে পারবে ৷ তাকে সমস্ত কথা বলতে — শিয়াল ব্রাহ্মনের কোন কথা বিশ্বাসই করল না ৷ বলল – “তাই আবার হয় নাকি!বাঘ খাঁচায় বন্দি হোলই বা কিভাবে, আর ছাড়া পেয়ে তোমাকে ছাড়লোই বা কেন? ঘটনাস্থলে চলো – সব দেখে তবে এর বিচার করব ।”
এদিকে তিনদিন কেটেও যাচ্ছে – ব্রাহ্মণকে ধর্মরক্ষা, সত্যরক্ষা করতে হলে ফিরতেও হবে । তাই সে শিয়ালের সাথে ফিরে এল সেই পূর্বের জায়গায়, খাঁচার কাছে।
বাঘ তো ব্রাহ্মণকে ফিরতে দেখে ভারী খুশী । বলল – “এস ব্রাহ্মণ ! এতদিনে নিশ্চয়ই তোমার মীমাংসা হয়ে গেছে ! তাহলে এইবার তুমি আমার ভক্ষ্য হও ।” ব্রাহ্মণ বলল – “না না ! মীমাংসা এখনও হয়নি ! এই শিয়াল বাবাজী মীমাংসা করবে ৷ সব কথা ওকে আমি বুঝিয়ে বলেছি কিন্তু ও আমার কোন কথা বিশ্বাস করেনি – তুমি ওকে বলতো যে ঘটনাগুলি সত্য !!”
বাঘ সন্মতি জানালো এবং বিশ্বাস না করার কারন জিজ্ঞাসা করল। বাঘের জিজ্ঞাসার উত্তরে শিয়াল বলল – “দ্যাখো,প্রথম কথাটাই আমি এখনও বুঝতে পারছি না — তুমি খাঁচার ভিতরে ছিলে কিন্তু বাইরে কি করে এলে ?” বাঘ বলল – “ওই তো! ব্রাহ্মণ নিজেই তো খাঁচার দরজা খুলে দিল ৷”
শিয়াল বলল – “তাই আবার হয় নাকি ? তুমি ভিতরে ছিলেই না, আমার মনে হচ্ছে তুমি বাইরেই ছিলে !” বাঘ আবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে – শিয়াল বুঝতে চায় না ৷ শেষে স্থির হ’ল — যে বাঘ আবার খাঁচার মধ্যে ঢুকে যাবে এবং ব্রাহ্মণ খাঁচা খুলে দেখাবে কিভাবে ঘটনাটা ঘটেছিল ৷
সেইমতই কাজ হ’ল ৷ বাঘ আবার খাঁচার মধ্যে ঢুকে গেল । শিয়াল ‘সটাক্’ করে খাঁচার দরজাটি বন্ধ করে দিল । হয়ে গেল বাঘবন্দী।
এবার শিয়াল ব্রাহ্মণকে বলল – “যাও এবার তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের কর্মের জগতে ফিরে যাও। । আর কখনও বাইরের ঝামেলা টেনে এনে নিজের অন্তরের শান্তি বিঘ্নিত কোরো না৷”
এতদূর পর্যন্ত গল্পটি বলে গুরু মহারাজ আমাদের বললেন – এখানে ঐ খেঁকশিয়াল হচ্ছে _মানবের জীবনে গুরুস্বরূপ ৷ সাধারণ জীব নিজেরই সৃষ্ট বিভিন্ন ঝামেলায় ফেঁসে যায়, জড়িয়ে যায় ৷ ফলে ইষ্টকে ভুলে নানান অনিষ্টে ভোগে । এই অবস্থায় মানুষ এখান ওখান করে খুঁজে বেড়ায় শান্তির আশ্রয় ৷ কিন্তু যত তার অভিজ্ঞতা বাড়ে ততই সে দেখে এই জগৎ বড় বিচিত্র ! সত্য – ত্রেতা – দ্বাপর – কলি এই চারযুগেই ন্যায়-অন্যায়ের কোন মীমাংসা হয়নি ৷ আজও সমাজে এই নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে – কোনটি ন্যায় আর কোনটি অন্যায় ! একদল রামের দলে_তো অন্যজন রাবণের দলে ! আজও ভারতে, শ্রীলঙ্কায় রাবণপূজা হয় বিভিন্ন স্থানে! কর্ণ বড় না অর্জুন বড় — এই নিয়ে সমাজে বিতর্কের শেষ নাই! মহারাজা হরিশচন্দ্রের কেন এত দুর্গতি এটাও খুবই বিতর্কিত! তাই তর্কে-বিতর্কে কখনও মীমাংসা হয় না বা সমাধানসূত্র মেলে না ৷ সমাধান করতে পারেন সদ্-গুরু । তিনি বিতর্কে যান না — তিনি সাধককে ঘটন – অঘটনের মূলে বা মূলকেন্দ্রে নিয়ে যান । যেখান থেকে সমস্যার শুরু হয়েছিল সেই খানে নিয়ে যান। ইন্দ্রিয়াদি রূপ বাঘের বর্হিঃজাগতিক ক্রিয়ায় অতিষ্ট হতে হয় মানবকে, গুরু এসে সাধকের চেতনাকে মূল কেন্দ্রে নিয়ে যান । বাঘ খাঁচায় ঢুকলে গুরু নিজে সেই আগল বন্ধ করে দেন — তখন বর্হিঃজাগতিক ঝামেলা মুক্ত হয় মানব ৷ এবার শুরু হয় তার অন্তরজগতের পথ চলা। বাউল গানে রয়েছে – “চলো গুরু যাই দুজন পারে / আমার একলা যেতে ভয় করে ।” এখানে “ভয়” বলতে মহামায়ার জগতে ফেঁসে যাবার ভয় । কিন্তু গুরু পথ দেখিয়ে দেন — পথের সঙ্গী হন না । চলতে চলতে থেমে গেলে, পথ হারালে আবার আবির্ভূত হন । সেই অর্থে সঙ্গের সঙ্গী — হাত ধরে নিয়ে চলা! অন্তর্নিহিত অর্থটা বুঝতে হবে, ব্যাপারটা স্থূল দিয়ে বুঝতে চাইলে হবে না । সূক্ষ বা কারণ জগতে গুরু চিরসঙ্গী — স্থূলে যেটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটা ! স্থূলে যে অনেক কম ক্রীয়াশীলতা, এখানে গতি কম_ বাধা অনেক । সূক্ষে আরও গতিশীলতা, এবং কারণজগতে সময়ের বন্ধন কাজই করে না, তাই এই অবস্থায় অনেক কাজ খুব দ্রুত করা সম্ভব হয় ৷ [ক্রমশঃ]
ব্রাহ্মণ আবার এগিয়ে যেতে লাগল । কিছুদূর গিয়ে এক খেঁকশিয়ালের সাথে তার দেখা হোল। শিয়ালটি একটা উঁচু ঢিপির উপর উঠে বেশ দীপ্ত ভঙ্গিমায় বসে ছিল ৷ ব্রাহ্মণ তাকে দেখে মনে একটু সাহস পেল – ভাবল শেয়াল তো খুবই চালাক হয়, এ নিশ্চয়ই তার কোন উপকার করতে পারবে ৷ তাকে সমস্ত কথা বলতে — শিয়াল ব্রাহ্মনের কোন কথা বিশ্বাসই করল না ৷ বলল – “তাই আবার হয় নাকি!বাঘ খাঁচায় বন্দি হোলই বা কিভাবে, আর ছাড়া পেয়ে তোমাকে ছাড়লোই বা কেন? ঘটনাস্থলে চলো – সব দেখে তবে এর বিচার করব ।”
এদিকে তিনদিন কেটেও যাচ্ছে – ব্রাহ্মণকে ধর্মরক্ষা, সত্যরক্ষা করতে হলে ফিরতেও হবে । তাই সে শিয়ালের সাথে ফিরে এল সেই পূর্বের জায়গায়, খাঁচার কাছে।
বাঘ তো ব্রাহ্মণকে ফিরতে দেখে ভারী খুশী । বলল – “এস ব্রাহ্মণ ! এতদিনে নিশ্চয়ই তোমার মীমাংসা হয়ে গেছে ! তাহলে এইবার তুমি আমার ভক্ষ্য হও ।” ব্রাহ্মণ বলল – “না না ! মীমাংসা এখনও হয়নি ! এই শিয়াল বাবাজী মীমাংসা করবে ৷ সব কথা ওকে আমি বুঝিয়ে বলেছি কিন্তু ও আমার কোন কথা বিশ্বাস করেনি – তুমি ওকে বলতো যে ঘটনাগুলি সত্য !!”
বাঘ সন্মতি জানালো এবং বিশ্বাস না করার কারন জিজ্ঞাসা করল। বাঘের জিজ্ঞাসার উত্তরে শিয়াল বলল – “দ্যাখো,প্রথম কথাটাই আমি এখনও বুঝতে পারছি না — তুমি খাঁচার ভিতরে ছিলে কিন্তু বাইরে কি করে এলে ?” বাঘ বলল – “ওই তো! ব্রাহ্মণ নিজেই তো খাঁচার দরজা খুলে দিল ৷”
শিয়াল বলল – “তাই আবার হয় নাকি ? তুমি ভিতরে ছিলেই না, আমার মনে হচ্ছে তুমি বাইরেই ছিলে !” বাঘ আবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে – শিয়াল বুঝতে চায় না ৷ শেষে স্থির হ’ল — যে বাঘ আবার খাঁচার মধ্যে ঢুকে যাবে এবং ব্রাহ্মণ খাঁচা খুলে দেখাবে কিভাবে ঘটনাটা ঘটেছিল ৷
সেইমতই কাজ হ’ল ৷ বাঘ আবার খাঁচার মধ্যে ঢুকে গেল । শিয়াল ‘সটাক্’ করে খাঁচার দরজাটি বন্ধ করে দিল । হয়ে গেল বাঘবন্দী।
এবার শিয়াল ব্রাহ্মণকে বলল – “যাও এবার তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের কর্মের জগতে ফিরে যাও। । আর কখনও বাইরের ঝামেলা টেনে এনে নিজের অন্তরের শান্তি বিঘ্নিত কোরো না৷”
এতদূর পর্যন্ত গল্পটি বলে গুরু মহারাজ আমাদের বললেন – এখানে ঐ খেঁকশিয়াল হচ্ছে _মানবের জীবনে গুরুস্বরূপ ৷ সাধারণ জীব নিজেরই সৃষ্ট বিভিন্ন ঝামেলায় ফেঁসে যায়, জড়িয়ে যায় ৷ ফলে ইষ্টকে ভুলে নানান অনিষ্টে ভোগে । এই অবস্থায় মানুষ এখান ওখান করে খুঁজে বেড়ায় শান্তির আশ্রয় ৷ কিন্তু যত তার অভিজ্ঞতা বাড়ে ততই সে দেখে এই জগৎ বড় বিচিত্র ! সত্য – ত্রেতা – দ্বাপর – কলি এই চারযুগেই ন্যায়-অন্যায়ের কোন মীমাংসা হয়নি ৷ আজও সমাজে এই নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে – কোনটি ন্যায় আর কোনটি অন্যায় ! একদল রামের দলে_তো অন্যজন রাবণের দলে ! আজও ভারতে, শ্রীলঙ্কায় রাবণপূজা হয় বিভিন্ন স্থানে! কর্ণ বড় না অর্জুন বড় — এই নিয়ে সমাজে বিতর্কের শেষ নাই! মহারাজা হরিশচন্দ্রের কেন এত দুর্গতি এটাও খুবই বিতর্কিত! তাই তর্কে-বিতর্কে কখনও মীমাংসা হয় না বা সমাধানসূত্র মেলে না ৷ সমাধান করতে পারেন সদ্-গুরু । তিনি বিতর্কে যান না — তিনি সাধককে ঘটন – অঘটনের মূলে বা মূলকেন্দ্রে নিয়ে যান । যেখান থেকে সমস্যার শুরু হয়েছিল সেই খানে নিয়ে যান। ইন্দ্রিয়াদি রূপ বাঘের বর্হিঃজাগতিক ক্রিয়ায় অতিষ্ট হতে হয় মানবকে, গুরু এসে সাধকের চেতনাকে মূল কেন্দ্রে নিয়ে যান । বাঘ খাঁচায় ঢুকলে গুরু নিজে সেই আগল বন্ধ করে দেন — তখন বর্হিঃজাগতিক ঝামেলা মুক্ত হয় মানব ৷ এবার শুরু হয় তার অন্তরজগতের পথ চলা। বাউল গানে রয়েছে – “চলো গুরু যাই দুজন পারে / আমার একলা যেতে ভয় করে ।” এখানে “ভয়” বলতে মহামায়ার জগতে ফেঁসে যাবার ভয় । কিন্তু গুরু পথ দেখিয়ে দেন — পথের সঙ্গী হন না । চলতে চলতে থেমে গেলে, পথ হারালে আবার আবির্ভূত হন । সেই অর্থে সঙ্গের সঙ্গী — হাত ধরে নিয়ে চলা! অন্তর্নিহিত অর্থটা বুঝতে হবে, ব্যাপারটা স্থূল দিয়ে বুঝতে চাইলে হবে না । সূক্ষ বা কারণ জগতে গুরু চিরসঙ্গী — স্থূলে যেটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটা ! স্থূলে যে অনেক কম ক্রীয়াশীলতা, এখানে গতি কম_ বাধা অনেক । সূক্ষে আরও গতিশীলতা, এবং কারণজগতে সময়ের বন্ধন কাজই করে না, তাই এই অবস্থায় অনেক কাজ খুব দ্রুত করা সম্ভব হয় ৷ [ক্রমশঃ]
