গুরু মহারাজ (স্বামী পরমানন্দ) বলেছিলেন – ” গুরু করবি শত শত , মন্ত্র করি সার , মনের মতো মানুষ পেলে তারে দিবি ভার ।” গুরু মহারাজ নিজে ছিলেন সেই ভার নেবার মানুষ, ন’কাকাও ছিলেন সেই ভার নেবার মানুষ ! যাঁর ওপর সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় – তিনিই গুরু মহারাজ ৷ তিনি যে কতটা ভার নেবার মানুষ ছিলেন _সে কথা বলার মতো ভক্ত পরমানন্দ জগতে অনেকে রয়েছে। তাদের সবার হয়ে আমার জীবনের একটা ঘটনা বলি।
আমার মনে পড়ছে আমার ছেলে হর্ষ’র ছোটবেলার কথা । মাত্র ১০ মাস বয়সে ওর হ’ল নিদারুন ব্যাধি ! সেই সময় আশ্রমের পুরোনো ভক্তরা যেই ওকে দেখেছিল – পরে পরে ভয়ে ভয়ে আমার সাথে দেখা হলে জিজ্ঞাসা কোরতো – ” হ্যাঁগো ! তোমার ছেলেটা …. ??” আমি হেসে বলতাম – “ভালো আছে – গুরু মহারাজের কৃপায় ও এখন সুস্থ !” কি নিশ্চিন্ততা ! কি নির্ভরতা ! হর্ষ অসুস্থ হবার সময় উনি বিদেশে ছিলেন তবে মাস চারেকের মধ্যেই উনি দেশে ফিরে এসেছিলেন দুর্খাপূজার ঠিক আগে। এসেই বিধান দিলেন স্বমূত্র চিকিৎসার ¡ ওর তখন দেড় বছর (প্রায়) বয়স।
গুরু মহারাজ হর্ষ-র মা (রুনু)-কে বলেছিলেন – ” ওকে Auto Urine করাবি ৷” আমরা বললাম – ” গুরু মহারাজ ! ও তো ছোট (তখন রোগগ্রস্থ অবস্থায় ও প্রায় শুয়েই থাকতো !) – তাহলে ওর পেচ্ছাব কি করে ধরব ?” উনি একটু বিরক্ত হলেন, বললেন – “Wait করবি ! ধৈর্য্য ধরে কাজটি করতেই হবে – এটাই ওর একমাত্র Treatment ! প্রথম প্রথম দিনে অন্ততঃ তিনবার ১ঝিনুক করে খাওয়াবি ৷ তবে প্রথমটা এবং শেষটা বাদ দিয়ে শুধু মাঝেরটাই ধরে খাওয়াবি !” পরে শুনেছিলাম সাপের যেমন লেজে মুখে বিষ _তেমনটাই ইউরিনে। (গুরুমহারাজ অবশ্য আরও বিজ্ঞানসম্মত ভাবে বুঝিয়েছিলেন_ইউরিনের ক্ষতিকর এলিমেন্টস্ গুলি হয় ভাসমান অবস্থায় থাকে অথবা সেডিমেন্ট অবস্থায় _তাই এই বিধান।)
সেই শুরু হোল – চলতে থাকল বহুদিন ৷ পরে কতদিন সিটিং-এ গুরু মহারাজ বলেছেন – ” আমি তো Auto – urine এর কথা কতজনকেই বললাম , কিন্তু বেশীরভাগই শুরু করে continue করতে পারলো না – দেখছি একমাত্র হর্ষ-ই ঠিকঠাক পালন করছে ৷” হর্ষ-র যখন ২/৩ বছর বয়স, তখন গুরু মহারাজ একদিন আমাকে ডেকে বললেন – ” শ্রীধর ! হর্ষ-কে কি পোলিও ভ্যাকসিন, ট্রিপল অ্যান্টিজেন এগুলো দেওয়া শুরু করেছিস নাকি ?” আমি বললাম – ” না – গুরু মহারাজ ! ও তো এই সবে সুস্থ হয়ে উঠছে – এবার তাহলে না হয় …..” কথা শেষ না হতেই উনি বললেন – “তাহলে ওকে আর ওগুলো নিতে দিস না ! ও – তো Auto-urine করছে, ফলে ওর এসবের প্রয়োজন নাই !” ব্যস্ ! আমরা আর কখনও স্বপ্নেও মনে ভাবিনি যে ছেলের ঐগুলি নেবার কোন প্রয়োজন রয়েছে ! বাড়ীতে সেই সময় এ নিয়ে একটু কথাও উঠেছিল – কিন্তু আমাদেরকে স্পর্শ‍্য করতে পারেনি! উনি বলেছেন _এর আবার অন্যথা কি!!!
তাই বলছিলাম – যতই জ্ঞানীগণ বলুন না কেন , ” উনি কোথায় গেছেন , আমাদের মধ্যেই আছেন ! অন্তরে অন্তর্যামী হয়ে রয়েছেন ” ইত্যাদি ইত্যাদি ! কিন্তু তাই কি হয় ! – তিনি ছিলেন আর্তের আশ্বাস , জিজ্ঞাসুর ‘মুসকিল আসান’ , ভক্তের ভগবান , যোগীর পরমাত্মাস্বরূপ , জ্ঞানীর কাছে ব্রহ্মস্বরূপ___ কিন্তু আমাদের মতো অতি সাধারণ মানুষের কাছে একান্ত আশ্রয় – পরম নির্ভরতা ! আমরা স্থূলচেতনার মানুষ , তাই স্থূল ঈশ্বরকেই বেশী করে চাই , তাঁকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাই !!আজ তাঁকে সেইভাবে পাইনা বলেই অন্তর্জগতে এত হাহাকার!!
যাইহোক, ফিরে যাই আগের আলোচনায় _যেখানে কথা হচ্ছিল সাপ নিয়ে, সাপের কামড় নিয়ে! গুরু মহারাজ নিজেও সাপের কামড় খেয়েছেন , বিষের জ্বালা সহ্য করেছেন! এই নিয়ে ন’কাকা শিশুর মতো হাততালি দিয়ে মজাও করেছেন – এসব কথা আগে বলা হয়েছে । এখন সাপের বিষ কেমনভাবে শরীরে ক্রিয়া করে তাই বলছি ! উনি বলছিলেন – ” গোক্ষুরা প্রজাতির সাপের বিষ মানুষের শরীরে ঢুকলে সে যে কি অসহ্য জ্বালা (যন্ত্রণা নয়) হয় – সেটা যে ভোগ করেনি সে বুঝতে পারবে না ৷ কথায় রয়েছে “কি যাতনা বিষে – বুঝিবে সে কিসে , কভু আশীবিষে দংশেনি যারে ৷” ঘটনাটা সত্যিই তাই ৷ ধরে নাও একটা জ্বলন্ত কোন কিছুকে যদি শরীরের ভিতরের শিরা উপশিরা দিয়ে ধীরে ধীরে আগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় — তাহলে যেমন একটা ভয়ঙ্কর Burning Sensation হয় , ঠিক তেমনি অসহ্য জ্বালা হয় । বিষ যেমন যেমন রক্তের প্রবাহের সাথে হার্টের দিকে এগিয়ে চলে – ঐ দুঃসহ জ্বালা তেমন তেমন আগায় । যার জন্য গোক্ষুরা প্রজাতির সাপের কামড় খাওয়া ব্যক্তি কিছুক্ষণের মধ্যেই ছটফট ছটফট করতে থাকে ৷ চিকিৎসার দেরী হলে মারাও যায়।”
ফনাহীন সাপের কামড়ে (বিশেষত ভাইপার জাতীয় বা চন্দ্রবোড়া) মানবশরীরে বিষের ক্রিয়া সম্বন্ধে উনি বলেছিলেন _”চন্দ্রবোড়া সাপে কামড়ালে সাধারণত ঐ স্থানটি অসাড় হয়ে যায়। এই বিষ খুব ধীরে ধীরে রক্তের উপর ক্রিয়া করতে থাকে। ফলে গোক্ষুরা প্রজাতির সাপের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তি অপেক্ষা চন্দ্রবোড়ার কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তি খানিকটা বেশি সময় পায়। কিন্ত এই বিষে কিডনি affected হয় এবং তখন যে কোন স্থান দিয়ে bleeding শুরু হয়ে যায় ।”
এই দুই প্রকার সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর ঔষধ (অ্যান্টিভেনাম) – ও আলাদা ।
সাপের ঔষধ কিভাবে তৈরি হয় সে ব্যাপারেও উনি আলোকপাত করেছিলেন। উনি বলেছিলেন _” প্রকৃতপক্ষে সাপের বিষ হল high প্রোটিন। কোন মানুষ সাপের বিষ খেয়ে ফেললে যদি ঐ ব্যক্তির গলবিল থেকে পায়ু পর্যন্ত সমগ্র পৌষ্টিক নালীর মধ্যে কোন কাটাছেঁড়া বা ঘা-জাতীয় কোন কিছু না থাকে _তাহলে ঐ ব্যক্তির কোন ক্ষতিই হবে না। এই বিষ রক্তের সংস্পর্শে না এলে শরীরের ক্ষতি হয় না।”
সাপের বিষ যে high প্রোটিন সেটা জীববিজ্ঞানীরা আবিস্কার করার আগেই আদিম মানুষেরা জানতে পেরেছিল ঘোড়ার শরীরে এই বিষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখে। আদিম মানবসমাজে কুকুরের পরেই মানুষের পোষ মেনেছিল ঘোড়া। ঘোড়ারা ঘাসের বনেই চড়ে বেড়ায় _আর কোবরা প্রজাতির সাপ সহ অন্যান্য সাপেরা ঘাসবনেই বেশি থাকে(যেহেতু কীটপতঙ্গ, ফরিং ইত্যাদিরা ওখানেই বেশি থাকে, যেগুলি সাপেদের খাদ্য)। এরফলে ঘোড়াদের প্রায়শই সাপের কামড় খেতে হয়।
সেই যুগের মানুষ লক্ষ্য করেছিল যে সাপের কামড় খেয়ে ঘোড়াগুলি নিস্তেজ হয়ে পড়ার বদলে আরও চনমনে হয়ে উঠছে।এইটা দেখে মানুষ বুঝে গিয়েছিল যে সাপের বিষে ঘোড়াদের ক্ষতি তো হয়ই না বরং উপকার হয়। তাই আদিকাল থেকে শুধুমাত্র দ্রুতগামী বলেই নয় জল-জঙ্গলে চলাফেরা করার সময় সর্পভয় নিবারনের জন্য ও ঘোড়ার ব্যবহার অপরিহার্য হয়েছিল।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আগেকার মানুষের ঐ observation – কে কাজে লাগাল। ঘোড়াদের রক্তে সাপের বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে _সেখান থেকেই তৈরি করে ফেলল সাপের বিষ বা antivenum! (ক্রমশঃ)