এক শহরে এক ব্যক্তির একটি পানগুমটি ছিল ৷ একদিন দুপুরবেলা ঐ পান-দোকানদার তার গুমটির মধ্যেই আরামে ঘুমাচ্ছিল । একজন বয়স্ক খরিদ্দার পান কিনতে এসে দেখে যে দোকানদার ঘুমাচ্ছে ! সে তো রেগে খাপ্পা ! ডাকাডাকি করে পানওয়ালার ঘুম ভাঙিয়ে তাকে জাগালো ৷ চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসে পানওয়ালা খরিদ্দারকে জিজ্ঞাসা করল – “হয়েছে টা কি ? এত চ্যাঁচামেচি কিসের ?” লোকটি বলল – “আশ্চর্য্য তো ! তুমি আবার জিজ্ঞাসা করছ – চ্যাঁচামেচি করছি কেন ? তুমি দোকান খুলে রেখে দিন-দুপুরে আরামসে ঘুম মারছ – তাহলে তোমার দোকান চলবে ?”
দোকানদার যেন একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করল – “আরে, সুযোগ পেয়ে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছিলাম — নাহলে কি ই বা করতাম! আর এর জন্য এতো চ্যাঁচামেচি কিসের বাপু ?”
খরিদ্দার ওর কথায় আরো রেগে গিয়ে বলল–” কি আবার করবে ? মন দিয়ে ব্যাবসা করবে – যাতে খরিদ্দার আরো আসে তার চেষ্টা করবে! খরিদ্দার যাতে না ফিরে যায় সেটা দেখবে! ”
পানওয়ালা বলল_” আচ্ছা – আচ্ছা বেশ , তা না হয় করব ৷ কিন্তু তাতে কি হবে ?”
খরিদ্দার এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল _”দ্যাখো কান্ড ! তুমি এটাও বোঝ না যে, বেশি বিক্রি হলে বেশি লাভ হবে এবং এতে তোমার রোজগার বাড়বে!”
পানওয়ালা আর একবার হাঁই তুলে উত্তর দিল_”হ্যাঁ – হ্যাঁ, তা অবশ্য হবে । কিন্তু বেশী রোজগার হলে কি হবে ?”
এই কথায় খরিদ্দারটি এবার খুব রেগে গিয়ে, বেশ কড়া ভাষায় উত্তর দিল _” তুমি তো দেখছি আচ্ছা বোকা ! এটাও বোঝ না যে বেশী রোজগার হলে তুমি বড়লোক হবে – ধনী হয়ে যাবে! তোমার এই গুমটির চাইতেও বড় দোকান হবে, বড় ব্যাবসা হবে ৷ আরও রোজগার বাড়লে – তুমি আরও ধনী হবে!”
পানওয়ালা এত কথা শুনেও শান্ত-অলসকন্ঠে বলল_”হ্যাঁ – তা না হয় হল । কিন্তু তাতেই বা কি হবে ?”
খরিদ্দারটি রেগেই ছিল এবার একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে বলে উঠল_” এ তো মহা মূর্খের পাল্লায় পড়া গেল ! তোমার তো দেখছি আটআনা-বারোআনা নয় ষোল আনাই জীবনখানা মিছে হয়ে গেল! ঘটে যার বুদ্ধি নাই, আর যারা অলস, তাদের তোমার মত এই দশাই হয়! আরে মূর্খ ! লোকে ধনী হলে বা হাতে পয়সা এলে কি করে ? তুমিও তাই করবে । বড় বড় বাড়ী করবে – গাড়ী কিনবে – বাড়ী সাজাবে! আরো অনেক কিছু করতে পারবে।”
পানওয়ালা আবার শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল _” বড় বড় বাড়ী না হয় করলাম, গাড়ীও কিনলাম, তারপর বাড়ী সাজাবার কথা কি যেন বললে– এটা তো ঠিক বুঝলাম না !”
বিরক্ত ও লোকটির বোকামি তে ক্রুদ্ধ খরিদ্দার, পানওয়ালার জিজ্ঞাসার উত্তরে বলে উঠল_” তোমায় নিয়ে তো মহামুস্কিলে পড়া গেল! যাদের কাছে প্রচুর পয়সা থাকে তারা এইসবই করে _বুঝেছ? বাড়ী সাজানো বুঝতে পারছ না __ঘরে দামী রঙ করাবে, মেঝেয় পাথর বসাবে, দামী দামী আসবাবপত্র কিনবে ৷ খাট, আলমারী, ড্রেসিংটেবিল, ফ্রিজ, টিভি এইসব কিনবে । সব দামী দামী কিনবে — তাহলে আরও ভালো হবে! উন্নত বা উচ্চমানের হবে ৷ – এবার বুঝলে ?”
পানওয়ালা সব কথা শুনল কিন্তু ডবুও বিরস মুখে উত্তর দিল _”না, ঠিক বুঝলাম না !”
খরিদ্দার এই কথা শুনে রেগে এক্কেবারে ফেটেই পড়ল, রাগের চোটে তূই-তোকারি তে নেমে এসে বলল_” তুই আর বুঝবিও না _ব্যাটা বোকা-হাঁদা-মাদামোটা! দামী খাট কিনবি, দামী বিছানাপত্র কিনবি – এতে কি হবে – বিছানাগুলো নরম আর গদি হবে ৷ তার মধ্যে তুই শুয়ে মনে করবি নরম পালকের মধ্যে ঢুকে আছিস ! বুঝলি ?”
এই কথা শুনে একটু যেন আহ্লাদিত হোল পানওয়ালা! তারপর ব্যগ্রতা সহকারে বলল_” হ্যাঁ-হ্যাঁ, এটা বুঝেছি । কিন্তু এরপর কি করব ?”
শেষমেষ খরিদ্দার হতাশ হয়ে বলল_”ওরে হাঁদারাম – বোকারাম ! এবার সবকিছু হয়ে গেলে আরাম করবি! অার বড় বাড়ীতে, দামী ঘরে, দামী নরম গদিতে শুয়ে আরামে ঘুম লাগাবি ।
শেষের এই কথাটি শুনে পানওয়ালা আবার দোকানের গদিতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে বলল–”আরে দুর মশাই ! আপনি আমাকে এতক্ষণ নানারকম গালাগালি দিচ্ছিলেন, এখন তো দেখছি আপনিই মাথামোটা ! যে জিনিসটা(ঘুম) এতকিছু করার পর করতে বলছেন, সেটা তো আমি এখনই করছিলাম ! অত কান্ড করে শেষে তো আরামে ঘুমাতেই বললেন – সেটা তো আমি আগেই বুঝেছি – আর সুযোগ পেলে সেটা করেও থাকি — ! এতক্ষণ ধরে ফালতু আপনার বকবকানি শুনে আর কি লাভ হ’ল? বরং ততক্ষণ ঘুমালে কাজ হোত। যান তো মশাই ! অন্য জায়গায় জ্ঞান দিন, এখানে নয়!”
গল্পটি শেষ করে গুরু মহারাজ আমাদের বললেন যে — এই রকমই হয়ে চলেছে জগতে । জগতে আপাত জ্ঞানী মানুষের বা অপরকে অকারণে জ্ঞান দেবার মানুষের অভাব নেই ৷ কিন্তু সে নিজে প্রকৃত জ্ঞানী নয়! তার নিজেরই জ্ঞান অর্জন এখনও শেষ হয় নি বা সম্পূর্ণ হয় নি ।
এইভাবে দেখা যায় __যে জ্ঞান দেবার অধিকারীই নয় — সে জ্ঞান দিচ্ছে ৷ এসবক্ষেত্রে ঐরূপ ব্যক্তি যদি প্রকৃত জ্ঞানীর পাল্লায় পড়ে যায় — তার ঐ পানওয়ালার খরিদ্দারের মতো অবস্থা হয়! এইভাবেই জগতে বিভিন্ন মানুষ শুধু নয় , বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়, বিভিন্ন দর্শন বা মতবাদও হয়তো সম্পূর্ণ নয় অথচ সে বা তারা চাইছে সকল মানুষ তার ছত্রছায়ায় আসুক! এদের মধ্যে অনেকে সম-মনভাবাপন্ন হওয়ায় তারা এই দলে যোগদান করছে! ফলে হয়তো কোন দল বা সম্প্রদায় শক্তিশালী হচ্ছে। আর তখনই বাকীদের উপর তাদের জোর-জবরদস্তি শুরু হয়ে যাচ্ছে !
এইভাবেই পৃথিবীতে শুধুমাত্র নিজের মতবাদ প্রচারের প্রচেষ্টায় বা নিজমতে অপরকে আনার প্রচেষ্টায় অথবা শক্তির (অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক, ধর্মনৈতিক) প্রভাব খাটিয়ে অপরকে dominate করে রাখার প্রচেষ্টায় __গোটা পৃথিবীতে হানাহানি, মারামারি, Blood-shed হয়ে চলেছে!
আবার অনেকে ঈশ্বরের নাম নিয়ে এটা করে চলেছে – কিন্তু এইসব মজহব বা সম্প্রদায়গুলির নেতারাও তো পূর্ণজ্ঞানী নয়! তারা নিজেরাই জানে না সর্বশক্তিমান ঈশ্বর অথবা Devine Mother বা Mother Nature -এর ইচ্ছাটি কি ? তারা একটু আধটু শক্তি সঞ্চয় করেই (ধর্মনৈতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি নেতা মানেই কিন্তু সে আর পাঁচজনের চাইতে শক্তিমান অর্থাৎ এই জন্মে বা পূর্ব পূর্ব জন্মে সাধন-ভজনের দ্বারা সে নিজেকে শক্তিমান করে গড়ে তুলেছে) তার প্রয়োগ সমাজ বা জনগণের উপর করতে চাইছে। আর এতেই হয় বিপত্তি! হয়তো সত্যের ধারণা রয়েছে কিন্তু সঠিক পথ বাতলাতে পারে না, ফলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে!
সুতরাং পূর্ণতা প্রাপ্তিই যখন মানব জীবনের উদ্দেশ্য _তখন আগে সেইটা সম্পন্ন করার চেষ্টায় যিনি রয়েছেন _তিনিই উন্নত মানব, প্রকৃত বুদ্ধিমান মানব। যা শেষে সকলকেই করতে হবে(আধ্যাত্মিক পথে এগিয়ে চলা) — তা এখনই করে ফেলাটাই তো বুদ্ধিমান বা বিবেকবানের কাজ ।৷ [ক্রমশঃ]