গুরু মহারাজের (স্বামী পরমানন্দ) দ্বারা শক্তি সঞ্চারের কথা হচ্ছিল ৷ একটা ঘটনা একবার গুরু মহারাজ আমাদের বলেছিলেন, বনগ্রামে রাত্রিবেলায় ন’কাকাদের (মুখার্জি বাড়ী) বাড়ীতে। সেইটা বলব কিন্তু তার আগে একটু উপক্রমণিকা সেরে ফেলা যাক । তখন আশ্রমে অনেক ইউরোপিয়ানরা আসা যাওয়া করতো । সবাইকে ভালো মতন চেনা আমাদের( সাধারণ লোকেদের) পক্ষে সম্ভব ছিল না ! তবু যে কজন আশ্রমে এসে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যেতো – তাদেরকে আমরা অনেকেই চিনতাম ৷ তার কারণ তারাও সিটিংয়ে এসে আমাদের পাশেই বসে থাকতো – আমাদেরই সাথে রান্নাঘরে খেতে যেতো , বিকালে মাঠে বসে গল্প করত ৷ যাই হোক ওদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নরওয়ের বেয়ন , ক্যারিয়াদা এবং ক্যারিয়াদার বাবা , মা , বোন প্রমুখেরা ৷ এছাড়া ইংল্যান্ডের ব্রায়ান তখন সবার খুবই প্রিয় ছিল ! ইতালি থেকে তখন আসতো এক ঝাঁক ছেলে-মেয়ে। এদের মধ্যে অনেকদিন করে থেকে যেতো – ইলারিও , রুজেরো , ফ্রান্সিসকো (পরে সন্ন্যাস নিয়ে নাম হয়েছিল প্রেমানন্দ) , ক্লাউডিও , আলেক্স , ব্রুনেলা (মেয়ে) , ক্লাউদিয়া (রুজেরোর স্ত্রী) ! জার্মানি থেকে আসা একটি ছেলেকে অনেকেই চিনতো, তার নাম ছিল ‘গের্ হাদ্’ বা ‘গেরাদ্’ । ও মাঠে ছেলেদের সাথে ফুটবলও খেলতো । জার্মানির আর একটি মেয়েকেও আশ্রমের বেশির ভাগ লোক খুবই চিনতো তার নাম ফ্রেডরিকা , গুরু মহারাজ ওর নাম দিয়েছিলেন ‘শান্তি’ ! আশ্রমে ওকে সবাই বলত ‘জার্মান শান্তি’ ! এখন ঐ জার্মান শান্তির দিদির কথাই বলতে যাচ্ছি_ এই ঘটনাটা আপনাদের অনেকেরই জানা, তবু অনেকে তো জানেনা_ তাই তাদের জন্য আর একবার বলা ! ঘটনাটি ঘটেছিল জার্মানিতে , ওই যে বলা হল ‘জার্মান শান্তি’ , ওদের বাড়িতে । জার্মান শান্তি বা ফ্রেডেরিকার দিদির নাম ছিল ফ্রান্সিসকা ৷ উনি খুবই শিক্ষিত মহিলা ছিলেন । আমরা ওনাকে দেখতাম গুরু মহারাজের সাথে সাথে বনগ্রামে মুখার্জি বাড়িতে এসে – ওনার পিছনে বসে থাকতেন । খুব সিগারেট খেতেন ভদ্রমহিলা – রোগা-ফিনফিনে শরীর , বয়স হয়তো ৫৫/৬০ হয়েই যাবে ।বয়স ঠিক বোঝা যেত না – আসলে বিদেশী বিদেশিনীদের বয়স ঠিক বোঝাও যায় না – একটু বয়স হলেই মুখগুলো কেমন বুড়ো বুড়ো হয়ে যায় ! যাই হোক এবার মূল ঘটনায় ফিরে আসি। গুরু মহারাজ যেমন যেমন বলেছিলেন সেইটা বলছি – ” জার্মানিতে শান্তি দের বাড়ি যাবার Program-টা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল । কিন্তু শান্তি আমাকে ওর দিদির কথা একটু_আধটু বলে রেখেছিল৷ তবে ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম যে, ওর দিদি প্রথম জীবন থেকেই খুবই আধ্যাত্মিক মহিলা ছিল ! প্রচুর পড়াশোনা করত এবং বুঝতে পারে যে ওকে প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার পাঠ নিতে হলে ভারতবর্ষে আসতেই হবে বা হিমালয়ে যেতে হবে! যেমন ভাবা তেমনি কাজ ! কিছু টাকা পয়সা সঞ্চয় করে ফ্রান্সিসসকা ভারতে চলে এসেছিল ৷ উত্তর ভারতে হিমালয়ের পাদদেশে (হরিদ্বার , হৃষীকেশ অথবা উত্তরকাশী) কোন আশ্রমে কিছুদিন কাটিয়েও ছিল । কিন্তু সেখানকার আশ্রমিকদের দ্বারা ও কোনভাবে physically লাঞ্ছিত হয়েছিল । এই ঘটনাটা ওকে Mentally প্রচন্ড আঘাত দিয়েছিল। এই আঘাতের পর ও দেশে ফিরে যায় এবং যেটুকু প্রাণায়াম-যোগ-ধ্যানের পদ্ধতি ভারতবর্ষে শিখেছিল সেগুলি Practice করতে থাকে ৷ এর কয়েক বছর পরে ও আর একবার ভারতবর্ষে এসেছিল – রামকৃষ্ণ মিশনের কোন এক শাখায় ! কারণ ইতিমধ্যেই ও স্বামী বিবেকানন্দের কিছু বই এবং রোমা রোঁলার বই থেকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও রামকৃষ্ণ মিশন সম্বন্ধে জানতে পেরেছিল ৷ কিন্তু দুর্ভাগ্য এই ভদ্রমহিলাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিলো । সেখানেও সে ভালো ব্যবহার পায় নি ! এবারের আঘাত-টা ফ্রানসিসকা নিতে পারেনি – দেশে ফিরে এসে ও পুরোপুরি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল । বাড়িতে ফিরে সেই যে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল – আর বেরোয় নি ! এরপর ধীরে ধীরে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল , কোনরকম ওষুধও খেতো না – অর্থাৎ ও মৃত্যুর দিকে ঢলে পরতেই চাইছিল , আর বাঁচতে চাইছিল না। শান্তি এবং ওর বাড়ির লোকেরা বহু রকমভাবে চেষ্টা করেছিল , অনেক ডাক্তারও দেখিয়েছিল কিন্তু যে suicide করতে চাইছে – তাকে কে বাঁচাবে ! এইরকম একটা situation-এ আমার শান্তি-দের বাড়িতে প্রবেশ । এইরকম একটা situation – এ আমার (গুরুমহারাজ) শান্তি-দের বাড়িতে প্রবেশ! আমি সব কথা শোনামাত্রই ওর ঘরে ঢুকে গেলাম। গিয়ে দেখি বিছানার উপর চাদর চাপা দেওয়া একটা জীর্ণ-শীর্ন-কঙ্কালসার একটা শরীর পড়ে রয়েছে! শরীরটা নারীর না পুরুষের অথবা অন্য কোনো জীব বোঝাই যাচ্ছিল না! আমি দেখলাম ওর জীবনী শক্তি একদম শেষ! বাড়ির লোকেরাও সব আশা ছেড়ে দিয়ে ওর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিল! যাইহোক, এক্ষুনি যদি ওকে শক্তিসঞ্চার না করা হয় তাহলে ও অতিশীঘ্র মারা যাবে। তাই আমি আর দেরি না করে আগে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলাম, তারপর বিছানায় বসে ওর মাথাটা আমার কোলের মধ্যে তুলে নিয়ে _আমার ডান হাতের বুড়োআঙুল ওর কপালের মাঝখানে স্পর্শ করে কিছুক্ষণ মনঃসংযোগ করে থাকতেই ধীরে ধীরে মেয়েটির শরীরে ‘সার'(চেতনা) আসতে শুরু করল। ও চোখ খুলল__আমার চোখে চোখ রেখে কিছু কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন কিছুই না খাওয়ার জন্য এত দূর্বল হয়ে গেছে যে গলা chocked হয়ে গেছে! কথা বেরোচ্ছে না! আমি ওর মাথায় স্নেহের সঙ্গে হাত বোলাতে শুরু করলাম। ওর কুলকুন্ডলিনীর ক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল ফলে ও কাঁদতে লাগল। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর আমার দিকে তাকিয়ে চিনচিন করে বলল _”তুমি কে?” আমি বললাম _” আমি তোমার সন্তান! আর তুমি আমার জননী! ” এই কথা শুনে ও কিছুটা অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল _তারপর বলল_” সত্যি সত্যিই আমি তোমার মা? তুমি আমার নিজের সন্তান?” আমি বললাম _” হ্যাঁ মা! আমি তোমারই সন্তান!” একথা শুনে ও শক্ত করে আমার হাতটা চেপে ধরে বলল _”তাহলে এবার থেকে আমি বাঁচার চেষ্টা করব। তবে তুমি আমাকে কথা দাও তুমি আমার ছেলে হয়েই থাকবে _আমার কথা শুনবে। বড় হয়ে যাবে না _ছেলে বড় হয়ে গেলে আর মায়ের কথা শোনে না!” আমি হাসতে হাসতে ওনার সব কথা মেনে নিলাম। তারপর ওনাকে ধরে ধরে বিছানায় বসালাম! সেখানেও কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করে ওনাকে নিয়ে বাইরে এলাম। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে বাড়ির লোকেরা সবাই ঘরের কাছে এসে জড়ো হয়ে গেল। ওরা আমাকে দেখে অবাক হল না _সবাই অবাক হয়ে গেল যখন দেখল আমার পিছন পিছন ফ্রানসিসকা বেড়িয়ে আসছে without any help! শান্তির বাড়ির লোকজনের সাথে তখনও তো আমার ভাল করে পরিচয় ই হয় নি! শান্তি আমার পরিচয় করাতে যেতেই ওরা হৈ হৈ করে বলে উঠল _”এনার সম্বন্ধে তোমাকে আর কিছু বলতে হবে না! ইনি কে এবং ইনি যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন _তা তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি!!” এরপর ভদ্রমহিলা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন এবং বেশ কয়েকবার বনগ্রাম আশ্রমেও এসেছিলেন!! (ক্রমশঃ)