[ন’কাকাকে নিয়ে আমরা এখনো শ্রীরামপুর, হুগলিতেই আছি! ওখানে ওনার সাথে আরও অনেক ঘটনা ঘটেছিল _সেইগুলি বলার চেষ্টা করা হচ্ছে……]
শ্রীরামপুরের মাষ্টারমশাই (সুদর্শন বাবু)-এর একজন ভাগ্নে ছিল , যার নাম পিন্টু ! ছেলেটি বেলুড়মঠ রামকৃষ্ণ মিশনের সাথে খুবই যুক্ত । ও ওখানকার শিষ্য ও ভক্ত, তাছাড়া সময় অসময়ে পিন্টু বেলুড় সহ রামকৃষ্ণ মিশনের অন্যান্য শাখার মহারাজদের নিঃস্বার্থভাবে সেবা কোরতো। এই সব কারনে ওখানকার Senior মহারাজেরা ওকে খুব ভালোবাসত ৷ ন’কাকা যখনই শ্রীরামপুরে মাষ্টারমশাই-এর বাড়ী যেতেন – পিন্টু অতি অবশ্যই সেদিন ওখানে উপস্থিত থাকতো এবং ন’কাকার পাশটিতেই বসে থাকতো । আর একটু সুযোগ পেলেই ন’কাকার গা-হাত-পা ‘ম্যাসেজ’ করে দিতো । যেদিন ওখানে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বা সারদা মায়ের পূজা হোত – সেদিন পূজার যোগাড়ের ভার থাকতো পিন্টুর উপর ৷ কি সুন্দর যোগাড় ! পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ! সমস্ত ফলমূল মিষ্টান্ন দ্রব্যাদি যেন বাজারের সেরা জিনিসের collection ! সুদর্শন বাবুই পুজো করতেন, তবে দু-একবার ন’কাকাও পুজো করে দিয়েছিলেন। যাইহোক, পুজো যিনিই করুন_পুজো, আরতির সমস্ত সরঞ্জাম পিন্টু-ই হাতে হাতে ধরিয়ে দিতো! ফলে যিনি পুজো করতেন তাঁর খুবই সুবিধা হোত! একেবারে ছবির মতো সাজানো ছিল ওর নিখুঁত কাজ!
ছেলেটি সংসারী ছিল কিন্তু স্বভাব-সাধু ! একবার পিন্টু অমরকন্টক বেড়াতে গিয়েছিল , ওখানে সে প্রায় ৫০০ বছর (!) বয়সী দাদাজি মহারাজ বা বরফানি বাবার সাক্ষাৎ পেয়েছিল ! সেবার ন’কাকা ওখানে যাবার পর মাস্টারমশাই(সুদর্শন বাবু) ভাগ্নে পিন্টুকে দাদাজি মহারাজের সাথে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা – ন’কাকাকে বলার জন্য অনুরোধ করলেন । মামার (মাস্টারমশাই) কথা শেষ হতে না হতেই – পিন্টু ন’কাকাকে প্রথমে জড়িয়ে ধরলো তারপর ন’কাকার পা দুটো এক জায়গা করে ওর মাথাটা জোড়া পায়ে ঠেকিয়ে বলল – ” মামা ! আমাদের ওই দূর থেকে দেখা অথবা দু ঘন্টা লাইন দিয়ে দেখা কোন মহাপুরুষের প্রয়োজন নাই , আমরা চাই ন’কাকার মতো মহাপুরুষদের ! যাঁকে আমরা ছুঁতে পারবো , যাঁকে আমরা জড়িয়ে ধরতে পারবো – একটু সেবা করতে পারবো , যিনি আমাদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করবেন !”
পিন্টুর কথাগুলো সেদিন আমার খুবই ভালো লেগেছিল ! সত্যিই তো – পিন্টু আমাদের মনের কথাই তো বলেছে ! আমরা তো গুরু মহারাজকে (স্বামী পরমানন্দ) , ন’কাকাকে এমনি করেই পেতে চেয়েছিলাম । অবশ্য তাঁদের কৃপায় পেয়েছিলামও ! আগেই বলা হয়েছে – আমার জীবনে গুরু মহারাজ ছিলেন বাবা-র মতো , আর ন’কাকা ছিলেন যেন মা-য়ের মতো ! সব সময় শান্ত , স্নিগ্ধ , চন্দ্র কিরণের ন্যায় শীতল ! যার কাছে অকপটে সব বলা যায় , দোষ করলে স্বীকার করা যায় এবং অবশ্যই সেই ক্ষমাসুন্দরের কাছে ক্ষমাও পাওয়া যায় ।
যাইহোক , আবার ফিরে আসি শ্রীরামপুরের মাষ্টারমশাই-এর কথায় ! মাষ্টারমশাই-এর নানাবিধ গুণের মধ্যে একটা অন্যতম ছিল দূর্লভ সামগ্রীর Collection ! কেমন সেই Collection ? যেমন ধরুন – ‘সারদা মায়ের মাথার চুল’ , ‘ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের খাওয়া ভাতের দানা'(যেটা শক্ত এবং প্রায় কালো হয়ে যাওয়া চাল হয়ে গিয়েছে) , ‘বামদেবের গলার রুদ্রাক্ষের মালা’ , ‘আনন্দময়ী মায়ের ব্যবহৃত কিছু জিনিস’ – ইত্যাদি আরও অনেক কিছু ! এই সুদুর্লভ সামগ্রীগুলি সংরক্ষণের জন্য মাষ্টারমশাই প্রত্যেকটি জিনিসকেই পৃথক পৃথক ভাবে রূপোর কৗেটোর মধ্যে মখমলের ছোট ছোট কাপড়ে বেঁধে ওনার ঠাকুরের আসনের নীচে অত্যন্ত যত্ন করে রেখে দিতেন! যে কাউকে উনি এগুলিকে দেখাতেনও না – তবে উনি ন’কাকাকে সব জিনিসগুলি রূপোর কৗেটো থেকে বের করে করে দেখিয়েছিলেন ৷ উনি সেদিন বলেছিলেন – এইসব সামগ্রীগুলির বেশিরভাগই অদ্ভুতভাবে বা অলৌকিকভাবে বাড়ীতে বসে বসেই উনি পেয়ে গিয়েছিলেন ! হয়তো কোন সাধুবাবা ওনার ঘরে এসে দিয়ে গেছেন অথবা কেউ সন্ধান দিয়েছে যে ‘অমুক’ জায়গায় গেলে ‘অমুক’ জিনিসটা পাওয়া যাবে এবং সেখানে গিয়ে উনি ঐ বিশেষ সামগ্রীটি পেয়ে যেতেন! এইভাবেই অতকিছু Collection জমা হয়েছিল ওনার !
যাইহোক , সেদিন সমস্ত সামগ্রী দেখানোর পর মাষ্টারমশাই (সুদর্শন বাবু) হঠাৎ করে বামদেবের রুদ্রাক্ষের মালাটা ন’কাকার হাতে দিয়ে বলে উঠলেন – ” দেখুন তো – এই মালাটি কি সত্যিই বামদেবের গলার রুদ্রাক্ষের মালা ?” মাষ্টারমশাই-এর কথা শেষ হোতে না হোতেই ন’কাকা হাততালি দিয়ে হেসে উঠে বললেন – ” ওঃ! দ্যাখো – মাষ্টারমশাই-এর কান্ডকারখানা ! ঐ রুদ্রাক্ষের মালাটা তো ‘খ্যাপা’-র গলাতেই থাকতো ! ওটা কৈলাশপতি ‘খ্যাপা’-কে দিয়েছিল !” মাষ্টারমশাই সাথে সাথেই ন’কাকাকে জড়িয়ে ধরে , সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন – ” আজ আমার দুদিক দিয়ে মনের ধন্দ দূর হ’ল ! একটা ঐ ‘মালা’-টা আসল কিনা , আর একটা এই ব্যক্তিটা (ন’কাকা) আসল কিনা !” মাষ্টারমশাই একটু রসিক লোক ছিলেন – তাই রসিকতা করেই কথা বলতেন ।(ক্রমশঃ)