গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ গিরি বিদেশ থেকে ফিরে বনগ্রাম আশ্রমে সিটিং-এ বলেছিলেন – “ভারতীয়রা তো আমাকে প্রথমে খুব একটা পাত্তা দেবে না , ইউরোপীয়রা স্বামী পরমানন্দের নামে যখন ‘বিউগিল’ বাজাবে – তখন তোদের ভারতীয়রা ওদের তালে তালে ‘ধুন্ধুরা’ (ঢাক-ঢোল) পেটাবে !” এই ধরনের আরও অনেক কথা উনি বলেছিলেন ! পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের বড় বড় পণ্ডিতেরা আমাকে চেনে ! তারা আমার বক্তব্য নিয়ে রিসার্চ করা শুরু করে দিয়েছে ! দেখবি কিছুদিন পর থেকেই – তার ফল প্রকাশ হতে শুরু করবে ।” বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন সম্বন্ধে বলে গেছেন – “আমি তো এদেশের মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাহায্যে এই আশ্রমের কাজগুলো (Building তৈরি বা আশ্রম পরিচালনা) সম্পন্ন করছি ! পরবর্তীতে বিদেশ থেকে টাকা আসবে ! এত টাকা আসবে যে সেই সব হিসাব রাখার লোক Appoint করতে হবে !” একবার বলেছিলেন – ” বিদেশ থেকে সরাসরি পরমানন্দ মিশনে আসার জন্য হেলিপ্যাড বা ছোট বিমান নামার ব্যবস্থা হবে ওই মাঠে ! বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে সাধুদের জন্য প্রাশ্চাত্যের দেশগুলি যাবার জন্য কোন পাসপোর্ট দরকার হবে না ! পরমানন্দ মিশনের সাধু বা সন্ন্যাসী – এই পরিচয়টাই যথেষ্ট হবে !”
এগুলো সবই হবে – কিন্তু তারজন্য বর্তমানে যেসব নবীন প্রজন্মের যুবকেরা পরমানন্দ মিশনে ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসী হিসাবে কাজ করছে – তাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে । গুরু মহারাজ বলেছিলেন – ” তুমি যতক্ষণ না বিশুদ্ধ ও পবিত্র হচ্ছ , ততক্ষণ তোমার ভিতর দিয়ে ভগবৎ শক্তির ক্রিয়া হবে না । তোমার Purity বা পবিত্রতার প্রয়োজন ।” – গুরু মহারাজের বলা এই মহামন্ত্র পরমানন্দ মিশনের নবীন প্রজন্মের ‘জপমালা’ হওয়া উচিত বলে আমার মনে হয় ৷ তবেই তো তাদের মধ্যে দিয়েও ভগবৎ শক্তির প্রকাশ দেখা যাবে , তবেই তো স্বদেশে ও বিদেশে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে , তবেই তো With-out Passport – শুধুমাত্র ‘পরমানন্দ মিশনের সাধু’ – বলেই সর্বত্র তার অবাধ যাতায়াত ঘটবে ! আমরা সেই সব দিনের প্রত্যাশায় নবীন প্রজন্মের ত্যাগী যুবকদের জন্য শ্রীভগবান্ স্বামী পরমানন্দের কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি ! তারা যেন সমস্তরকম ভোগেচ্ছা তুচ্ছ জ্ঞান করে ত্যাগের মহিমময় জীবনকে গ্রহন করে এবং এই জীবনেই পরম পুরুষার্থ লাভ করে জীবন ধন্য করে!!
এখন উপক্রমণিকা ছেড়ে আমরা ফিরে যাই আবার গুরু মহারাজের ইউরোপে থাকাকালীন দিনগুলির কথায় ! আগেই বলা হয়েছিল যে , গুরু মহারাজ ইউরোপ ভ্রমণকালে দুটো দেশের যেখানে যেখানে বর্ডার পড়ছিল (আসলে ‘ইউরো-রেল’ – সমগ্র ইউরোপের প্রায় সমস্ত দেশকে Cover করে , তাই ‘ইউরো-রেলে’ এক দেশ থেকে বিভিন্ন দেশে যাওয়া যায় এবং বারবার বর্ডার পড়ে) – সেখানেই চেকিং , পাসপোর্ট দেখাও – ভিসা দেখাও – অন্যান্য বৈধ কাগজপত্র দেখাও – তাছাড়া ট্রেনে দু-তিন ঘণ্টা আটকে থাকার ঝামেলা এসব তো রয়েছেই ! কিন্তু একবার ‘ইউরো-রেলে’ ঐ রকম কোন একটা বর্ডারে যা অঘটন ঘটেছিল সেটা গুরু মহারাজ বলেই সামাল দিয়েছিলেন – অন্য কেউ হলে সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই অন্যরকম হতো ! ঘটনাটা বলছি !
গুরু মহারাজ ‘ইউরো-রেলে’ চেপে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাচ্ছিলেন – সঙ্গে বেয়ন পেটারসন । খুব সম্ভবতঃ বুলগেরিয়া Border-এ ট্রেন দাঁড়িয়ে রয়েছে – চেকিং চলছে ! গুরু মহারাজরা যে কম্পার্টমেন্টে ছিলেন সেখানে দুজন জাপানি যুবক ছিল যারা এশিয়াড বা অলিম্পিকে কোন সোনা-রূপো পেয়েছিল – তাই সরকারি টাকায় ইউরোপ ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিল বলে ‘ইউরো-রেল’ করে এদেশ ওদেশ করছিল , আর ছিল একজন আমেরিক্যান যিনি হয়তো অরিজিনালি ব্রাজিলীয় বা আফ্রিকান অর্থাৎ রংটা কুচকুচে কালো আর মল্লবীর যোদ্ধার মত সুন্দর লম্বা চওড়া পেশীবহুল শরীর স্বাস্থ্য) ! তাছাড়াও দু-একজন ইউরোপীয়রাও ছিল । ওসব দেশের জনসংখ্যা কম – সবারই গাড়ি রয়েছে , ফলে ট্রেনে-বাসে কখনোই ঠাসাঠাসি ভিড় হয় না !
সে যাইহোক, বর্ডারের অফিসারেরা সব জায়গায় চেক করতে করতে গুরুমহারাজেরা যে compartment_এ বসেছিলেন, সেখানেও এসে পৌঁছালো এবং সবার কাগজপত্র এবং লাগেজ চেক করতে লাগল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, ঐ ব্ল্যাক আমেরিকানটার কাছে গিয়ে শ্বেতাঙ্গ অফিসারেরা ওর সাথে বাজে ব্যবহার করতে শুরু করল! ওদের এইরকম অদ্ভুত আচরন দেখে কামরার সকলেই বিরক্ত হচ্ছিল _কিন্তু কি-ই বা করার আছে! কিন্তু ঐ compartment_এ যখন স্বয়ং ভগবান রয়েছে _তখন কিছু তো একটা হবেই! কি ঘটল দ্যাখা যাক্!!
ঐ compartment_এ দুজন অফিসার উঠছিল আর সিকিউরিটি স্টাফেরা কামরার গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। ঐ অফিসার দুজন কামরার সবার কাগজপত্র দেখার পর ঐ কালো ছেলেটির কাছে গিয়েছিল। ছেলেটির কাগজপত্র একজন দেখছিল অন্যজন লাগেজ! আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ওরা দুজনেই ছেলেটির সঙ্গে একইরকম বাজে ব্যবহার করল! একজন ছেলেটির কাগজপত্র চেক করার পর _সেগুলি ওর হাতে ফেরত না দিয়ে সিটের উপর ছুঁড়ে দিল এবং অন্যজন ওর ব্যাগ থেকে জিনিসপত্র টেনে বের করে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছড়িয়ে ফেলেছিল! ছেলেটি অনেকক্ষণ ধরে অফিসারটিকে ঐরকম না করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছিল, কিন্তু কে শোনে কার কথা!
শেষে ছেলেটি রেগেমেগে বড় বড় চোখ পাকিয়ে বলে উঠল _”যা যা মাল ফেলেছ, ওগুলো সব যেমন ছিল _সেই অবস্থায় রাখো, নাহলে কিন্তু তোমরা আমার কাছে punishment পাবে!”
একথা শুনেই প্রথমজন একেবারে রে-রে করে উঠল _আর তারপরেই একেবারে ওর কাছে গিয়ে, ওর দিকে আঙুল তুলে _ওকে একটা খিস্তি করে গালাগালি দিল। আর যায় কোথায় _” লাগি গেল _লাগি গেল গন্ডগোল….!!! ” পরের অংশ পরের দিন…! (ক্রমশঃ)